ঢাকা ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিস্ট-আমলা সিন্ডিকেট:  মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীকে তোয়াক্কা করছেন না চুক্তিভিত্তিক সচিব! ইতিহাসের আয়নায় বিএনপি: অতীতের শিক্ষা কি ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত হবে? উদ্যোক্তা বিকাশে পঞ্চগড়ে নারী উদ্যোক্তাদের পাশে প্রতিমন্ত্রী আজাদ। রাজৈরের‌ প্রবাসী ও যুবকদের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা প্রফেসর ডঃ দীপ্তি সাহা শ্বাসনালীতে খাবার ঢোকার কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।। তজুমদ্দিনে এমপিও জালিয়াতির অভিযোগ: মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার নিয়ে তোলপাড়। নীতিমালা ছিঁড়ে ফেলে’ কি গণপূর্তে গণবদলি ? আইন উপেক্ষার অভিযোগে তোলপাড় : মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বিদ্যালয়ের মাঠে যদি মানবিকতা অপমানিত হয়, তবে রাষ্ট্রের নীরব থাকার সুযোগ নেই। তথ্য না জেনে লাইভ, যাচাই ছাড়া অভিযোগ: অপসাংবাদিকতার বিস্তার এবং সমাজের জন্য এক নীরব বিপদ। সালাহ উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে টেকনাফে বিক্ষোভ মিছিল, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের দাবি! 

ইতিহাসের আয়নায় বিএনপি: অতীতের শিক্ষা কি ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত হবে?

 

রাজনীতিতে জনগণ সাধারণত দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় স্মৃতি এবং প্রত্যাশা। স্মৃতি মানুষকে অতীতের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়, আর প্রত্যাশা তাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শেখায়। তাই কোনো রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বা সেই দায়িত্ব লাভের প্রত্যাশা করে, তখন জনগণ শুধু তার নির্বাচনী অঙ্গীকার নয়; বরং অতীতের কর্মকাণ্ড, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং সেখান থেকে নেওয়া শিক্ষার মূল্যায়নও করে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)ও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী দলে দীর্ঘ সময় থাকার অভিজ্ঞতা—দুটি মিলিয়ে দলটির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়: অতীতের ভুল, বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা থেকে কি তারা কার্যকর শিক্ষা নিয়েছে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো, ক্ষমতা মানুষকে পরীক্ষা করে, আর জবাবদিহিতা সেই ক্ষমতার মান নির্ধারণ করে। নির্বাচনে জয়লাভ একটি রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তার প্রতিফলন হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতা নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করা হয়েছে, আইনের শাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা অর্জিত হয়েছে—এসবের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল বহুবার ঘটেছে। কিন্তু একটি অভিযোগ প্রায় সব সরকারের ক্ষেত্রেই শোনা গেছে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া শুধু বিএনপির নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই অপরিহার্য।

অতীতের অভিজ্ঞতা: আত্মসমালোচনার সুযোগ

বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামল নিয়ে সময়ে সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে নানা সমালোচনা এসেছে। যেমন—

* প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন;

* দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে বিতর্ক;

* রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার পরিবেশ;

* বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা নিয়ে আলোচনা;

* রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ।

অন্যদিকে বিএনপি বহুবার বলেছে, এসব অভিযোগের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্থাপিত হয়েছে এবং তাদের অবস্থান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এই দুই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট—যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের জন্য আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি শক্তি, দুর্বলতা নয়।

বিরোধী দল থেকে সরকার: মানসিকতার পরিবর্তন কি সম্ভব?

দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতা একটি রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও নাগরিক প্রত্যাশা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিতে পারে। কিন্তু সেই উপলব্ধি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

যদি বিরোধী দলে থাকাকালে যে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের দাবি তোলা হয়েছে, ক্ষমতায় গিয়েও একই নীতি অনুসরণ করা হয়—তবে সেটিই হবে রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ। কিন্তু যদি ক্ষমতায় গিয়ে একই ধরনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, দলীয় প্রভাব বা অসহিষ্ণুতার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ভিন্ন

আজকের তরুণ ভোটার অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বর্তমানের কর্মক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য যাচাই করে। ফলে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন প্রজন্ম এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে—

* আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে;

* দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো দলীয় ছাড় থাকবে না;

* যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে;

* স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে;

* নির্বাচিত সরকার সমালোচনাকে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।

প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিহিংসার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। কিন্তু একটি পরিণত গণতন্ত্রে সরকারের প্রধান কাজ প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।

যদি বিএনপি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চায়, তবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলকেন্দ্রিক শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা।

ইতিহাস কি পুনরাবৃত্ত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাসের বিচার হয় কথায় নয়, কাজে। নির্বাচনী ইশতেহার, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা জনসভায় দেওয়া বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শেষ পর্যন্ত জনগণ মূল্যায়ন করবে—

* সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ ছিল;

* আইন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে;

* বিরোধী মত কতটা নিরাপদ ছিল;

* রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে;

* সাধারণ মানুষ কতটা ন্যায়বিচার ও সেবা পেয়েছে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শক্তি কোনো একটি দলের সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ অটুট থাকে।

বিএনপির সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা সমর্থক-সমালোচক নির্বিশেষে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে ইতিহাসের শিক্ষা কেবল বিএনপির জন্য নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ, আর গণতন্ত্রে জনগণের আস্থাই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় বৈধতা।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিস্ট-আমলা সিন্ডিকেট:  মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীকে তোয়াক্কা করছেন না চুক্তিভিত্তিক সচিব!

ইতিহাসের আয়নায় বিএনপি: অতীতের শিক্ষা কি ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত হবে?

আপডেট সময় : ০৭:৩১:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

 

রাজনীতিতে জনগণ সাধারণত দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় স্মৃতি এবং প্রত্যাশা। স্মৃতি মানুষকে অতীতের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়, আর প্রত্যাশা তাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শেখায়। তাই কোনো রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বা সেই দায়িত্ব লাভের প্রত্যাশা করে, তখন জনগণ শুধু তার নির্বাচনী অঙ্গীকার নয়; বরং অতীতের কর্মকাণ্ড, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং সেখান থেকে নেওয়া শিক্ষার মূল্যায়নও করে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)ও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী দলে দীর্ঘ সময় থাকার অভিজ্ঞতা—দুটি মিলিয়ে দলটির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়: অতীতের ভুল, বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা থেকে কি তারা কার্যকর শিক্ষা নিয়েছে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো, ক্ষমতা মানুষকে পরীক্ষা করে, আর জবাবদিহিতা সেই ক্ষমতার মান নির্ধারণ করে। নির্বাচনে জয়লাভ একটি রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তার প্রতিফলন হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতা নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করা হয়েছে, আইনের শাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা অর্জিত হয়েছে—এসবের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল বহুবার ঘটেছে। কিন্তু একটি অভিযোগ প্রায় সব সরকারের ক্ষেত্রেই শোনা গেছে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া শুধু বিএনপির নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই অপরিহার্য।

অতীতের অভিজ্ঞতা: আত্মসমালোচনার সুযোগ

বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামল নিয়ে সময়ে সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে নানা সমালোচনা এসেছে। যেমন—

* প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন;

* দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে বিতর্ক;

* রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার পরিবেশ;

* বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা নিয়ে আলোচনা;

* রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ।

অন্যদিকে বিএনপি বহুবার বলেছে, এসব অভিযোগের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্থাপিত হয়েছে এবং তাদের অবস্থান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এই দুই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট—যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের জন্য আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি শক্তি, দুর্বলতা নয়।

বিরোধী দল থেকে সরকার: মানসিকতার পরিবর্তন কি সম্ভব?

দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতা একটি রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও নাগরিক প্রত্যাশা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিতে পারে। কিন্তু সেই উপলব্ধি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

যদি বিরোধী দলে থাকাকালে যে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের দাবি তোলা হয়েছে, ক্ষমতায় গিয়েও একই নীতি অনুসরণ করা হয়—তবে সেটিই হবে রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ। কিন্তু যদি ক্ষমতায় গিয়ে একই ধরনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, দলীয় প্রভাব বা অসহিষ্ণুতার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা ভিন্ন

আজকের তরুণ ভোটার অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বর্তমানের কর্মক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য যাচাই করে। ফলে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন প্রজন্ম এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে—

* আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে;

* দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো দলীয় ছাড় থাকবে না;

* যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে;

* স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে;

* নির্বাচিত সরকার সমালোচনাকে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।

প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিহিংসার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। কিন্তু একটি পরিণত গণতন্ত্রে সরকারের প্রধান কাজ প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।

যদি বিএনপি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চায়, তবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলকেন্দ্রিক শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা।

ইতিহাস কি পুনরাবৃত্ত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাসের বিচার হয় কথায় নয়, কাজে। নির্বাচনী ইশতেহার, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা জনসভায় দেওয়া বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শেষ পর্যন্ত জনগণ মূল্যায়ন করবে—

* সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ ছিল;

* আইন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে;

* বিরোধী মত কতটা নিরাপদ ছিল;

* রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে;

* সাধারণ মানুষ কতটা ন্যায়বিচার ও সেবা পেয়েছে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শক্তি কোনো একটি দলের সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ অটুট থাকে।

বিএনপির সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা সমর্থক-সমালোচক নির্বিশেষে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে ইতিহাসের শিক্ষা কেবল বিএনপির জন্য নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ, আর গণতন্ত্রে জনগণের আস্থাই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় বৈধতা।