ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
কাশীপুর মাদ্রাসায় দ’গ্ধ জিদনি-আতিয়ার পর মা’রা গেল লামিয়া ‎ বিআইডব্লিউটিএ’র মেগা প্রকল্পে পাইলিং জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ‎ ‎ জাতীয় যুব শক্তির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির অনুমোদন ভাঙ্গুড়া থেকে অসুস্থ গরু কিনে মাংস বিক্রির চেষ্টা, ফরিদপুরে দুজন আটক পীরগঞ্জে শারদীয় দূর্গোৎসব উপলক্ষ্য পীরগঞ্জ থানার উদ্যেগে মত-বিনিময় সভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বরণে কুমিল্লার মহাসড়কজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ শৈলকূপায় স্ত্রীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে স্বামী গুরুতর আহত, স্ত্রী আটক গোপালগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ‘ফ্যাব্রিক লাইব্রেরি’র যাত্রা শুরু, দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত   কৃষক কার্ড’ বিতরণ কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ-ফজলুল হক মিলন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ দেওয়া হবে না: প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্য চাই—সৌহার্দ্যও চাই, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও চাই।

 

সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলার জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য, সত্যকে সামনে আনার জন্য। একটি জনপদের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকারকে রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই সাংবাদিকতার পরিচয় শুধু একটি কার্ড বা একটি প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত নৈতিকতা, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ, সত্যনিষ্ঠা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার।

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজের সাম্প্রতিক নানা আলোচনা ও পারস্পরিক মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে তাই বিষয়টি শুধু কে কার বিরুদ্ধে কী লিখলেন—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো অপসাংবাদিকতা হচ্ছে কি না, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন কি না, কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না।

তবে এসব প্রশ্ন তুলতে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করাও সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী। অভিযোগ থাকলে তার তথ্য-প্রমাণ, যাচাই ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা এক নয়

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কেউ যদি সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তথ্য যাচাই না করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করেন, কারও সম্মানহানি করেন কিংবা সাংবাদিক পরিচয় দেখিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করেন—এসব অভিযোগ সত্য হলে তা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক চর্চা নয়; বরং অপসাংবাদিকতার গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বিশেষ করে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রকে যদি কেউ চাঁদাবাজি, তদবির, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা ত্রাস সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে তার দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানোও যেমন অন্যায়, তেমনি এমন আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়াও সাংবাদিকতার মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর।

সাংবাদিক কার্ড কোনো ক্ষমতার লাইসেন্স নয়

একটি প্রেস কার্ড একজন সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশনের পেশাগত পরিচয় দিতে পারে; কিন্তু এটি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।

সাংবাদিক পরিচয় দেখিয়ে কোনো অফিসে গিয়ে ভয় দেখানো, ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষকে চাপ দেওয়া, ব্যক্তিগত বিরোধে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া কিংবা আর্থিক সুবিধা দাবি করা—এসবের কোনো বৈধ সাংবাদিকতাসুলভ ভিত্তি নেই।

প্রেস কার্ড সম্মানের পরিচয়, ক্ষমতা প্রদর্শনের অস্ত্র নয়।

তাই সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে—কারা প্রকৃত অর্থে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা কী ধরনের সাংবাদিকতা করছেন এবং পরিচয়পত্রের অপব্যবহার হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকা।

যোগ্যতা ও শিক্ষার প্রশ্নটি হেয় করার জন্য নয়

সাংবাদিকতায় মানুষের শিক্ষাগত পটভূমি ভিন্ন হতে পারে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করা সমীচীন নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত মূল্যায়নে সততা, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান, অনুসন্ধানী মনোভাব, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এটিও সত্য—সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। ফলে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে হলে সংবাদবোধ, তথ্য যাচাই, আইন ও নৈতিকতার মৌলিক জ্ঞান এবং পেশাগত আচরণ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

শুধু একটি কার্ড হাতে থাকলেই কেউ দায়িত্বশীল সাংবাদিক হয়ে যান না। আবার কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেই তাকে অযোগ্য বলা যায় না। যোগ্যতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজের মান, তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত আচরণ ও জনস্বার্থে ভূমিকার ভিত্তিতে।

সৌহার্দ্য চাই, কিন্তু অপসাংবাদিকতার সঙ্গে আপস নয়

রাজৈরের সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য অত্যন্ত প্রয়োজন। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্ট, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কাদা ছোড়াছুড়ি কোনো সমস্যার সমাধান করে না।

কিন্তু সৌহার্দ্যের অর্থ এই নয় যে, কোনো গুরুতর অনিয়ম দেখেও সবাই নীরব থাকবেন।

সহকর্মীর ভুল হলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে; আর গুরুতর অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনে বিষয়টি তুলতে হবে।

বন্ধুত্বের নামে অন্যায়কে আড়াল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ব্যক্তিগত বিরোধকে সাংবাদিকতার নামে প্রকাশ করাও ঠিক নয়।

সিনিয়র সাংবাদিকদের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

রাজৈরের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের মধ্যে যে কোনো বিরোধ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি সত্যিই চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, হয়রানি বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখোমুখি হন, তাহলে বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়—তথ্য, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে দেখা উচিত।

প্রয়োজনে সাংবাদিক সংগঠনগুলো একটি পেশাগত আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে—

সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ দাবি করা যাবে না;

সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া যাবে না;

যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না;

ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়া যাবে না;

ভুল সংবাদ হলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে;

সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রের অপব্যবহার করা যাবে না;

অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে;

গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংরক্ষণ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।

এ ধরনের নীতিমালা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা কমাবে না; বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভিত আরও শক্ত করবে।

আমাদের প্রতিযোগিতা হোক ভালো সাংবাদিকতার

রাজৈরের সাংবাদিকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে কে কাকে হারাবেন—সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং কে জনগণের জন্য ভালো কাজ করবেন—সেই প্রতিযোগিতা।

কে আগে কোনো অনিয়মের তথ্য বের করবেন, কে মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরবেন, কে সত্যতা যাচাই করে ভালো প্রতিবেদন করবেন, কে অসহায় মানুষের কথা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরবেন—প্রতিযোগিতা হোক সেখানে।

একজন সাংবাদিকের সাফল্য অন্য সাংবাদিকের ব্যর্থতা নয়। বরং একজনের ভালো প্রতিবেদন পুরো সাংবাদিক সমাজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

শেষ কথা

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজের প্রতি তাই আহ্বান—পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হোক, কিন্তু সাংবাদিকতার নামে অনিয়মের বিরুদ্ধেও নীরবতা না থাকুক।

সৌহার্দ্য থাকুক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকুক, ভুল হলে ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ থাকুক। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, হয়রানি বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড করেন—অভিযোগটি সত্য হলে তার বিরুদ্ধে পেশাগত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা থাকুক।

কারণ কয়েকজনের অপকর্মের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের নয়; আবার কয়েকজনের পরিচয় ব্যবহার করে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার সুযোগও কাউকে দেওয়া উচিত নয়।

সাংবাদিকতা হোক মানুষের আস্থার জায়গা।

প্রেস কার্ড হোক দায়িত্বের পরিচয়—ক্ষমতার নয়।

কলম হোক সত্যের পক্ষে—ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়।

সমালোচনা হোক তথ্যভিত্তিক—কাদা ছোড়াছুড়ি নয়।

সম্পর্কে থাকুক সৌহার্দ্য—কিন্তু নীতির প্রশ্নে থাকুক দৃঢ়তা।

ক্যাচাল নয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরুন।

ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়—তথ্য ও যুক্তির চর্চা করুন।

সাংবাদিকতার আড়ালে অপসাংবাদিকতা নয়—সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় সবাই দায়িত্বশীল হোন।

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজ হোক বিভেদের নয়, সত্যনিষ্ঠা, সৌহার্দ্য, পেশাদারিত্ব ও জনস্বার্থের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

কাশীপুর মাদ্রাসায় দ’গ্ধ জিদনি-আতিয়ার পর মা’রা গেল লামিয়া ‎

সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্য চাই—সৌহার্দ্যও চাই, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও চাই।

আপডেট সময় : ১২:১৮:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

 

সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলার জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য, সত্যকে সামনে আনার জন্য। একটি জনপদের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকারকে রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই সাংবাদিকতার পরিচয় শুধু একটি কার্ড বা একটি প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত নৈতিকতা, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ, সত্যনিষ্ঠা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার।

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজের সাম্প্রতিক নানা আলোচনা ও পারস্পরিক মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে তাই বিষয়টি শুধু কে কার বিরুদ্ধে কী লিখলেন—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো অপসাংবাদিকতা হচ্ছে কি না, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন কি না, কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না।

তবে এসব প্রশ্ন তুলতে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করাও সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী। অভিযোগ থাকলে তার তথ্য-প্রমাণ, যাচাই ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা এক নয়

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কেউ যদি সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তথ্য যাচাই না করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করেন, কারও সম্মানহানি করেন কিংবা সাংবাদিক পরিচয় দেখিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করেন—এসব অভিযোগ সত্য হলে তা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক চর্চা নয়; বরং অপসাংবাদিকতার গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বিশেষ করে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রকে যদি কেউ চাঁদাবাজি, তদবির, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা ত্রাস সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে তার দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানোও যেমন অন্যায়, তেমনি এমন আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়াও সাংবাদিকতার মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর।

সাংবাদিক কার্ড কোনো ক্ষমতার লাইসেন্স নয়

একটি প্রেস কার্ড একজন সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশনের পেশাগত পরিচয় দিতে পারে; কিন্তু এটি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।

সাংবাদিক পরিচয় দেখিয়ে কোনো অফিসে গিয়ে ভয় দেখানো, ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষকে চাপ দেওয়া, ব্যক্তিগত বিরোধে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া কিংবা আর্থিক সুবিধা দাবি করা—এসবের কোনো বৈধ সাংবাদিকতাসুলভ ভিত্তি নেই।

প্রেস কার্ড সম্মানের পরিচয়, ক্ষমতা প্রদর্শনের অস্ত্র নয়।

তাই সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে—কারা প্রকৃত অর্থে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা কী ধরনের সাংবাদিকতা করছেন এবং পরিচয়পত্রের অপব্যবহার হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকা।

যোগ্যতা ও শিক্ষার প্রশ্নটি হেয় করার জন্য নয়

সাংবাদিকতায় মানুষের শিক্ষাগত পটভূমি ভিন্ন হতে পারে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করা সমীচীন নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত মূল্যায়নে সততা, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান, অনুসন্ধানী মনোভাব, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এটিও সত্য—সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। ফলে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে হলে সংবাদবোধ, তথ্য যাচাই, আইন ও নৈতিকতার মৌলিক জ্ঞান এবং পেশাগত আচরণ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

শুধু একটি কার্ড হাতে থাকলেই কেউ দায়িত্বশীল সাংবাদিক হয়ে যান না। আবার কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেই তাকে অযোগ্য বলা যায় না। যোগ্যতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজের মান, তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত আচরণ ও জনস্বার্থে ভূমিকার ভিত্তিতে।

সৌহার্দ্য চাই, কিন্তু অপসাংবাদিকতার সঙ্গে আপস নয়

রাজৈরের সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য অত্যন্ত প্রয়োজন। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্ট, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কাদা ছোড়াছুড়ি কোনো সমস্যার সমাধান করে না।

কিন্তু সৌহার্দ্যের অর্থ এই নয় যে, কোনো গুরুতর অনিয়ম দেখেও সবাই নীরব থাকবেন।

সহকর্মীর ভুল হলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে; আর গুরুতর অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনে বিষয়টি তুলতে হবে।

বন্ধুত্বের নামে অন্যায়কে আড়াল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ব্যক্তিগত বিরোধকে সাংবাদিকতার নামে প্রকাশ করাও ঠিক নয়।

সিনিয়র সাংবাদিকদের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

রাজৈরের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের মধ্যে যে কোনো বিরোধ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি সত্যিই চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, হয়রানি বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখোমুখি হন, তাহলে বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়—তথ্য, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে দেখা উচিত।

প্রয়োজনে সাংবাদিক সংগঠনগুলো একটি পেশাগত আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে—

সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ দাবি করা যাবে না;

সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া যাবে না;

যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না;

ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়া যাবে না;

ভুল সংবাদ হলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে;

সাংবাদিকতার পরিচয়পত্রের অপব্যবহার করা যাবে না;

অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে;

গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংরক্ষণ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।

এ ধরনের নীতিমালা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা কমাবে না; বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভিত আরও শক্ত করবে।

আমাদের প্রতিযোগিতা হোক ভালো সাংবাদিকতার

রাজৈরের সাংবাদিকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে কে কাকে হারাবেন—সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং কে জনগণের জন্য ভালো কাজ করবেন—সেই প্রতিযোগিতা।

কে আগে কোনো অনিয়মের তথ্য বের করবেন, কে মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরবেন, কে সত্যতা যাচাই করে ভালো প্রতিবেদন করবেন, কে অসহায় মানুষের কথা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরবেন—প্রতিযোগিতা হোক সেখানে।

একজন সাংবাদিকের সাফল্য অন্য সাংবাদিকের ব্যর্থতা নয়। বরং একজনের ভালো প্রতিবেদন পুরো সাংবাদিক সমাজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

শেষ কথা

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজের প্রতি তাই আহ্বান—পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হোক, কিন্তু সাংবাদিকতার নামে অনিয়মের বিরুদ্ধেও নীরবতা না থাকুক।

সৌহার্দ্য থাকুক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকুক, ভুল হলে ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ থাকুক। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, হয়রানি বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড করেন—অভিযোগটি সত্য হলে তার বিরুদ্ধে পেশাগত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা থাকুক।

কারণ কয়েকজনের অপকর্মের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের নয়; আবার কয়েকজনের পরিচয় ব্যবহার করে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার সুযোগও কাউকে দেওয়া উচিত নয়।

সাংবাদিকতা হোক মানুষের আস্থার জায়গা।

প্রেস কার্ড হোক দায়িত্বের পরিচয়—ক্ষমতার নয়।

কলম হোক সত্যের পক্ষে—ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়।

সমালোচনা হোক তথ্যভিত্তিক—কাদা ছোড়াছুড়ি নয়।

সম্পর্কে থাকুক সৌহার্দ্য—কিন্তু নীতির প্রশ্নে থাকুক দৃঢ়তা।

ক্যাচাল নয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরুন।

ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়—তথ্য ও যুক্তির চর্চা করুন।

সাংবাদিকতার আড়ালে অপসাংবাদিকতা নয়—সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় সবাই দায়িত্বশীল হোন।

রাজৈরের সাংবাদিক সমাজ হোক বিভেদের নয়, সত্যনিষ্ঠা, সৌহার্দ্য, পেশাদারিত্ব ও জনস্বার্থের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।