সবাই যাকে ‘চোর’ বলল, মেয়েটি তাকে শুধু ‘বাবা’ বলল!
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক সরদার নামে এক যুবককে স্থানীয়রা আটক করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রাতভর তাকে সেখানে আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘটে এমন একটি দৃশ্য, যা পুরো ঘটনাটিকে ছাপিয়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
খবর পেয়ে বাবার কাছে ছুটে আসে তার ছোট্ট মেয়েটি। এসে দেখে—বাবা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, শারীরিকভাবে দুর্বল, অসহায় অবস্থায় পড়ে আছেন।
মেয়েটি কোনো বিচার করেনি।
বাবা সত্যিই অপরাধ করেছেন কি না, সে প্রশ্নও করেনি।
সে শুধু দেখেছে—তার বাবা কষ্ট পাচ্ছেন।
প্রথমে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল সে। তারপর নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার শরীরের ধুলো ও আঘাতের জায়গাগুলো মুছে দিতে লাগল।
হয়তো তার ছোট্ট মনে হলো—সারারাত না খেয়ে থাকা বাবার নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধা পেয়েছে!
সে ছুটে গেল পাশের দোকানে। কিনে আনল এক কাপ চা আর কিছু পাউরুটি। তারপর সবার সামনে মাটিতে বসে চায়ে রুটি ভিজিয়ে পরম মমতায় বাবার মুখে তুলে দিতে লাগল। এই দৃশ্যের ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দৃশ্যটি শুধু আবেগঘন নয়—এটি আমাদের সমাজ ও বিবেকের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়।
অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে, সত্যতা যাচাই হবে এবং প্রমাণিত হলে আইনের মাধ্যমে শাস্তি হবে। কিন্তু বিচার করার অধিকার জনতার নয়।
কারণ গণপিটুনি কোনো বিচার নয়। কাউকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়।
আর সেই ছোট্ট মেয়েটি সেদিন যেন আমাদের সবচেয়ে সহজ অথচ গভীর সত্যটিই মনে করিয়ে দিল—
দুনিয়ার চোখে একজন মানুষ অভিযুক্ত হতে পারেন, কিন্তু সন্তানের চোখে তিনি তার বাবা।
সে বাবার অপরাধের হিসাব বোঝেনি;
সে শুধু বাবার ব্যথা বুঝেছে।
সে আইনের ভাষা জানেনি;
সে ভালোবাসার ভাষা জানে।
এক কাপ চা আর কয়েক টুকরো পাউরুটি দিয়ে একটি ছোট্ট শিশু যেন বলে গেল—
“তোমরা তাকে যা-ই বলো, সে আমার বাবা।”
অপরাধের বিচার হোক—অবশ্যই।
কিন্তু সেই বিচার হোক আইনের পথে, মানবিকতার সীমারেখা অতিক্রম না করে।
কারণ একজন অভিযুক্ত মানুষের শাস্তি নির্ধারণ করতে গিয়ে যেন তার নিষ্পাপ সন্তানের হৃদয়ে আমরা আরেকটি শাস্তি লিখে না দিই।
আইনের হাতে বিচার থাকুক, মানুষের হাতে থাকুক মানবিকতা।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 






















