মুখোশের আড়ালে জাতি: ভয়ের মহামারি ও বিবেকের সংকট
একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় ভীতিকর আর কী হতে পারে? আজ বাংলাদেশে এই ভীতিটা প্রায় সবার মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। দিন দিন এই ভীতি বদ্ধমূল হচ্ছে, জেঁকে বসছে।
এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে সৎ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভয়ের মধ্যে আছে। দেশপ্রেমের দায়বদ্ধতা যাদের ভেতরে আছে, এই ভীতিটা তাদেরই সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। এমন ভীতিকর অবস্থা সত্যিই একটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ভীতিটা দৃশ্যমান। সবাই উপলব্ধি করে, সবাই বলে। কিন্তু ভীতি থেকে বের হওয়ার কোনো কাজ করে না। বরং যাতে আরও ভীতি তৈরি হয়, আমরা যেন উঠে-পড়ে লাগি। ভীতি এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে।
এই ভীতিটা কী? এই ভীতিটা হলো দেশপ্রেমের দায়বদ্ধতাহীন, অমানবিক, মানুষরূপী কিছু হায়েনার ঘুষ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনসহ সকল অপকর্ম।
আপনি যার সাথেই কথা বলবেন, তিনি বলবেন, ‘আহা! এসব অপকর্মের কারণে দেশটা রসাতলে গেল।’ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি এমন একজন লোকও পাইনি যিনি এই কথা বলেন না। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই অপকর্মগুলো করে কারা? তাদের বাড়িঘর কোথায়? তাদের আকার-আকৃতি কেমন? তারা কোন ধর্মের? সচেতন মানুষ মাত্রই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চায়।
কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দেশটা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই হায় হায় করছি। তাহলে এই দুর্নীতির জন্য দায়ী কারা? এমন কোনো লোক খুঁজে পেলাম না, যিনি রাষ্ট্রের দুর্নীতি নিয়ে ভাবেন না। তাহলে রাষ্ট্রের এই অবস্থা হলো কেন? এর জন্য দায়ী কে?
আমরা যেহেতু সবাই বলছি, ‘হায় হায়, রাষ্ট্রটা রসাতলে গেল’, তাহলে তো রাষ্ট্রের রসাতলে যাওয়ার কথা নয়। আমরা যদি সত্যিই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলি, তাহলে তো রাষ্ট্রের একটি সভ্য, কল্যাণকামী রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার কথা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যারা বলছি, ‘হায় হায়, রাষ্ট্রটা অন্যায়-অপকর্মে ডুবে যাচ্ছে’, আমরা কি নিজেদের হাঁড়ির খবর রাখি? যিনি বলছেন রাষ্ট্র তলিয়ে যাচ্ছে, তিনি কি কথার কথা বলছেন, নাকি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বলছেন?
যদি অন্তর থেকে বলে থাকেন, তাহলে তো বাংলাদেশের স্বর্গে পরিণত হওয়ার কথা। আর আমি যদি আমার জীবনে কোনো অসৎ মানুষই না দেখি, তাহলে তো বাংলাদেশের পৃথিবীর রোল মডেল হওয়ার কথা। তা কেন হলো না?
এই প্রশ্নগুলো সচেতন মানুষ মাত্রই মনে জাগে। তাই আমি সব সময় একটি কথা বলি—
>মানুষ কথা বলে ফেরেশতার মতো, কাজ করে শয়তানের মতো।
তাহলে আমরা কি দেশের অধিকাংশ মানুষই এমন? আমাদের ভেতর থেকে কি ধর্ম-দর্শন, মানবতা, দেশপ্রেম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে? আমরা কি সবাই মুখোশধারী?
আমরা বাহ্যিকভাবে এমন ভাব দেখাই, যেন আমরা দুধে ধোয়া তুলসী পাতা, অথচ ভেতরে ভেতরে এমন কোনো অপকর্ম নেই – যা আমরা করি না। এই ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। দেশে কি সৎ মানুষ দিন দিন কমে যাচ্ছে? সৎ মানুষ কি দুরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না?
আমরা সবাই বলি, ‘সর্বনাশ! দেশের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে!’ অথচ এই আমরাই দেশের সর্বনাশ করে ফেলছি। বাহ্যিক আচরণে আমরা দুধে ধোয়া তুলসী পাতা!
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, একটি জাতি কেন এমন হলো? এ জাতির তো অনেক ঐতিহ্য আছে। নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়ে অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করার দৃষ্টান্ত আছে। তাহলে জাতিটি কেন এমন হয়ে গেল?
আমরা সবাই মুখোশধারী। নিজের প্রকৃত পরিচয় মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখি। এর ফলে জাতি এমন এক অভিশপ্ত অবস্থায় পৌঁছে গেছে, যেখানে দেশপ্রেমিক খুঁজে পাওয়া দায়। অনেকের মনোভাব— ‘রাখ তোর দেশপ্রেম।’ এটাই হলো মুখোশের ভেতরের আসল মুখ।
জাতিকে ভালোবাসার জন্য যে মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, ধর্ম-দর্শনের প্রতি সম্মান দরকার, তা আজ এমন জায়গায় ঠেকেছে যে কল্পনা করলে গা শিউরে ওঠে। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের আসল চরিত্র লুকিয়ে রাখি আর বলি, ‘হায়, রাষ্ট্রটা রসাতলে গেল।’ কিন্তু রাষ্ট্রকে রসাতলে নেওয়ার জন্য আমি, আপনি ও আমরাই দায়ী।
একটি দেশ তার সভ্যতা ও কৃষ্টিকে কত নিকৃষ্ট জায়গায় নিয়ে গেলে ঘুষ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, ধর্মবিদ্বেষ, হানাহানি, চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি অসম্মানসহ খাদ্যে ভেজাল—এসব অন্যায়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়? যা দেখার কেউ নেই। আমরা সবাই চোখ বন্ধ করে আছি।
রাষ্ট্রে একধরনের ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করে। যার ফলে মনে হয় প্রতিবাদীরা লুকিয়ে আছে। জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে তারা প্রতিবাদ করে না।
খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং আহ্বায়ক: নিরাপদ খাদ্য খাই (নিখাখা)।
সারাক্ষণ ডেস্ক 




















