রাতের অন্ধকারে তার চুরি, খুলনা মহানগরে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
খালিশপুরে ট্রান্সফরমারের সংযোগ কেটে নেওয়ার অভিযোগ, বিদ্যুৎহীন এলাকাবাসী; চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে রাতের টহল জোরদারের দাবি।
মো: আল-মাহফুজ শাওন , খুলনা
রাত গভীর হলেই যেন বাড়ে আতঙ্ক। কোথাও ট্রান্সফরমারের সংযোগের তার কেটে নেওয়ার অভিযোগ, কোথাও বাড়িঘরে চুরির খবর, আবার কোথাও ছিনতাইয়ের আশঙ্কা—খুলনা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নগরবাসী।
সর্বশেষ নগরীর খালিশপুর থানার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ১২ নম্বর রোডে, এমদাদিয়া জামে মসজিদের পাশে একটি ট্রান্সফরমারের বিদ্যুৎ সংযোগের তার কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন ওই এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়রা জানান, প্রথমে তারা ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট মনে করেছিলেন। পরে বাইরে বের হয়ে দেখতে পান, ট্রান্সফরমারের সংযোগের তার কেটে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বিদ্যুৎ অফিসে জানানো হলে কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে সংযোগ সচল করার চেষ্টা করেন। তবে রাত ৩টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।
শুধু খালিশপুর নয়, খুলনা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলায় চুরি ও ছিনতাইয়ের আশঙ্কা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। নিউজপ্রিন্ট এলাকার শফি ডেন্টালের বিপরীতে একটি বাড়িতেও গভীর রাতে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাউজিং এলাকার বাসিন্দারাও রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
এক বাসিন্দা বলেন,
“বাড়িতে থাকার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বাইরে বের হয়ে দেখি সার্ভিসের তার কেটে নিয়ে গেছে। রাতের বেলায় এভাবে তার চুরি হওয়া খুবই আতঙ্কের বিষয়।”
আরেক বাসিন্দার অভিযোগ,
“অনেকে হয়তো জানেন এসব কাজ কারা করতে পারে, কিন্তু ভয় বা ঝামেলার আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।”
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতের বেলায় বাইরে বের হলে চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কা অনেকের মধ্যেই কাজ করছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অন্ধকারে অপরাধের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে মনে করছেন তারা।
এক নগরবাসীর ভাষায়,
“পরিবার নিয়ে বাইরে বের হলেও এখন নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। এই বুঝি গলার চেইন ছিনতাই হলো, কিংবা হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল—এমন ভয় কাজ করে।”
তার চুরি থেকে বড় প্রশ্ন
বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ তার ও সরঞ্জাম চুরি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়—এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ে। পাশাপাশি রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে অন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
এ কারণে নগরবাসীর প্রশ্ন—একই ধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটে থাকে, তাহলে চোরচক্র শনাক্তে কার্যকর নজরদারি কোথায়? চুরি হওয়া তার বা সরঞ্জাম কোথায় যাচ্ছে, সেগুলো কারা কিনছে কিংবা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি উঠেছে।
রাজনীতির ‘ছায়া’ নিয়েও গুঞ্জন, তবে প্রমাণ কোথায়?
চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে নগরীর বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য ছাড়া কাউকে দায়ী করা যায় না। ফলে নগরবাসীর এই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্পষ্ট বক্তব্য।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, গুঞ্জন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ যেন অপরাধ থেকে পার না পায় এবং নিরপরাধ কাউকেও যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়।
নগরবাসীর দাবি
খুলনা মহানগরের বাসিন্দাদের দাবি, শুধু চুরির পর বিদ্যুৎ সংযোগ মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনা ও সংযোগের নিরাপত্তায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি রাতে পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে খালিশপুর, হাউজিং, নিউজপ্রিন্টসহ নগরীর অন্যান্য এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নগরবাসীর প্রশ্ন একটাই—রাত নামলেই যদি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় হয়, তাহলে নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ কবে দেখা যাবে?
খুলনা মহানগরবাসী এখন শুধু চুরি হওয়া তার ফেরত বা বিদ্যুৎ সংযোগ মেরামত চান না; তারা চান, অপরাধের কারণ ও চক্র শনাক্ত হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক এবং রাতের খুলনায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।
সারাক্ষণ ডেস্ক 














