ঢাকা ০১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
মডেল থানা পুলিশ কর্তৃক ৮২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ০১ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার। বাতিল ওয়াবিবাদি গোত্রবাদী সৌদি স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দিবস ২৩শে সেপ্টেম্বর(১৯৩২)কে মহা প্রলয়ংকর আঁধার দিবস হিসেবে ঘোষনা আল্লামা ইমাম হায়াতের নবীনগরে পূর্বশত্রুতার জেরে হামলায় আহত ব্যক্তির মৃত্যু শার্শা থানা পুলিশের অভিযানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতিসহ আটক-২ খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হত্যা মামলায় আরও দুই আসামি গ্রেপ্তার কক্সবাজারে সাইফুল হত্যা মামলার আসামি ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার পরিকল্পিত সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে পলাশবাড়ীতে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ  কুমিল্লা দাউদকান্দিতে নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি হালুয়াঘাট সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ,বিজিবির টহল জোরদারের পাশাপাশি হাতির উপদ্রব ও সীমান্তঘেঁষা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেত্রকোনায় বৌ-ভাত অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়

জাত-পাত নয়, মানবতাই হোক পরিচয়: সনাতন ধর্মের সমতার দর্শন।

 

মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় তার জন্ম নয়, তার মনুষ্যত্ব। স্রষ্টার সৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান মর্যাদার অধিকারী। কারও জন্ম কোনো মানুষের সম্মান বাড়ায় না, আবার কারও জন্ম কোনো মানুষের মর্যাদা কমায় না। অথচ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে জাত-পাত, বর্ণ ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা মানবিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সনাতন ধর্মের গভীর দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল শিক্ষা কোনো বৈষম্য নয়; বরং আত্মার ঐক্য, সহমর্মিতা ও সর্বজনীন মানবতার শিক্ষা।

আত্মার দৃষ্টিতে নেই কোনো ভেদাভেদ উপনিষদের মহান বাণী—

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

অর্থাৎ, এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মের প্রকাশ।

এই দর্শন ঘোষণা করে যে সকল জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ রয়েছে। যদি সৃষ্টির মূল উৎস এক হয়, তাহলে সৃষ্ট মানুষের মধ্যে অহংকার, ঘৃণা বা বৈষম্যের ভিত্তি কোথায়?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

“পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ”

অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানীরা সকলের মধ্যে সমভাব দেখেন। জ্ঞানীর চোখে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আত্মিক গুণ, নৈতিকতা ও কর্মের মাধ্যমে; জন্মের পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।

বর্ণের প্রকৃত দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা

গীতায় বলা হয়েছে—

“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।”

এখানে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সামাজিক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ধারণা জন্মভিত্তিক কঠোর বিভাজনে রূপ নিয়েছে। এর ফলে বহু মানুষ সামাজিক সুযোগ, শিক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থা যদি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কারণ ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ, মানুষের মধ্যে প্রাচীর তৈরি করা নয়।

গোত্র: ঐতিহ্য, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়:

গোত্র প্রাচীন ঋষি-ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। এটি সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু গোত্র কখনো মানুষের উচ্চ-নীচ নির্ধারণের মাধ্যম হতে পারে না।

একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আচরণে, জ্ঞানে, সততায় ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়।

স্বামী বিবেকানন্দের মানবতার শিক্ষা:

স্বামী বিবেকানন্দ সনাতন ধর্মের সার্বজনীন রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে। তাই দরিদ্র, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।

তিনি মনে করতেন, যে সমাজ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না।

আজকের সমাজে আমাদের দায়িত্ব:

বর্তমান যুগে প্রয়োজন এমন একটি সনাতন চেতনা, যেখানে জন্মের অহংকারের পরিবর্তে কর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।জাত-পাতের বিভেদের পরিবর্তে মানবিক ঐক্য গুরুত্ব পাবে।শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক উন্নয়নে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানবিক পরিচয়কে মূল্য দেওয়া হবে।

“বসুধৈব কুটুম্বকম”—সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার—এই মহান আদর্শ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আহ্বান।

উপসংহার

স্রষ্টার কাছে মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন মানুষ। সমাজের তৈরি বিভাজন কখনো সৃষ্টির মূল সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।

সনাতন ধর্মের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তার উদারতা, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমে। তাই আজকের আহ্বান—

জাত নয়, মানবতা; জন্ম নয়, কর্ম; বিভেদ নয়, ঐক্য—এই হোক আধুনিক সনাতন চেতনার মূল মন্ত্র।

যেদিন মানুষ অন্য মানুষের মধ্যে নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে শিখবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে ধর্ম ও মানবতার বিজয় হবে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

মডেল থানা পুলিশ কর্তৃক ৮২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ০১ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার।

জাত-পাত নয়, মানবতাই হোক পরিচয়: সনাতন ধর্মের সমতার দর্শন।

আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

 

মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় তার জন্ম নয়, তার মনুষ্যত্ব। স্রষ্টার সৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান মর্যাদার অধিকারী। কারও জন্ম কোনো মানুষের সম্মান বাড়ায় না, আবার কারও জন্ম কোনো মানুষের মর্যাদা কমায় না। অথচ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে জাত-পাত, বর্ণ ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা মানবিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সনাতন ধর্মের গভীর দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল শিক্ষা কোনো বৈষম্য নয়; বরং আত্মার ঐক্য, সহমর্মিতা ও সর্বজনীন মানবতার শিক্ষা।

আত্মার দৃষ্টিতে নেই কোনো ভেদাভেদ উপনিষদের মহান বাণী—

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

অর্থাৎ, এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মের প্রকাশ।

এই দর্শন ঘোষণা করে যে সকল জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ রয়েছে। যদি সৃষ্টির মূল উৎস এক হয়, তাহলে সৃষ্ট মানুষের মধ্যে অহংকার, ঘৃণা বা বৈষম্যের ভিত্তি কোথায়?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

“পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ”

অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানীরা সকলের মধ্যে সমভাব দেখেন। জ্ঞানীর চোখে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আত্মিক গুণ, নৈতিকতা ও কর্মের মাধ্যমে; জন্মের পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।

বর্ণের প্রকৃত দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা

গীতায় বলা হয়েছে—

“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।”

এখানে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সামাজিক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ধারণা জন্মভিত্তিক কঠোর বিভাজনে রূপ নিয়েছে। এর ফলে বহু মানুষ সামাজিক সুযোগ, শিক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থা যদি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কারণ ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ, মানুষের মধ্যে প্রাচীর তৈরি করা নয়।

গোত্র: ঐতিহ্য, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়:

গোত্র প্রাচীন ঋষি-ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। এটি সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু গোত্র কখনো মানুষের উচ্চ-নীচ নির্ধারণের মাধ্যম হতে পারে না।

একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আচরণে, জ্ঞানে, সততায় ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়।

স্বামী বিবেকানন্দের মানবতার শিক্ষা:

স্বামী বিবেকানন্দ সনাতন ধর্মের সার্বজনীন রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে। তাই দরিদ্র, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।

তিনি মনে করতেন, যে সমাজ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না।

আজকের সমাজে আমাদের দায়িত্ব:

বর্তমান যুগে প্রয়োজন এমন একটি সনাতন চেতনা, যেখানে জন্মের অহংকারের পরিবর্তে কর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।জাত-পাতের বিভেদের পরিবর্তে মানবিক ঐক্য গুরুত্ব পাবে।শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক উন্নয়নে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানবিক পরিচয়কে মূল্য দেওয়া হবে।

“বসুধৈব কুটুম্বকম”—সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার—এই মহান আদর্শ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আহ্বান।

উপসংহার

স্রষ্টার কাছে মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন মানুষ। সমাজের তৈরি বিভাজন কখনো সৃষ্টির মূল সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।

সনাতন ধর্মের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তার উদারতা, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমে। তাই আজকের আহ্বান—

জাত নয়, মানবতা; জন্ম নয়, কর্ম; বিভেদ নয়, ঐক্য—এই হোক আধুনিক সনাতন চেতনার মূল মন্ত্র।

যেদিন মানুষ অন্য মানুষের মধ্যে নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে শিখবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে ধর্ম ও মানবতার বিজয় হবে।