রাহুর কবলে পড়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নানা কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। সেই টাকায় তারা রাজধানীতে বাড়ী,গাড়ি,প্লট,ফ্ল্যাট এমন কি বড় বড় শপিং মলে শোরুমে দোকান কিনে নামে-বেনামে ব্যবসা বাণিজ্যও করছেন। তাদের জীবনযাত্রা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। তারা মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বছরের পর বছর একই দপ্তরে চাকুরী করে যাচ্ছেন। চেয়ারম্যান বদল হলেও তাদের বদলী হয়না।
সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানাগেছে, বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে (শেখ হাসিনার শাসনামলে) বিসিকে দুর্নীতবাজদের নিয়োগ ও পদায়ন ঘটে। আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, নূরুল মজিদ হুমায়ুন ও প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এই প্রতিষ্ঠানটিকে শতভাগ আওয়ামীকরণ করে দুহাতে সরকারী অর্থ হরিলুট করেন। ততসময়ে ফরিদপুরের কোঠায় আওয়ামী লীগের কট্রোর সমর্থক সরোয়ার হোসেনকে বিসিকের লবণ সেলের প্রধান পদে (উপমহাব্যবস্থাপক) পদায়ন করা হয়। সেই থেকে সরোয়ার হোসেন অদ্যবধি লবণ সেল প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি বছর পর পর এই পদে রদবদলের বিধান থাকলেও সেটি প্রতিপালন করা হয়নি আওয়ামী লীগ আমলে। এমন কি অন্তরবর্তীকালীন সরকার আমলেও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের এই দোসর রয়েছেন বহাল তবিয়তে। এই সুদীর্ঘ সময় তিনি লবণ সেলের প্রধান পদে থেকে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট আজ ১৫ বছর যাবত বিসিকে বিকল্প প্রশাসন পরিচালনা করছে। তারা নিয়োগ,বদলী,টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিসিকে যে চেয়ারম্যানই বদলী হয়ে আসুক না কেন তাকেই এই সিন্ডিকেট জিম্মি করে ফেলেন। ফলে কোন চেয়ারম্যানই সরোয়ার গংদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
এই উপমহাব্যবস্থাপক সরোয়ার হোসেন সরকারী নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তার নিজস্ব কৌশল খাটিয়ে বিসিকের লবণ সেল প্রধান হিসাবে কর্মরত আছেন ২০১৯ সাল হতে অদ্যাবধি। দীর্ঘ ৮ বছর লবণ সেল প্রধানের দায়িত্বে থেকে লবণ সেলকে তার ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। মিল মালিকদের কাছে যে আয়োডিন বিক্রি করা হয় তার হিসাব নয়ছয় করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। এই খাতের আয় ব্যয়ের হিসাব চেয়ে চিঠি ইস্যু করায় তিনি রাজনৈতিক তদবীর করে একজন পরিচালক প্রশাসনকে অন্যত্র বদলী করে দিয়েছেন। শুধু তাইই নয়, তিনি লবণ সেলে প্রতিবছর যে ২৫/৩০ কোটি টাকার আয়োডিন ক্রয় করা হয় সেই আয়োডিন ক্রয়ের টেন্ডার নিজের পকেট ঠিকাদারকে পাইয়ে দিয়ে মোটা অংকের টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। গত অর্থ বছরে একজন রাইস মিলের মালিককে আয়োডিন সাপ্লায়ের ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেন। এরপর এই রাইস সিল মালিক ঠিকাদার অতিনিন্মমানের আয়োডিন সাপ্লায় দিলে সেটি ধরা পড়ে যায়। পরবর্তীতে কর্মচারি ও সাংবাদিকদের চাপে সেই অতিনিন্মমানের আয়োডিন বাতিল করা হয়। যেটি এখনো বিসিক এর গোডাউনে রক্ষিত রয়েছে। গত ৮ বছরের লবণ সেলের আয় ব্যায়ের হিসাব নীরিক্ষা করলে সরোয়ার হোসেনের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে বলে সরার ধারনা।
সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলী বিষয়ে ২২ মে ১৯৮৩ সালের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত যা ১৩ জুন ১৯৮৩ তারিখে ইডি/এস এ ১-১৩/৮৩-২৫৭(১০০)স্মারকে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে সরকারি ও বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা/দপ্তর/পরিদপ্তর এবং অন্যান্য বদলীযোগ্য কর্মকর্তা যাহারা একই স্থানে/একই পদে তিন বৎসরের অধিককাল যাবত কর্মরত আছেন, তাহাদের অবিলম্বে বদলী করিতে হইবে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীবৃন্দ অবশ্য এই আদেশের আওতাভূক্ত নহে। উল্লিখিত মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্তের কোন ব্যতিক্রম ঘটিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সরকারি আইন ও সরকারি বিধি অনুসারে চাকুরীচ্যুতিসহ যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৭ তারিখের স্মারক নং-এমই (এডি-৩)-৩৮৮৪-১৩০ এর মাধ্যমে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (ক) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বদলীযোগ্য পদে কর্মচারীগণকে বদলীর প্রয়োজন হইলে প্রথমে তাহাদেরকে একই কর্মস্থলের জন্য অফিসে বদলী করা যাইতে পারে। (খ) একই কর্মস্থলে অন্য অফিসে বদলীর সুবিধা না থাকিলে নিকটতম অফিসে বদলী করা যাইতে পারে। (গ) তাহাদের বেলায় বদলীর জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় সীমা থাকিবে না। (ঘ) শুধুমাত্র প্রশাসনিক প্রয়োজনেই এই দুই শ্রেণীর কর্মচারীকে বদলী করা যাইবে। উপরোক্ত সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করিয়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে বদলী করা হইলে উহা অবশ্যই “হয়রানিমূলক” বলিয়া ধরা হইবে এবং এই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করা “অসদাচরণের” সামিল হইবে।
অতিশয় দুরন্ধর প্রকৃতির একজন লোক মোঃ সরোয়ার হোসেন, যে কোন অসাধ্য সাধনে তার জুড়ি মেলা ভার। কোন দেবতাকে কি ফুল দিয়ে তুষ্ট করতে হয় তা তার ভালভাবেই জানা আছে। কৌশলবাজ এ কর্মকর্তা লবণ সেল প্রধান হিসেবে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারী অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং যার একটি অংশ আত্মসাত করছেন, অপর অংশ বিসিক চেয়ারম্যান এবং অন্যদের পিছনে দুহাতে খরচ করছেন। যার অকাট্য প্রমাণ: যেখানেই বিসিক চেয়ারম্যান সেখানে তার সফরসংগী সরোয়ার।
এই সরোয়ারের প্ররোচনায় বিসিক চেয়ারম্যান সুকৌশলে বিসিকের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেংগে দেয়ার কাজটি করে চলেছেন হরহামেশা। বাংলাদেশে লবন উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রকৃতির উপর নির্ভর। এক্ষেত্রে বিসিক চেয়ারম্যান বা সরোয়ারের এক ফোটা লবন বেশী উৎপাদনের কোন ক্ষমতা নেই। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবন উৎপাদন হবে, আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকলে কম পরিমাণ লবন উৎপাদন হবে। এক্ষেত্রে কারো বাহবা নেয়ার মতো কোন সুযোগ নেই। তথাপি কেউ কেউ লবন উৎপাদনে সাফল্যের অংশীদার হিসাবে তাদেরকে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন-যা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই সরোয়ার হোসেন ২০২০ সালে উপব্যবস্থাপক হতে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন নিয়ম নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে। বিসিকে তার প্রথম নিয়োগ এবং যোগদান বিসিক নৈপুন্য বিকাশ কেন্দ্র, গোপালগঞ্জ শীর্ষক প্রকল্পে। প্রকল্পটি সরকারী জি,ও মূলে রাজস্বখাতে স্থানান্তরিত হয়েছে ২০১৫ সালে। প্রকল্পের জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তর সংক্রান্ত সরকারী নির্দেশনা, জৈষ্ঠতা বিধিমালা এবং বিসিক সার্ভিস রুলস ১৯৮৯ এর পদোন্নতির তফশীলে বর্নিত বিধানমতে ৫ বছর পুর্তির আগেই তিনি পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন যা সম্পূর্ণ বেআইনী। সরকারের প্রচলিত নিয়ম নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে উল্লেখিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন সমাজ।
সরোয়ার হোসেন এলোটি না হয়েও বিসিক এর দুখানা গাড়ি ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ পাওয়াগেছে। তিনি অবৈধপথে উপার্জিত অর্থ দুটি রিয়েল এস্টেট ও আবাসন কোম্পানীতে বিনিয়োগ করেছেন। ঢাকার ধানমন্ডিতে কিনেছেন একাধিক ফ্ল্যাট। নিকট আত্মীয়র কছে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন বলেও তথ্য পাওয়াগেছে। এ বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য বিসিক এর লবণ সেল প্রধান উপমহাব্যবস্থাপক সরোয়ার হোসেন এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এখন সবার একটিই প্রশ্ন,ফ্যাসিবাদের দোসর সরোয়ার হোসেন কিভাবে বিসিক এ বিকল্প প্রশাসন পরিচালনা করছেন? কিভাবে তিনি ৮ বছর লবণ সেলের প্রথান পদে আছেন। তার বদলী হয়না কেন? তিনি অবৈধ পথে যে সম্পদ অর্জন করেছেন তার তদন্ত হচ্ছেনা কেন? আর কতদিন তিনি বিসিক এ দুর্নীতির রাজত্ব পরিচালনা করবেন? শিল্প মন্ত্রণালয় তার ক্ষেত্রে চুপ কেন?
এ ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয় ও সরকারের অপরাপর মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ সমূহের পদক্ষেপ কামনা করেছেন বিসিক এর দেশ প্রেমিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিবৃন্দ।
সারাক্ষণ ডেস্ক 




















