ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বাংলাদেশ: বিদ্যুৎ সংকট নয়, এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরীক্ষা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরও ফের শোন-অ্যারেস্ট শাহেদ। গোপালগঞ্জ শহরের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের তার চুরি, রাতে আতঙ্ক। মান্দায় ভুয়া পরিচয়ে বিয়ে, ৪ মাস পর তরুণীকে নিয়ে উধাও যুবক: আতঙ্কে পরিবার। গোপালগঞ্জে পুলিশ সুপারের কার্যালয় পরিদর্শন করেন অ্যাডিশনাল ডিআইজির। মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি হিটলুর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট।  সন্দ্বীপে কোস্ট গার্ডের যৌথ অভিযান, ইয়াবা ও অস্ত্রসহ মাদক কারবারি আটক। ঠাকুরগাঁওয়ে ডিবির অভিযানে ডলার সহ প্রতারক চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার। অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগে পাসপোর্ট অফিসের ডিডি শাহজাহান কবির বদলি, স্থলাভিষিক্ত হালিমা খাতুন। পুলিশ দাঁড়িয়ে, নারী আক্রান্ত—রাষ্ট্র তখন কোথায়?

লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বাংলাদেশ: বিদ্যুৎ সংকট নয়, এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরীক্ষা।

 

বিদ্যুৎ আছে—কিন্তু বিদ্যুৎ নেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে—কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে উৎপাদন হচ্ছে না।

কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই; কোথাও জ্বালানি আছে, কিন্তু কারিগরি ত্রুটি; আবার কোথাও উৎপাদন সম্ভব হলেও সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় সেই বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। কোথাও দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এটি কি কেবল সাময়িক সংকট? নাকি আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ?

আমার বিবেচনায়, দ্বিতীয় প্রশ্নটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা, তবু বিদ্যুতের জন্য হাহাকার!

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সংকটের সময়ে তার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আগস্টের এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ সরবরাহ ছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গা।

শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য জ্বালানি লাগবে, জ্বালানি পরিবহনের ব্যবস্থা লাগবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য শক্তিশালী গ্রিড লাগবে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আধুনিক বিতরণব্যবস্থা লাগবে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তাব্যবস্থা।

গ্যাস সংকটই কি সব সমস্যার মূল?

বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধ থাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য এসেছে।

তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না।

প্রশ্ন করতে হবে—একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কেন এতটা একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হবে?

আজ গ্যাস কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কাল আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম বেড়ে গেলে কী হবে? জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হলে কী হবে?

তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতিতে বহুমুখীকরণ অপরিহার্য।

গ্রামের মানুষ কি উন্নয়নের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—লোডশেডিংয়ের বড় বোঝাটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ছে।

আগস্টের সংকটের সময় বিদ্যুৎ বিভাগ ঢাকায় লোডশেডিং কিছুটা সমন্বয় করে গ্রামীণ ও অন্যান্য এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।

 

এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—

কেন বারবার সংকট এলে গ্রামের মানুষকেই বেশি অন্ধকারে থাকতে হবে?

একজন শহুরে নাগরিকের যেমন বিদ্যুতের অধিকার আছে, একজন কৃষক, গ্রামের শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার রোগীরও একই অধিকার আছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকের সেচ ব্যাহত হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না—খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়ে। গ্রামের ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ থাকলে কর্মসংস্থান কমে। শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হলে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুতরাং গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহকে উন্নয়ননীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

আগামীর বাংলাদেশে ১০ দফা বিদ্যুৎ কর্মপরিকল্পনা

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সামনে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

১. বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং LNG আমদানির পাশাপাশি জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে।

২. বর্তমানে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বন্ধ, কোথায় জ্বালানি সংকট, কোথায় কারিগরি সমস্যা—এসবের একটি প্রকাশ্য জাতীয় ড্যাশবোর্ড থাকা উচিত।

৩. গ্রামকে ‘লোডশেডিংয়ের ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বানানো বন্ধ করতে হবে।

শহর-গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা সূচক চালু করা যেতে পারে।

কোন এলাকায় মাসে কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না—এই তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

৫. জাতীয় গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর করতে হবে।

আধুনিক সাবস্টেশন, স্মার্ট মিটার, স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ ও উন্নত সঞ্চালনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৬. সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি করতে হবে।

বাংলাদেশের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু লক্ষ্য কাগজে থাকলে চলবে না—এখন প্রয়োজন বাস্তবায়ন।

৭. প্রতিটি সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও উপজেলা পরিষদ ভবনে পর্যায়ক্রমে রুফটপ সোলার স্থাপন করা যেতে পারে।

৮. গ্রামে ‘সোলার মিনি-গ্রিড’ ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিশেষ করে কৃষি সেচ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

৯. বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যুৎ ক্রয়, জ্বালানি ব্যয়, চুক্তি, ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট—সবকিছুর নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা হওয়া দরকার।

১০. রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যুৎনীতি যেন পরিবর্তিত না হয়।

কমপক্ষে ১০, ২০ ও ৩০ বছরের একটি জাতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি রোডম্যাপ তৈরি করে সেটিকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও প্রয়োজন

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতাও জরুরি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনার্জি অডিট চালু করা যেতে পারে।

তবে এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি।

সাধারণ মানুষকে শুধু ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন’ বলা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্প, শপিং মল, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকেও শক্তি ব্যবহারে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সংকটকে সুযোগে পরিণত করতে হবে

বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু প্রতিটি সংকটের মধ্যেই একটি সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশ চাইলে এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আগামী দশকের মধ্যে একটি বিকেন্দ্রীভূত, নবায়নযোগ্য, স্মার্ট ও জ্বালানি-নিরাপদ বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

আমাদের ভাবতে হবে—কেন প্রতিটি গ্রামে জাতীয় গ্রিডের ওপর শতভাগ নির্ভরশীলতা থাকবে? কেন গ্রামের স্কুলের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থাকবে না? কেন ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট সোলার মিনি-গ্রিড থাকবে না? কেন কৃষকের সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে চলবে না?

একটি আধুনিক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়—ঘরের ছাদে, স্কুলের ছাদে, কারখানার ছাদে, কৃষিজমির পাশে এবং স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রেও।

শেষ কথা: আলো চাই, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ।

একজন কৃষকের কাছে বিদ্যুৎ মানে সেচ।

একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যুৎ মানে পড়ার আলো।

একজন রোগীর কাছে বিদ্যুৎ মানে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা।

একজন উদ্যোক্তার কাছে বিদ্যুৎ মানে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান।

আর রাষ্ট্রের কাছে বিদ্যুৎ মানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সক্ষমতা।

তাই বর্তমান লোডশেডিংকে কেবল ‘সাময়িক বিদ্যুৎ সংকট’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আজকের অন্ধকার আগামী দিনের উন্নয়নকে অন্ধকার করে দিতে পারে।

আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি প্রতিবার সংকট দেখা দিলে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকব, নাকি এমন একটি বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলব যেখানে সংকটের সময়ও দেশের হাসপাতাল, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও মানুষের জীবন থেমে যাবে না?

আগামীর বাংলাদেশকে যদি সত্যিই সমৃদ্ধ, আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে প্রতিটি ঘরে শুধু বিদ্যুতের সংযোগ নয়—নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

কারণ- উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ যত দ্রুতই এগিয়ে যাক, বিদ্যুতের আলো যদি পিছনে পড়ে থাকে—তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বাংলাদেশ: বিদ্যুৎ সংকট নয়, এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরীক্ষা।

লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বাংলাদেশ: বিদ্যুৎ সংকট নয়, এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরীক্ষা।

আপডেট সময় : ০১:৫৬:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

বিদ্যুৎ আছে—কিন্তু বিদ্যুৎ নেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে—কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে উৎপাদন হচ্ছে না।

কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই; কোথাও জ্বালানি আছে, কিন্তু কারিগরি ত্রুটি; আবার কোথাও উৎপাদন সম্ভব হলেও সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় সেই বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। কোথাও দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এটি কি কেবল সাময়িক সংকট? নাকি আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ?

আমার বিবেচনায়, দ্বিতীয় প্রশ্নটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা, তবু বিদ্যুতের জন্য হাহাকার!

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সংকটের সময়ে তার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আগস্টের এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ সরবরাহ ছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এখানেই আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গা।

শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য জ্বালানি লাগবে, জ্বালানি পরিবহনের ব্যবস্থা লাগবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য শক্তিশালী গ্রিড লাগবে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আধুনিক বিতরণব্যবস্থা লাগবে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তাব্যবস্থা।

গ্যাস সংকটই কি সব সমস্যার মূল?

বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাসের ঘাটতি। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধ থাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য এসেছে।

তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না।

প্রশ্ন করতে হবে—একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কেন এতটা একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হবে?

আজ গ্যাস কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কাল আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম বেড়ে গেলে কী হবে? জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হলে কী হবে?

তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতিতে বহুমুখীকরণ অপরিহার্য।

গ্রামের মানুষ কি উন্নয়নের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—লোডশেডিংয়ের বড় বোঝাটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ছে।

আগস্টের সংকটের সময় বিদ্যুৎ বিভাগ ঢাকায় লোডশেডিং কিছুটা সমন্বয় করে গ্রামীণ ও অন্যান্য এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।

 

এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—

কেন বারবার সংকট এলে গ্রামের মানুষকেই বেশি অন্ধকারে থাকতে হবে?

একজন শহুরে নাগরিকের যেমন বিদ্যুতের অধিকার আছে, একজন কৃষক, গ্রামের শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার রোগীরও একই অধিকার আছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকের সেচ ব্যাহত হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না—খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়ে। গ্রামের ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ থাকলে কর্মসংস্থান কমে। শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হলে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুতরাং গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহকে উন্নয়ননীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

আগামীর বাংলাদেশে ১০ দফা বিদ্যুৎ কর্মপরিকল্পনা

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সামনে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

১. বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং LNG আমদানির পাশাপাশি জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে।

২. বর্তমানে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বন্ধ, কোথায় জ্বালানি সংকট, কোথায় কারিগরি সমস্যা—এসবের একটি প্রকাশ্য জাতীয় ড্যাশবোর্ড থাকা উচিত।

৩. গ্রামকে ‘লোডশেডিংয়ের ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বানানো বন্ধ করতে হবে।

শহর-গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা সূচক চালু করা যেতে পারে।

কোন এলাকায় মাসে কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না—এই তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

৫. জাতীয় গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তর করতে হবে।

আধুনিক সাবস্টেশন, স্মার্ট মিটার, স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ ও উন্নত সঞ্চালনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৬. সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি করতে হবে।

বাংলাদেশের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু লক্ষ্য কাগজে থাকলে চলবে না—এখন প্রয়োজন বাস্তবায়ন।

৭. প্রতিটি সরকারি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও উপজেলা পরিষদ ভবনে পর্যায়ক্রমে রুফটপ সোলার স্থাপন করা যেতে পারে।

৮. গ্রামে ‘সোলার মিনি-গ্রিড’ ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিশেষ করে কৃষি সেচ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

৯. বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যুৎ ক্রয়, জ্বালানি ব্যয়, চুক্তি, ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট—সবকিছুর নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা হওয়া দরকার।

১০. রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যুৎনীতি যেন পরিবর্তিত না হয়।

কমপক্ষে ১০, ২০ ও ৩০ বছরের একটি জাতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি রোডম্যাপ তৈরি করে সেটিকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও প্রয়োজন

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতাও জরুরি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, শক্তি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনার্জি অডিট চালু করা যেতে পারে।

তবে এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি।

সাধারণ মানুষকে শুধু ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন’ বলা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্প, শপিং মল, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকেও শক্তি ব্যবহারে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সংকটকে সুযোগে পরিণত করতে হবে

বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু প্রতিটি সংকটের মধ্যেই একটি সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশ চাইলে এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আগামী দশকের মধ্যে একটি বিকেন্দ্রীভূত, নবায়নযোগ্য, স্মার্ট ও জ্বালানি-নিরাপদ বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

আমাদের ভাবতে হবে—কেন প্রতিটি গ্রামে জাতীয় গ্রিডের ওপর শতভাগ নির্ভরশীলতা থাকবে? কেন গ্রামের স্কুলের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থাকবে না? কেন ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট সোলার মিনি-গ্রিড থাকবে না? কেন কৃষকের সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে চলবে না?

একটি আধুনিক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়—ঘরের ছাদে, স্কুলের ছাদে, কারখানার ছাদে, কৃষিজমির পাশে এবং স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রেও।

শেষ কথা: আলো চাই, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ।

একজন কৃষকের কাছে বিদ্যুৎ মানে সেচ।

একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যুৎ মানে পড়ার আলো।

একজন রোগীর কাছে বিদ্যুৎ মানে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা।

একজন উদ্যোক্তার কাছে বিদ্যুৎ মানে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান।

আর রাষ্ট্রের কাছে বিদ্যুৎ মানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সক্ষমতা।

তাই বর্তমান লোডশেডিংকে কেবল ‘সাময়িক বিদ্যুৎ সংকট’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আজকের অন্ধকার আগামী দিনের উন্নয়নকে অন্ধকার করে দিতে পারে।

আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি প্রতিবার সংকট দেখা দিলে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকব, নাকি এমন একটি বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলব যেখানে সংকটের সময়ও দেশের হাসপাতাল, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও মানুষের জীবন থেমে যাবে না?

আগামীর বাংলাদেশকে যদি সত্যিই সমৃদ্ধ, আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে প্রতিটি ঘরে শুধু বিদ্যুতের সংযোগ নয়—নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

কারণ- উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ যত দ্রুতই এগিয়ে যাক, বিদ্যুতের আলো যদি পিছনে পড়ে থাকে—তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।