ঢাকা ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা। ভাঙ্গার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে শতাধিক নৌকার মহারণ, সেরা রাজৈরের ‘বৈতরণী’। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের বার্তা: অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ- অপর্ণা রায় দাস। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আউট সোর্সিং এর কাজ শতভাগ আওয়ামী প্রতিষ্ঠানের দখলে! এনআরবিসি ব্যাংকে চিহ্নিত লুটেরা চক্রের অপতৎপরতা! শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বরিশাল শাখার ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন আবুল কালাম আজাদ নজরুল বর্ষ ও আমাদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: বিদ্রোহী কবির প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার। যেভাবে বিএনপির প্রতিষ্ঠা , সংকটের ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অভিযাত্রা। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত অভিযানে: অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার মান্দার ২ কিশোর গ্যাং লিডার। ঠাকুরগাঁওয়ে সমতলের চা বাগান দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
বৈঠার ছন্দে জেগে উঠল গ্রামবাংলা।

ভাঙ্গার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে শতাধিক নৌকার মহারণ, সেরা রাজৈরের ‘বৈতরণী’।

  • ফরিদপুর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৮:১৫:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৭৩ জন সংবাদটি পড়েছেন

 

বিলের স্বচ্ছ জলে তখন একের পর এক নৌকার ছুটে চলা। বৈঠার তালে তালে মাঝিদের হুঙ্কার। দুই তীরে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর আনন্দধ্বনি। কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন প্রিয় মুহূর্ত, কেউ আবার প্রিয় নৌকার জয়ের আশায় উৎকণ্ঠিত। মুহূর্তেই যেন ফিরে এসেছে হারিয়ে যেতে বসা সেই চিরচেনা গ্রামবাংলা—যেখানে নৌকা বাইচ ছিল মানুষের আনন্দ, উৎসব ও মিলনের অন্যতম প্রধান উপলক্ষ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে অনুষ্ঠিত হলো এযাবৎকালের অন্যতম সেরা ও জমজমাট নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেয় প্রায় শতাধিক নৌকা। সকাল থেকেই বিলের চারপাশে মানুষের ঢল নামে। প্রতিযোগিতা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধাবাড়ি গ্রামের নিউটন বসুর ‘বৈতরণী’।

প্রথম স্থান অর্জনকারী ‘বৈতরণী’ নৌকার জন্য পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ১৪ সিএফটি ধারণক্ষমতার একটি রেফ্রিজারেটর। বিজয়ের পর নিউটন বসু ও তাঁর দলের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে আনন্দের বন্যা।

‘বৈতরণী’র বিজয়

নৌকা বাইচে জয় পাওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়। একটি নৌকার পেছনে থাকে বহুদিনের প্রস্তুতি, দক্ষ মাঝি, শারীরিক সক্ষমতা, দলগত সমন্বয় এবং সর্বোপরি জয়ের অদম্য মানসিকতা। ‘বৈতরণী’র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই নৌকাটি দর্শকদের নজর কাড়ে। বৈঠার সমন্বিত আঘাত আর মাঝিদের ছন্দময় প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করে নৌকাটি।

বিজয়ী নৌকার মালিক নিউটন বসু বলেন, “গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া নৌকা বাইচকে বাঁচিয়ে রাখতে আয়োজকরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নৌকা বাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে মাদক ও জুয়ার প্রবণতা কমাতে তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। এ ধরনের আয়োজন সেই সুযোগ তৈরি করে। তাই এত সুন্দর একটি নৌকা বাইচ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”

শুধু নৌকা বাইচ নয়, সামাজিক প্রতিরোধেরও হাতিয়ার

আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এবারের আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু প্রতিযোগিতার ব্যাপকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সামাজিক বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় বর্ষা এলেই নৌকা বাইচ ছিল অন্যতম প্রধান বিনোদন। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় ঘিরে বসত উৎসব। কিন্তু আধুনিকতার বিস্তার, জলাশয় কমে যাওয়া এবং বিনোদনের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচও অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে।

অন্যদিকে, তরুণ সমাজের একটি অংশ যখন মাদক, জুয়া ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিতে পড়ছে, তখন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। নৌকা বাইচের মতো ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজন তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা, দলগত চেতনা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তাই নৌকা বাইচকে কেবল একটি দিনব্যাপী উৎসব হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনেকটাই উপেক্ষিত হবে। বরং এটি হতে পারে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার একটি কার্যকর মাধ্যম।

ফিরে আসুক হারানো ঐতিহ্য

একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বর্ষার মৌসুম মানেই ছিল নৌকা বাইচের অপেক্ষা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নৌকা নিয়ে আসত। প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বসত মেলা। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বাড়িতে চলত অতিথি আপ্যায়ন। নৌকা বাইচ হয়ে উঠত পুরো এলাকার সামাজিক মিলনমেলা।

সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম মানুষের হাতের নাগালে এলেও নৌকা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের আবেদন এখনো কমেনি—আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ।

প্রায় শতাধিক নৌকার অংশগ্রহণ এবং বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, মানুষ এখনো নিজের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়। তারা আধুনিকতার পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্যকেও দেখতে চায় নতুন প্রজন্মের সামনে।

নিয়মিত আয়োজনের দাবি

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এই নৌকা বাইচ একবারের আয়োজন হয়ে থেমে থাকবে না। প্রতিবছর আরও বৃহৎ পরিসরে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি নৌকা বাইচের সঙ্গে যুক্ত মাঝিদের উৎসাহিত করা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণে সহযোগিতা করা এবং প্রতিযোগিতার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে এই আয়োজন আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিচারণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে না; নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই তা টিকে থাকে।

আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এবারের নৌকা বাইচ তাই শুধু কে প্রথম হলো, কে দ্বিতীয় হলো—তার হিসাব নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতির শেকড়ে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়াস। বৈঠার প্রতিটি আঘাত যেন বলে গেল—বাংলার ঐতিহ্য এখনো মরে যায়নি।

‘বৈতরণী’র বিজয় সেই ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক। আর আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের ঢেউ যেন বলে গেল—নৌকা বাইচ ফিরে আসুক, ফিরে আসুক গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া প্রাণের উৎসব।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

বৈঠার ছন্দে জেগে উঠল গ্রামবাংলা।

ভাঙ্গার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে শতাধিক নৌকার মহারণ, সেরা রাজৈরের ‘বৈতরণী’।

আপডেট সময় : ০৮:১৫:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

বিলের স্বচ্ছ জলে তখন একের পর এক নৌকার ছুটে চলা। বৈঠার তালে তালে মাঝিদের হুঙ্কার। দুই তীরে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর আনন্দধ্বনি। কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন প্রিয় মুহূর্ত, কেউ আবার প্রিয় নৌকার জয়ের আশায় উৎকণ্ঠিত। মুহূর্তেই যেন ফিরে এসেছে হারিয়ে যেতে বসা সেই চিরচেনা গ্রামবাংলা—যেখানে নৌকা বাইচ ছিল মানুষের আনন্দ, উৎসব ও মিলনের অন্যতম প্রধান উপলক্ষ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে অনুষ্ঠিত হলো এযাবৎকালের অন্যতম সেরা ও জমজমাট নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেয় প্রায় শতাধিক নৌকা। সকাল থেকেই বিলের চারপাশে মানুষের ঢল নামে। প্রতিযোগিতা যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধাবাড়ি গ্রামের নিউটন বসুর ‘বৈতরণী’।

প্রথম স্থান অর্জনকারী ‘বৈতরণী’ নৌকার জন্য পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ১৪ সিএফটি ধারণক্ষমতার একটি রেফ্রিজারেটর। বিজয়ের পর নিউটন বসু ও তাঁর দলের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে আনন্দের বন্যা।

‘বৈতরণী’র বিজয়

নৌকা বাইচে জয় পাওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়। একটি নৌকার পেছনে থাকে বহুদিনের প্রস্তুতি, দক্ষ মাঝি, শারীরিক সক্ষমতা, দলগত সমন্বয় এবং সর্বোপরি জয়ের অদম্য মানসিকতা। ‘বৈতরণী’র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই নৌকাটি দর্শকদের নজর কাড়ে। বৈঠার সমন্বিত আঘাত আর মাঝিদের ছন্দময় প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করে নৌকাটি।

বিজয়ী নৌকার মালিক নিউটন বসু বলেন, “গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া নৌকা বাইচকে বাঁচিয়ে রাখতে আয়োজকরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নৌকা বাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে মাদক ও জুয়ার প্রবণতা কমাতে তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। এ ধরনের আয়োজন সেই সুযোগ তৈরি করে। তাই এত সুন্দর একটি নৌকা বাইচ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”

শুধু নৌকা বাইচ নয়, সামাজিক প্রতিরোধেরও হাতিয়ার

আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এবারের আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু প্রতিযোগিতার ব্যাপকতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সামাজিক বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় বর্ষা এলেই নৌকা বাইচ ছিল অন্যতম প্রধান বিনোদন। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় ঘিরে বসত উৎসব। কিন্তু আধুনিকতার বিস্তার, জলাশয় কমে যাওয়া এবং বিনোদনের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচও অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে।

অন্যদিকে, তরুণ সমাজের একটি অংশ যখন মাদক, জুয়া ও নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিতে পড়ছে, তখন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। নৌকা বাইচের মতো ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজন তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা, দলগত চেতনা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তাই নৌকা বাইচকে কেবল একটি দিনব্যাপী উৎসব হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনেকটাই উপেক্ষিত হবে। বরং এটি হতে পারে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার একটি কার্যকর মাধ্যম।

ফিরে আসুক হারানো ঐতিহ্য

একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বর্ষার মৌসুম মানেই ছিল নৌকা বাইচের অপেক্ষা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নৌকা নিয়ে আসত। প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বসত মেলা। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বাড়িতে চলত অতিথি আপ্যায়ন। নৌকা বাইচ হয়ে উঠত পুরো এলাকার সামাজিক মিলনমেলা।

সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যম মানুষের হাতের নাগালে এলেও নৌকা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের আবেদন এখনো কমেনি—আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তারই প্রমাণ।

প্রায় শতাধিক নৌকার অংশগ্রহণ এবং বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, মানুষ এখনো নিজের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়। তারা আধুনিকতার পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্যকেও দেখতে চায় নতুন প্রজন্মের সামনে।

নিয়মিত আয়োজনের দাবি

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এই নৌকা বাইচ একবারের আয়োজন হয়ে থেমে থাকবে না। প্রতিবছর আরও বৃহৎ পরিসরে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি নৌকা বাইচের সঙ্গে যুক্ত মাঝিদের উৎসাহিত করা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণে সহযোগিতা করা এবং প্রতিযোগিতার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে এই আয়োজন আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একটি জাতির ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিচারণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে না; নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই তা টিকে থাকে।

আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের এবারের নৌকা বাইচ তাই শুধু কে প্রথম হলো, কে দ্বিতীয় হলো—তার হিসাব নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতির শেকড়ে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়াস। বৈঠার প্রতিটি আঘাত যেন বলে গেল—বাংলার ঐতিহ্য এখনো মরে যায়নি।

‘বৈতরণী’র বিজয় সেই ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক। আর আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলের ঢেউ যেন বলে গেল—নৌকা বাইচ ফিরে আসুক, ফিরে আসুক গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া প্রাণের উৎসব।