ঢাকা ০৭:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচআর ও ডিপো ইনচার্জ : যমুনা অয়েলে দ্বৈত নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ। বনলতা ল্যান্ডমার্কে অন্ধকারের জাল: শেয়ার দখল, কোটি টাকার লেনদেন ও ‘হুমকির রাজনীতি’—কার স্বার্থে নীরবতা ? ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে চেক বিতরণ। আমলাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সংস্কার অতি আবশ্যক। তজুমদ্দিনে হামলার শিকার ছাত্রদল নেতা, থানায় অভিযোগের পর প্রেসক্লাবে সরব নেতাকর্মীরা। শালিখা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হেনায়ারা খানমের দায়িত্বহীনতার জন্য ১৫০ জন শিক্ষক বেতন ও ঈদ বোনাস পেল না। হাত- পা বাঁধা অবস্থায় এক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার। ক্লিন, গ্রীন ও নিরাপদ নগরী চট্টগ্রাম করতে চাই- বললেন শাহাদাত হোসেন।  সীতাকুণ্ড মডেল থানা এলাকায় চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যা ঘটনার মূল আসামী বাবু শেখ গ্রেপ্তার। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার গণেশ পাগল সেবাশ্রম মাঠে ঐতিহ্যবাহী হোলি উৎসব-২০২৬ উদযাপিত।

আমলাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সংস্কার অতি আবশ্যক।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:০৯:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
  • ৩৯ জন সংবাদটি পড়েছেন

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের সংস্কার কেন প্রয়োজন? আমলাতন্ত্রের কার্যাবলী সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানকালে আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার ব্যবস্থায় এটি এক অপরিহার্য অঙ্গরূপে পরিণত হয়েছে। আমলাতন্ত্রের কার্যাবলী (১) সরকারি নীতি বাস্তবায়ন আইনসভা যে আইন ও নীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব আমলাদের। তাঁদের মাধ্যমেই সরকারের নীতি বাস্তবায়িত এবং আইন প্রযুক্ত হয়। (২) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমলাদের গুরুত্ব দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিভাগীয় আমলাগণ আইনের খসড়া প্রণয়নে মন্ত্রীদেরকে সাহায্য করে থাকেন। মন্ত্রীরা আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নন। তাই তারা আমলাদের উপর নির্ভর করে থাকেন। আইন সভায় আমলারা মন্ত্রীদেরকে প্রশ্নের জবাব তৈরি করে দেন এবং বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করেন। (৩) অর্পিত আইন সংক্রান্ত কাজ আইনসভা কোন বিষয়ে আইনের সাধারণ নীতিই শুধু স্থির করে। আইনের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদানের ক্ষমতা শাসন বিভাগের হাতে ন্যস্ত থাকে। শাসন বিভাগের পক্ষে আমলারা এ দায়িত্ব পালন করেন। এরূপ অর্পিত আইনের মাধ্যমে আমলাদের গুরুত্ব¡ বৃদ্ধি পেয়েছে। (৪) জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমলারা কোন রাজনৈতিক দলের লোক নন। তারা নিজেদেরকে দল নিরপেক্ষ ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষক মনে করেন। তাই তাঁরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের উপরে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে থাকেন। (৫)আমলাতন্ত্র প্রশাসন ব্যবস্থাকে গতানুগতিক তার হাত থেকে উদ্ধার করে আধুনিকী করণের দিকে ধাবিত করে। ফলে সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা উন্নত হয় এবং সভ্যতার বিকাশ ঘটে। (৬) আমলাতন্ত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যোগ্য কর্মকর্তাগণ তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্ম কুশলতার দ্বারা সংগঠনকে শক্তিশালী করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। (৭) শাসক শ্রেণিকে সজাগ ও সতর্ক রাখায় বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে কোন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, কোন পদক্ষেপ নিলে সুফল পাওয়া যাবে ইত্যাদি সম্পর্কে আমলাতন্ত্র সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ব মন্তব্য প্রদান করে আমলাতন্ত্র ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সজাগ করে। (৮) গণসংযোগ সরকারের সফলতার চাবি কাঠি। আমলাতন্ত্র গণসংযোগের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরে।

আদর্শ আমলাতন্ত্র নিচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, বিভাগীয় ন্যায় বিচার এবং বিভাগীয় আদালতের প্রসারের ফলে আমলাতন্ত্রকে কিছু বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংযোগ সাধনের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারী। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণ অনেক সময়ে প্রশাসনিক কর্মচারীদের দ্বারা প্রচারিত তথ্যের উপর নির্ভরশীল থাকেন। সরকারি নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য প্রদানের সূত্র হিসেবে এবং গণসংযোগের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং আধুনিকী করণের ক্ষেত্রে আমলাগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা আধুনিকীকরণের কর্মসূচি প্রণয়ন ও প্রয়োগে সাহায্য করে থাকেন। আধুনিকীকরণের এজেন্সী নামে আমলাদের চিহ্নিত করা হয়। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে তাদের এই ভূমিকা বেশি কার্যকর। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক অঞ্চল এবং সদ্য স্বাধীন দেশে আমলারাই সরকার পরিচালনা, নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগের মাধ্যম। রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা আমলাদের উদ্যোগী হতে সাহায্য করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিকীকরণ এমন এক দৃষ্টিভঙ্গী এবং মূল্যবোধের দ্বার ানিয়ন্ত্রিত, যার সাথে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের কোন সংযোগ থাকেনা। তথাপি আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশিষ্ট এবং অপরিহার্য উপাদান হিসেবে পরিণত হয়েছে।

আমলাতন্ত্র, জনবিচ্ছিন্নতা ও লাল ফিতা উদারপন্থী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকাসত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। আমলাতন্ত্র অপব্যাখ্যামূলক শব্দে পরিণত হয়েছে। কেবলমাত্র সাধারণ নাগরিকই নয়, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এর বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছেন। কারণ হিসেবে বলা হ”েছ যে, আমলাতন্ত্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। রাজনৈতিক এবং আইনের দিক থেকে আমলারা প্রত্যক্ষভাবে জনসাধারণের নিকট জবাবদানে বাধ্য নয়। আমলাগণ সমাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র বলে গণ্য করেন। আমলাগণ পেশাদারী প্রশাসক। বৈষয়িক উন্নতি এবং প্রশাসনে নতুন মর্যাদা অর্জনের জন্য আমলাগণ সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন। জনজীবনের সমস্যা সম্পর্কে তারা সজাগ থাকেন না। দেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত থাকার জন্য সমাজের অন্যান্য অংশেরপ্রতি আমলাদের তাচ্ছিল্যের মনোভাব গড়ে ওঠে। নিজের পদোন্নতি এবং বৈষয়িক পুরস্কার অর্জন তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করে। আমলাগণ সরকারি কাঠামোর মধ্যে নির্দিষ্ট বিধি, পদ্ধতি, আচরণ ও পদোন্নতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এ কাঠামোর বাইরের জীবন তার কাছে অপরিচিত হয়ে উঠে। সাধারণ জীবন থেকে এই বিচ্ছিন্নতা আমলাতান্ত্রিক সংগঠনের ফলপ্রসূ কার্য-পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা।

আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকে কর্মচারীদের মধ্যে অফিসের দৈনন্দিন কর্তব্যরূপে বণ্টন করে দেওয়া হয়।আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কার্য পদ্ধতি আইনের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়। এতে প্রত্যেক কর্মচারীকে তার স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কার্য সম্পাদন করতে হয়। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পদসোপান নীতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ এখানে উর্ধ্বতন অধঃস্তন সম্পর্ক বিরাজ করে। এই নীতি অনুসারে বিভিন্ন পদের শ্রেণি বিন্যাস করা হয়। প্রত্যেক নিম্নতর পদই কোন উচ্চতর পদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ নিম্নতর কর্মকর্তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলারা পেশাদারী ও বেতনভুক্ত বা বেসামারিক সরকারি কর্মচারীগণ পেশাদারী ও বেতনভোগী। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাদি পান। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কমর্ বিভক্তি ও বিশেষীকরণ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলা প্রশাসন রাজনীতি নিরপেক্ষ সংগঠন। আমলারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থেকে, ঘৃণা ও আবেগকে পরিহার করে নিয়মসিদ্ধ ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেক কর্মচারীই তার ব্যক্তিগত জীবনকে প্রশাসনিক জীবন থেকে পৃথক রাখেন। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনে নিয়োগ প্রদান করা হয় মেধার ভিত্তিতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। জ্যেষ্ঠতা এবং কৃতিত্ব বা সাফল্য এই দুই মানদন্ডেই তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। আমলাতন্ত্রে আনুষ্ঠানিকতার উপর, অনমনীয় বিধি ও কার্যপদ্ধতির উপর অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। বিধি মোতাবেক যথাযথ নিয়মে সবকিছু করা হয়। সমস্ত কাজ হয় রুটিন মাফিক।
আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলাদের চাকরি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত স্থায়ী। অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তাঁরা চাকরিতে বহাল থাকেন। সরকার পরিবর্তন ঘটলেও তারা থেকে যান। শুধুমাত্র দৈহিক ও মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে তারা চাকরিচ্যুত হতে পারেন।

আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা, আনুষ্ঠানিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিচ্ছার ফলে জনগণের সমস্যার কথা, আবেদন-নিবেদন তাঁদের কাছে প্রেরিত হলে সহজে সেই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। সকল প্রস্তাব দীর্ঘদিন ফাইলবন্দী থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্বিত হয়। ফাইলের লাল ফিতার বাঁধন সহসা খোলা হয় না। এজন্য অনেকে মনে করেন আমলাতন্ত্র হচ্ছে লাল ফিতার দৌরাত্ম। আমলাতন্ত্রের ঔদাসীন্য, আনুষ্ঠানিকতা, রুটিন মাফিক কাজের প্রবণতা, দীর্ঘসূত্রিতা, বিভাগীয় মনোভাব এবং গড়িমসির প্রচেষ্টা দূর করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আমলাতন্ত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে প্রশাসন কার্য পরিচালনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পদাধিকারীগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রায়ই পদস্থ কর্মকর্তাদের উপর নির্ভর করেন। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমলাগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আমলাতন্ত্র কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে(১) সমস্যার বিষয়বস্তু নির্ধারণে একজন আমলা প্রথমে সমস্যা সম্পর্কে অবগত হন, তারপর সে সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হন। (২) ঘটনা বিশেষজ্ঞ তথ্য সংগ্রহের পর আমলাগণ তথ্য বিশ্লেষণে অগ্রসর হন। তথ্যগুলো নানা ভাগে ভাগ করেন, পর্যালোচনা করেন, অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে ঘটনার কারণ নির্ধারণ করেন। (৩) বিকল্প সমাধান নির্ধারণে সমস্যা অবগত হওয়ার পর আমলাগণ কি কি উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায় তার বিভিন্ন বিকল্প পথ অনুসন্ধান করেন এবং কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান গ্রহণ করেন। এরূপে গৃহীত বিকল্পস মাধান সমস্যার সঠিক সমাধানের দিক নির্দেশ করে। (৪) সমাধান নির্বাচনে বিকল্প সমাধান গুলোর মধ্য হতে সর্বোত্তম সমাধান গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মধ্যেই আমলাতন্ত্রের সাফল্য নিহিত। একজন আমলা সাধারণত বিকল্প সমাধানগুলোর ব্যয়, উপযোগিতা, গ্রহণযোগ্যতা, সমর্থন ও বিরোধিতা ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমাধান নির্বাচন করেন। (৫) চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যার আগাগোড়া পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ ও বিকল্প গ্রহণযোগ্য সমাধান।

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে। (১) আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে পদ সোপান নীতিতে বিন্যস্ত। তবে উচ্চ পর্যায়ের আদেশ ছাড়া নিন্ম পর্যায়ে কেউ কাজ করতে চায় না। এই নীতির কারণে পুরণো সনাতন নিয়ম-কানুনের প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা বেড়ে উঠে যা আধুনিক প্রশাসনের কাম্য নয়। (২) বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতালিপ্সা একটি মস্ত বড় সমস্যা। আমলারা ক্ষমতা হাত ছাড়া করতে চায় না বরং ক্রমাগতভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে তাদের অধীনস্ত অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলো ক্ষমতাশূন্য হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুনের কোন ধরনের পরিবর্তনকে এরা সহজে মেনে নিতে চায় না। (৩) বাংলাদেশে প্রচলিত সনাতন রীতি-নীতির উপর অধিক জোর দেওয়া হয় এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। ফলে সমস্যা সমাধানে জটিলতা দেখা দেয়। নানা ধরনের আইন-কানুনের অজুহাতে অযথা বিলম্ব ঘটায় সমস্যার পরিধি বৃদ্ধি পায়। ফাইল বা নথি এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে গড়াতে থাকে। এতে করে এত বেশী সময়ের অপচয় ঘটে যে, রোগী মারা যাবার পর ডাক্তার আসার মত ঘটনা ঘটে। (৪)আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকে। তাই তারা নিজেদেরকে জনগণের সেবক মনে না করে প্রভ মনে করে। জনগণের দাবীকে তারা মেনে নিতে পারে না। (৫) নীতি নির্ধারণে অতি আগ্রহী আমলাগণ রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ করে। আইনসভার কাজের পরিধিবৃদ্ধি, জটিল প্রকৃতি এবং সদস্যদের সময়ের অভাবের সুযোগে আমলারাই নীতি নির্ধারণে এবং আইন প্রণয়নে প্রভুত্ব বিস্তার করে।

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশঃ
আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটি প্রশাসনিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আমলা প্রশাসন উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। সুতরাং সেই সুদূর অতীত থেকে আমলাতন্ত্রের যে সমস্যাগুলো এই উপমহাদেশে আসন গেড়েছে, তাও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমলাগণের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এর অতিবিকাশ ঘটেছে, ফলে সেবকের অব¯’ান থেকে তারা প্রভুর স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পিছনে কিছু কারণ বিদ্যমান রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব একটিি নত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। নেতৃত্বের দুর্বলতা ও মন্ত্রীদের অদক্ষতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অধিক ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পেয়েছে। অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চার ফলে আমলাগণ জন-সেবকের পরিবর্তে নিজেদেরকে প্রভুর ভূমিকায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। উপরোক্ত কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক দল, জনমত, নির্বাচক মন্ডলী কোনটাই এখানে সুসংগঠিত নয়। যার ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান অত্যন্ত নিন্ম। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগেও বিভিন্ন দুর্বলতা বিদ্যমান। বাংলাদেশে এসবের অভাব তীব্র ভাবে বিদ্যমান থাকায় একটি সংঘবদ্ধ শ্রেণি হিসেবে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশ ঘটেছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহরায়ন, শিল্পায়ন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ইত্যাদি কারণে আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশ ঘটেছে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচআর ও ডিপো ইনচার্জ : যমুনা অয়েলে দ্বৈত নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ।

আমলাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সংস্কার অতি আবশ্যক।

আপডেট সময় : ০৪:০৯:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের সংস্কার কেন প্রয়োজন? আমলাতন্ত্রের কার্যাবলী সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানকালে আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার ব্যবস্থায় এটি এক অপরিহার্য অঙ্গরূপে পরিণত হয়েছে। আমলাতন্ত্রের কার্যাবলী (১) সরকারি নীতি বাস্তবায়ন আইনসভা যে আইন ও নীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব আমলাদের। তাঁদের মাধ্যমেই সরকারের নীতি বাস্তবায়িত এবং আইন প্রযুক্ত হয়। (২) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমলাদের গুরুত্ব দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিভাগীয় আমলাগণ আইনের খসড়া প্রণয়নে মন্ত্রীদেরকে সাহায্য করে থাকেন। মন্ত্রীরা আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নন। তাই তারা আমলাদের উপর নির্ভর করে থাকেন। আইন সভায় আমলারা মন্ত্রীদেরকে প্রশ্নের জবাব তৈরি করে দেন এবং বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করেন। (৩) অর্পিত আইন সংক্রান্ত কাজ আইনসভা কোন বিষয়ে আইনের সাধারণ নীতিই শুধু স্থির করে। আইনের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদানের ক্ষমতা শাসন বিভাগের হাতে ন্যস্ত থাকে। শাসন বিভাগের পক্ষে আমলারা এ দায়িত্ব পালন করেন। এরূপ অর্পিত আইনের মাধ্যমে আমলাদের গুরুত্ব¡ বৃদ্ধি পেয়েছে। (৪) জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমলারা কোন রাজনৈতিক দলের লোক নন। তারা নিজেদেরকে দল নিরপেক্ষ ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষক মনে করেন। তাই তাঁরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের উপরে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে থাকেন। (৫)আমলাতন্ত্র প্রশাসন ব্যবস্থাকে গতানুগতিক তার হাত থেকে উদ্ধার করে আধুনিকী করণের দিকে ধাবিত করে। ফলে সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা উন্নত হয় এবং সভ্যতার বিকাশ ঘটে। (৬) আমলাতন্ত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যোগ্য কর্মকর্তাগণ তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্ম কুশলতার দ্বারা সংগঠনকে শক্তিশালী করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। (৭) শাসক শ্রেণিকে সজাগ ও সতর্ক রাখায় বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে কোন নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, কোন পদক্ষেপ নিলে সুফল পাওয়া যাবে ইত্যাদি সম্পর্কে আমলাতন্ত্র সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ব মন্তব্য প্রদান করে আমলাতন্ত্র ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সজাগ করে। (৮) গণসংযোগ সরকারের সফলতার চাবি কাঠি। আমলাতন্ত্র গণসংযোগের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরে।

আদর্শ আমলাতন্ত্র নিচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, বিভাগীয় ন্যায় বিচার এবং বিভাগীয় আদালতের প্রসারের ফলে আমলাতন্ত্রকে কিছু বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংযোগ সাধনের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারী। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণ অনেক সময়ে প্রশাসনিক কর্মচারীদের দ্বারা প্রচারিত তথ্যের উপর নির্ভরশীল থাকেন। সরকারি নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য প্রদানের সূত্র হিসেবে এবং গণসংযোগের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং আধুনিকী করণের ক্ষেত্রে আমলাগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা আধুনিকীকরণের কর্মসূচি প্রণয়ন ও প্রয়োগে সাহায্য করে থাকেন। আধুনিকীকরণের এজেন্সী নামে আমলাদের চিহ্নিত করা হয়। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহে তাদের এই ভূমিকা বেশি কার্যকর। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক অঞ্চল এবং সদ্য স্বাধীন দেশে আমলারাই সরকার পরিচালনা, নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগের মাধ্যম। রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা আমলাদের উদ্যোগী হতে সাহায্য করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিকীকরণ এমন এক দৃষ্টিভঙ্গী এবং মূল্যবোধের দ্বার ানিয়ন্ত্রিত, যার সাথে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের কোন সংযোগ থাকেনা। তথাপি আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশিষ্ট এবং অপরিহার্য উপাদান হিসেবে পরিণত হয়েছে।

আমলাতন্ত্র, জনবিচ্ছিন্নতা ও লাল ফিতা উদারপন্থী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকাসত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। আমলাতন্ত্র অপব্যাখ্যামূলক শব্দে পরিণত হয়েছে। কেবলমাত্র সাধারণ নাগরিকই নয়, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও এর বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছেন। কারণ হিসেবে বলা হ”েছ যে, আমলাতন্ত্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। রাজনৈতিক এবং আইনের দিক থেকে আমলারা প্রত্যক্ষভাবে জনসাধারণের নিকট জবাবদানে বাধ্য নয়। আমলাগণ সমাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র বলে গণ্য করেন। আমলাগণ পেশাদারী প্রশাসক। বৈষয়িক উন্নতি এবং প্রশাসনে নতুন মর্যাদা অর্জনের জন্য আমলাগণ সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন। জনজীবনের সমস্যা সম্পর্কে তারা সজাগ থাকেন না। দেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত থাকার জন্য সমাজের অন্যান্য অংশেরপ্রতি আমলাদের তাচ্ছিল্যের মনোভাব গড়ে ওঠে। নিজের পদোন্নতি এবং বৈষয়িক পুরস্কার অর্জন তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করে। আমলাগণ সরকারি কাঠামোর মধ্যে নির্দিষ্ট বিধি, পদ্ধতি, আচরণ ও পদোন্নতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এ কাঠামোর বাইরের জীবন তার কাছে অপরিচিত হয়ে উঠে। সাধারণ জীবন থেকে এই বিচ্ছিন্নতা আমলাতান্ত্রিক সংগঠনের ফলপ্রসূ কার্য-পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা।

আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকে কর্মচারীদের মধ্যে অফিসের দৈনন্দিন কর্তব্যরূপে বণ্টন করে দেওয়া হয়।আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কার্য পদ্ধতি আইনের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়। এতে প্রত্যেক কর্মচারীকে তার স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কার্য সম্পাদন করতে হয়। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পদসোপান নীতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ এখানে উর্ধ্বতন অধঃস্তন সম্পর্ক বিরাজ করে। এই নীতি অনুসারে বিভিন্ন পদের শ্রেণি বিন্যাস করা হয়। প্রত্যেক নিম্নতর পদই কোন উচ্চতর পদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ নিম্নতর কর্মকর্তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলারা পেশাদারী ও বেতনভুক্ত বা বেসামারিক সরকারি কর্মচারীগণ পেশাদারী ও বেতনভোগী। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাদি পান। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কমর্ বিভক্তি ও বিশেষীকরণ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলা প্রশাসন রাজনীতি নিরপেক্ষ সংগঠন। আমলারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থেকে, ঘৃণা ও আবেগকে পরিহার করে নিয়মসিদ্ধ ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেক কর্মচারীই তার ব্যক্তিগত জীবনকে প্রশাসনিক জীবন থেকে পৃথক রাখেন। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনে নিয়োগ প্রদান করা হয় মেধার ভিত্তিতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। জ্যেষ্ঠতা এবং কৃতিত্ব বা সাফল্য এই দুই মানদন্ডেই তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। আমলাতন্ত্রে আনুষ্ঠানিকতার উপর, অনমনীয় বিধি ও কার্যপদ্ধতির উপর অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। বিধি মোতাবেক যথাযথ নিয়মে সবকিছু করা হয়। সমস্ত কাজ হয় রুটিন মাফিক।
আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলাদের চাকরি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত স্থায়ী। অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তাঁরা চাকরিতে বহাল থাকেন। সরকার পরিবর্তন ঘটলেও তারা থেকে যান। শুধুমাত্র দৈহিক ও মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে তারা চাকরিচ্যুত হতে পারেন।

আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা, আনুষ্ঠানিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিচ্ছার ফলে জনগণের সমস্যার কথা, আবেদন-নিবেদন তাঁদের কাছে প্রেরিত হলে সহজে সেই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। সকল প্রস্তাব দীর্ঘদিন ফাইলবন্দী থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্বিত হয়। ফাইলের লাল ফিতার বাঁধন সহসা খোলা হয় না। এজন্য অনেকে মনে করেন আমলাতন্ত্র হচ্ছে লাল ফিতার দৌরাত্ম। আমলাতন্ত্রের ঔদাসীন্য, আনুষ্ঠানিকতা, রুটিন মাফিক কাজের প্রবণতা, দীর্ঘসূত্রিতা, বিভাগীয় মনোভাব এবং গড়িমসির প্রচেষ্টা দূর করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আমলাতন্ত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে প্রশাসন কার্য পরিচালনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পদাধিকারীগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রায়ই পদস্থ কর্মকর্তাদের উপর নির্ভর করেন। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমলাগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আমলাতন্ত্র কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে(১) সমস্যার বিষয়বস্তু নির্ধারণে একজন আমলা প্রথমে সমস্যা সম্পর্কে অবগত হন, তারপর সে সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হন। (২) ঘটনা বিশেষজ্ঞ তথ্য সংগ্রহের পর আমলাগণ তথ্য বিশ্লেষণে অগ্রসর হন। তথ্যগুলো নানা ভাগে ভাগ করেন, পর্যালোচনা করেন, অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে ঘটনার কারণ নির্ধারণ করেন। (৩) বিকল্প সমাধান নির্ধারণে সমস্যা অবগত হওয়ার পর আমলাগণ কি কি উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যায় তার বিভিন্ন বিকল্প পথ অনুসন্ধান করেন এবং কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান গ্রহণ করেন। এরূপে গৃহীত বিকল্পস মাধান সমস্যার সঠিক সমাধানের দিক নির্দেশ করে। (৪) সমাধান নির্বাচনে বিকল্প সমাধান গুলোর মধ্য হতে সর্বোত্তম সমাধান গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মধ্যেই আমলাতন্ত্রের সাফল্য নিহিত। একজন আমলা সাধারণত বিকল্প সমাধানগুলোর ব্যয়, উপযোগিতা, গ্রহণযোগ্যতা, সমর্থন ও বিরোধিতা ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমাধান নির্বাচন করেন। (৫) চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যার আগাগোড়া পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ ও বিকল্প গ্রহণযোগ্য সমাধান।

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে। (১) আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে পদ সোপান নীতিতে বিন্যস্ত। তবে উচ্চ পর্যায়ের আদেশ ছাড়া নিন্ম পর্যায়ে কেউ কাজ করতে চায় না। এই নীতির কারণে পুরণো সনাতন নিয়ম-কানুনের প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা বেড়ে উঠে যা আধুনিক প্রশাসনের কাম্য নয়। (২) বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতালিপ্সা একটি মস্ত বড় সমস্যা। আমলারা ক্ষমতা হাত ছাড়া করতে চায় না বরং ক্রমাগতভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে তাদের অধীনস্ত অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলো ক্ষমতাশূন্য হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুনের কোন ধরনের পরিবর্তনকে এরা সহজে মেনে নিতে চায় না। (৩) বাংলাদেশে প্রচলিত সনাতন রীতি-নীতির উপর অধিক জোর দেওয়া হয় এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। ফলে সমস্যা সমাধানে জটিলতা দেখা দেয়। নানা ধরনের আইন-কানুনের অজুহাতে অযথা বিলম্ব ঘটায় সমস্যার পরিধি বৃদ্ধি পায়। ফাইল বা নথি এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে গড়াতে থাকে। এতে করে এত বেশী সময়ের অপচয় ঘটে যে, রোগী মারা যাবার পর ডাক্তার আসার মত ঘটনা ঘটে। (৪)আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকে। তাই তারা নিজেদেরকে জনগণের সেবক মনে না করে প্রভ মনে করে। জনগণের দাবীকে তারা মেনে নিতে পারে না। (৫) নীতি নির্ধারণে অতি আগ্রহী আমলাগণ রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ করে। আইনসভার কাজের পরিধিবৃদ্ধি, জটিল প্রকৃতি এবং সদস্যদের সময়ের অভাবের সুযোগে আমলারাই নীতি নির্ধারণে এবং আইন প্রণয়নে প্রভুত্ব বিস্তার করে।

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশঃ
আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটি প্রশাসনিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আমলা প্রশাসন উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। সুতরাং সেই সুদূর অতীত থেকে আমলাতন্ত্রের যে সমস্যাগুলো এই উপমহাদেশে আসন গেড়েছে, তাও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমলাগণের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এর অতিবিকাশ ঘটেছে, ফলে সেবকের অব¯’ান থেকে তারা প্রভুর স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পিছনে কিছু কারণ বিদ্যমান রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব একটিি নত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। নেতৃত্বের দুর্বলতা ও মন্ত্রীদের অদক্ষতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অধিক ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পেয়েছে। অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চার ফলে আমলাগণ জন-সেবকের পরিবর্তে নিজেদেরকে প্রভুর ভূমিকায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। উপরোক্ত কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক দল, জনমত, নির্বাচক মন্ডলী কোনটাই এখানে সুসংগঠিত নয়। যার ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান অত্যন্ত নিন্ম। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগেও বিভিন্ন দুর্বলতা বিদ্যমান। বাংলাদেশে এসবের অভাব তীব্র ভাবে বিদ্যমান থাকায় একটি সংঘবদ্ধ শ্রেণি হিসেবে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশ ঘটেছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহরায়ন, শিল্পায়ন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ইত্যাদি কারণে আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশ ঘটেছে।