১ সেপ্টেম্বর ২০২৬—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি আজ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। দলটির উত্থান, বিকাশ, ক্ষমতায় আরোহণ, বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানা বিতর্ক—সব মিলিয়ে বিএনপির ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্মদিন উদযাপনের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ফিরে দেখার উপলক্ষ।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন বিএনপির প্রয়োজন হয়েছিল? কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির জন্ম? কী ছিল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন? আর ৪৮ বছর পর সেই দর্শনের কতটুকু বাস্তব রাজনীতিতে জীবন্ত আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতার পরবর্তী অস্থির বাংলাদেশের কাছে।
স্বাধীনতার স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার কঠিন সংঘাত
১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। কোটি মানুষের আশা ছিল—স্বাধীন দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা।
কিন্তু স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা দ্রুত সামনে চলে আসে। অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেশের মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় কাঠামোর দিকে দেশ এগিয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল।
সমর্থকদের কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জাতীয় পুনর্গঠনের একটি উদ্যোগ; সমালোচকদের কাছে এটি ছিল গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ সংকুচিত করার পদক্ষেপ। সংবাদপত্রের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
ইতিহাসের এই জায়গাটিই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করে।
১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর: রাষ্ট্র যখন অনিশ্চয়তার মুখে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাংলাদেশকে গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
৩ নভেম্বরের ঘটনা এবং ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন।
পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে এই সময়ের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এক নয়। কেউ ৭ নভেম্বরকে জাতীয় মুক্তির দ্বিতীয় অধ্যায় হিসেবে দেখেন, কেউ সামরিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠের জন্য উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
জিয়াউর রহমানের সামনে তখন দুটি পথ
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমানের সামনে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশকে কোন রাজনৈতিক পথে এগিয়ে নেওয়া হবে?
একদিকে ছিল সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অন্যদিকে ছিল দুর্বল ও বিভক্ত রাজনৈতিক পরিসর। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ছিল সময়ের জরুরি দাবি।
জিয়াউর রহমান প্রথমদিকে সরাসরি রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে অনাগ্রহী ছিলেন—এমন বিবরণ পাওয়া যায়। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের দিকে নিয়ে যায়।
এই নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে সামনে আসে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: একটি রাজনৈতিক বিকল্পের জন্ম
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ছিল বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
এর মূলকথা ছিল—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড, রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য, জনগণের সম্মিলিত পরিচয় এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিকে সংগঠিত করা।
এই দর্শনের মাধ্যমে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পৃথক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জন্ম নেয়নি; বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনকে সাংগঠনিক কাঠামো দেওয়ার প্রয়াস হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিল।
১৯ দফা: উৎপাদনের রাজনীতির ভিত্তি
বিএনপি প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি নতুন রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
এই কর্মসূচিতে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে উৎপাদন ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি ধারণা সামনে আনেন।
‘উৎপাদনের রাজনীতি’—এই শব্দবন্ধটি সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছিল।
আলোচনার টেবিল থেকে রাজনৈতিক সংগঠন
বিএনপির জন্ম কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফল ছিল না। ১৯৭৬-৭৭ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নেতা ও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ভিত্তি তৈরি হয়।
ন্যাপ-ভাসানী, জাতীয় লীগ, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, সাম্যবাদী দল, জাতীয় দল, জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।
এখানেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়—বিভিন্ন রাজনৈতিক মতকে একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বিত করার চেষ্টা।
অর্থাৎ বিএনপির জন্ম কোনো একটি পুরনো রাজনৈতিক দলের উত্তরাধিকার হিসেবে নয়; বরং নানা রাজনৈতিক ধারার সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে ঘটেছিল।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮: আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ
অবশেষে আসে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর।
ঢাকার রমনা এলাকায় এক অনাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
সেদিনের সেই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণাপত্রে জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বিকেন্দ্রীকরণ, যুবসমাজের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অর্থাৎ দলটির ঘোষণাপত্র ছিল কেবল নির্বাচনী ইশতেহার নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা।
প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বড় পরীক্ষা
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তার জনসমর্থনের পরীক্ষা দিতে।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে দলটি।
মাত্র কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এটি ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক ও নির্বাচনী সাফল্য।
এখানেই বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়—দলটি খুব দ্রুত দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানের রাজনীতি: সাফল্য ও বিতর্ক দুটোই থাকবে
জিয়াউর রহমানকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিএনপি ও তার সমর্থকদের কাছে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার।
তাঁর সময়ের কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো, বেসরকারি উদ্যোগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার নীতিকে তাঁর সমর্থকেরা বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।
অন্যদিকে তাঁর শাসনামল সামরিক আইন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে সমালোচিতও হয়েছে।
একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজে তাই জিয়াউর রহমানের মূল্যায়ন হওয়া উচিত আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও ইতিহাসের আলোকে।
কারণ একজন রাষ্ট্রনায়কের সাফল্য যেমন ইতিহাসের অংশ, তাঁর বিতর্কিত সিদ্ধান্তও তেমনি ইতিহাসের অংশ।
বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন কী?
এই প্রশ্নের উত্তর একেকজন একেকভাবে দেবেন।
কেউ বলবেন—বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
কেউ বলবেন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা।
কেউ বলবেন—উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ধারণা।
কেউ বলবেন—গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।
আবার সমালোচকেরা বলবেন—সামরিক শাসনের বাস্তবতায় দলটির জন্ম হওয়াই এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক।
সবগুলো মতকে বিবেচনায় নিলে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিএনপির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এনেছিল।
৪৮ বছর পর বিএনপির সামনে নতুন পরীক্ষা
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ আর নেই।
দেশের অর্থনীতি বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনা বদলেছে। কিন্তু গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা—এসব প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক।
তাই ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে কার্যকর করা হবে?
শুধু ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ উচ্চারণ করলেই হবে না। এর বাস্তব অর্থ কী—তা স্পষ্ট করতে হবে।
শুধু গণতন্ত্রের কথা বললেই হবে না। দলের অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে।
শুধু সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নিতে হবে।
শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বললেই হবে না। তরুণদের কর্মসংস্থান, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং মধ্যবিত্তের নিরাপত্তার বিষয়ে বাস্তব কর্মসূচি দিতে হবে।
রাজনীতির শেষ কথা জনগণ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস একটি বিষয় বারবার প্রমাণ করেছে—কোনো রাজনৈতিক দল শুধু অতীতের গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে অনন্তকাল টিকে থাকতে পারে না।
জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয় প্রতিদিন।
বিএনপির ক্ষেত্রেও সত্যটি একই।
১৯৭৮ সালে যে দলটি জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার কথা বলেছিল, ২০২৬ সালে সেই দলকে নতুন বাস্তবতার আলোকে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ জানতে চায়—আগামী দিনের রাষ্ট্র কেমন হবে? রাজনীতি কি সংঘাতের বদলে সহনশীলতার পথে যাবে? নির্বাচন কি হবে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে? তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কি সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বিএনপির আগামী দিনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার সেই অনাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলনে যে রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজ ৪৮ বছরে এসে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
জিয়াউর রহমান সেই রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা করেছিলেন গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় সংকটের এক সময়ে। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা—যে শক্তি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ধারণ করবে, উৎপাদন বাড়াবে, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার দিকে এগোবে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াবে।
কালের প্রবাহে বিএনপি অনেক পথ অতিক্রম করেছে। পেয়েছে সাফল্য, মুখোমুখি হয়েছে ব্যর্থতা; ক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরেও থেকেছে; আন্দোলন করেছে, কঠিন সংকট মোকাবিলা করেছে।
তবু দলটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো সামনে।
কারণ ইতিহাসের উত্তরাধিকার শুধু স্মরণ করার জন্য নয়—বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির সামনে প্রশ্ন হওয়া উচিত—১৯৭৮-এর স্বপ্নের সঙ্গে ২০২৬-এর বাংলাদেশের বাস্তবতার সেতুবন্ধন কীভাবে তৈরি করা হবে?
এই প্রশ্নের জবাব যত স্পষ্ট হবে, ততই স্পষ্ট হবে বিএনপির ভবিষ্যৎ পথ।
আর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির চূড়ান্ত বিচারক কোনো দল, নেতা কিংবা ইতিহাসের কোনো একক ব্যাখ্যা নয়—বাংলাদেশের জনগণ।
সেই জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্যেই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 













