নিয়োগ,বদলী ও পদোন্নতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, ভুয়া বিল ভাউচার, বার্ষিক মেরামত খাতের অর্থ বরাদ্দ বিলি বন্টন নিয়ে এক ধরনের বাণিজ্য চলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এসব কাজ সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রকৌশলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। অধিদপ্তর ঘিরে নানান সুযোগ সুবিধা গ্রহনে কিছু দুর্নীতি পরায়ণ প্রকৌশলী, যারা কিনা ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ পরিবারের বংশধরের ট্যাগ লাগিয়ে সচিবালয় থেকে শুরু করে গনভবন পর্যন্ত আনাগোনা করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই কার্যক্রম অতীতেও ছিলো এবং বর্তমানেও চলমান আছে। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শামীম আখতারদের মতো চেইন অব কমান্ড’কে পুঁজি করেই কিছু প্রকৌশলী এখনও বেপরোয়া। তবে তার মধ্যে অন্যতম গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম-৪ নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম।
অভিযোগ রয়েছে, তানভীর আলমের চাচা (বাগেরহাট ৩ আসন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, খুলনার সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক) তবে অধিদপ্তরের কাগজপত্রে টেম্পারিং পিতা হিসেবে পরিচিত এমনকি পাসপোর্টেও নিজ পিতার নামের বদলে চাচাকে পিতা সাজিয়েছেন, তানভীর আলমের মা খুলনা ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের স্ত্রী সম্পার ঘনিষ্ঠবান্ধবীর হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে শেখ পরিবারের বংশধর পরিচয়ে ব্যাপক অধিপত্য বিস্তার করেছে, যার ফলে একই চেয়ারে পাঁচ বছর সাত মাস যাবৎ বহাল তবিয়তে ছিলেন। তৎকালীন সময়ে সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের কালেক্টরেট দায়িত্ব ও নেপথ্যে প্রধান প্রকৌশলীর দরবারের মুরিদ। পাসপোর্ট ডকুমেন্টসে বাবার বদলে চাচার নাম। এছাড়াও ‘আজিমপুর (ইএম বিভাগ-৩) থাকাকালীন সময়ে মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনে অধিদপ্তরের দরপত্র শর্ত পূরণে বিধিমালা লঙ্ঘন করে ‘অযোগ্য’ রওশন এলিভেটরস প্রতিষ্ঠানকে ‘যোগ্য’ বিবেচনা করে, নির্ধারিত রেট সিডিউল থেকে প্রায় ১৯ শতাংশ কম দামে অস্বাভাবিকভাবে দরপত্র দাখিল করেছে’। শুধু তাই নয়, আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড নির্মাণে ১২ তলা স্টিল স্ট্রাকচারের পার্কিং ভবনের জন্য ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। ডিপিপিতে ২৮৮ টি গাড়ি পার্কিং রাখা স্থানের কথা বলা হলেও ২৪০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ডিপিপি অনুযায়ী পুরো বিল উত্তোলন করা হয়, অথচ ৪৮টি গাড়ি পার্কিংয়ের বাকি ১১ কোটি টাকা। এসকল অভিযোগ প্রসঙ্গে কিন্তু কাজ না করে বিল তোলার অভিযোগ রয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তদন্ত কমিটিকে উপরি মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করে, প্রতিবেদনে তানভীর আলমের পক্ষ বিবেচনা করে কৌশলগত প্রকাশ করা হয়’। এদিকে ‘আজিমপুর নতুন কলোনিতে বেশিরভাগ ভাবন তিন বছর আগের নির্মিত, গত পাঁচ বছরে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা, সাধারণত নতুন ভবনে বৈদ্যুতিক খাতে খরচের খুব একটা জায়গা নেই, পুরাতন কিছু ভবনে বৈদ্যুতিক রক্ষণাবেক্ষণে দৃশ্যমান কিছুই নেই। অথচ তানভীরের নেতৃত্বে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেশিরভাগই ভুয়া বিল-ভাউচারে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে’।
নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো: তানভীর আলমের বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি অভিযোগ, অথচ মন্ত্রণালয়ের বিচারিক ব্যবস্থা নিশ্চুপ। বাংলায় প্রবাদ আছে- ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’। তানভীর আলম এক্ষেত্রে কোনো অংশে কম নয়। নিজ পিতাকে অস্বীকার করে ক্ষমতা ও অর্থের লোভ লালসায় সরকারি কাগজে নিজ পিতার নাম টেম্পারিং করে চাচাকে (স্বৈরাচার সরকারের বাগেরহাট ৩ আসনের সংসদ সদস্য) ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে, গত বছরের ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার গন অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সচিবালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টেম্পারিং কর্মকর্তা তানভীর আলমকে প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার প্রাইজ পোস্টিং দিয়ে ফ্যাসিস্টদের ফের পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয় বৈদ্যুতিক স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) থেকে। সাধারণত সকেট-প্লাগে লুজ কানেকশন (দুর্বল সংযোগ), কেব্ল ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ ইত্যাদি কারণে বৈদ্যুতিক স্পার্ক হয়ে থাকে। নিম্নমানের ইলেকট্রিক কাজের কারণেই আগুন লেগেছে। সচিবালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আলম এর তত্ত্বাবধানে কিভাবে নিম্নমানের পন্য ব্যবহার করা হয়েছে? এর নেপথ্যে ‘রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল পরিমান বাজেট অর্থ-বরাদ্দ! বাজেট কারসাজিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা মাফিক অর্থ-লোপাট ও বিদেশে পাচার! প্রধান প্রকৌশলীকে একই পদে টিকিয়ে রাখতে বিনিয়োগের অংশহিসেবে নতুন ফিরিস্তি! ফ্যাসিস্টদের আমলনামা ঢাকতে নথিপত্র মুছে দেওয়ার জন্য ‘ফায়ার মিশন’?
গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো রয়েছেন ফ্যাসিস্টের এজেন্ডারা, যারা স্বৈরাচারী শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কিত ছিলেন। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের একাধিক পরিবর্তন হলেও এসব ব্যক্তিকে সরানো হয়নি, বরং তারা নানা প্রভাবশালী পদে বহাল থেকে দপ্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, এদের অনেকেই অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে হাত রেখে নিয়েছেন সুযোগ সুবিধা।
ইএম বিভাগ-৩ মূলত আজিমপুর এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে পাঁচ বছর ৭ মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো: তানভীর আলম। তার সঙ্গে ছিলেন গণপূর্ত ডিপ্লোমা প্রকৌশল সমিতির সাবেক সভাপতি এ কে এম গোলাম মোস্তফা। প্রভাবশালী এ দুই প্রকৌশলীই প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণের নামে খরচ দেখিয়েছেন।
অনিয়ম প্রসঙ্গে কথা বলতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আক্তারকে একাধিকবার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
শাফিন আহমেদ 

















