৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে বিরূপ মন্তব্য করেছিল তথাকথিত জেনজি প্রজন্ম।তখন গর্জে উঠেছিল ৭১ এর রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেই মুক্তিযোদ্ধার নাম ফজলুর রহমান। যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিল, যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান-অপদস্ত করছিল, যখন জাতীয় সংগীত বিলুপ্ত করে দিতে চাইছিল, যখন মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছিল, যখন বাংলার সহজিয়া মানুষদের আশ্রস্থয়ল মাজারগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যখন কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যখন তারা ক্ষমতায় যাওয়ার নকশার খসড়া প্রস্তুত করছিল, তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছিলেন, “বাংলাদেশের নাম যদি বাংলাদেশ থাকে, তাহলে এই দেশে জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারবে না। ওরা ক্ষমতায় গেলে আমি বিষ খাবো।”
এবার বলি একটি গল্প। অর্জুন ও জয়দ্রথের গল্প। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশতম দিনে অর্জুনপুত্র অভিমন্যুকে চক্রবূহ্যতে ঘিরে নির্মমভাবে বধ করা হলো। রাতে তাকে তোলা হলো চিতায়। মুখাগ্নি করবেন অর্জুন। তার হাতে অগ্নিদণ্ড। মুখাগ্নির পূর্বমুহূর্তে তিনি ভাইদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘অভিমুন্যকে বাঁচাতে তোমরা কেন চক্রবূহ্যে ঢুকতে পারলে না? কে তোমাদের বাধা দিয়েছিল?’ ভাইয়েরা বলল, ‘জয়দ্রথের কারণে আমরা ঢুকতে পারিনি। তার কারণেই আমরা অভিমন্যুকে বাঁচাতে পারিনি।’
অগ্নিদণ্ড হাতে অর্জুন শপথ নিলেন, অভিমন্যু হত্যার প্রতিশোধ নিতে আগামী কাল সূর্যাস্তের আগে তিনি জয়দ্রথকে বধ করবেন। জলে, স্থলে, পর্বতে, অরণ্যে কিংবা মাটির নিচে―যেখানেই সে লুকাক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে তিনি বধ করবেন। ব্যর্থ হলে পুত্রের সঙ্গে তিনিও চিতায় চড়বেন। অর্থাৎ তিনি আত্মহত্যা করবেন।
তার এই শোক, তার এই শপথ সংক্রমিত হয়েছিল পাণ্ডববাহিনীর মধ্যেও। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী একে বলছেন প্রাইভেট শোক পাবলিক শোকে রূপান্তরিত হওয়া। ব্যক্তিগত প্রতিশোধস্পৃথা সমষ্টিগত তথা সামাজিক প্রতিশোধস্পৃহায় রূপান্তরিত হওয়া। অর্জুনের ব্যক্তিগত শপথ সামষ্টিক শপথে রূপান্তরিত হয়েছিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান-এর এই শপথ―‘এই দেশে জামায়াত ক্ষমতায় এলে আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব’―সব্যসাচী অর্জুনের সেই শপথেরই প্রতিধ্বনি। ইতিহাসে এমন ধ্বনি বার বার উচ্চারিত হয়। ফজলুর রহমানের এই প্রাইভেট শপথ রূপান্তরিত হয়েছে পাবলিক শপথে।
আমি স্রোতের বিরুদ্ধে বুক টান টান করে দাঁড়ানো একজন অকুতোভয় বীরকে দেখেছি, আমি বাংলার একজন ভূমিপুত্রকে দেখেছি, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি, আমি একজন ফজলুর রহমানকে দেখেছি এবং তাঁর ভেতর দিয়ে আমি একাত্তরকে দেখেছি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের প্রতি আনতমস্তক শ্রদ্ধা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অপশক্তির বিরুদ্ধে যে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দেখিয়েছেন তা সত্যিই অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। তাঁর দৃপ্ত কঠিন উচ্চারণ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের আভায় রঞ্জিত হয়ে এদেশের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে।বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় আবারো প্রমাণ করে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা যে কোনো পরিস্থিতিতেই নিজেকে উৎসর্গ করতে কখনো কুন্ঠিত নয়।
এদেশের ঘরে ঘরে জন্ম হোক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের মত দেশ প্রেমিক অকুতোভয় নির্ভীক সন্তানের। তাহলেই জিতবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
সারাক্ষণ ডেস্ক 






















