শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব যখন নির্বিঘ্নে ও আনন্দমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, তখন তা কেবল একটি সম্প্রদায়ের আনন্দকে ধারণ করে না—সমগ্র সমাজের শান্তি ও সৌহার্দ্যকে আরও সুদৃঢ় করে। সেই লক্ষ্যেই আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করার প্রত্যয়ে রাজৈরে অনুষ্ঠিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক সভা।
আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় রাজৈর উপজেলা অডিটরিয়ামে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার সকল পূজারী, মন্দির কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে এ প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজৈর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোকসানা খাইরুন নেছার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উৎসবের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
সভাটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু।
সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজৈর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওহাব আলী মিয়া, রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্য আরিফ হাওলাদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট মাদারীপুর জেলার আহ্বায়ক জীবন বোস, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মহসিন ফকির, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট রাজৈর উপজেলা শাখার সভাপতি বিপ্লব ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব কুমার দাস, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কদমবাড়ী ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ভবেন সরকারসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকবৃন্দ।
সভায় বক্তারা এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। প্রশাসন, পুলিশ, পূজা উদযাপন কমিটি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাস্তবতা হলো, একটি বড় ধর্মীয় উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব শুধু প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার নয়। পূজামণ্ডপের আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সামান্য অসতর্কতা যেমন একটি উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে, তেমনি সামান্য মানবিকতা, সহনশীলতা ও সহযোগিতা একটি উৎসবকে পরিণত করতে পারে সম্প্রীতির মহোৎসবে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতায় সবাইকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পূজা কমিটিগুলোকেও নিজ নিজ মণ্ডপে শৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
দুর্গোৎসবের মূল শিক্ষা অশুভের বিরুদ্ধে শুভের বিজয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রত্যয়। সেই শিক্ষা যদি আমাদের সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হয়, তাহলেই উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।
রাজৈরের এই প্রস্তুতিমূলক সভা তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সভা নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোকসানা খাইরুন নেছার সভাপতিত্বে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদযাপন সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং পূজা কমিটির প্রতিনিধিদের এই সমন্বিত উদ্যোগ এবারের দুর্গোৎসবকে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে—এটাই প্রত্যাশা।
দুর্গার আরাধনা হোক মানুষের কল্যাণের জন্য, উৎসব হোক সম্প্রীতির, আর রাজৈরের প্রতিটি পূজামণ্ডপ হয়ে উঠুক শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার মিলনস্থল। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ হোক সবার—এই চেতনাই হোক এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল বার্তা।
মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি: 
























