বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে শহর-বন্দর পর্যন্ত উৎসবের আবহ তৈরি হয়। প্রিয় দলের জার্সি, রঙিন ব্যানার আর বিশাল আকৃতির বিদেশি পতাকায় ছেয়ে যায় বিভিন্ন এলাকা। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং আবাসিক এলাকায় ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, জার্মানি, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের বিশাল পতাকা।
ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি বিষয়। তবে প্রশ্ন উঠছে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকাকে জাতীয় পতাকার চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা কতটা যৌক্তিক? অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল খেলাপ্রেম নয়; বরং জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধের বিষয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
পীরগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা শিক্ষক আব্দুল করিম বলেন, “খেলা নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের দেশের পতাকা না টাঙিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের বিশাল পতাকা উড়ানো জাতীয় চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখাই উচিত।”
কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, “আমরা আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলকে সমর্থন করতেই পারি। কিন্তু সেটা যেন এমন পর্যায়ে না যায়, যেখানে নিজের দেশের পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। বাংলাদেশই আমাদের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয়।”
পীরগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিশ্বকাপ এলেই পতাকা বিক্রি বাড়ে। তবে অনেক সময় দেখা যায় বিদেশি পতাকার আকার জাতীয় পতাকার চেয়েও বড়। বিষয়টি সত্যিই অস্বস্তিকর। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।”
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “এই লাল-সবুজের পতাকার জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছেন। তাই বিদেশি কোনো দেশের পতাকাকে এমনভাবে প্রদর্শন করা উচিত নয়, যাতে আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার প্রতি সমর্থন অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সমর্থন কখনোই রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় পতাকার গুরুত্বকে খাটো করতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, অন্ধ সমর্থন এবং প্রতিযোগিতামূলক উন্মাদনা অনেক সময় মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
সাংস্কৃতিক কর্মী সঞ্জয় কুমার বলেন, “আমরা বিদেশি দলকে ভালোবাসতেই পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার নাগরিক আমরা নই। আমরা বাংলাদেশি। তাই আমাদের প্রথম পরিচয়, প্রথম ভালোবাসা এবং প্রথম সম্মান হওয়া উচিত বাংলাদেশের প্রতি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত তরুণদের মধ্যে জাতীয় পতাকার মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিশ্বকাপের আনন্দ যেন বিভক্তি নয়, বরং ক্রীড়াসুলভ মনোভাব, সৌহার্দ্য ও জাতীয় গর্বের সঙ্গে উদযাপিত হয়।
পীরগঞ্জের বর্তমান দৃশ্যপট হয়তো দেশের আরও অনেক অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। খেলার প্রতি আবেগ থাকবে, প্রিয় দলকে সমর্থনও থাকবে। তবে সেই আবেগ যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যেখানে নিজের দেশের পতাকার মর্যাদা ম্লান হয়ে যায়, তখন তা নিছক খেলাপ্রেমের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।
বিশ্বকাপ কয়েক সপ্তাহের আয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পতাকার মর্যাদা চিরস্থায়ী। তাই বিশ্বকাপের উন্মাদনা উপভোগের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
নিজস্ব প্রতিবেদক 














