নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে বিজয়ের উল্লাস, বৈঠার ছন্দে ছন্দে জয়ের গান—মৃধাবাড়ি গ্রামের নিউটন বসুর বৈতরণী নৌকার সাফল্যে গর্বিত কদমবাড়ি ইউনিয়ন।
বাংলার নদী শুধু জলধারা নয়, নদী বাঙালির প্রাণ, আবেগ, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর বুকে ছুটে চলা নৌকা, মাঝিদের সম্মিলিত হুংকার, বৈঠার ছন্দময় আঘাত আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস—এসবের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় চিরচেনা বাংলার শাশ্বত রূপ। নৌকাবাইচ তাই নিছক একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি গ্রামবাংলার আত্মার উৎসব, মানুষের মিলনমেলা এবং আমাদের সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
এমনই এক আনন্দঘন ও রোমাঞ্চকর মুহূর্তের সাক্ষী হলো ফরিদপুরের ভাঙ্গার দিকনগরের কুমার নদ। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জমজমাট নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার চতুর্থ টানে বাংলার টাইগার কোসা নৌকাকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে চিলা বাছাড়ির ‘বৈতরণী’ নৌকা। এই বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মৃধাবাড়ি গ্রামের নাম। নৌকার মালিক নিউটন বসুর এই সাফল্যে আনন্দিত তাঁর স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং নৌকাবাইচপ্রেমীরা।
বৈতরণীর বৈঠায় জয়ের ইতিহাস
কুমার নদের জলরাশি সেদিন যেন পরিণত হয়েছিল উত্তেজনা আর উন্মাদনার এক বিশাল মঞ্চে। নদীর দুই তীরে দর্শকদের ভিড়, প্রতিযোগীদের দিকে নিবদ্ধ অসংখ্য চোখ, মাঝিদের বুকভরা সাহস আর বৈঠার প্রতিটি আঘাতে জয়ের আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রতিটি নৌকার লক্ষ্য ছিল সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছানো। প্রতিটি বৈঠার টানে মিশে ছিল শ্রম, সাধনা, আত্মবিশ্বাস ও দলগত ঐক্য। প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তেজনায় যখন নদীর বুক কেঁপে উঠছিল, তখন বৈতরণীর মাঝিরা নিজেদের দক্ষতা, সমন্বয় ও অদম্য মনোবলের পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন বিজয়ের লক্ষ্যে।
অবশেষে বাংলার টাইগার কোসাকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়নের মুকুট অর্জন করে বৈতরণী। সেই মুহূর্তটি শুধু একটি নৌকার জয় ছিল না; সেটি ছিল বহু মানুষের স্বপ্নপূরণ, পরিশ্রমের স্বীকৃতি এবং আনন্দে বুক ভরে ওঠার এক অনন্য উপলক্ষ।
মৃধাবাড়ি গ্রামের গর্ব, নিউটন বসুর আনন্দ
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রাম মৃধাবাড়ি। এই গ্রামের বাসিন্দা নিউটন বসুর মালিকানাধীন বৈতরণী নৌকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবর তাই তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দের গণ্ডি পেরিয়ে এলাকার মানুষের গর্বের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
একটি নৌকার পেছনে থাকে মালিকের স্বপ্ন, মাঝিদের নিরলস পরিশ্রম এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। বৈতরণীর এই সাফল্যও তার ব্যতিক্রম নয়। নদীর বুকে বিজয়ের জন্য মাঝিদের ঘাম ঝরানো প্রচেষ্টা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দৃঢ় মনোবলই এই অর্জনের অন্যতম শক্তি।
নিউটন বসুর জন্য এই বিজয় নিঃসন্দেহে আনন্দ ও গৌরবের। আর মৃধাবাড়ি গ্রামের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় এক অর্জনের গল্প। কদমবাড়ি ইউনিয়ন ও রাজৈরবাসীর জন্যও এই সাফল্য আনন্দের বার্তা বহন করে।
নিজ গ্রামের নামের সঙ্গে এমন একটি বিজয়ের স্মৃতি জড়িয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কারণ, স্থানীয় মানুষের সাফল্য যখন বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি পায়, তখন তা একটি গ্রামের মানুষের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
পুরস্কারের চেয়েও বড় মাঝিদের ঘাম ও ভালোবাসা
চ্যাম্পিয়ন বৈতরণী নৌকা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে বড় মাপের একটি রেফ্রিজারেটর। এই পুরস্কার বিজয়ের আনন্দকে করেছে আরও পরিপূর্ণ। তবে পুরস্কারের বস্তুগত মূল্যের বাইরেও রয়েছে গভীরতর তাৎপর্য।
একটি রেফ্রিজারেটর হয়তো বিজয়ের স্মারক হয়ে থাকবে; কিন্তু এই সাফল্যের প্রকৃত সম্পদ হলো মাঝিদের সম্মিলিত শ্রম, সাহস, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং প্রতিকূলতার মুখেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। বৈঠা হাতে নদীর বুকে যাঁরা নিজেদের সর্বশক্তি উজাড় করে দেন, তাঁদের ঘামেই রচিত হয় বিজয়ের গল্প।
বৈতরণীর সকল মাঝি, সহযোগী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন। তাঁদের দক্ষতা, নিষ্ঠা ও ঐক্যই বৈতরণীকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বাংলার টাইগার কোসা, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জের বন্যাবাড়ীর ‘জয় মা কালী’সহ অন্যান্য নৌকার মাঝি ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতিও রইল শুভেচ্ছা। জয়-পরাজয় প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিণতি; কিন্তু অংশগ্রহণের সাহস, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাবই নৌকাবাইচকে সত্যিকার অর্থে মহিমান্বিত করে।
নৌকাবাইচ বেঁচে থাকুক, বেঁচে থাকুক বাংলার আত্মপরিচয়
আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। অথচ নৌকাবাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সামষ্টিক আনন্দের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ আয়োজন মানুষকে একত্র করে, নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের পরিচয় দেয় এবং নদীকেন্দ্রিক বাংলার গৌরবময় অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
তাই নৌকাবাইচকে শুধু একটি দিনের উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আয়োজক, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক, সংস্কৃতিকর্মী ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগে এই ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হোক। প্রতিযোগিতা হোক নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দময়।
উপসংহারে বলা যায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গার দিকনগরের কুমার নদের বুকে ১২ অক্টোবরের সেই বিজয় যেন শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল হয়ে না থাকে; এটি হয়ে থাকুক বাংলার ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসার স্মারক, পরিশ্রমের মর্যাদার প্রতীক এবং মানুষের সম্মিলিত আনন্দের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
চ্যাম্পিয়ন বৈতরণীর বিজয়ের সুর ছড়িয়ে পড়ুক মৃধাবাড়ি গ্রাম থেকে সমগ্র কদমবাড়ি ইউনিয়নে, কদমবাড়ি থেকে রাজৈর, রাজৈর থেকে মাদারীপুর এবং মাদারীপুর ছাড়িয়ে সমগ্র বাংলার নৌকাবাইচপ্রেমীদের হৃদয়ে।
অভিনন্দন চ্যাম্পিয়ন বৈতরণী! অভিনন্দন মৃধাবাড়ি গ্রামের গর্ব নিউটন বসু! হৃদয়ের গভীর থেকে শুভেচ্ছা বৈতরণীর সকল মাঝি, সহযোগী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি।
নদীর বুকে বৈঠা চলুক, মাঝির কণ্ঠে জয়ের গান উঠুক, মানুষের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ জাগুক। বাংলার নদী বেঁচে থাকুক, বাংলার নৌকাবাইচ বেঁচে থাকুক, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অমলিন থাকুক আমাদের গৌরবময় লোকজ ঐতিহ্য।
বৈতরণীর বিজয় হোক মৃধাবাড়ি গ্রামের গর্ব, কদমবাড়ি ইউনিয়নের আনন্দ এবং বাংলার ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল উদ্যাপন।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী। 























