বাংলাদেশের বিখ্যাত নদী গুলির মধ্যে মধুমতি অন্যতম। একে ঘিরে আছে আবেগ, আছে ভালবাসা,আছে বেদনা, আছে নষ্টালজিক হওয়ার মত কিছু অনুভূতি। আবার একে ঘিরে আছে জীবন জীবিকা,প্রান সঞ্চারিত হওয়ার মত কিছু উপায়।কেউ নদী পারাপার করে অর্থ উপার্জন করে,কেউবা মাছ ধরে কেউবা আবার নদীর জল ব্যাবহার করে জলজান চালিয়ে। কেউবা আবার এর জল সেচ কাজে ব্যবহার করে ফসল ফলায়।
খরস্রোতা এ নদীর পাল তোলা নৌকার সমাহার যুবতী নারীর অলংকরণের মত।উচ্ছসিত যৌবনের জলরাশি ছিল নদী পারাপার পথিকের বুকের কাপন।
ভরা ভাদর আসে, ভরা যৌবন আসে কিন্তু এখন আর পারাপারের পথিকের বুকে কাপন ধরায় না।বর্ষায় কিছু প্রজনন তাড়নায় উদ্ভ্রান্ত ইলিশ মাছের ছুটোছুটি দেখা যায়।তখন উন্মত্ত জেলেরাও উদ্ভ্রান্ত হয়ে যায় এ মাছ ধরার জন্য। তখন রাতে জেলে নৌকাগুলো ব্যাস্ত হয়ে ওঠে।
মধুমতী নদীটি কামারখালী গড়াই নদীর ছুড়ে ফেলা অংশ থেকে বেরিয়ে দে ছুট সাগর পর্যন্ত। দীর্ঘ পথ তবে তার ক্লান্তি নেই ছুটে চলায়।পূর্ব প্রান্তে ফরিদ পুর,গোপালগঞ্জ হয়ে সাগরে আবার অন্য প্রান্তে মাগুরা, নড়াইল,বাগেরহাট হয়ে সাগরে। দুই কুলের অসংখ্য জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।কেউ জেলে জন্মগতভাবে আবার কেউ জন্মের পর মাছের ব্যাবসা করে জেলে হয়ে গিয়েছে। জন্মগত এবং জন্মের পরে জেলের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।এ পার্থক্য আমি স্বচোখে দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি। একজন জন্মগতভাবে জেলের নিকট নদী যেন পূন্য
জলাশয়ের। নদীকে তারা দেবীর মত মনে করে।তাই তার পবিত্রতা রক্ষার জন্য মনপ্রাণ সপে দেয়।নদীর জল একসময় খেয়েছে,রান্না করেছে,গোসল করেছে।আবার জলের মাছ ধরেছে আবার যাতে মাছ জন্মে সে পরিবেশটাও তারা রক্ষা করেছে।আমার দেখা মধুমতীর তীরের জেলে পরিবার যারা যুগযুগ ধরে এখানে বসবাস করে নদীর উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।তারা কখনো নদীর মাছের প্রজন্ন ক্ষতি গ্রস্থ হয় এমন কাজের সাথে জড়িত হয় না।তার কারণ তারা জানে এ নদীর মাছই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জীবন জীবিকার উপায়।তাই নদীকে বাচিয়ে রাখতে চায়।মৎস্য সম্পদ আহরণ করার আশায়।তারা মাছ ক্রয় বিক্রয় ছাড়া অন্য কাজ বুঝে না। অথচ যারা জাতজেলে নয়।অন্য কাজ করে পাশাপাশি মাছের ব্যবসা করে তারা নদীর মাছের প্রজননের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করছে।এ ধরনের আধা জেলে নদীতে গ্যাস ট্যাবলেট, ইলেক্ট্রিক শক, কারেন্ট জাল ব্যবহার করে মাছ ধরে।ফলে এর ক্ষমতার মধ্যে ছোট বড় যে মাছই থাকুক না কেন দূর্বল হয়ে ভেসে ওঠে এবং ধরা পড়ে
। এ ভাবে ছানা এবং মা মাছ ধরা পড়ে পরবর্তী প্রজন্ম জন্মাতে গ্যাপ সৃষ্টী হচ্ছে।নদীতে মাছের আকাল দেখা দিচ্ছে।আবার এই পদ্ধতিতে ধরা মাছে কোন স্বাদও পাওয়া যায় না।
প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে মধুমতী নদীর মাছে যে স্বাদ পাওয়া যেত এখন সে রকম স্বাদ নেই।অনেকেই মনে করেন এর কারণ মধুমতী নদীর দু পাশে প্রচুর মুরগির খামার আছে।সে খামার গুলোর বর্জ্য নদীতে যায়।এই খামারগুলোতে মুরগির খাবারের প্রচুর কেমিক্যাল যায়।
আর এই বর্জ মাছে খায় বলেই মধুমতীর মাছের স্বাদের পরিবর্তন এবং মাছের জীব বৈচিত্রে প্রভাব পড়ছে।
মধুমতী নদীর মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় এ নদী পাড়ের জাত জেলেরা সাতক্ষীরার মাছ,চলন বিলের মাছ(তাদের ভাষায়),বরিশালের মাছ আমদানি করে ব্যাবসা পরিচালনা করছে।বাবুখালীর হরিনাডাংগা গ্রামের গীটার কুমার বলে,”মধুমতী নদীতে মাছ এখন পাওয়া যাচ্ছে না বলেই এলাকার বাইরের মাছের উপর তারা নির্ভরশীল। নদীতে অবৈধ উপায়ে মাছ ধরার কারণে মাছের জন্ম লোপ পাচ্ছে।”
স্থানীয় জনগণ মনে করেন নদী পাড়ের বাসিন্দা, অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে বিষয়টি স্ব স্ব দায়িত্বশীল জায়গা থেকে মধুমতী নদীর মাছের প্রজনন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।
অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলম 






















