ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
৩ লাখ টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ, কোটালীপাড়ায় আদালতে মামলা। এমডি’র অব্যবস্থাপনায় ডুবছে অগ্রণী ব্যাংক! ভাঙ্গুড়ায় শহীদ মিনারের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করলেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। আলীগের সাবেক এমপি শাহীন চাকলাদারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে যশোরে হত্যাচেষ্টা মামলা। শিশু খাদ্যে ভেজালে পুলেরহাটে তানসীপ ট্রেডার্সকে লক্ষ টাকা জরিমানা। কুমিল্লা বুড়িচং প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে খোরশেদ সভাপতি, বাবু সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির। গণপূর্তের ‘উজির’: ক্ষমতার বলয়, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ। গণপূর্তে ‘কায়কোবাদ বলয়’ : কমিশন বাণিজ্য, বদলি-পদায়ন ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ—নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। কাহারোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০১ শয্যায় উন্নীত: আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাহারোলবাসী। রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব পদে ঠাকুরগাঁওয়ের আউয়াল আহমেদ।

জাত-পাত নয়, মানবতাই হোক পরিচয়: সনাতন ধর্মের সমতার দর্শন।

 

মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় তার জন্ম নয়, তার মনুষ্যত্ব। স্রষ্টার সৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান মর্যাদার অধিকারী। কারও জন্ম কোনো মানুষের সম্মান বাড়ায় না, আবার কারও জন্ম কোনো মানুষের মর্যাদা কমায় না। অথচ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে জাত-পাত, বর্ণ ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা মানবিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সনাতন ধর্মের গভীর দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল শিক্ষা কোনো বৈষম্য নয়; বরং আত্মার ঐক্য, সহমর্মিতা ও সর্বজনীন মানবতার শিক্ষা।

আত্মার দৃষ্টিতে নেই কোনো ভেদাভেদ উপনিষদের মহান বাণী—

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

অর্থাৎ, এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মের প্রকাশ।

এই দর্শন ঘোষণা করে যে সকল জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ রয়েছে। যদি সৃষ্টির মূল উৎস এক হয়, তাহলে সৃষ্ট মানুষের মধ্যে অহংকার, ঘৃণা বা বৈষম্যের ভিত্তি কোথায়?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

“পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ”

অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানীরা সকলের মধ্যে সমভাব দেখেন। জ্ঞানীর চোখে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আত্মিক গুণ, নৈতিকতা ও কর্মের মাধ্যমে; জন্মের পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।

বর্ণের প্রকৃত দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা

গীতায় বলা হয়েছে—

“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।”

এখানে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সামাজিক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ধারণা জন্মভিত্তিক কঠোর বিভাজনে রূপ নিয়েছে। এর ফলে বহু মানুষ সামাজিক সুযোগ, শিক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থা যদি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কারণ ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ, মানুষের মধ্যে প্রাচীর তৈরি করা নয়।

গোত্র: ঐতিহ্য, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়:

গোত্র প্রাচীন ঋষি-ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। এটি সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু গোত্র কখনো মানুষের উচ্চ-নীচ নির্ধারণের মাধ্যম হতে পারে না।

একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আচরণে, জ্ঞানে, সততায় ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়।

স্বামী বিবেকানন্দের মানবতার শিক্ষা:

স্বামী বিবেকানন্দ সনাতন ধর্মের সার্বজনীন রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে। তাই দরিদ্র, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।

তিনি মনে করতেন, যে সমাজ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না।

আজকের সমাজে আমাদের দায়িত্ব:

বর্তমান যুগে প্রয়োজন এমন একটি সনাতন চেতনা, যেখানে জন্মের অহংকারের পরিবর্তে কর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।জাত-পাতের বিভেদের পরিবর্তে মানবিক ঐক্য গুরুত্ব পাবে।শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক উন্নয়নে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানবিক পরিচয়কে মূল্য দেওয়া হবে।

“বসুধৈব কুটুম্বকম”—সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার—এই মহান আদর্শ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আহ্বান।

উপসংহার

স্রষ্টার কাছে মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন মানুষ। সমাজের তৈরি বিভাজন কখনো সৃষ্টির মূল সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।

সনাতন ধর্মের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তার উদারতা, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমে। তাই আজকের আহ্বান—

জাত নয়, মানবতা; জন্ম নয়, কর্ম; বিভেদ নয়, ঐক্য—এই হোক আধুনিক সনাতন চেতনার মূল মন্ত্র।

যেদিন মানুষ অন্য মানুষের মধ্যে নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে শিখবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে ধর্ম ও মানবতার বিজয় হবে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ লাখ টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ, কোটালীপাড়ায় আদালতে মামলা।

জাত-পাত নয়, মানবতাই হোক পরিচয়: সনাতন ধর্মের সমতার দর্শন।

আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

 

মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় তার জন্ম নয়, তার মনুষ্যত্ব। স্রষ্টার সৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই সমান মর্যাদার অধিকারী। কারও জন্ম কোনো মানুষের সম্মান বাড়ায় না, আবার কারও জন্ম কোনো মানুষের মর্যাদা কমায় না। অথচ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে জাত-পাত, বর্ণ ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা মানবিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সনাতন ধর্মের গভীর দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল শিক্ষা কোনো বৈষম্য নয়; বরং আত্মার ঐক্য, সহমর্মিতা ও সর্বজনীন মানবতার শিক্ষা।

আত্মার দৃষ্টিতে নেই কোনো ভেদাভেদ উপনিষদের মহান বাণী—

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

অর্থাৎ, এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্মের প্রকাশ।

এই দর্শন ঘোষণা করে যে সকল জীবের মধ্যে একই পরম চৈতন্যের প্রকাশ রয়েছে। যদি সৃষ্টির মূল উৎস এক হয়, তাহলে সৃষ্ট মানুষের মধ্যে অহংকার, ঘৃণা বা বৈষম্যের ভিত্তি কোথায়?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

“পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ”

অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞানীরা সকলের মধ্যে সমভাব দেখেন। জ্ঞানীর চোখে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আত্মিক গুণ, নৈতিকতা ও কর্মের মাধ্যমে; জন্মের পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।

বর্ণের প্রকৃত দর্শন ও সামাজিক বাস্তবতা

গীতায় বলা হয়েছে—

“চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।”

এখানে গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে সামাজিক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ধারণা জন্মভিত্তিক কঠোর বিভাজনে রূপ নিয়েছে। এর ফলে বহু মানুষ সামাজিক সুযোগ, শিক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থা যদি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কারণ ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ, মানুষের মধ্যে প্রাচীর তৈরি করা নয়।

গোত্র: ঐতিহ্য, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়:

গোত্র প্রাচীন ঋষি-ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। এটি সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু গোত্র কখনো মানুষের উচ্চ-নীচ নির্ধারণের মাধ্যম হতে পারে না।

একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আচরণে, জ্ঞানে, সততায় ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়।

স্বামী বিবেকানন্দের মানবতার শিক্ষা:

স্বামী বিবেকানন্দ সনাতন ধর্মের সার্বজনীন রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ রয়েছে। তাই দরিদ্র, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা।

তিনি মনে করতেন, যে সমাজ মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ প্রকৃত উন্নতির পথে এগোতে পারে না।

আজকের সমাজে আমাদের দায়িত্ব:

বর্তমান যুগে প্রয়োজন এমন একটি সনাতন চেতনা, যেখানে জন্মের অহংকারের পরিবর্তে কর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।জাত-পাতের বিভেদের পরিবর্তে মানবিক ঐক্য গুরুত্ব পাবে।শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক উন্নয়নে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানবিক পরিচয়কে মূল্য দেওয়া হবে।

“বসুধৈব কুটুম্বকম”—সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার—এই মহান আদর্শ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আহ্বান।

উপসংহার

স্রষ্টার কাছে মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন মানুষ। সমাজের তৈরি বিভাজন কখনো সৃষ্টির মূল সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।

সনাতন ধর্মের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তার উদারতা, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমে। তাই আজকের আহ্বান—

জাত নয়, মানবতা; জন্ম নয়, কর্ম; বিভেদ নয়, ঐক্য—এই হোক আধুনিক সনাতন চেতনার মূল মন্ত্র।

যেদিন মানুষ অন্য মানুষের মধ্যে নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে শিখবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে ধর্ম ও মানবতার বিজয় হবে।