ফায়ার সার্ভিসে
পরিচালক (প্রশাসন) আতাহার হোসেন শহীদের বেসামাল দুর্নীতি!
# জবানবন্দিতে অসঙ্গতি ঘটনাটি ধামাচাপার চেষ্টা
# রহস্যজনক ফোন কলের বিষয় এরিয়া যাওয়া
# লাবনী আক্তারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার
# পেনশন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল
# রহস্য ঘেরা মোবাইল নম্বরের কল রেকর্ড ও মালিকানা নিয়ে ধোঁয়াসা
# জমি বিক্রির অর্থ কোন ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হলো?
রোস্তম মল্লিক
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠানো ৮৫ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য এবং চালক সিহাব উদ্দিনের আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়ায় মারাত্মক অসঙ্গতি ও জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। নিহত সিহাব উদ্দিনের পরিবারের ওপর ভয়ভীতি প্রদর্শন, রহস্যজনক ফোন কল এবং জবানবন্দিতে অসঙ্গতি তৈরি করে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চালক সিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর দিনসহ তিন দিন ধরে শিহাবের এক সহকর্মী দ্বিতীয় স্ত্রীকে ফোনে যোগাযোগ করেন। ফোনদাতা স্পষ্টভাবে জানান যে, ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে চালক সিহাবের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেন প্রর্থীদের কাছ থেকে মোট ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। চাকরি না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত না পেয়ে প্রার্থীরা সিহাবের ওপর চাপ তৈরি করছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া আবেদনে লাবনী আক্তার অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেছেন। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ শহীদ আতাহার হোসেনের সাথে ২০১৯ সাল থেকে সিহাবের পরিচয় ও লেনদেন। ২০২৫ সালের নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে সিহাব ৫০ লাখ টাকা এনে পরিচালককে দেন। ২০২৬ সালের ২ আগস্ট পরিচালক শহীদ আতাহারের বদলি ঠেকানো ও চাকরি নিশ্চিত করার নামে আরও ৩৫ লাখ টাকা—সর্বমোট ৮৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। চুক্তি ভঙ্গ হওয়ায় এবং পরিচালক ফোন রিসিভ বন্ধ করে হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক দেওয়ায়, পাওনাদারদের চাপে সিহাব উদ্দিন বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার গন্দগ্রাম মৌজার ৮ শতক জমিসহ বাড়ি ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেনা শোধের চেষ্টা করেন এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যা করেন।
আশ্চর্যজনকভাবে, বিভাগীয় তদন্ত কমিটির সামনে লিখিত জবানবন্দিতে লাবনী আক্তার সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান দেন!
তদন্ত কমিটির সংগৃহীত জবানবন্দীতে চরম নাটকীয়তা ও অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ফোনদাতার স্পষ্ট বক্তব্যের পর নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী জবানবন্দিতে দাবি করেন যে— ফোনদাতাকে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি বলেন তার স্বামী এই ৮৫ লাখ টাকার লেনদেনের সাথে কোনোভাবেই জড়িত না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বক্তব্যটি স্বাভাবিক নয়। সিহাবের পরিবারকে চাকরিজনিত সুযোগ-সুবিধা ও প্রাপ্য পেনশন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। সেই ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখেই পরিবারটিকে দিয়ে পরিচালককে দায়মুক্ত করার মতো অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। মোবাইলের কল রেকর্ড, ফোনদাতার তথ্য ও বক্তব্য তদন্ত করা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, ফোনদাতা ছিলেন শিহাবের সহকর্মী, উক্ত সহকর্মীকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মো. শহিদ আতাহার হোসেন অফিসে ডেকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং এসব বিষয়ে চুপ থাকতে বলেন। পরিচালকের (প্রশাসন ও অর্থ) অধীনস্থ সহকারী পরিচালক মো. শারফুল আহসান ভুঞার নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি যে ১২ পৃষ্ঠার রিপোর্ট জমা দিয়েছে, তাতে ধামাচাপা দেওয়ার কয়েকটি লক্ষণ স্পষ্ট বলে জানা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। লাবনী আক্তার যে অজানা নম্বর ০১৩…১৬৮ থেকে হুমকি ও নিয়োগ বাণিজ্যের স্বীকারোক্তির ফোন আসার কথা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি সেই নম্বরটির কল ডিটেইলস রেকর্ড বা মালিকানা যাচাই করার কোনো আইনি উদ্যোগ নেয়নি। সিহাব উদ্দিন বগুড়া শহরের ৮ শতক বাড়ি ও জমি ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। সেই বিক্রিত টাকা এবং প্রবাসীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কোন একাউন্টে লেনদেন হলো—তদন্ত কমিটি কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট খতিয়ে দেখেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে গাড়ি চালক সিহাব উদ্দিনের মাতা মোছা. সুফিয়া খাতুনের লিখিত জবানবন্দিতে জানান, মোছা. মরিয়ম খাতুন, মোছা. লাবনী আক্তার ও মোছা. মিনারা খাতুন মুন্নী নামে সিহাব উদ্দিনের তিন জন স্ত্রী ছিল। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুন ও দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. লাবনী আক্তার সিহাব উদ্দিনকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান। অপরদিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন, সিহাব উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. লাবনী আক্তার ও তৃতীয় স্ত্রী মোছা. মিনারা খাতুন মুন্নী কে ফায়ার সার্ভিস সিহাব উদ্দিনের পেনসন বাবদ দুই জনকে ১৫ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা প্রদান করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, ফায়ার সার্ভিস কোন নিয়মে ডিভোর্স স্ত্রীকে পেনসনের অর্থ প্রদান করেছেন।
মৃত্যুর সময় সিহাব উদ্দিনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন স্টেশন অফিসার রফিকুল ইসলামের কাছে কীভাবে পৌঁছাল এবং মৃত্যুর দিন সকালে ফোন রিসিভ না করে কেন কেবল এসএমএস উত্তর দেওয়া হলো—তা নিয়ে গভীর তদন্ত করা হয়নি। সিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবার বা স্ত্রীকে বাদী হতে না দিয়ে তাদের নিজেদের পছন্দের লিডার মো. মমিনকে দিয়ে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করায়, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক। পরিচালক মো. শহিদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে সরাসরি ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কমিটি তাঁর কোনো সাক্ষাৎকার বা বক্তব্যই গ্রহণ করেনি।
তদন্ত কমিটি ডিজিটাল আলামতগুলো উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো তা গোপন করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এর আগেও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক শহিদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে ৮.৭ লাখ টাকার মালামাল গরমিল সংক্রান্ত প্রথম তদন্ত রিপোর্টে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও পরবর্তীতে জালিয়াতি করে দ্বিতীয় রিপোর্টে সবকিছু ‘সচল’ দেখিয়ে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এবারও একই কৌশলে নিজের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ বানিয়ে ৮৫ লাখ টাকার কেলেঙ্কারি ও আত্মহত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিচালক মো. শহীদ আতাহার হোসেন বিসিএস (পশু সম্পদ) ১৯তম ব্যাচের কর্মকর্তা থেকে উপসচিব হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করে তিনি একটি একচ্ছত্র প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চলতি বছরের গত ২ এপ্রিল ২১৮ নম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শহীদ আতাহার হোসেনকে ফায়ার সার্ভিস থেকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে বদলি করা হয়। এরপর কোন এক অদৃশ্য প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে তিনি গত ৬ এপ্রিল বদলি আদেশটি বাতিল করান। ফায়ার সার্ভিসের ১১৭ পদের নিয়োগসহ বিভিন্ন নিয়োগে সিহাবের মতো কর্মচারীদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার ও সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা মো. শহীদ আতাহার হোসেনের রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের পেছনে ঢাকা পড়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চালক মো. সিহাব উদ্দিনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক কৃষি মন্ত্রী ড. মো আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সাথে ঘনিষ্ঠ আলোকচিত্র এবং মির্যা আজমের ডিও লেটার ব্যবহারের মাধ্যমে শহীদ আতাহার হোসেন ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে প্রেষণে পরিচালক হিসেবে যোগদান করে নিজের প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খানকে দিয়ে নিজ পিতার নামে নির্মিত গ্রামের বাড়ির প্রধান গেট উদ্বোধন করানো এবং আওয়ামী বলয়ের শীর্ষ নেতাদের সাথে তাঁর সখ্যতার বিভিন্ন স্থিরচিত্র এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত।
এ-সব অসংগতি নিয়ে তদন্ত কমিটির সভাপতি ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর পাবনার সহকারী পরিচালক মো. শারফুল আহসান ভুঞার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
সারাক্ষণ ডেস্ক 


















