ঢাকা ০২:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
চট্টগ্রাম বন্দরে রাশিয়ান নৌবাহিনীর দুই জাহাজের শুভেচ্ছা সফর। গাজীপুরে স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়িচাপায় শিক্ষিকার মৃত্যু। বাগেরহাটে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা রাজমিস্ত্রী গ্রেফতার। ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি এবং সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি। আল্টিমেটামের ভেতরেই ট্রাম্পের যুদ্ধ বিরতি,কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ? ফুলছড়িতে জুয়ার আসরে অভিযান: মবের কবলে পুলিশ, উত্তেজনার মধ্যেই ৭ জুয়ারী গ্রেফতার। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন সেই দুর্নীতিবাজ আব্দুর রশিদ মিয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ——মিজান চৌধুরী। বিজয়নগরে ১০ হাজার ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার। নড়াইলের কালিয়ায় মাংস ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ২৫ গ্রেপ্তার ২০।

আল্টিমেটামের ভেতরেই ট্রাম্পের যুদ্ধ বিরতি,কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিনা উস্কানিতে ইরানে হামলার পর ২১ মার্চ শনিবার যুদ্ধের, ২২তম দিনে ইরানকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হরমুজ প্রনালির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আল্টিমেটাম ঘোষনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করায় বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নাটকীয় পতন ঘটে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

আল্টিমেটাম, হুমকি ও হঠাৎ স্থগিতাদেশঃ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে। পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফসহ সামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থান জানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে “ফলপ্রসূ আলোচনা” হয়েছে এবং তিনি পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত করেন।

অন্যদিকে ইরান এই আলোচনার দাবি অস্বীকার করে বলেছে, কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি; বরং তাদের কঠোর অবস্থানের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটেছে।

পাল্টাপাল্টি হুমকি-যুদ্ধের বিস্তারের আশঙ্কাঃ

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) স্পষ্টভাবে জানায়—ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানবে।

এছাড়া হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে মাইন পেতে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেয় তেহরান।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাল্টা হুমকি কার্যকর হলে তা সরাসরি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ দিতে পারত।

তেলের বাজারে বড় ধাক্কাঃ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

রয়টার্স ও সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে ৯৬ ডলারে নেমে আসে, যদিও পরে কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে প্রায় ১০৪ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়। একইভাবে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট(WTI) তেলের দামও বড় পতনের মুখে পড়ে, যা ১৩%-এর বেশি পড়ে গিয়ে একপর্যায়ে ৮৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। এর আগে সংঘাতের জেরে তেলের দাম ৫০% পর্যন্ত বেড়েছিল। ফলে বাজারে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দরপতনের মূল কারণ ছিল সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার ইঙ্গিত। এর আগে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দাম দ্রুত বাড়ছিল। কারণ, বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, ইসলামিক র‍্যাভুলুশনারী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পাল্টা হুমকি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করবে। এতে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের নতুন মন্তব্যঃ

বৈশ্বিক জ্বালানির ‘লাইফলাইন’বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। ইরান দাবি করছে—শত্রু দেশের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তবে বাস্তবে বহু জাহাজ আটকে পড়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুব শিগগিরই খুলে দেওয়া হতে পারে। সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর হলে দ্রুতই এ সমুদ্রপথ সচল হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যৌথভাবে প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। এ সময় তিনি “আমি আর আয়াতুল্লাহ” বলে মন্তব্য করেন, যা ইরানের নেতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর এটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ট্রাম্প জানান, চলমান আলোচনা সংঘাত নিরসনে কিছুটা আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের নতুন কৌশল: মাশুল আরোপঃ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর হুমকি ও চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কিছু জাহাজের ওপর প্রায় ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আরোপের কথা জানিয়েছে। দেশটির আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজেরদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং কে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। জবাবে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের শত্রু ছাড়া অন্যদের জন্য প্রণালী উন্মুক্ত থাকবে। সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যদিও পরে কিছুটা স্থিতিশীল হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়—বরং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপঃ

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের সরকারগুলো সরকারি ছুটি ঘোষণা, বাধ্যতামূলকভাবে বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার মতো জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংকটের প্রভাবে বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে—

শ্রীলঙ্কায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতীব জরুরি নয় এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ লিটার পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে।

ভুটানে মজুতদারি রোধে জেরি ক্যানে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস নির্ধারণ এবং সরকারি দপ্তরে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

ফিলিপাইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ সীমিত করা হয়েছে।

ভিয়েতনামে যতটুকু সম্ভব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাগরিকদের গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে তীব্র সংকটে পেট্রলপাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে ‘জোড়-বিজোড়’ রেশনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে।

কম্বোডিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রলপাম্প কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। লাওসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং যাতায়াত কমাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি চালু হয়েছে।

মিসরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৯টার মধ্যে বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁ এবং সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সরকারি ভবন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের আলোও বন্ধ রাখা হচ্ছে।

কেনিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধের পাশাপাশি রেশনিং চালু হয়েছে। দেশটির বর্তমান মজুত কেবল এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডিজেল সংকট ও আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা রুখতে শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রিত বরাদ্দের ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।

নিউজিল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের নীতি অনুসরণ করে সপ্তাহে এক দিন ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার ‘গাড়িমুক্ত দিবস’ চালুর কথা ভাবছে সরকার। জ্বালানি মজুত পর্যবেক্ষণে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যের কারণে এয়ার নিউজিল্যান্ডের কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

স্লোভাকিয়ায় ডিজেল মজুতদারি ঠেকাতে সরকারিভাবে ক্রয়ের কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। স্লোভেনিয়ায় স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

এসব পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের ভয়াবহতা এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশগুলো কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা-ই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তাঃ

International Energy Agency–এর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন,

এই সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট কিংবা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।

সংস্থাটি ইতোমধ্যে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আরও ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা: কারা থামাল সংঘাত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তুরস্ক ও মিসরসহ একাধিক দেশ বার্তা আদান-প্রদান করছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আঞ্চলিক নেতাদের কাছ থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছেন—ইরানে হামলা হলে ভয়াবহ পাল্টা আঘাত আসতে পারে।

যদিও ট্রাম্প ‘সম্পূর্ণ সমাধান’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করছে।

‘চোরাবালিতে আটকে’ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলঃ

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সংঘাতে ‘চোরাবালিতে’ আটকে গেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘ভুয়া আলোচনার’ গল্প ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, আলোচনা ইতিবাচক এবং দ্রুত সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, যখন ইরান দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে “চোরাবালিতে আঁটকে গেছে”। ইরানের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক কৌশলে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তারা এখন একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। তার ভাষায়, “এটি এমন এক চোরাবালি, যেখানে যতই এগোনোর চেষ্টা করা হচ্ছে, ততই তারা গভীরে ডুবে যাচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে একের পর এক হুমকি ও পাল্টা হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও—তেলের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।

ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেও বাস্তবে তারা কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তেলআবিব দাবি করছে, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ইরানের কর্মকাণ্ডই অস্থিতিশীলতার মূল কারণ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই “চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার” বক্তব্য মূলত একটি কৌশলগত বার্তা—যার মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চায় যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমর্থন জোগাড়েরও একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার আগে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।

ভবিষ্যৎ কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা স্পষ্ট—

আলোচনা সফল হলে হরমুজ প্রণালি খুলে যেতে পারে, ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই পাঁচ দিনের ‘বিরতি’ কি শান্তির পথ খুলবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের পূর্বাভাস!

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরে রাশিয়ান নৌবাহিনীর দুই জাহাজের শুভেচ্ছা সফর।

আল্টিমেটামের ভেতরেই ট্রাম্পের যুদ্ধ বিরতি,কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ?

আপডেট সময় : ১২:৪২:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিনা উস্কানিতে ইরানে হামলার পর ২১ মার্চ শনিবার যুদ্ধের, ২২তম দিনে ইরানকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হরমুজ প্রনালির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আল্টিমেটাম ঘোষনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করায় বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নাটকীয় পতন ঘটে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

আল্টিমেটাম, হুমকি ও হঠাৎ স্থগিতাদেশঃ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে। পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফসহ সামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থান জানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে “ফলপ্রসূ আলোচনা” হয়েছে এবং তিনি পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত করেন।

অন্যদিকে ইরান এই আলোচনার দাবি অস্বীকার করে বলেছে, কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি; বরং তাদের কঠোর অবস্থানের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটেছে।

পাল্টাপাল্টি হুমকি-যুদ্ধের বিস্তারের আশঙ্কাঃ

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) স্পষ্টভাবে জানায়—ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানবে।

এছাড়া হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে মাইন পেতে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেয় তেহরান।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাল্টা হুমকি কার্যকর হলে তা সরাসরি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ দিতে পারত।

তেলের বাজারে বড় ধাক্কাঃ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

রয়টার্স ও সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে ৯৬ ডলারে নেমে আসে, যদিও পরে কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে প্রায় ১০৪ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়। একইভাবে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট(WTI) তেলের দামও বড় পতনের মুখে পড়ে, যা ১৩%-এর বেশি পড়ে গিয়ে একপর্যায়ে ৮৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। এর আগে সংঘাতের জেরে তেলের দাম ৫০% পর্যন্ত বেড়েছিল। ফলে বাজারে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দরপতনের মূল কারণ ছিল সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার ইঙ্গিত। এর আগে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দাম দ্রুত বাড়ছিল। কারণ, বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, ইসলামিক র‍্যাভুলুশনারী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পাল্টা হুমকি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করবে। এতে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের নতুন মন্তব্যঃ

বৈশ্বিক জ্বালানির ‘লাইফলাইন’বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে। ইরান দাবি করছে—শত্রু দেশের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তবে বাস্তবে বহু জাহাজ আটকে পড়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুব শিগগিরই খুলে দেওয়া হতে পারে। সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর হলে দ্রুতই এ সমুদ্রপথ সচল হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যৌথভাবে প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। এ সময় তিনি “আমি আর আয়াতুল্লাহ” বলে মন্তব্য করেন, যা ইরানের নেতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর এটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ট্রাম্প জানান, চলমান আলোচনা সংঘাত নিরসনে কিছুটা আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের নতুন কৌশল: মাশুল আরোপঃ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর হুমকি ও চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কিছু জাহাজের ওপর প্রায় ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আরোপের কথা জানিয়েছে। দেশটির আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজেরদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং কে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। জবাবে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের শত্রু ছাড়া অন্যদের জন্য প্রণালী উন্মুক্ত থাকবে। সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যদিও পরে কিছুটা স্থিতিশীল হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়—বরং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপঃ

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের সরকারগুলো সরকারি ছুটি ঘোষণা, বাধ্যতামূলকভাবে বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার মতো জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংকটের প্রভাবে বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে—

শ্রীলঙ্কায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতীব জরুরি নয় এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ লিটার পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে।

ভুটানে মজুতদারি রোধে জেরি ক্যানে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস নির্ধারণ এবং সরকারি দপ্তরে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

ফিলিপাইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ সীমিত করা হয়েছে।

ভিয়েতনামে যতটুকু সম্ভব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাগরিকদের গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মিয়ানমারে তীব্র সংকটে পেট্রলপাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে ‘জোড়-বিজোড়’ রেশনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে।

কম্বোডিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রলপাম্প কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। লাওসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং যাতায়াত কমাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি চালু হয়েছে।

মিসরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৯টার মধ্যে বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁ এবং সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সরকারি ভবন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের আলোও বন্ধ রাখা হচ্ছে।

কেনিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধের পাশাপাশি রেশনিং চালু হয়েছে। দেশটির বর্তমান মজুত কেবল এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডিজেল সংকট ও আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা রুখতে শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রিত বরাদ্দের ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।

নিউজিল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের নীতি অনুসরণ করে সপ্তাহে এক দিন ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার ‘গাড়িমুক্ত দিবস’ চালুর কথা ভাবছে সরকার। জ্বালানি মজুত পর্যবেক্ষণে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যের কারণে এয়ার নিউজিল্যান্ডের কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

স্লোভাকিয়ায় ডিজেল মজুতদারি ঠেকাতে সরকারিভাবে ক্রয়ের কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। স্লোভেনিয়ায় স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

এসব পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের ভয়াবহতা এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশগুলো কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা-ই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তাঃ

International Energy Agency–এর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন,

এই সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট কিংবা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।

সংস্থাটি ইতোমধ্যে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আরও ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা: কারা থামাল সংঘাত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তুরস্ক ও মিসরসহ একাধিক দেশ বার্তা আদান-প্রদান করছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আঞ্চলিক নেতাদের কাছ থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছেন—ইরানে হামলা হলে ভয়াবহ পাল্টা আঘাত আসতে পারে।

যদিও ট্রাম্প ‘সম্পূর্ণ সমাধান’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করছে।

‘চোরাবালিতে আটকে’ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলঃ

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই সংঘাতে ‘চোরাবালিতে’ আটকে গেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘ভুয়া আলোচনার’ গল্প ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, আলোচনা ইতিবাচক এবং দ্রুত সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, যখন ইরান দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে “চোরাবালিতে আঁটকে গেছে”। ইরানের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক কৌশলে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তারা এখন একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। তার ভাষায়, “এটি এমন এক চোরাবালি, যেখানে যতই এগোনোর চেষ্টা করা হচ্ছে, ততই তারা গভীরে ডুবে যাচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে একের পর এক হুমকি ও পাল্টা হুমকির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও—তেলের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।

ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেও বাস্তবে তারা কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তেলআবিব দাবি করছে, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ইরানের কর্মকাণ্ডই অস্থিতিশীলতার মূল কারণ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই “চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার” বক্তব্য মূলত একটি কৌশলগত বার্তা—যার মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চায় যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সমর্থন জোগাড়েরও একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার আগে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।

ভবিষ্যৎ কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা স্পষ্ট—

আলোচনা সফল হলে হরমুজ প্রণালি খুলে যেতে পারে, ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই পাঁচ দিনের ‘বিরতি’ কি শান্তির পথ খুলবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের পূর্বাভাস!