ঢাকা ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা। ভাঙ্গার আলগীর ঝালডাঙ্গা বিলে শতাধিক নৌকার মহারণ, সেরা রাজৈরের ‘বৈতরণী’। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের বার্তা: অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ- অপর্ণা রায় দাস। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আউট সোর্সিং এর কাজ শতভাগ আওয়ামী প্রতিষ্ঠানের দখলে! এনআরবিসি ব্যাংকে চিহ্নিত লুটেরা চক্রের অপতৎপরতা! শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বরিশাল শাখার ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন আবুল কালাম আজাদ নজরুল বর্ষ ও আমাদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন: বিদ্রোহী কবির প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার। যেভাবে বিএনপির প্রতিষ্ঠা , সংকটের ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অভিযাত্রা। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত অভিযানে: অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার মান্দার ২ কিশোর গ্যাং লিডার। ঠাকুরগাঁওয়ে সমতলের চা বাগান দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

 

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত,

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।”

ভগবদ্গীতার এই অমর বাণী ভারতীয় দর্শনের এক গভীর জীবনদর্শনকে ধারণ করে। যখন ধর্মের—অর্থাৎ ন্যায়, সত্য ও নৈতিকতার—অবক্ষয় ঘটে এবং অধর্ম, অন্যায় ও অনাচার সমাজকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন শুভশক্তির পুনর্জাগরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। গীতার পরবর্তী শ্লোকেই কৃষ্ণ বলেন—

“পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥”

এই দর্শনের আলোতেই হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকে দেখা হয়।

কিন্তু কৃষ্ণকে শুধু ধর্মীয় আবেগের পরিসরে আবদ্ধ রাখলে তাঁর বিশালতাকে ছোট করা হয়। কৃষ্ণ একই সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, রাজনীতি, নৈতিকতা, মানবসম্পর্ক, রাষ্ট্রচিন্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অসাধারণ সমন্বয়। তাঁর চরিত্রে যেমন আছে শিশুর সারল্য, তেমনি রাষ্ট্রনায়কের প্রজ্ঞা; যেমন আছে প্রেমের মাধুর্য, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা; যেমন আছে বাঁশির সুর, তেমনি কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে কর্তব্যের কঠিন আহ্বান।

অন্ধকার কারাগারে আলোর আবির্ভাব

শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, মথুরার কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসেবে কৃষ্ণের আবির্ভাব। তখন মথুরার শাসক কংসের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। নিজের মৃত্যুভয়ের কারণে কংস দেবকীর সন্তানদের একের পর এক হত্যা করেন।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণের জন্মের তাৎপর্য নিছক অলৌকিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি গভীর প্রতীকী পাঠও রয়েছে।

অত্যাচারের অন্ধকার যত গভীর হয়, প্রতিরোধের আলোর প্রয়োজন তত বেশি হয়।

কারাগারের শৃঙ্খল, কংসের সন্ত্রাস এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যেই কৃষ্ণের আবির্ভাব যেন ঘোষণা করে—কোনো অন্যায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। মানুষকে বন্দি রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে অনন্তকাল বন্দি রাখা যায় না।

সেই অর্থে কৃষ্ণের জন্ম একটি চিরন্তন মানবিক প্রত্যয়ের প্রতীক—অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভবোধের জন্ম হবেই।

‘দুষ্টের দমন’ কি কেবল শত্রু নিধন?

কৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘দুষ্টের দমন’ কথাটি বারবার সামনে আসে। কিন্তু এর প্রকৃত তাৎপর্য আরও বিস্তৃত।

দুষ্টতা শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে থাকে না। দুষ্টতা একটি মানসিকতা—লোভ, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায়, শোষণ ও অসত্যের সমষ্টি।

কংস তাই শুধু একজন অত্যাচারী শাসকের নাম নয়; তিনি অত্যাচারী মানসিকতার প্রতীক। দুর্যোধন শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি লোভ, ক্ষমতালিপ্সা ও অন্যায়ের প্রতীক। শকুনি প্রতারণামূলক কূটবুদ্ধির প্রতীক।

এই প্রতীকী পাঠে কৃষ্ণের ‘দুষ্টের দমন’ মানে শুধু ব্যক্তিবিশেষকে পরাজিত করা নয়; বরং অন্যায়ের সংস্কৃতিকে প্রতিহত করা।

আর ‘শিষ্টের পালন’ মানে কেবল সাধু ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়; বরং সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়ানো।

কৃষ্ণের ঐতিহাসিক বিবর্তন

শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। কৃষ্ণকে নিয়ে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা পরবর্তী যুগে নানা স্তরে সমৃদ্ধ হয়েছে।

মহাভারতে কৃষ্ণ প্রধানত একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক, পরামর্শদাতা ও পাণ্ডবদের সুহৃদ। তিনি যুদ্ধের আগে শান্তির উদ্যোগ নেন। কৌরবদের কাছে ন্যায্য দাবির পক্ষে দূত হয়ে যান। তাঁর সেই শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি বুঝতে পারেন—অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

পরবর্তীকালে ভাগবত ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যে কৃষ্ণের আরেকটি রূপ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে—ব্রজের গোপাল, মাখনচোর, বাঁশিওয়ালা, রাধার প্রিয়তম এবং ভক্তের হৃদয়ের পরম আশ্রয়।

অন্যদিকে ভগবদ্গীতার কৃষ্ণ হয়ে ওঠেন বিশ্বদর্শনের শিক্ষক।

এই বিবর্তন কৃষ্ণকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেনি। বরং তাঁকে করেছে বহুমাত্রিক।

তিনি একই সঙ্গে প্রেমের কৃষ্ণ, নীতির কৃষ্ণ, কর্মের কৃষ্ণ, জ্ঞানের কৃষ্ণ এবং কর্তব্যের কৃষ্ণ।

কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণ: যুদ্ধের চেয়ে বড় যে শিক্ষা

কৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দার্শনিক মুহূর্তগুলোর একটি কুরুক্ষেত্র।

অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আপনজন, গুরু ও স্বজনদের দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাঁর হাতে অস্ত্র, কিন্তু মনে দ্বন্দ্ব। এই সংকট কেবল অর্জুনের সংকট নয়; এটি মানুষের চিরন্তন নৈতিক সংকট।

ঠিক সেই মুহূর্তে কৃষ্ণ তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে বলেননি; বরং চিন্তা করতে, কর্তব্য বুঝতে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছেন।

গীতার অন্যতম আলোচিত শিক্ষা—

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।”

মানুষের কর্তব্য হলো সৎ ও ন্যায়সঙ্গত কর্ম করা; ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি যেন তাকে কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না করে।

আজকের সমাজে এই শিক্ষা কতটা প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়। যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় নীতি ও কর্তব্যকে ছাপিয়ে যায়, তখন গীতার কর্মদর্শন নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।

কৃষ্ণ ও রাজনীতি: নীতি এবং বাস্তবতার সমন্বয়

কৃষ্ণকে শুধু ধর্মীয় চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁর রাষ্ট্রনৈতিক প্রজ্ঞা উপেক্ষিত হয়।

তিনি ছিলেন বাস্তবতাবাদী। কিন্তু বাস্তবতাবাদী হওয়া আর নীতিহীন হওয়া এক বিষয় নয়।

তিনি জানতেন কখন আলোচনা করতে হবে, কখন আপসের সুযোগ তৈরি করতে হবে, কখন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে এবং কখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর শান্তি প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে তিনি যুদ্ধকে প্রথম সমাধান হিসেবে দেখেননি। কিন্তু শান্তির নামে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতেও রাজি ছিলেন না।

আধুনিক রাজনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

শান্তি চাই, কিন্তু অন্যায়ের বিনিময়ে নয়।

সমঝোতা চাই, কিন্তু ন্যায় বিসর্জন দিয়ে নয়।

ক্ষমতা চাই, কিন্তু মানুষের কল্যাণের জন্য।

আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এই নৈতিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সমাজে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

আজ আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। মানুষের হাতে তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল অর্থনীতি—সব মিলিয়ে পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিকতার অগ্রগতি কি সমানতালে হচ্ছে?

মিথ্যা তথ্য, গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, দুর্নীতি, প্রতারণা, সামাজিক বিভাজন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসহিষ্ণুতা আমাদের সমাজজীবনের নানা স্তরে উদ্বেগ তৈরি করছে।

এখানেই কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

কৃষ্ণ আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বলেননি—কারণ তাঁর যুগে প্রযুক্তি আজকের মতো ছিল না। কিন্তু তিনি আমাদের বিবেক ব্যবহার করতে শিখিয়েছেন।

তিনি আমাদের বলেননি কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে; কিন্তু তিনি শিখিয়েছেন—ক্ষমতা ও কর্তব্যের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত।

তিনি আধুনিক গণমাধ্যমের কথা বলেননি; কিন্তু সত্য ও অসত্যের পার্থক্য অনুধাবনের যে নৈতিক বোধ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে কৃষ্ণের শিক্ষা

আজ যদি আমরা প্রশ্ন করি—সমাজে অন্যায় কেন বাড়ে?

শুধু অন্যায়কারী ব্যক্তির জন্য নয়; অনেক সময় অন্যায়ের নীরব দর্শকরাও এর জন্য দায়ী।

কৃষ্ণের দর্শন আমাদের নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকার শিক্ষা দেয় না। বরং কর্তব্যের প্রশ্ন সামনে আনে।

কোনো দুর্বল মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে তার পাশে দাঁড়ানো কি আমাদের কর্তব্য নয়?

কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে প্রতিবাদ করা কি আমাদের সামাজিক দায়িত্ব নয়?

দুর্নীতি যখন সমাজের স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে চায়, তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলা কি নাগরিক কর্তব্য নয়?

অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে পরে শুধু ধর্মীয় আচার পালন করলে কৃষ্ণের দর্শন কতটা ধারণ করা হয়—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

ধর্মীয় উৎসবের অর্থ কী?

জন্মাষ্টমী আমাদের কাছে আনন্দ, ভক্তি ও ধর্মীয় আবেগের উৎসব। মন্দিরে পূজা, কীর্তন, গীতাপাঠ, শোভাযাত্রা—সবই আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

কিন্তু উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন উৎসব আমাদের আচরণে পরিবর্তন আনে।

কৃষ্ণের জন্মদিন পালন করে যদি আমরা মিথ্যা বলি, অন্যায় করি, দুর্বলকে নিপীড়ন করি, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিই কিংবা মানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি—তাহলে কৃষ্ণের জন্মোৎসব আমাদের জীবনে কতটা অর্থ বহন করে?

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে শুধু কৃষ্ণের নাম উচ্চারণ করা নয়।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে কর্তব্য পালন করা।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেক জাগ্রত রাখা।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করা।

তরুণ প্রজন্ম ও কৃষ্ণচেতনা

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সামনে সুযোগ যেমন অনেক, তেমনি বিভ্রান্তিও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল সাফল্য, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদ অনেক সময় তাদের প্রকৃত লক্ষ্যকে আড়াল করে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে অর্জুনের সংশয় এবং কৃষ্ণের উপদেশ আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবনে ব্যর্থতা আসবে, সংশয় আসবে, সংকট আসবে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়।

তরুণদের জন্য কৃষ্ণের শিক্ষা হতে পারে—

নিজেকে জানো।

নিজের কর্তব্যকে জানো।

জ্ঞান অর্জন করো।

সত্যকে ধারণ করো।

অন্যায়ের সঙ্গে আপস করো না।

আর সাফল্যের চেয়ে চরিত্রকে বড় করে দেখো।

কৃষ্ণের প্রেম: বিভাজনের পৃথিবীতে ঐক্যের শিক্ষা

কৃষ্ণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর প্রেম ও মানবিকতা।

বৃন্দাবনের কৃষ্ণ মানুষের হৃদয়ে আনন্দ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও ভক্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলেন। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বৈষ্ণব দর্শনে পরম প্রেম ও ভক্তির এক গভীর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ নানা পরিচয়ে বিভক্ত—ধর্ম, জাতি, মত, রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক শ্রেণি ইত্যাদি।

এই বিভাজনের মধ্যে কৃষ্ণের প্রেমের দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, সম্মান ও সহমর্মিতা।

কৃষ্ণের প্রকৃত আবির্ভাব কোথায়?

হাজার হাজার বছর আগে মথুরার কারাগারে কৃষ্ণের আবির্ভাবের কাহিনি আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু আধুনিক সময়ে কৃষ্ণের আবির্ভাবের একটি প্রতীকী অর্থও আমাদের উপলব্ধি করা দরকার।

যখন একজন মানুষ দুর্নীতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি করেন না—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্বলের ওপর অন্যায় করেন না—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রকে মানুষ করার চেষ্টা করেন—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ায়—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন মানুষ প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়কে বেছে নেন—সেখানেও কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে।

অর্থাৎ কৃষ্ণ শুধু মথুরায় জন্ম নেননি; প্রতিটি যুগে মানুষের বিবেকের মধ্যে তাঁর পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের প্রত্যাশা

আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো প্রযুক্তির নয়, নৈতিকতার। তথ্যের অভাব নয়, সত্যের সংকট। সম্পদের অভাব নয়, ন্যায়বণ্টনের সংকট। জ্ঞানের অভাব নয়, জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহারের সংকট।

এই বাস্তবতায় কৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

আমাদের দরকার এমন সমাজ, যেখানে ধর্ম হবে মানবিকতার উৎস; রাজনীতি হবে জনকল্যাণের মাধ্যম; শিক্ষা হবে চরিত্র গঠনের হাতিয়ার; ক্ষমতা হবে সেবার উপায় এবং আইন হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই।

শ্রীকৃষ্ণকে যত গভীরভাবে দেখা যায়, তাঁর বহুমাত্রিকতা তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু পুরাণের কৃষ্ণ নন, শুধু বৃন্দাবনের বাঁশিওয়ালা নন, শুধু কুরুক্ষেত্রের সারথিও নন।

তিনি মানুষের নৈতিক সংকটে এক দার্শনিক আশ্রয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নৈতিক আহ্বান; কর্তব্যের প্রশ্নে এক দৃঢ় নির্দেশনা এবং মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেম ও সহমর্মিতার এক অনন্ত প্রতীক।

তাই আজ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—কৃষ্ণ কি শুধু মন্দিরে আবির্ভূত হবেন, নাকি আমাদের বিবেকেও আবির্ভূত হবেন?

কংসের পতন যেমন শুধু একজন অত্যাচারীর পতন ছিল না, তেমনি আজকের ‘কংস’ও শুধু কোনো ব্যক্তি নয়—লোভ, দুর্নীতি, হিংসা, অন্যায়, অসত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারই আজকের কংস।

সুতরাং আজ আমাদের প্রার্থনা হোক—

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস দাও,

সত্যের পথে চলার শক্তি দাও,

কর্তব্য পালনের নিষ্ঠা দাও,

মানুষকে ভালোবাসার হৃদয় দাও।

কারণ কৃষ্ণের প্রকৃত আবির্ভাব তখনই সার্থক হবে, যখন তাঁর জন্মের আলো মন্দিরের প্রদীপ পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে, সমাজের বিবেকে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বোধে জ্বলে উঠবে।

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন কোনো অতীতের কাহিনি নয়—এটি প্রতিটি যুগের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই রয়েছে কৃষ্ণের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব: দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও সমকালীন পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

আপডেট সময় : ১১:৪৪:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত,

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।”

ভগবদ্গীতার এই অমর বাণী ভারতীয় দর্শনের এক গভীর জীবনদর্শনকে ধারণ করে। যখন ধর্মের—অর্থাৎ ন্যায়, সত্য ও নৈতিকতার—অবক্ষয় ঘটে এবং অধর্ম, অন্যায় ও অনাচার সমাজকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন শুভশক্তির পুনর্জাগরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। গীতার পরবর্তী শ্লোকেই কৃষ্ণ বলেন—

“পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥”

এই দর্শনের আলোতেই হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকে দেখা হয়।

কিন্তু কৃষ্ণকে শুধু ধর্মীয় আবেগের পরিসরে আবদ্ধ রাখলে তাঁর বিশালতাকে ছোট করা হয়। কৃষ্ণ একই সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, রাজনীতি, নৈতিকতা, মানবসম্পর্ক, রাষ্ট্রচিন্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অসাধারণ সমন্বয়। তাঁর চরিত্রে যেমন আছে শিশুর সারল্য, তেমনি রাষ্ট্রনায়কের প্রজ্ঞা; যেমন আছে প্রেমের মাধুর্য, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা; যেমন আছে বাঁশির সুর, তেমনি কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে কর্তব্যের কঠিন আহ্বান।

অন্ধকার কারাগারে আলোর আবির্ভাব

শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, মথুরার কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসেবে কৃষ্ণের আবির্ভাব। তখন মথুরার শাসক কংসের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। নিজের মৃত্যুভয়ের কারণে কংস দেবকীর সন্তানদের একের পর এক হত্যা করেন।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণের জন্মের তাৎপর্য নিছক অলৌকিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি গভীর প্রতীকী পাঠও রয়েছে।

অত্যাচারের অন্ধকার যত গভীর হয়, প্রতিরোধের আলোর প্রয়োজন তত বেশি হয়।

কারাগারের শৃঙ্খল, কংসের সন্ত্রাস এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যেই কৃষ্ণের আবির্ভাব যেন ঘোষণা করে—কোনো অন্যায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। মানুষকে বন্দি রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে অনন্তকাল বন্দি রাখা যায় না।

সেই অর্থে কৃষ্ণের জন্ম একটি চিরন্তন মানবিক প্রত্যয়ের প্রতীক—অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভবোধের জন্ম হবেই।

‘দুষ্টের দমন’ কি কেবল শত্রু নিধন?

কৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘দুষ্টের দমন’ কথাটি বারবার সামনে আসে। কিন্তু এর প্রকৃত তাৎপর্য আরও বিস্তৃত।

দুষ্টতা শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে থাকে না। দুষ্টতা একটি মানসিকতা—লোভ, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায়, শোষণ ও অসত্যের সমষ্টি।

কংস তাই শুধু একজন অত্যাচারী শাসকের নাম নয়; তিনি অত্যাচারী মানসিকতার প্রতীক। দুর্যোধন শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি লোভ, ক্ষমতালিপ্সা ও অন্যায়ের প্রতীক। শকুনি প্রতারণামূলক কূটবুদ্ধির প্রতীক।

এই প্রতীকী পাঠে কৃষ্ণের ‘দুষ্টের দমন’ মানে শুধু ব্যক্তিবিশেষকে পরাজিত করা নয়; বরং অন্যায়ের সংস্কৃতিকে প্রতিহত করা।

আর ‘শিষ্টের পালন’ মানে কেবল সাধু ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়; বরং সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়ানো।

কৃষ্ণের ঐতিহাসিক বিবর্তন

শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। কৃষ্ণকে নিয়ে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা পরবর্তী যুগে নানা স্তরে সমৃদ্ধ হয়েছে।

মহাভারতে কৃষ্ণ প্রধানত একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক, পরামর্শদাতা ও পাণ্ডবদের সুহৃদ। তিনি যুদ্ধের আগে শান্তির উদ্যোগ নেন। কৌরবদের কাছে ন্যায্য দাবির পক্ষে দূত হয়ে যান। তাঁর সেই শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি বুঝতে পারেন—অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

পরবর্তীকালে ভাগবত ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যে কৃষ্ণের আরেকটি রূপ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে—ব্রজের গোপাল, মাখনচোর, বাঁশিওয়ালা, রাধার প্রিয়তম এবং ভক্তের হৃদয়ের পরম আশ্রয়।

অন্যদিকে ভগবদ্গীতার কৃষ্ণ হয়ে ওঠেন বিশ্বদর্শনের শিক্ষক।

এই বিবর্তন কৃষ্ণকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেনি। বরং তাঁকে করেছে বহুমাত্রিক।

তিনি একই সঙ্গে প্রেমের কৃষ্ণ, নীতির কৃষ্ণ, কর্মের কৃষ্ণ, জ্ঞানের কৃষ্ণ এবং কর্তব্যের কৃষ্ণ।

কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণ: যুদ্ধের চেয়ে বড় যে শিক্ষা

কৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দার্শনিক মুহূর্তগুলোর একটি কুরুক্ষেত্র।

অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আপনজন, গুরু ও স্বজনদের দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাঁর হাতে অস্ত্র, কিন্তু মনে দ্বন্দ্ব। এই সংকট কেবল অর্জুনের সংকট নয়; এটি মানুষের চিরন্তন নৈতিক সংকট।

ঠিক সেই মুহূর্তে কৃষ্ণ তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে বলেননি; বরং চিন্তা করতে, কর্তব্য বুঝতে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছেন।

গীতার অন্যতম আলোচিত শিক্ষা—

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।”

মানুষের কর্তব্য হলো সৎ ও ন্যায়সঙ্গত কর্ম করা; ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি যেন তাকে কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না করে।

আজকের সমাজে এই শিক্ষা কতটা প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়। যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় নীতি ও কর্তব্যকে ছাপিয়ে যায়, তখন গীতার কর্মদর্শন নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।

কৃষ্ণ ও রাজনীতি: নীতি এবং বাস্তবতার সমন্বয়

কৃষ্ণকে শুধু ধর্মীয় চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁর রাষ্ট্রনৈতিক প্রজ্ঞা উপেক্ষিত হয়।

তিনি ছিলেন বাস্তবতাবাদী। কিন্তু বাস্তবতাবাদী হওয়া আর নীতিহীন হওয়া এক বিষয় নয়।

তিনি জানতেন কখন আলোচনা করতে হবে, কখন আপসের সুযোগ তৈরি করতে হবে, কখন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে এবং কখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর শান্তি প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে তিনি যুদ্ধকে প্রথম সমাধান হিসেবে দেখেননি। কিন্তু শান্তির নামে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতেও রাজি ছিলেন না।

আধুনিক রাজনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

শান্তি চাই, কিন্তু অন্যায়ের বিনিময়ে নয়।

সমঝোতা চাই, কিন্তু ন্যায় বিসর্জন দিয়ে নয়।

ক্ষমতা চাই, কিন্তু মানুষের কল্যাণের জন্য।

আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এই নৈতিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সমাজে কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

আজ আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। মানুষের হাতে তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল অর্থনীতি—সব মিলিয়ে পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিকতার অগ্রগতি কি সমানতালে হচ্ছে?

মিথ্যা তথ্য, গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, দুর্নীতি, প্রতারণা, সামাজিক বিভাজন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসহিষ্ণুতা আমাদের সমাজজীবনের নানা স্তরে উদ্বেগ তৈরি করছে।

এখানেই কৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা।

কৃষ্ণ আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বলেননি—কারণ তাঁর যুগে প্রযুক্তি আজকের মতো ছিল না। কিন্তু তিনি আমাদের বিবেক ব্যবহার করতে শিখিয়েছেন।

তিনি আমাদের বলেননি কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে; কিন্তু তিনি শিখিয়েছেন—ক্ষমতা ও কর্তব্যের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত।

তিনি আধুনিক গণমাধ্যমের কথা বলেননি; কিন্তু সত্য ও অসত্যের পার্থক্য অনুধাবনের যে নৈতিক বোধ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে কৃষ্ণের শিক্ষা

আজ যদি আমরা প্রশ্ন করি—সমাজে অন্যায় কেন বাড়ে?

শুধু অন্যায়কারী ব্যক্তির জন্য নয়; অনেক সময় অন্যায়ের নীরব দর্শকরাও এর জন্য দায়ী।

কৃষ্ণের দর্শন আমাদের নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকার শিক্ষা দেয় না। বরং কর্তব্যের প্রশ্ন সামনে আনে।

কোনো দুর্বল মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে তার পাশে দাঁড়ানো কি আমাদের কর্তব্য নয়?

কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে প্রতিবাদ করা কি আমাদের সামাজিক দায়িত্ব নয়?

দুর্নীতি যখন সমাজের স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে চায়, তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলা কি নাগরিক কর্তব্য নয়?

অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে পরে শুধু ধর্মীয় আচার পালন করলে কৃষ্ণের দর্শন কতটা ধারণ করা হয়—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

ধর্মীয় উৎসবের অর্থ কী?

জন্মাষ্টমী আমাদের কাছে আনন্দ, ভক্তি ও ধর্মীয় আবেগের উৎসব। মন্দিরে পূজা, কীর্তন, গীতাপাঠ, শোভাযাত্রা—সবই আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

কিন্তু উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন উৎসব আমাদের আচরণে পরিবর্তন আনে।

কৃষ্ণের জন্মদিন পালন করে যদি আমরা মিথ্যা বলি, অন্যায় করি, দুর্বলকে নিপীড়ন করি, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিই কিংবা মানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি—তাহলে কৃষ্ণের জন্মোৎসব আমাদের জীবনে কতটা অর্থ বহন করে?

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে শুধু কৃষ্ণের নাম উচ্চারণ করা নয়।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে কর্তব্য পালন করা।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেক জাগ্রত রাখা।

কৃষ্ণকে ধারণ করা মানে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করা।

তরুণ প্রজন্ম ও কৃষ্ণচেতনা

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সামনে সুযোগ যেমন অনেক, তেমনি বিভ্রান্তিও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল সাফল্য, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদ অনেক সময় তাদের প্রকৃত লক্ষ্যকে আড়াল করে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে অর্জুনের সংশয় এবং কৃষ্ণের উপদেশ আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবনে ব্যর্থতা আসবে, সংশয় আসবে, সংকট আসবে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়।

তরুণদের জন্য কৃষ্ণের শিক্ষা হতে পারে—

নিজেকে জানো।

নিজের কর্তব্যকে জানো।

জ্ঞান অর্জন করো।

সত্যকে ধারণ করো।

অন্যায়ের সঙ্গে আপস করো না।

আর সাফল্যের চেয়ে চরিত্রকে বড় করে দেখো।

কৃষ্ণের প্রেম: বিভাজনের পৃথিবীতে ঐক্যের শিক্ষা

কৃষ্ণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর প্রেম ও মানবিকতা।

বৃন্দাবনের কৃষ্ণ মানুষের হৃদয়ে আনন্দ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও ভক্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলেন। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বৈষ্ণব দর্শনে পরম প্রেম ও ভক্তির এক গভীর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ নানা পরিচয়ে বিভক্ত—ধর্ম, জাতি, মত, রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক শ্রেণি ইত্যাদি।

এই বিভাজনের মধ্যে কৃষ্ণের প্রেমের দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, সম্মান ও সহমর্মিতা।

কৃষ্ণের প্রকৃত আবির্ভাব কোথায়?

হাজার হাজার বছর আগে মথুরার কারাগারে কৃষ্ণের আবির্ভাবের কাহিনি আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু আধুনিক সময়ে কৃষ্ণের আবির্ভাবের একটি প্রতীকী অর্থও আমাদের উপলব্ধি করা দরকার।

যখন একজন মানুষ দুর্নীতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি করেন না—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্বলের ওপর অন্যায় করেন না—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রকে মানুষ করার চেষ্টা করেন—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ায়—সেখানে কৃষ্ণচেতনার আবির্ভাব ঘটে।

যখন একজন মানুষ প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়কে বেছে নেন—সেখানেও কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে।

অর্থাৎ কৃষ্ণ শুধু মথুরায় জন্ম নেননি; প্রতিটি যুগে মানুষের বিবেকের মধ্যে তাঁর পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের প্রত্যাশা

আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো প্রযুক্তির নয়, নৈতিকতার। তথ্যের অভাব নয়, সত্যের সংকট। সম্পদের অভাব নয়, ন্যায়বণ্টনের সংকট। জ্ঞানের অভাব নয়, জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহারের সংকট।

এই বাস্তবতায় কৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

আমাদের দরকার এমন সমাজ, যেখানে ধর্ম হবে মানবিকতার উৎস; রাজনীতি হবে জনকল্যাণের মাধ্যম; শিক্ষা হবে চরিত্র গঠনের হাতিয়ার; ক্ষমতা হবে সেবার উপায় এবং আইন হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই।

শ্রীকৃষ্ণকে যত গভীরভাবে দেখা যায়, তাঁর বহুমাত্রিকতা তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু পুরাণের কৃষ্ণ নন, শুধু বৃন্দাবনের বাঁশিওয়ালা নন, শুধু কুরুক্ষেত্রের সারথিও নন।

তিনি মানুষের নৈতিক সংকটে এক দার্শনিক আশ্রয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নৈতিক আহ্বান; কর্তব্যের প্রশ্নে এক দৃঢ় নির্দেশনা এবং মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেম ও সহমর্মিতার এক অনন্ত প্রতীক।

তাই আজ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—কৃষ্ণ কি শুধু মন্দিরে আবির্ভূত হবেন, নাকি আমাদের বিবেকেও আবির্ভূত হবেন?

কংসের পতন যেমন শুধু একজন অত্যাচারীর পতন ছিল না, তেমনি আজকের ‘কংস’ও শুধু কোনো ব্যক্তি নয়—লোভ, দুর্নীতি, হিংসা, অন্যায়, অসত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারই আজকের কংস।

সুতরাং আজ আমাদের প্রার্থনা হোক—

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস দাও,

সত্যের পথে চলার শক্তি দাও,

কর্তব্য পালনের নিষ্ঠা দাও,

মানুষকে ভালোবাসার হৃদয় দাও।

কারণ কৃষ্ণের প্রকৃত আবির্ভাব তখনই সার্থক হবে, যখন তাঁর জন্মের আলো মন্দিরের প্রদীপ পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে, সমাজের বিবেকে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বোধে জ্বলে উঠবে।

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন কোনো অতীতের কাহিনি নয়—এটি প্রতিটি যুগের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই রয়েছে কৃষ্ণের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।