ঢাকা ০৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
নির্বাচন কমিশনের সতর্কবার্তা। সাবধান থাকার পরামর্শ। স্বৈরাচারের দোসরেরা ভোট বানচালের চেষ্টা করবে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত: প্রধান উপদেষ্টা প্রতি বছর বিলম্বে পাঠ্যবই ছাপার নেপথ্যে  ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য ! নিরপরাধ আ. লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হলে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি বিএনপি নেতা হারুনের। মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঘোর বিরোধী দাপুটে তিন বুদ্ধিজীবী। ইয়াবাসহ সুমন নামে এক মাদক কারবারি ডিবির হাতে গ্রেফতার। সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের সাথে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। খুলনা গণপূর্তে দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য : উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুরের সাত বছরের অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট ! তিনিই স্বঘোষিত সম্রাট! শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশ ফাউন্ডেশনের শিক্ষা প্রণোদনা বিতরণ। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ১৫টি বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সবার শীর্ষে শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ।

বিআরটিএ’র নম্বরপ্লেট দুর্নীতি! দেখার কেউ নেই ।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:০৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ১৬৭ জন সংবাদটি পড়েছেন
8

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। এই ভোগান্তির মধ্যে বিআরটিএর একদল কর্মকর্তা মিরপুর, উত্তরা, ইকুরিয়া ও পূর্বাচল শাখা থেকে সারা দেশে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। এই অপকর্মের মাধ্যমে প্রতি মাসে তারা ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির নানা তথ্য।

বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার তথ্য বলছে, বিআরটিএতে নিবন্ধিত কোনো গাড়ির কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে গেলে নিয়ম অনুযায়ী ফি দিতে হয় ৩ হাজার ৬৫২  টাকা। মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে ফি দিতে হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফি দিতে হয় ২ হাজার ২৬০ টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফি দিতে হয় ৫৫৫ টাকা।

দুদকের প্রতিবেদন বলছে, তারা কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে নির্ধারিত ফিসহ ৫ হাজার টাকা, মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৪ হাজার টাকা, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৩ হাজার টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফিসহ ২ হাজার টাকা আদায় করছেন।

বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা এভাবে লুটপাট হচ্ছে, সেই অঙ্কটি নির্ধারণ করা যায়নি। তবে দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির হোতারা প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন।

দুর্নীতির হোতা আল আমিন।

এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আল আমিন। ২০১২ সালে এলরোলমেন্ট অফিসার থেকে ম্যানেজার পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি নম্বরপ্লেট সেকশনকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। তিনি বিআরটিএর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় দুর্নীতির রাজত্ব বিস্তার করেছেন বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিকবার শাস্তির সুপারিশ করা হলেও আল আমিন প্রতিবার মোটা অঙ্কের টাকার ঘুষের বিনিময়ে পার পেয়ে গেছেন। তিনি বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকা উৎকোচ প্রদান করছেন বলে দুদকের কর্মকর্তারা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন।

এখানেই শেষ নয়, আল আমিন তার সিন্ডিকেট সদস্যদের সহযোগিতায় মিরপুর সার্কেলের এক ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদকে এনরোলমেন্ট এক্সিকিউটিভ পদে অবনমন করিয়ে আনেন। এর কিছু দিন পর বিআরটিএর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে তানভীরকে গাজীপুর সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এরপর বেশ কয়েকজন সহকারী ব্যবস্থাপককে ডিঙিয়ে আল আমিনকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, আল আমিন দুর্নীতি করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে অবস্থিত তার বর্তমান ফ্ল্যাটের মূল্য ৮০ লাখ টাকা। বগুড়ায় কোটি টাকার মশারির ব্যবসা আছে তার। ৬ লাখ টাকা দামের একটি গাড়ি আছে তার। এ ছাড়া আল আমিন এবং তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ আছে।

কারা জড়িত ‘আল আমিন সিন্ডিকেটে’ ?

আল আমিন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিআরটিএ সার্কেল-১-এর কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান, প্লাবন রোজারিও, ডমিনিক ফালিয়া ও ইশতিয়াক আহমেদের।

বিআরটিএর ডিজিটাল নম্বরপ্লেট বানাতে কারিগরি সহায়তা দেয় টাইগার আইটি। সেই টাইগার আইটির একদল কর্মকর্তাও এই দুর্নীতিতে জড়িত। টাইগার আইটির নম্বরপ্লেট সেকশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আহসান হাবীব, কারিগরি দলের প্রধান রুহুল রনি, কারিগরি সহায়ক বেলাল হোসেন, হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী, প্রকল্পের সমন্বয়ক মাসুদ সুজনের সহযোগী রক্সি এবং এইচ আল হুমায়রা নামও উঠে এসেছে নম্বরপ্লেট জালিয়াতির ঘটনায়।

বিআরটিএর নম্বরপ্লেটের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিনও এই অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল নম্বরপ্লেট জালিয়াতিতে যুক্ত সবচেয়ে বড় নাম বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি শাখা) শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের। তিনি একা নন, এই নম্বরপ্লেট দুর্নীতির অর্থ লোপাটে নাম এসেছে ইকুরিয়া বিআরটিএ শাখার ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, পূর্বাচল বিআরটিএ সেকশনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, আমজাদ হোসেন রুবেল এবং ফিক্সিং অপারেটর ইব্রাহীমের। বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখরের আপন ভায়রা। মেহেদী হাসান শীতাংশু শেখরের ড্রাইভার জসিম উদ্দিনের আপন ভাই। আল আমিন সিন্ডিকেটকে সহায়তা দিতে শীতাংশু শেখরের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।

এর আগে বিআরটিএর ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রমে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। ২০১২ সাল থেকে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটি যুক্ত হয়। পরে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিআরটিএ। কিন্তু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন ভেহিক্যাল নম্বরপ্লেটে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে টাইগার আইটির চুক্তি এখনো বাতিল হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করে।

এমন ঘটনার পরেও বিআরটিএ কেন টাইগার আইটির কারিগরি সহায়তা নিচ্ছে, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

যেভাবে হয় টাকা বিলি-বণ্টন

আল আমিনের প্রধান সহযোগী বিআরটিএর কর্মকর্তা ইশতিহাক আহমেদ। তিনি বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (এডি) এবং পরিদর্শকদের স্বাক্ষর-সিল নকল করেন। পরে সেই সিল-সাইন ব্যবহার করে ভুয়া নম্বরপ্লেট তৈরি করেন। প্লাবন রোজারিও সব নম্বরপ্লেট হস্তান্তরের হিসাব সংরক্ষণ করেন। ডমিনিক ফালিয়া ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হস্তান্তর বাবদ যত টাকা আয় হয়, তার হিসাব রাখেন। মাকসুদুর রহমান বায়োমেট্রিক থেকে যা আয় হয় তার হিসাব রাখেন।

বিআরটিএর চারটি কার্যালয় থেকে সারা দেশে নম্বরপ্লেট পাঠানো হয়। এরপর নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয় তার হিসাব-নিকাশ করেন এই কর্মকর্তারা। প্রত্যেকের লাভের অংশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হয়। নিজেদের ভাগের টাকা রেখে তারা বড় অঙ্কের অর্থ পাঠিয়ে দেন আল আমিনের কাছে।০

আল আমিনের হয়ে এই অর্থ বিলি-বণ্টন করেন টাইগার আইটির হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী। বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে মাস শেষে কত টাকা উঠল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখেন তিনি।

আক্কাস আলীর দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি বিআরটিএর মিরপুর সার্কেলের নম্বরপ্লেট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিনকে উত্তরা সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এই বদলি করানোর জন্য তিনি বিআরটিএর তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক শীতাংশু শেখরকে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দেন বলে বিআরটিএর নানা সূত্রে জানা গেছে।

সারাক্ষণ বার্তাকে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান জানিয়েছেন এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।নম্বরপ্লেট দুর্নীতির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিআরটিএর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে সারাক্ষণ বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। এই কর্মকর্তাদের একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি। শীতাংশু শেখরকে তার কার্যালয়ে গিয়েও পাওয়া যায়নি।পরে এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ মো. সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দুদক থেকে এখনো কোনো চিঠি আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি। আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। বিআরটিএর নানা দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছি। সব অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচন কমিশনের সতর্কবার্তা। সাবধান থাকার পরামর্শ।

বিআরটিএ’র নম্বরপ্লেট দুর্নীতি! দেখার কেউ নেই ।

আপডেট সময় : ০৯:০৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫
8

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। এই ভোগান্তির মধ্যে বিআরটিএর একদল কর্মকর্তা মিরপুর, উত্তরা, ইকুরিয়া ও পূর্বাচল শাখা থেকে সারা দেশে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। এই অপকর্মের মাধ্যমে প্রতি মাসে তারা ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির নানা তথ্য।

বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার তথ্য বলছে, বিআরটিএতে নিবন্ধিত কোনো গাড়ির কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে গেলে নিয়ম অনুযায়ী ফি দিতে হয় ৩ হাজার ৬৫২  টাকা। মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে ফি দিতে হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফি দিতে হয় ২ হাজার ২৬০ টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফি দিতে হয় ৫৫৫ টাকা।

দুদকের প্রতিবেদন বলছে, তারা কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে নির্ধারিত ফিসহ ৫ হাজার টাকা, মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৪ হাজার টাকা, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফিসহ ৩ হাজার টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফিসহ ২ হাজার টাকা আদায় করছেন।

বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা এভাবে লুটপাট হচ্ছে, সেই অঙ্কটি নির্ধারণ করা যায়নি। তবে দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির হোতারা প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন।

দুর্নীতির হোতা আল আমিন।

এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আল আমিন। ২০১২ সালে এলরোলমেন্ট অফিসার থেকে ম্যানেজার পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি নম্বরপ্লেট সেকশনকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। তিনি বিআরটিএর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় দুর্নীতির রাজত্ব বিস্তার করেছেন বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিকবার শাস্তির সুপারিশ করা হলেও আল আমিন প্রতিবার মোটা অঙ্কের টাকার ঘুষের বিনিময়ে পার পেয়ে গেছেন। তিনি বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকা উৎকোচ প্রদান করছেন বলে দুদকের কর্মকর্তারা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন।

এখানেই শেষ নয়, আল আমিন তার সিন্ডিকেট সদস্যদের সহযোগিতায় মিরপুর সার্কেলের এক ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদকে এনরোলমেন্ট এক্সিকিউটিভ পদে অবনমন করিয়ে আনেন। এর কিছু দিন পর বিআরটিএর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে তানভীরকে গাজীপুর সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এরপর বেশ কয়েকজন সহকারী ব্যবস্থাপককে ডিঙিয়ে আল আমিনকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, আল আমিন দুর্নীতি করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে অবস্থিত তার বর্তমান ফ্ল্যাটের মূল্য ৮০ লাখ টাকা। বগুড়ায় কোটি টাকার মশারির ব্যবসা আছে তার। ৬ লাখ টাকা দামের একটি গাড়ি আছে তার। এ ছাড়া আল আমিন এবং তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ আছে।

কারা জড়িত ‘আল আমিন সিন্ডিকেটে’ ?

আল আমিন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিআরটিএ সার্কেল-১-এর কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান, প্লাবন রোজারিও, ডমিনিক ফালিয়া ও ইশতিয়াক আহমেদের।

বিআরটিএর ডিজিটাল নম্বরপ্লেট বানাতে কারিগরি সহায়তা দেয় টাইগার আইটি। সেই টাইগার আইটির একদল কর্মকর্তাও এই দুর্নীতিতে জড়িত। টাইগার আইটির নম্বরপ্লেট সেকশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আহসান হাবীব, কারিগরি দলের প্রধান রুহুল রনি, কারিগরি সহায়ক বেলাল হোসেন, হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী, প্রকল্পের সমন্বয়ক মাসুদ সুজনের সহযোগী রক্সি এবং এইচ আল হুমায়রা নামও উঠে এসেছে নম্বরপ্লেট জালিয়াতির ঘটনায়।

বিআরটিএর নম্বরপ্লেটের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিনও এই অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল নম্বরপ্লেট জালিয়াতিতে যুক্ত সবচেয়ে বড় নাম বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি শাখা) শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের। তিনি একা নন, এই নম্বরপ্লেট দুর্নীতির অর্থ লোপাটে নাম এসেছে ইকুরিয়া বিআরটিএ শাখার ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, পূর্বাচল বিআরটিএ সেকশনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেট সেকশনের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, আমজাদ হোসেন রুবেল এবং ফিক্সিং অপারেটর ইব্রাহীমের। বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বিআরটিএর পরিচালক শীতাংশু শেখরের আপন ভায়রা। মেহেদী হাসান শীতাংশু শেখরের ড্রাইভার জসিম উদ্দিনের আপন ভাই। আল আমিন সিন্ডিকেটকে সহায়তা দিতে শীতাংশু শেখরের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগে উঠে এসেছে।

এর আগে বিআরটিএর ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রমে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। ২০১২ সাল থেকে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটি যুক্ত হয়। পরে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিআরটিএ। কিন্তু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন ভেহিক্যাল নম্বরপ্লেটে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে টাইগার আইটির চুক্তি এখনো বাতিল হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করে।

এমন ঘটনার পরেও বিআরটিএ কেন টাইগার আইটির কারিগরি সহায়তা নিচ্ছে, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

যেভাবে হয় টাকা বিলি-বণ্টন

আল আমিনের প্রধান সহযোগী বিআরটিএর কর্মকর্তা ইশতিহাক আহমেদ। তিনি বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (এডি) এবং পরিদর্শকদের স্বাক্ষর-সিল নকল করেন। পরে সেই সিল-সাইন ব্যবহার করে ভুয়া নম্বরপ্লেট তৈরি করেন। প্লাবন রোজারিও সব নম্বরপ্লেট হস্তান্তরের হিসাব সংরক্ষণ করেন। ডমিনিক ফালিয়া ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হস্তান্তর বাবদ যত টাকা আয় হয়, তার হিসাব রাখেন। মাকসুদুর রহমান বায়োমেট্রিক থেকে যা আয় হয় তার হিসাব রাখেন।

বিআরটিএর চারটি কার্যালয় থেকে সারা দেশে নম্বরপ্লেট পাঠানো হয়। এরপর নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয় তার হিসাব-নিকাশ করেন এই কর্মকর্তারা। প্রত্যেকের লাভের অংশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হয়। নিজেদের ভাগের টাকা রেখে তারা বড় অঙ্কের অর্থ পাঠিয়ে দেন আল আমিনের কাছে।০

আল আমিনের হয়ে এই অর্থ বিলি-বণ্টন করেন টাইগার আইটির হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী। বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে মাস শেষে কত টাকা উঠল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখেন তিনি।

আক্কাস আলীর দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি বিআরটিএর মিরপুর সার্কেলের নম্বরপ্লেট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিনকে উত্তরা সার্কেলে বদলি করিয়ে দেন। এই বদলি করানোর জন্য তিনি বিআরটিএর তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক শীতাংশু শেখরকে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দেন বলে বিআরটিএর নানা সূত্রে জানা গেছে।

সারাক্ষণ বার্তাকে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান জানিয়েছেন এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।নম্বরপ্লেট দুর্নীতির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিআরটিএর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে সারাক্ষণ বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। এই কর্মকর্তাদের একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি। শীতাংশু শেখরকে তার কার্যালয়ে গিয়েও পাওয়া যায়নি।পরে এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ মো. সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দুদক থেকে এখনো কোনো চিঠি আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি। আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। বিআরটিএর নানা দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছি। সব অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’