ঢাকা ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
খুলনায় মাদক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৯ মোহনা টিভির অনলাইন শাখায় পুনর্বিন্যাস: আটজনকে অব্যাহতি; বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকির অভিযোগ আহত পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমকে দেখতে হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সচিবালয় (মন্ত্রণালয়) স্থানান্তরের গল্প: ঢাকার বাস্তবতা….. কালিয়াকৈরে অবৈধ আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারী পুরুষ কর্তৃপক্ষ সহ ৩৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ প্রয়াত নন-পুলিশ সদস্যের পরিবারের পাশে কেএমপি, দুর্গাপূজার উপহার দিলেন পুলিশ কমিশনার গণপূর্ত অধিদপ্তরে ১১৬ প্রকৌশলীর  ‎বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ!  ‎ প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর: জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনে হুইপ বকুল পঞ্চগড়ে সদরে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নামে সার ডিলার নিয়োগের আদেশ বাতিল করে : ছোলায়মান আলীকে সার ডিলার নিয়োগের দাবী এলাকাবাসীর জাতীয়তাবাদী ব্যাটারী চালিত থ্রি-হুইলারযান শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন আবুল হাসান খান

রংপুরের চার লাশ: সত্য উদঘাটন হোক, নিরাপত্তার আস্থা ফিরুক।

 

রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগ ও শোকের। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে। একটি পরিবারের চারটি প্রাণ এভাবে নিভে যাওয়া শুধু একটি মর্মান্তিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে উদঘাটন করা।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করছে। ফরেনসিক পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা উদ্দেশ্যকে দায়ী করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না।

কিন্তু তদন্তাধীন—এই যুক্তিতে ঘটনাটিকে গুরুত্বহীন করে দেখারও সুযোগ নেই।

চারজন মানুষ একই বাড়িতে কীভাবে মৃত্যুবরণ করলেন, বাড়িটি কেন তালাবদ্ধ ছিল, মৃত্যুর আগে বা পরে সেখানে কারা যাতায়াত করেছিল, কোনো সংঘর্ষ বা জোরপূর্বক প্রবেশের আলামত ছিল কি না, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে উদ্বেগকে অবহেলা নয়

নিহত পরিবারটি হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে। এই উদ্বেগকে খাটো করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। তাই কোনো নাগরিক তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করা।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো অপরাধের ধর্ম হয় না; অপরাধীর পরিচয় নির্ধারিত হয় তার কর্মকাণ্ডে।

তবে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় পরিচয় হত্যাকাণ্ডের কোনো উদ্দেশ্য বা প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না। সেটি হবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের গুরুতর ঘটনা এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ—প্রমাণই হোক শেষ কথা

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘হিন্দুশূন্য’ করার ষড়যন্ত্রের মতো নানা বক্তব্য সামনে আসতে পারে। এসব বক্তব্যের পেছনে কোনো বাস্তব তথ্য বা ধারাবাহিকতার প্রমাণ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই তা তদন্ত করতে হবে।

কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করা কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা একইভাবে বিপজ্জনক।

কারণ গুজব ও অনুমান কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

বরং এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—তথ্য সংগ্রহ করা, প্রমাণ বিশ্লেষণ করা, অপরাধীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা।

সত্য যদি সাধারণ অপরাধের দিকে নির্দেশ করে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। আর যদি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিও গোপন না করে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি হলো—তার সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা নিরাপদ।

কোনো হিন্দু পরিবার যদি মনে করে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা ঝুঁকিতে আছে, তবে সেই ভয় দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একইভাবে কোনো মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও রাষ্ট্রকে সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে।

কারণ বাংলাদেশ কোনো একটি সম্প্রদায়ের দেশ নয়। বাংলাদেশ তার সব নাগরিকের।

মন্দিরে পূজা, মসজিদে নামাজ, গির্জায় প্রার্থনা কিংবা বৌদ্ধবিহারে প্রার্থনা—এসবের সহাবস্থানই বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের শক্তি। এই সম্প্রীতি নষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তদন্তে কোনো ছাড় নয়

রংপুরের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট।

ঘটনাস্থলের সব আলামত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক তদন্তের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। নিহতদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।

তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এই ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু নিহত পরিবারের স্বজনরাই নয়, বৃহত্তর সমাজও সত্য জানতে চাইছে।

আর যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

গুজব নয়, আস্থা চাই

এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি হয় আতঙ্ক ও পারস্পরিক সন্দেহ।

এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়মিতভাবে জনগণকে জানানো উচিত, যাতে তথ্যের শূন্যস্থান গুজব দিয়ে পূরণ না হয়।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। উত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন শিরোনাম কিংবা যাচাইহীন অভিযোগ নয়—জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে যাচাই করা তথ্য।

চারটি মৃত্যু আমাদের যে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে

গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্য আজ আর নেই। তাঁদের ঘর হয়তো আবার কোনোদিন আগের মতো হবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যেন কেবল একটি সংবাদ হয়ে কয়েকদিন পর বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

এই চারটি মৃত্যু আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে—

বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক কি সত্যিই তাঁর নিজের ঘরে নিরাপদ?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়, আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশিত।

আমরা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না। আমরা চাই না এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন আরও গভীর হোক। আমরা চাই না গুজবের আগুনে নতুন কোনো সহিংসতার জন্ম হোক।

আমরা চাই সত্য।

আমরা চাই ন্যায়বিচার।

আমরা চাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

আর সবচেয়ে বেশি চাই—বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যেন কখনো মনে না করেন, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

রংপুরের তালাবদ্ধ সেই বাড়ির নীরবতা আজ আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে।

রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা একটাই—

দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে চারটি মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করুন। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনুন। আর যদি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়, তার শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে কঠোর ব্যবস্থা নিন।

কারণ একটি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু চারটি প্রাণের প্রতি ন্যায়বিচার নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় মাদক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৯

রংপুরের চার লাশ: সত্য উদঘাটন হোক, নিরাপত্তার আস্থা ফিরুক।

আপডেট সময় : ০৯:০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

 

রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগ ও শোকের। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে। একটি পরিবারের চারটি প্রাণ এভাবে নিভে যাওয়া শুধু একটি মর্মান্তিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে উদঘাটন করা।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করছে। ফরেনসিক পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা উদ্দেশ্যকে দায়ী করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না।

কিন্তু তদন্তাধীন—এই যুক্তিতে ঘটনাটিকে গুরুত্বহীন করে দেখারও সুযোগ নেই।

চারজন মানুষ একই বাড়িতে কীভাবে মৃত্যুবরণ করলেন, বাড়িটি কেন তালাবদ্ধ ছিল, মৃত্যুর আগে বা পরে সেখানে কারা যাতায়াত করেছিল, কোনো সংঘর্ষ বা জোরপূর্বক প্রবেশের আলামত ছিল কি না, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে উদ্বেগকে অবহেলা নয়

নিহত পরিবারটি হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে। এই উদ্বেগকে খাটো করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। তাই কোনো নাগরিক তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করা।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো অপরাধের ধর্ম হয় না; অপরাধীর পরিচয় নির্ধারিত হয় তার কর্মকাণ্ডে।

তবে তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় পরিচয় হত্যাকাণ্ডের কোনো উদ্দেশ্য বা প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না। সেটি হবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের গুরুতর ঘটনা এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ—প্রমাণই হোক শেষ কথা

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘হিন্দুশূন্য’ করার ষড়যন্ত্রের মতো নানা বক্তব্য সামনে আসতে পারে। এসব বক্তব্যের পেছনে কোনো বাস্তব তথ্য বা ধারাবাহিকতার প্রমাণ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই তা তদন্ত করতে হবে।

কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করা কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা একইভাবে বিপজ্জনক।

কারণ গুজব ও অনুমান কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

বরং এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—তথ্য সংগ্রহ করা, প্রমাণ বিশ্লেষণ করা, অপরাধীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা।

সত্য যদি সাধারণ অপরাধের দিকে নির্দেশ করে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। আর যদি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিও গোপন না করে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি হলো—তার সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা নিরাপদ।

কোনো হিন্দু পরিবার যদি মনে করে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তারা ঝুঁকিতে আছে, তবে সেই ভয় দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একইভাবে কোনো মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও রাষ্ট্রকে সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে।

কারণ বাংলাদেশ কোনো একটি সম্প্রদায়ের দেশ নয়। বাংলাদেশ তার সব নাগরিকের।

মন্দিরে পূজা, মসজিদে নামাজ, গির্জায় প্রার্থনা কিংবা বৌদ্ধবিহারে প্রার্থনা—এসবের সহাবস্থানই বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের শক্তি। এই সম্প্রীতি নষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তদন্তে কোনো ছাড় নয়

রংপুরের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট।

ঘটনাস্থলের সব আলামত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক তদন্তের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। নিহতদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।

তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এই ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু নিহত পরিবারের স্বজনরাই নয়, বৃহত্তর সমাজও সত্য জানতে চাইছে।

আর যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

গুজব নয়, আস্থা চাই

এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি হয় আতঙ্ক ও পারস্পরিক সন্দেহ।

এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়মিতভাবে জনগণকে জানানো উচিত, যাতে তথ্যের শূন্যস্থান গুজব দিয়ে পূরণ না হয়।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। উত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন শিরোনাম কিংবা যাচাইহীন অভিযোগ নয়—জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে যাচাই করা তথ্য।

চারটি মৃত্যু আমাদের যে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে

গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্য আজ আর নেই। তাঁদের ঘর হয়তো আবার কোনোদিন আগের মতো হবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যেন কেবল একটি সংবাদ হয়ে কয়েকদিন পর বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

এই চারটি মৃত্যু আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে—

বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক কি সত্যিই তাঁর নিজের ঘরে নিরাপদ?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়, আমাদের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশিত।

আমরা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না। আমরা চাই না এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন আরও গভীর হোক। আমরা চাই না গুজবের আগুনে নতুন কোনো সহিংসতার জন্ম হোক।

আমরা চাই সত্য।

আমরা চাই ন্যায়বিচার।

আমরা চাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

আর সবচেয়ে বেশি চাই—বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যেন কখনো মনে না করেন, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তিনি এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

রংপুরের তালাবদ্ধ সেই বাড়ির নীরবতা আজ আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে।

রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা একটাই—

দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে চারটি মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করুন। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনুন। আর যদি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়, তার শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে কঠোর ব্যবস্থা নিন।

কারণ একটি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু চারটি প্রাণের প্রতি ন্যায়বিচার নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা