শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সামাজিক বাস্তবতায় দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সামাজিক উৎসব। তাই এই উৎসব নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও আনন্দমুখর করার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের, তেমনি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, পূজা কমিটি এবং সর্বস্তরের মানুষেরও।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ৫ অক্টোবর ২০২৬ মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসব ২০২৬ শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মিজ মর্জিনা আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পাঁচ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার অফিসার ইনচার্জ, জনপ্রতিনিধির প্রতিনিধি, পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, পূজা উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর জেলার পুলিশ সুপার, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জনাব জাহান্দার আলী মিয়ার প্রতিনিধি জনাব মুর্তজা ঢালী, পাঁচ উপজেলার ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ। সনাতন ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু, মাদারীপুর জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক জীবন বোস, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রাণতোষ মন্ডল, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট মাদারীপুর জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক হরি সাধন দত্ত, পূজা ফ্রন্টের নেতা নিরাঞ্জন ঘোষ, মাদারীপুর জেলা পূজা ফ্রন্ট ও পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সজল রায় সনাতন, মাদারীপুর সদর উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি প্রবীর সাহা, রাজৈর উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি বিপ্লব ঘোষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
নিরাপত্তা মানে শুধু পুলিশি পাহারা নয়:
দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের কথা আসে। কিন্তু বাস্তবে একটি বড় ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা শুধু মণ্ডপে পুলিশ মোতায়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা, নারী ও শিশুদের নিরাপদ চলাচল, যানজট নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, মণ্ডপে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা—সবকিছুই নিরাপত্তার অংশ।
বিশেষ করে কোনো মণ্ডপে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুততম সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পূজা কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দলকেও দায়িত্বশীল ও প্রশিক্ষিত হতে হবে। কোনো গুজব, উত্তেজনা বা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে নিজেরা আইন হাতে না নিয়ে প্রশাসনকে অবহিত করাই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার বড় চ্যালেঞ্জ:
বর্তমান সময়ে দুর্গোৎসবের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
একটি মিথ্যা খবর, পুরোনো ছবি বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে একটি স্থানীয় ঘটনা অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
এ কারণে পূজা চলাকালে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। প্রশাসনেরও উচিত দ্রুত তথ্য দেওয়ার জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা রাখা, যাতে গুজবের জায়গা তথ্য দিয়ে পূরণ করা যায়।
পূজা কমিটির দায়িত্বও কম নয়:
প্রশাসন নিরাপত্তা দেবে—এটি যেমন সত্য, তেমনি পূজা কমিটিগুলোকেও তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
মণ্ডপের নিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা, দর্শনার্থীদের শৃঙ্খলা, অতিরিক্ত শব্দ পরিহার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা—এসব বিষয়ে পূজা কমিটির আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না হয়—এই বোধটিও উৎসবের সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।
সম্প্রীতির পরীক্ষাও দুর্গোৎসব:
দুর্গাপূজা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মাদারীপুরের মতো একটি জেলায় যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন, সেখানে দুর্গোৎসবকে ঘিরে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ আরও দৃঢ় করা সম্ভব।
একজন মুসলমান যখন পূজামণ্ডপে গিয়ে তার হিন্দু প্রতিবেশীকে শুভেচ্ছা জানান, একজন হিন্দু যখন তার মুসলমান প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ও আনন্দের বিষয়টি নিজের দায়িত্ব মনে করেন—সেখানেই বাংলাদেশের প্রকৃত সামাজিক শক্তি প্রকাশ পায়।
ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু নিরাপদ সমাজের প্রয়োজন সবার। তাই দুর্গোৎসবকে কোনো বিভাজনের উৎসব নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি চাই জবাবদিহি ও সমন্বয়:
মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জেলা প্রশাসন থেকে উপজেলা ও থানাপর্যায়ের প্রশাসন এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের একই আলোচনার টেবিলে আনা।
এখন প্রয়োজন এই সমন্বয়কে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা। প্রতিটি পূজামণ্ডপের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা দরকার।
একই সঙ্গে পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, পূজা উদযাপন পরিষদ ও স্থানীয় পূজা কমিটিগুলোর পক্ষ থেকেও প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন।
কারণ নিরাপত্তা তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রশাসনের পরিকল্পনা এবং জনগণের সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করে।
উৎসব হোক ভয়ের নয়, আস্থার:
একটি পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ থেকে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে মানুষের প্রত্যাশা একটাই—নিরাপদ পরিবেশে ধর্মীয় আচার পালন এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা।
কোনো ধর্মীয় উৎসব যেন আতঙ্ক, গুজব, অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে ম্লান না হয়। আবার নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও যেন অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও মানবিক ব্যবস্থাপনা।
আজকের মতবিনিময় সভা সেই সমন্বিত দায়িত্ববোধেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু বলেন,”দুর্গাপূজার মূল দর্শন অশুভের ওপর শুভের জয়। এই দর্শন কেবল মণ্ডপের প্রতিমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে তার পূর্ণতা আসে না; আমাদের সামাজিক আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।”
অন্যায়, গুজব, বিদ্বেষ, উসকানি ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যদি আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা ও সম্প্রীতিকে শক্তিশালী করতে পারি, তবেই দুর্গোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
মাদারীপুরের প্রতিটি পূজামণ্ডপ হোক নিরাপদ। প্রতিটি পূজার আয়োজন হোক নির্বিঘ্ন। প্রশাসন থাকুক দায়িত্বশীল, পূজা কমিটি থাকুক সচেতন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকুক তৎপর এবং সাধারণ মানুষ থাকুক সহযোগিতামুখী।
কারণ নিরাপদ দুর্গোৎসব শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ হোক সবার; আর মাদারীপুর হোক ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিকতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
সারাক্ষণ ডেস্ক 























