ঢাকা ১০:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
স্বৈরাচারের দোসরেরা ভোট বানচালের চেষ্টা করবে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত: প্রধান উপদেষ্টা প্রতি বছর বিলম্বে পাঠ্যবই ছাপার নেপথ্যে  ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য ! নিরপরাধ আ. লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হলে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি বিএনপি নেতা হারুনের। মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঘোর বিরোধী দাপুটে তিন বুদ্ধিজীবী। ইয়াবাসহ সুমন নামে এক মাদক কারবারি ডিবির হাতে গ্রেফতার। সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের সাথে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। খুলনা গণপূর্তে দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য : উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুরের সাত বছরের অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট ! তিনিই স্বঘোষিত সম্রাট! শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশ ফাউন্ডেশনের শিক্ষা প্রণোদনা বিতরণ। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ১৫টি বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সবার শীর্ষে শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ। মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম কমিটির আগামীদিনের কর্ম পরিকল্পনা ঘোষণা।

শৈশবে শীতের স্মৃতি বিস্মৃতির অনুভূতি এ যেন এক অজানা নষ্টালজিয়া।

11

মানুষের জন্মের ইতিহাস এক একজনের এক এক রকম। কেউ রান্না ঘরের এক কোনায়,কেউবা আবার গৃহ ঘরের এক কোনায় আলাদা জায়গায়। কেউবা আবার হাসপাতালে। আমাদের সময়ে হাসপাতালে শিশুর জন্ম ভাবাই যেত না। বিশেষ করে গ্রামে। গ্রামের অশিক্ষিত ধাত্রীই ছিল অবলম্বন। তারা অশিক্ষিত প্রশিক্ষণ বিহীন হলেও অভিজ্ঞতা তাদেরকে দক্ষ ধাত্রী করে গড়ে তুলেছিল। এমনই এক ধাত্রীর তত্বাবধানে মামার বাড়িতে গৃহ ঘরের এক কোনে আমার জন্ম।আমার জন্মের সময় দুজন ধাত্রী ছিলেন।কোন শিশুর জন্মের সাধ না থাকলেও জন্মানোর সাধই তাকে বাধ্য করে পৃথিবীতে আগমনে। আমার আগমনও ছিল তেমন।

জন্মের ছয় মাসে আমার একটি ছবি তুলেছিলেন আমার আব্বা মাগুরা থেকে ক্যামেরা ম্যান ভাড়া করে এনে। ছবিটি আমিও দেখেছিলাম ছোট বেলায়।পরনে ছিল সাদা এক টুকরো কাপড়। সে সময় বাচ্চাদের জন্য বাজারে এত কাপড়ও ছিল না।দুই তিন বছরের আগে খুব কম ছেলে মেয়েই কাপড় পরেছে।তবে মেয়েদের তবন পরতে দেখা যেত। অনেকে বড় হলেও পোরত।তবন তখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।বাজারে আধুনিক পোশাক আসতে শুরু করেছে।

পোশাক যে শুধুমাত্র লজ্জা নিরারনের জন্য তাইই নয়।শীত নিবারনের জন্যও বটে।কিন্তু সে সময় শীত নিবারনের জন্য আলাদা পোশাক কল্পনা করা যেত না বিশেষ করে গ্রামে।

সম্পন্ন গৃহস্থ শীতকে শত্রুর মত দেখেছে।শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য যেমন ঢাল তলোয়ার তৈরী করে রাখতে হয় আসন্ন যুদ্ধের জন্য। তেমনি শীতের মোকাবিলায় শিমুল তুলা আর পুরনো শাড়ী লুংগী গোজগাজ করে রাখতেন কাঁথা আর লেপ সেলাই করার জন্য। কার্তিক অগ্রহায়ণ মাস এলেই বাড়ির মহিলারা কাজের ফাঁকে, বাড়ির আংগিনায়, কোন গাছের তলায় খেজুরের মাদুর পেতে তার উপর চৌকোনা করে কাপড় বিছিয়ে খেজুরের কাঁটা দিয়ে চার পাশ মাটিতে সেটে চলত এ সেলাই।কয়েক দিনের মধ্যেই সূঁচের এফোঁড় ওফোঁড়ে কাঁথা বা লেপ সেলাই সম্পন্ন হয়ে যেত। কিন্তু আজকের মত লেপ কাঁথা দোকানে পাওয়া যেত না।তবে শীত মৌসুম এলে এলাকায় ধুনকার আসত।কেউ কেউ ধোনকার দিয়ে শিমুল তুলো ধুনে লেপ বানাতো।তার সংখ্যা সমাজে খুব কম ছিল। বাড়িতে যে শীতের লেপ কাথা থাকতো তাতে গ্রামের বেশির ভাগ লোকেরই শীত নিবারনের চাহিদা পূরন হতো না। তাই রাতে অনেক পরিবারকেই নাড়ার আগুনে গা গরম করতে দেখেছি।

এজন্য সে সময় বিলের লম্বা ধানের নাড়া সংগ্রহ করে বাড়ির আংগিনায় স্তুপ করে রেখে দিত। উদ্দেশ্য দুটো থাকতো। খেজুরের গুড় জ্বালানো অন্যটি শীতের রাতে ও সকালে আগুন পোহানো। সকাল সন্ধ্যায় যখন রান্না হতো আমরা চূলোর পাশে শরীর গরম করার জন্য গোল হয়ে বসে থাকতাম। রাতে লেপের মধ্যে ভাই বোন একসাথে ঘুমাতাম। লেপ ছোট হয়ে গেলে কোনার দুজনের মধ্যে একজনের ঘুম ভাংলে টান দিলে অন্য পাশের জন আলগা হয়ে যেত। আবার অপর পাশের জন ঠান্ডায় জেগে উঠলে সে টান দিত। এমনি টানাটানি করেই রাতের ঘুম ভেংগে সকাল হতো। কথায় বলে, ‘খাটো কাপড় টানলে বড় হয় না।” তাই লেপ টানাটানি করলেও শীতের দূর্ভোগ যেত না।

আজকে তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য ব্যারোমিটার গ্রামে অনেকেই ঘরে রাখে। তাই তাপমাত্রা কতটা বুঝা যায়।তা না হলেও স্মার্ট ফোনে Weather App। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় এ গুলো কেউ গ্রামে রাখতো না। রাখত না, না বলে বলা যায় সে সময় পাওয়া যেত না। সেজন্য হয়তো বা কেউ ঘরে রাখতেন না। এ বছর মাগুরায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। আমাদের ছেলে বেলায় নির্দিষ্ট এ রকম তাপমাত্রা পেয়েছি কিনা জানিনে তবে শরীরে কাপন যে উঠতো তা বুঝতে পারতাম। শিশুদের শুধু নয় বয়ষ্কদের দেখেছি জবুথবু হয়ে বাড়ির আংগিনায় সূর্য মামার চেদর হাসির জন্য অপেক্ষা করতে। যতক্ষণ সূর্য না উঠেছে ততক্ষণে নাড়ার আগুনে গা গরম রাখার চেষ্টা চলেছে। এ আগুন অনেকে গোল হয়ে চারপাশ ঘিরে বসে তাপের উষ্ণতা অনুভব করেছে। সামনের দিকে গরম হতো আবার পিছনে ঠান্ডা হয়ে যেত। আবার পিছনের দিকে গরম করতে গেলে সামনে ঠান্ডা হতো। এ ভাবেই চলতো নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা । আমার নানীকে দেখেছি রাতে যতক্ষণ বিছানায় না গিয়েছে ততক্ষণে মালসায় কাঠের আগুন ছাইসহ ধরে রেখে হাত পা গরম রেখেছে।

সে সময় শীতের গরম কাপড় খুব কম লোকই কিনতে পেরেছে। বড়রা চাদর কেউ কেউ সয়েটার পরেছে।বেশির ভাগ শিশুদের গায়ের জামার উপর একটি পুরনো লুংগি গায়ে জড়িয়ে গলার সাথে একটি গিট দিয়ে দিয়েছে। তাতেই তাদের শীত নিবারন হয়েছে। না হয়েত উপায় ছিল না।

এই সময় শীতে কষ্ট পেলেও মনে হতো না।কারন রাত কোনমতে পার করলেই খড়ের গাদার মধ্যে,নাড়ার গাদার মধ্যে বসে কাঁচা মরিচের ঝালে মাখানো মুড়ি চিবোলে কান গরম হয়ে ঘেমে উঠতাম, শীত পালাতো। খেজুর রসে ভেজা চিতই পিঠা যে দিন খেতাম সেদিন শীত বুঝতে পারতাম। ঠকঠক করে কাপন হোত কিন্তু পিঠে খাওয়া কম হতো না।

এখন প্রায় মানুষের বাড়িতে চৌকির উপর তোষক জাজিম দেখা যায়।আমাদের ছেলে বেলায় অনেক ধানি পানি গৃহস্তদের বাড়িতে শীতের সময় খড় বিছিয়ে বিছানা গরম রেখেছে।

আমাদের বাড়ি থেকে বাবুখালী বাজার বেশি দূরে নয়। এখানে কয়েক ঘর বুনো বা আদিবাসী বাস করে। আমাদের বাড়ি থেকে এদের বাড়ি ঘর অনেকটাই দেখা যেত। অনেক রাত পর্যন্ত এদের আগুন পোহাতে দেখেছি। আর সাথে থাকত সমবেত কন্ঠে গান।অনেকেই সকাল বেলায় বস্তা গায়ে জড়িয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা করছে। এখন বুঝি এ গান, সমবেত সংগীত আনন্দের ছিল না শীতের তীব্রতাকে উপেক্ষা করার ব্যার্থ চেষ্টা।

সেই ছেলেবেলার শীত আর আজকের বুড়ো বয়সের শীত নিবারনের মধ্যে অনেক তফাৎ খুজে পাই। এখন শিশুদের গায়েও শীতের গরম কাপড়। হত দরিদ্র মানুষের মধ্যেও এ কাপড় কিনতে দেখা যায়। আবার যাদের অভাব তাদেরকে অনেকেই এখন শীত বস্ত্র দান করতে দেখা যায়।ফলে সকালের শীত বিতাড়নের জন্য আগুন বা রোদ পোহাতে দেখা তেমন যায় না।তার পরিবর্তে দেখা যায় গরমের কাপড় পরেই যার যার কাজে ছুটে যাচ্ছে।সে সময়ে শীতে কাবু হলেও এখন মানুষ আর কাবু হয় না।গ্রামেও এ,সি, রুমহিটার,গিজারের গরম পানি সব মিলে শীত আমাদের এখন ভাবিয়ে তোলে না। বরং কর্মব্যস্ত করে তুলেছে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বৈরাচারের দোসরেরা ভোট বানচালের চেষ্টা করবে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত: প্রধান উপদেষ্টা

শৈশবে শীতের স্মৃতি বিস্মৃতির অনুভূতি এ যেন এক অজানা নষ্টালজিয়া।

আপডেট সময় : ১০:৪৯:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
11

মানুষের জন্মের ইতিহাস এক একজনের এক এক রকম। কেউ রান্না ঘরের এক কোনায়,কেউবা আবার গৃহ ঘরের এক কোনায় আলাদা জায়গায়। কেউবা আবার হাসপাতালে। আমাদের সময়ে হাসপাতালে শিশুর জন্ম ভাবাই যেত না। বিশেষ করে গ্রামে। গ্রামের অশিক্ষিত ধাত্রীই ছিল অবলম্বন। তারা অশিক্ষিত প্রশিক্ষণ বিহীন হলেও অভিজ্ঞতা তাদেরকে দক্ষ ধাত্রী করে গড়ে তুলেছিল। এমনই এক ধাত্রীর তত্বাবধানে মামার বাড়িতে গৃহ ঘরের এক কোনে আমার জন্ম।আমার জন্মের সময় দুজন ধাত্রী ছিলেন।কোন শিশুর জন্মের সাধ না থাকলেও জন্মানোর সাধই তাকে বাধ্য করে পৃথিবীতে আগমনে। আমার আগমনও ছিল তেমন।

জন্মের ছয় মাসে আমার একটি ছবি তুলেছিলেন আমার আব্বা মাগুরা থেকে ক্যামেরা ম্যান ভাড়া করে এনে। ছবিটি আমিও দেখেছিলাম ছোট বেলায়।পরনে ছিল সাদা এক টুকরো কাপড়। সে সময় বাচ্চাদের জন্য বাজারে এত কাপড়ও ছিল না।দুই তিন বছরের আগে খুব কম ছেলে মেয়েই কাপড় পরেছে।তবে মেয়েদের তবন পরতে দেখা যেত। অনেকে বড় হলেও পোরত।তবন তখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।বাজারে আধুনিক পোশাক আসতে শুরু করেছে।

পোশাক যে শুধুমাত্র লজ্জা নিরারনের জন্য তাইই নয়।শীত নিবারনের জন্যও বটে।কিন্তু সে সময় শীত নিবারনের জন্য আলাদা পোশাক কল্পনা করা যেত না বিশেষ করে গ্রামে।

সম্পন্ন গৃহস্থ শীতকে শত্রুর মত দেখেছে।শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য যেমন ঢাল তলোয়ার তৈরী করে রাখতে হয় আসন্ন যুদ্ধের জন্য। তেমনি শীতের মোকাবিলায় শিমুল তুলা আর পুরনো শাড়ী লুংগী গোজগাজ করে রাখতেন কাঁথা আর লেপ সেলাই করার জন্য। কার্তিক অগ্রহায়ণ মাস এলেই বাড়ির মহিলারা কাজের ফাঁকে, বাড়ির আংগিনায়, কোন গাছের তলায় খেজুরের মাদুর পেতে তার উপর চৌকোনা করে কাপড় বিছিয়ে খেজুরের কাঁটা দিয়ে চার পাশ মাটিতে সেটে চলত এ সেলাই।কয়েক দিনের মধ্যেই সূঁচের এফোঁড় ওফোঁড়ে কাঁথা বা লেপ সেলাই সম্পন্ন হয়ে যেত। কিন্তু আজকের মত লেপ কাঁথা দোকানে পাওয়া যেত না।তবে শীত মৌসুম এলে এলাকায় ধুনকার আসত।কেউ কেউ ধোনকার দিয়ে শিমুল তুলো ধুনে লেপ বানাতো।তার সংখ্যা সমাজে খুব কম ছিল। বাড়িতে যে শীতের লেপ কাথা থাকতো তাতে গ্রামের বেশির ভাগ লোকেরই শীত নিবারনের চাহিদা পূরন হতো না। তাই রাতে অনেক পরিবারকেই নাড়ার আগুনে গা গরম করতে দেখেছি।

এজন্য সে সময় বিলের লম্বা ধানের নাড়া সংগ্রহ করে বাড়ির আংগিনায় স্তুপ করে রেখে দিত। উদ্দেশ্য দুটো থাকতো। খেজুরের গুড় জ্বালানো অন্যটি শীতের রাতে ও সকালে আগুন পোহানো। সকাল সন্ধ্যায় যখন রান্না হতো আমরা চূলোর পাশে শরীর গরম করার জন্য গোল হয়ে বসে থাকতাম। রাতে লেপের মধ্যে ভাই বোন একসাথে ঘুমাতাম। লেপ ছোট হয়ে গেলে কোনার দুজনের মধ্যে একজনের ঘুম ভাংলে টান দিলে অন্য পাশের জন আলগা হয়ে যেত। আবার অপর পাশের জন ঠান্ডায় জেগে উঠলে সে টান দিত। এমনি টানাটানি করেই রাতের ঘুম ভেংগে সকাল হতো। কথায় বলে, ‘খাটো কাপড় টানলে বড় হয় না।” তাই লেপ টানাটানি করলেও শীতের দূর্ভোগ যেত না।

আজকে তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য ব্যারোমিটার গ্রামে অনেকেই ঘরে রাখে। তাই তাপমাত্রা কতটা বুঝা যায়।তা না হলেও স্মার্ট ফোনে Weather App। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় এ গুলো কেউ গ্রামে রাখতো না। রাখত না, না বলে বলা যায় সে সময় পাওয়া যেত না। সেজন্য হয়তো বা কেউ ঘরে রাখতেন না। এ বছর মাগুরায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। আমাদের ছেলে বেলায় নির্দিষ্ট এ রকম তাপমাত্রা পেয়েছি কিনা জানিনে তবে শরীরে কাপন যে উঠতো তা বুঝতে পারতাম। শিশুদের শুধু নয় বয়ষ্কদের দেখেছি জবুথবু হয়ে বাড়ির আংগিনায় সূর্য মামার চেদর হাসির জন্য অপেক্ষা করতে। যতক্ষণ সূর্য না উঠেছে ততক্ষণে নাড়ার আগুনে গা গরম রাখার চেষ্টা চলেছে। এ আগুন অনেকে গোল হয়ে চারপাশ ঘিরে বসে তাপের উষ্ণতা অনুভব করেছে। সামনের দিকে গরম হতো আবার পিছনে ঠান্ডা হয়ে যেত। আবার পিছনের দিকে গরম করতে গেলে সামনে ঠান্ডা হতো। এ ভাবেই চলতো নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা । আমার নানীকে দেখেছি রাতে যতক্ষণ বিছানায় না গিয়েছে ততক্ষণে মালসায় কাঠের আগুন ছাইসহ ধরে রেখে হাত পা গরম রেখেছে।

সে সময় শীতের গরম কাপড় খুব কম লোকই কিনতে পেরেছে। বড়রা চাদর কেউ কেউ সয়েটার পরেছে।বেশির ভাগ শিশুদের গায়ের জামার উপর একটি পুরনো লুংগি গায়ে জড়িয়ে গলার সাথে একটি গিট দিয়ে দিয়েছে। তাতেই তাদের শীত নিবারন হয়েছে। না হয়েত উপায় ছিল না।

এই সময় শীতে কষ্ট পেলেও মনে হতো না।কারন রাত কোনমতে পার করলেই খড়ের গাদার মধ্যে,নাড়ার গাদার মধ্যে বসে কাঁচা মরিচের ঝালে মাখানো মুড়ি চিবোলে কান গরম হয়ে ঘেমে উঠতাম, শীত পালাতো। খেজুর রসে ভেজা চিতই পিঠা যে দিন খেতাম সেদিন শীত বুঝতে পারতাম। ঠকঠক করে কাপন হোত কিন্তু পিঠে খাওয়া কম হতো না।

এখন প্রায় মানুষের বাড়িতে চৌকির উপর তোষক জাজিম দেখা যায়।আমাদের ছেলে বেলায় অনেক ধানি পানি গৃহস্তদের বাড়িতে শীতের সময় খড় বিছিয়ে বিছানা গরম রেখেছে।

আমাদের বাড়ি থেকে বাবুখালী বাজার বেশি দূরে নয়। এখানে কয়েক ঘর বুনো বা আদিবাসী বাস করে। আমাদের বাড়ি থেকে এদের বাড়ি ঘর অনেকটাই দেখা যেত। অনেক রাত পর্যন্ত এদের আগুন পোহাতে দেখেছি। আর সাথে থাকত সমবেত কন্ঠে গান।অনেকেই সকাল বেলায় বস্তা গায়ে জড়িয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা করছে। এখন বুঝি এ গান, সমবেত সংগীত আনন্দের ছিল না শীতের তীব্রতাকে উপেক্ষা করার ব্যার্থ চেষ্টা।

সেই ছেলেবেলার শীত আর আজকের বুড়ো বয়সের শীত নিবারনের মধ্যে অনেক তফাৎ খুজে পাই। এখন শিশুদের গায়েও শীতের গরম কাপড়। হত দরিদ্র মানুষের মধ্যেও এ কাপড় কিনতে দেখা যায়। আবার যাদের অভাব তাদেরকে অনেকেই এখন শীত বস্ত্র দান করতে দেখা যায়।ফলে সকালের শীত বিতাড়নের জন্য আগুন বা রোদ পোহাতে দেখা তেমন যায় না।তার পরিবর্তে দেখা যায় গরমের কাপড় পরেই যার যার কাজে ছুটে যাচ্ছে।সে সময়ে শীতে কাবু হলেও এখন মানুষ আর কাবু হয় না।গ্রামেও এ,সি, রুমহিটার,গিজারের গরম পানি সব মিলে শীত আমাদের এখন ভাবিয়ে তোলে না। বরং কর্মব্যস্ত করে তুলেছে।