রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পূজা উদযাপন পরিষদের ১৫ সদস্যের বৈঠকের ছবিটি সামনে আসার পর সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি ছবি যতটা দৃশ্যমান, বৈঠকের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো ততটাই অদৃশ্য।
কী কথা হলো? কী দাবি জানানো হলো? সাধারণ সনাতনীর নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন কতটা গুরুত্ব পেল? এবং বৈঠকের পর জনগণকে কতটা অবহিত করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানা সাধারণ মানুষের অধিকার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও গভীর একটি প্রশ্ন—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কি সনাতনী নেতৃত্বের অবস্থানও পরিবর্তিত হবে?
এক সরকারের ছায়া থেকে আরেক সরকারের দরজায়?
সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃত্বের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং এর ফলে সংগঠনটির একটি অংশের ওপর রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবার সেই নেতৃত্বেরই রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এখানে অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও নেতৃত্বের। কিন্তু অভিযোগটি যে মৌলিক প্রশ্নটি সামনে এনেছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই—
সনাতনী সংগঠন কি কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সহযোগী হবে, নাকি সরকার যেই হোক—সাধারণ সনাতনীর অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাধীনভাবে কথা বলবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।
কারণ সরকার আসে, সরকার যায়।
ক্ষমতার মানুষ বদলায়।
রাজনৈতিক সমীকরণ বদলায়।
কিন্তু একজন সাধারণ সনাতনীর নিরাপত্তাহীনতা, তার মন্দির, তার সম্পত্তি, তার নাগরিক অধিকার এবং তার মর্যাদার প্রশ্ন থেকে যায়।
তাহলে জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী সনাতনীদের জায়গা কোথায়?
এই জায়গাটিই বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরীক্ষা।
জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী সনাতনীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছেন যে, তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন নেতৃত্বের পরিসরে ঘটেনি। অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা নিজেদের উপেক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন মনে করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সেই প্রেক্ষাপটে পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আবির্ভাব অনেকের কাছে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল।
প্রত্যাশাটি ছিল খুব সরল—
একটি সংগঠন থাকবে, যারা কোনো সরকারের লেজুড়বৃত্তি করবে না; আবার কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সনাতনী নাগরিকের অধিকারকেও খাটো করবে না।
কিন্তু সেই সংগঠনের নেতৃত্বের মধ্যেই যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা অপেশাদার সাংগঠনিক আচরণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক।
ফ্রন্টের ভবিষ্যৎ—প্রশ্নটি এখানেই
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—
জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী সনাতনীদের প্রতিনিধিত্ব করবে কে?
উত্তরটি কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের হাতে থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সামনে এখন দুটি পথ।
একটি পথ হলো—ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পদ-পদবি, অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সংগঠন পরিচালনা করা।
অন্য পথটি অনেক কঠিন, কিন্তু অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ—
নীতিনিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি সনাতনী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করা।
দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারলে ফ্রন্টের ভবিষ্যৎ অবশ্যই রয়েছে।
কাউকে প্রতিস্থাপন নয়, নেতৃত্বের সংস্কৃতি বদলানো প্রয়োজন
সমস্যার সমাধান কখনো শুধু এই নয় যে, একটি সংগঠনের জায়গায় আরেকটি সংগঠন বসবে কিংবা একদল নেতার জায়গায় অন্যদল নেতা আসবে।
প্রয়োজন নেতৃত্বের সংস্কৃতির পরিবর্তন।
যে নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, কিন্তু তার কাছে নিজের স্বাধীনতা বিক্রি করবে না।
যে নেতৃত্ব বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষকেও সনাতনী নাগরিক হিসেবে সম্মান করবে।
যে নেতৃত্ব নিজের দলের ভুল স্বীকার করতে পারবে।
যে নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করলে সাধারণ মানুষকে জানাবে—কী কথা হয়েছে।
যে নেতৃত্ব কোনো হামলা হলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দেবে না; বরং আইনগত ও সাংগঠনিকভাবে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াবে।
এটাই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মানদণ্ড।
সাধারণ সনাতনী আর নেতার ছবি দেখতে চান না
আজকের সাধারণ সনাতনী অনেক বেশি সচেতন।
তিনি জানতে চান—
আমার বিপদে কে পাশে থাকবে?
আমার মন্দির আক্রান্ত হলে কে কথা বলবে?
আমার জমি বা সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা হলে কে আইনি সহায়তা দেবে?
আমার সন্তান বৈষম্যের শিকার হলে কে প্রতিবাদ করবে?
আমার রাজনৈতিক মত আলাদা হলে কি সংগঠন আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে?
এখন আর শুধু মঞ্চে বক্তৃতা কিংবা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একটি ছবি দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।
মানুষ ফলাফল দেখতে চায়।
মুক্তির পথ—ঐক্য, নীতি ও জবাবদিহি
সনাতনী সম্প্রদায়ের মুক্তির পথ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের আনুগত্যে নেই; আবার কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে অন্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যেও নেই।
মুক্তির পথ হলো—
রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ, কিন্তু লেজুড়বৃত্তি নয়।
সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক, কিন্তু নীতির বিনিময়ে নয়।
নিজেদের মধ্যে মতভেদ, কিন্তু শত্রুতা নয়।
নেতৃত্ব, কিন্তু ব্যক্তিপূজা নয়।
পূজা উদযাপন পরিষদ হোক কিংবা পূজা উদযাপন ফ্রন্ট—কোনো সংগঠনই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
যে সংগঠন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব দাবি করবে, তাকে সাধারণ মানুষের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ১৫ সদস্যের বৈঠকের ছবিটি তাই আমাদের সামনে শুধু একটি সাক্ষাতের স্মৃতি নয়; এটি সনাতনী নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনার একটি সুযোগ।
অতীতে কে কোন সরকারের কাছাকাছি ছিলেন—সেই হিসাবের পাশাপাশি আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো:
আগামী দিনে সনাতনী নেতৃত্ব কি ক্ষমতার কাছে যাবে, নাকি ক্ষমতার কাছে সাধারণ সনাতনীর অধিকার নিয়ে যাবে?
পূজা উদযাপন পরিষদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার যে অভিযোগ রয়েছে, তার সত্যতা ও দায় সংশ্লিষ্টদেরই ব্যাখ্যা করতে হবে। একইভাবে পূজা উদযাপন ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের সংকটের অভিযোগও তাদেরই স্বচ্ছতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
কারণ ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে সাধারণ সনাতনী আর কারও “রাজনৈতিক পুঁজি” হতে চান না।
তারা চান—
সম্মান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সমঅধিকার।
তারা এমন নেতৃত্ব চান, যে ক্ষমতা বদলালে নিজের অবস্থান বদলাবে না; বরং নীতির জায়গা থেকে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে এবং জনগণের অধিকারকে রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরবে।
সেই নেতৃত্ব তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের ভবিষ্যৎ আছে।
আর যদি সংগঠনও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, পদ-পদবি ও ক্ষমতার সমীকরণের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে হতাশ সনাতনীর সামনে আবারও একই প্রশ্ন ফিরে আসবে—
“আমাদের হয়ে কথা বলার মানুষ কোথায়?”
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
সারাক্ষণ ডেস্ক 














