দুর্নীতির সুতিকাগার খ্যাত ঢাকা ওয়াসায় বিগত আওয়ামী শাসনামলে ফ্যাসিস্ট দোসর তাকসিম এ. খান চক্রের লুটপাটে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিল। ৫ আগষ্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ওয়াসাকে রাইট ট্রাকে আনার জন্যে ”রেসকিউ টিম” হিসেবে কয়েকজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে সরকার এখানে পোস্টিং প্রদান করেন। এর মধ্যে একজন হচ্ছেন ঢাকা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মো: মাহবুবুর রহমান। বিসিএস ২২তম ব্যাচ(কৃষি ক্যাডার) এর মো: মাহবুবুর রহমান প্রশাসনে ২৮তম ব্যাচের সাথে ২৫ পার্সেন্ট কোটায় উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।
অত:পর ৪ নভেম্বর-২০২৪ সালে ঢাকা ওয়াসায় প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ”রেসকিউ টিম” হিসেবে ডুবন্ত তরি ঢাকা ওয়াসাকে ওপরে উঠানোর পরিবর্তে তিনি আরো তলিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি দায়িত্ব নেয়ার ওয়াসার রাজস্ব আদায়ে রীতিমত ধস নেমেছে।
ঢাকা ওয়াসার দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী,২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। রাজস্ব আদায় হ্রাস পাওয়ার জন্যে অনিয়ম,অব্যবস্থাপনা,দুর্নীতি,কোড বরাদ্দ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতিকে দায়ি করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক ধস নামায় ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এদিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করায় চটে গেছেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মো: মাহবুবুর রহমান।তিনি রাজস্ব আদায়ের টার্গেট বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছেন। এবিষয়ে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে তিনি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে অশোভন আচরণ করেছেন। এমনকি রাজস্ব আদায়ের টার্গেট বৃদ্ধি ঠেকাতে তিনি ঢাকা ওয়াসার কথিত সিবিএ নেতাদের দিয়েও কর্তৃপক্ষকে প্রেসার দিচ্ছেন বলে জানাগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর মো: মাহবুবুর রহমান ছাত্রজীবনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি নিলফামারী জেলায়। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুরের সাথে সখ্যতা ছিল মো: মাহবুবুর রহমানের। মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর তার এলাকার হওয়ায় নিজেকে তার আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফায়দা হাসিল করতেন। তিনি আসাদুজ্জামান নুরের একজন ডোনার ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর মো: মাহবুবুর রহমান ৩৬০ ডিগ্রি পল্টি নিয়েছেন। এখন বিএনপি সাজার বনিতা করছেন। এককালে আসাদুজ্জামান নুরের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফায়দা হাসিল করতেন; আর এখন সওয়ার হয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি আব্দুর রউফ মিয়ার ঘারে। আব্দুর রউফ মিয়া-কে চাচা পরিচয় দিয়ে ওয়াসায় নিজের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে কোন কাজ বাগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ”চাচা” আব্দুর রউফ মিয়ার নাম বিক্রি করছেন। প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন, আব্দুর রউফ মিয়ার সাথে তার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। তবে ”চাচা” বানিয়ে তার নাম বিক্রি করে ফায়দা হাসিল করার বিষয়টি আব্দুর রউফ মিয়া অবগত আছেন কিনা;বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মো: মাহবুবুর রহমান প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই রাজস্ব সাইট কোড বরাদ্দ বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কোড বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করছেন। কোড বাণিজ্যে তার মূল সারথী হিসেবে রয়েছেন তার ভাগ্নে ঢাকা ওয়াসার সহকারি প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন। আর প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছেন বিতর্কিত দুই উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা তানবির আহম্মেদ সিদ্দিকি(রাজস্ব জোন-১০) ও এনায়েত করিম(রাজস্ব জোন-৬)।আওয়ামী ফ্যাসিস্ট বিতর্কিত দুই উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও ভাগ্নে প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন-কে নিয়ে ওয়াসায় তিনি রাবন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করছেন।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের ভাগ্নি জামাতা এবং ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতির বরপুত্র উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা তানবির আহম্মেদ সিদ্দিকির আমলনামা থাকবে পৃথক প্রতিবেদনে।
এছাড়া, মো: মাহবুবুর রহমান প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিলিং সহকারী মো: নাজমুল হকসহ ( রাজস্ব জোন-৩, কোড-৪২৩,সাইট-লালমাটিয়া ব্লক সি,ডি,এফ,জি ও নজরুল ইসলাম রোড, হিসাব সংখ্যা- ৩০০) অনন্ত ১৫ জন আত্মীয় স্বজনকে বিলিং সহকারি ও পাম্প অপারেটর পদে চাকরি দিয়েছেন।
অন্যদিকে মো: মাহবুবুর রহমান বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হলেও তিনি প্রটোকল,ডেকোরাম কিছুই মানতে রাজি নয়। যে সকল অনুষ্ঠানে ওয়াসার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারিরা প্রধান অতিথি,বিশেষ অতিথি ও সভাপতি থাকেন;সেখানে তিনি উপস্থিত থাকেন। এমনকি তৃতীয় শ্রেণির ধনী কর্মচারি হাসপাতালে থাকলে সেখানে গিয়ে তিনি দেখা করেন। তার এমন আচরণে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বিব্রত বোধ করছেন। প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে।
এদিকে প্রটোকল,ডেকোরাম ভঙ্গের এখানেই শেষ নয়। মো: মাহবুবুর রহমান এর মহিলা ব্যক্তিগত সহকারি(পিএ) কে নিয়ম অনুযায়ী তার কক্ষের সামনে নির্ধারিত কক্ষে না বসিয়ে তার রুমের ভিতরে বসিয়ে কাজ করাচ্ছেন। যা নিয়ে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চলছে নানা মুখরোচক কথা বার্তা।
ঢাকা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মো: মাহবুবুর রহমান এর অনিয়ম,দুর্নীতি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্যে এলজিআরডি মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ।
এবিষয়ে ঢাকা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মো: মাহবুবুর রহমান এর বক্তব্য নেয়ার জন্যে তার মুঠোফোনে চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
সারাক্ষণ ডেস্ক 



















