নির্বাচন শেষ। এখন নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষা। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন। পুরো জাতি তাকিয়ে আছে সেদিকেই। এদিকে সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাকিয়ে আছেন, নতুন সরকার প্রশাসন কীভাবে সাজায়, তার দিকে।
নির্বাচনি ছুটির পর গতকাল (১৫ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে ছিল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথম কর্মদিবস। সপ্তাহের শুরুর এই দিনে সচিবালয় কর্মকর্তাদের মাঝে আলোচনা চলে, কোন কর্মকর্তার কোথায় পদায়ন হতে পারে? কোন কোন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) পদে কোন কোন কর্মকর্তা নিয়োগ পেতে পারেন? আবার এমন আলোচনাও শোনা গেছে, কোন কোন কর্মকর্তা কোন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পিএস পদে যোগদানে (!) কতদূর অগ্রসর হয়েছেন। সচিবালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার কক্ষে গতকাল কথা বলে এসব জানা গেছে।
কর্মকর্তাদের আলোচনায় ‘সরেস রসদ’ হিসেবে যোগ হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ আকস্মিকভাবে বাতিল করার আদেশ। অনেক কর্মকর্তার ধারণা, এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজ পছন্দের কর্মকর্তাকে সহজেই নিয়োগ দিতে পারবে।
সদ্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদের সঙ্গে দেশের ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের সংযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আব্দুর রশীদের চুক্তি বাতিলের পর চুপসে গেছেন দেড় বছর ধরে দাপিয়ে বেড়ানো কর্মকর্তাদের অনেকেই।
সচিবালয়ের বেশ কয়েক জন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রশাসনকে গতিশীলতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য প্রতিটি সরকারই যোগ্য বিবেচিত কর্মকর্তাদের যথাযথ স্থানে পদায়ন করে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
আলাপে কর্মকর্তারা জানান, সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ৮৫ ব্যাচের এক কর্মকর্তার নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এ ছাড়া ভিন্ন আদর্শের কয়েকজন সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হতে যাচ্ছে। নিয়মিত পদোন্নতি পাওয়া অথচ বিতর্কিত ও সমালোচিত কয়েক জন সচিবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সম্ভাবনা আছে।
সচিবালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পরবর্তী সরকার হয়তো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে অধিকতর যোগ্য কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে পারে। বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া স্বরাষ্ট্র সচিবের পরিবর্তে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে অন্য কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
আলোচনার ভিড়ে উঠে এসেছে প্রশাসনের জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তার কথা, যারা সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ থেকে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ধর্মভিত্তিক বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবে যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের পরিবর্তে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের পক্ষেও গতকাল জোরালো আলোচনা ছিল সচিবালয়ে। এসব আলোচনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দলীয় মনোভাব সম্পন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের ক্ষোভও দেখা গেছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, ছাত্রজীবনের অল্প-স্বল্প রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেক বড় বড় পদ হাতিয়ে নেন তুলনামূলক বিচারে কম দক্ষতাসম্পন্ন অনেকেই।
কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, এসব কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যেন ভবিষ্যতে ছাত্রজীবনের পরিচয় ব্যবহার করে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা নিয়োগ নিতে না পারেন।
কর্মকর্তারা চাইছেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক আদর্শের কারণে বঞ্চিত যোগ্য কর্মকর্তাদের যেন এবার যথাযথ স্থানে পদায়ন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। স্বভাবতই তাদের লক্ষ্য থাকবে সরকার পরিচালনায় সফল হতে। তাই দলের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকার প্রশাসনের কার্যকারিতা গতিশীল করার ব্যবস্থা নেবে, এটাই প্রত্যাশিত। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রশাসনের পেশাদারত্ব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তবে দলের প্রতি অনুগত কর্মকর্তারা যদি সৎ ও দক্ষ হন, তাহলেও প্রশাসন ভালো চলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে প্রশাসন দলনিরপেক্ষ থাকার কথা। আমাদের দেশে যুক্তরাজ্যের সরকার পদ্ধতি বা যুক্তরাজ্যের মতো ওয়েস্ট মিনস্টার মডেল অনুসরণ করা হয়। তাই আমাদের দেশেও সরকারের অধীনে যে প্রশাসন থাকে, সেই প্রশাসন (ব্যুরোক্রেসি) দল নিরপেক্ষ হওয়ার কথা।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো ভালো রাষ্ট্রের ব্যুরোক্রেসি সরকারের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে না। ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎসময়ের সরকার ভালো করেনি। তাই আইন করে সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরোক্রেসিতে আমাদের মতো প্রশাসনের হাতে ৯০ ভাগ ও রাষ্ট্রপতির হাতে ১০ ভাগ নিয়োগের ক্ষমতা থাকে । যুক্তরাষ্ট্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে আমলাতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, লেজুড়বৃত্তি করা আমলাতন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র ভাল চলে না।’
আব্দুল আউয়াল মজুমদার আরও বলেন, ‘আমলাতন্ত্র হবে অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দক্ষ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ভারতের মতো রাষ্ট্রে কেবল উপযুক্ত ও দক্ষরাই এই দায়িত্বে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। এমনকি পাকিস্তানের ব্যুরোক্রেসিতে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি নেই। ফলে পাকিস্তানের এত অধঃপতনের পরও তাদের আমলাতন্ত্র স্বাধীন, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিমুক্ত। সে দেশের ব্যুরোক্রেসি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন পেশাদারত্ব দিয়ে পরিচালিত হয়। আমাদের ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্রকে বিরাজনীতিকীকরণ করতে হবে। যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ, পেশাদার যেসব কর্মকর্তা সার্ভিসে আছেন, তাদের কাজে লাগাতে হবে। এসব কর্মকর্তাকে কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে। আদরে-শাসনে, নজরদারিতে রাখতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর খারাপ কাজের জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সফলতা পাবে সরকার।’
সারাক্ষণ ডেস্ক 




















