কলেজ থেকে চলে আসার বেশ আগেই কি মনে হলো কয়েকটি ফুল গাছ রোপন করে যাই।তখন কলেজে ছাত্র/ছাত্রীর ভর্তি সংখ্যা শতকের কম ছিল না ।অনেক সময় বসার সংকুলান করে দিতে হিমশিম খেয়ে যেতাম। আর ফলাফলে উপজেলার ভাল কলেজগুলোর লগে লগেই থাকতো।
তখন বুকের ভিতর কবি সুকান্তের “প্রিয়তমাসু” কবিতা মনে পড়ত। এ কবিতায় অনেক কথাইই আছে। তবে ভাল কিছু কিছু বাক্য যেমন, “যুদ্ধ করেছি অনেক এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্য” তাঁর একই কবিতায়” আত্মম্ভর আশা নিয়ে” বাক্যটি ব্যাবহার করেছেন তাঁর প্রিয়তমার জন্য।আমিও এক সময় আত্মম্ভর আশায় চলতাম যে, অচিরেই কলেজ একটি ভাল কলেজ হবে। গ্রামের অনেক মেয়েকে সাজালে সেও শহরের সুন্দরী মেয়ের চেয়েও সুন্দরী লাগে।তাহলে গ্রামের এ কলেজও একদিন সাজগোজ পাবে সুন্দর হবে। শহরের কলেজের চেয়েও সুন্দর কলেজ হবে। সেজন্যই কলেজে প্রথম দিকে একটি ফুলের বাগান,কিছু কাঠের গাছ,নারকেল গাছ লাগানো হয়েছিল। সারাজীবন ‘ত আর কেউ থাকে না। তবে ভাল কিছু ভাবনাতো থাকেই।
আমি চলে গেলে এখানে ভাল শিক্ষক আসবেন। লাইব্রেরিতে বসে রাতে পড়াশোনা করবে আর ফুলের গন্ধ নেবে। দিবসে ফোটা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করবে। তাই শিউলি, কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুলের গাছ লাগালাম বিল্ডিংয়ের সামনে। এরও পূর্বে ১৯৯৫ সালে একটি চামেলি ফুলের গাছ লাগিয়েছিলাম টিনের ঘরের সামনের ফুল বাগানে। বাগানের অস্তিত্ব নাই কিন্তু ফুল গাছটি আছে । চামেলি ফুল ফুটলে পাতা দেখা যেত না। ফুল গুলো অনেক আগেই ওর সৌন্দর্য আমাকে উপভোগ করিয়েছে। একেবারে ইলিয়ড মহাকাব্যের হীরা, এথেনা আর আফ্রোদিতি দেবীদের নায়ক প্যারিসকে সৌন্দর্য দেখানোর মত। আমি যতদিন কলেজে থেকেছি এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি মাতাল প্রেমিকের মত। এ ফুল ফুটলে গাছের দিকে না তাকালে মনে হোত প্রমিকা বিরহে আছি।
পরে যে ফুল গাছ গুলো লাগিয়েছিলাম তখন আমি অবসরের কাছাকাছি। শিউলি গাছটি সুগন্ধিযুক্ত তাই লাইব্রেরীর সামনে, কৃষ্ণ চূড়া বিল্ডিংয়ের মাঝামাঝি আর পলাশ ফুলটি পশ্চিম কোনায় শহীদ মিনারের পাশে। যাতে ফুল ফুটলে শহীদের রক্তের লাল রং শহীদ মিনারে আগতদের ৫২ র গভীর বেদনা বুকের কোনায় মোচড় দিয়ে ওঠে।
এই তিনটি গাছ লাগানোর সময় বলেছিলাম,”কেসমত, এ গাছগুলো আমার সাথে বেঈমানী করবে। গাছগুলোর যত্ন নিস।আমি থাকতে আর ফুল ফুটবে না।”
কেসমত এ কলেজের মালি। এ কথার মানে বুঝার মতই ও। তাই ও বলত,”স্যার,সময় বেঈমানী করবে, গাছ নয়।”
অবসরে যাওয়ার পর কলেজে কাউকে দেখতেও যাই নে। কারণ এ কলেজের কোন কোন স্টাফ এমনই যে আমি গেলে ভাবে, না জানি কি খারাপ মন্ত্র দিতে আসছে। এগুলো ভেবেই ওদিকে পা বাড়াতে ভয় লাগে। আরও কারন আছে। প্রথম কারন সৈয়দ হাফিজুর রহমান সভাপতির দায়িত্ব পেলে তাঁর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত দিলে উপস্থিত হয়েছিলাম। খুব পানির পিপাসা অনুভূত হলে পানি চেয়েছিলাম। যার কাছে চেয়েছিলাম সে হয়ত বা আমার চেয়ে অনুষ্ঠানের ব্যাক্তিদের গুরুত্ব বেশী উপলব্ধি করেছিল।তাই আমার কথা ভুলেছিল। আমি মন্টু কাজিকে দিয়ে এক লিটার পানি কিনে এনে পান করেছিলাম।
দ্বিতীয় কারন, ঐ অনুষ্ঠানে আমার বক্তৃতা ছিল।আমার এই বক্তৃতার জন্য উপস্থাপককে বেশী কথা শুনতে হয়েছিল। কেন সাবেক প্রিন্সিপালকে বক্তৃতার সু্যোগ দেয়া হলো? যিনি গোপনে ধমকিয়েছিলেন তিনি একজন অফিস সহকারী।
যেখানে গেলে একবার অপমানিত হতে হয় সেখানে দ্বিতীয় বার যাওয়া উচিৎ না। তাই এখন একেবারেই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।
আর এজন্যই হয়তোবা “হৈমন্তী” গল্পে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নায়িকা হৈমন্তীর বাবা তার শ্বশুর বাড়িতে অপমানিত হলেও বাবাকে বেড়াতে যেতে বললে তিনি সিঁধ কাঠি নিয়েই যেতে চেয়েছিলেন। মানে গোপনে যেতে চেয়েছিলেন যাতে দ্বিতীয় বার অপমানিত না হতে হয়।
আমার মধ্যেও দ্বিতীয় বার অপমানিত হওয়ার ভয় ছিল।তাই আমি ভেবেছিলাম আমিও কলেজে গেলে গোপনেই যাব।
আমি শিউলি ফুটলে মালির নিকট জিজ্ঞাসা করি পথে দেখা হলে, “হ্যারে কেসমত, শিউলি ফুল কি ফুটেছে। ও বলে, “স্যার,জানিনে। ”
ওরতো জানার কথা না।কারন ও দিনে কাজ করে আর ফুল ফুটে রাতে।
এদের অবস্থা রাইস টিউব দিয়ে ভাত খাওয়ার মত।কলেজে আসতে হয় আসেন কিন্তু কলেজকে ভালবাসার মন না থাকলে ওর মধ্যে দেখার মত তৃতীয় চোখ খোলে না। অর্থাৎ রাইস টিউবের খাবারে পেট ভরে কিন্তু স্বাদ পাওয়া যায় না। এ কলেজে বেশির ভাগ স্টাফদের অবস্থাও এ রকমই।
আমি খুব ভয়ে ভয়ে একদিন সকাল বেলা খুব সন্তর্পণে কলেজের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। মূল উদ্দেশ্য কৃষ্ণ চূড়া ফুলের সৌন্দর্য দেখা। কাঁঠাল , আম, নারকেল গাছের দিকে তাকালাম।
একবার গভীরভাবে ভিতরে তাকালাম ঐ বেশী কথা বলা অফিস সহকারীটি আছে কি না দেখার জন্য। এত সকালে থাকার কথা না,কিন্তু গোহালে আগুন লাগা গরুর মত ভয়তো আছে। শুধু তাইই নয় শ্রী শরৎ চন্দ্র চট্টপধ্যায়ের “বিলাসী” গল্পের গোখরো সাপের আক্রমণ থেকে রক্ষার তাবিজ বিক্রির কথা মনে পড়ে গেল। সাপুড়ে বিষধর সাপ ধরে সাপের মুখে গরম শিকের ছ্যাকা দেয় ফলে সামনে তাবিজ ধরলে ছ্যাকার ভয়ে আর ফণা তোলে না। আমিও অনেকটা ছ্যাকা খাওয়া সাপের মতই।
আমি গাছটি জড়িয়ে ধরলাম। অ বাক (কথা না বলা) গাছ স বাক হলো। আমি ফিস ফিস করে বললাম, ” তুমি কি আমাকে চিনেছ।”
ও বলল,”তুমি’ত প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। তুমি না হলে আমি এ কলেজে আসতাম না।তুমিই আমাকে এনেছ।আর আমি চিনব না”?
আমি বললাম,”তোমাকে, তোমার ফুল দেখতে এসেছি।”
ও বলল, “তুমি দেখতে এলে।কিন্তু প্রতিদিন যারা আসে তারা আমাকে দেখে।কি সুন্দর ফুল দিয়েছি।এ সৌন্দর্য কেউ দেখে না। আর তোমার মত চোখ সবার না। এখন সব আসে পড়াক বা না পড়াক সকাল ১১ টার পরে ছাত্র/ছাত্রী থাকেনা।শিক্ষকরাও থাকেন না। আর ছাত্র /ছাত্রী আগের মত নেই। ডিগ্রির ছাত্র/ছাত্রীদের হাজিরা খাতা নেই।কোনদিন একটা ছাত্র/ছাত্রী দেখলাম না। তাও ডিগ্রির শিক্ষক কর্মচারী এম,পি,ও চায়। আপনাকে যে বক্তৃতা দিতে নিষেধ করেছিল। তিনিই আবার বর্তমান প্রিন্সিপালকে কয়েকদিন আগে অপমান করেছে। বাকী স্যারকে ডিগ্রির এক ম্যাডাম লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছে। এইই সব এখন কলেজে চলছে। আমি এগুলো বললাম কাউকে বলো না।তহলে আমাকে কেটে ফেলবে।গায়ে করাতের পোচ দিলে সে যে কি কষ্ট। ঐ যে , তুমি,এ,ডি,সি কৃষ্ণ পদ বিশ্বাস , ইউ,এন,ও বাবুল চন্দ্র রায়, তুহিন মল্লিক আরও অনেকে মেহগনি গাছ লাগিয়েছিলেন তা সব কেটে ফেলেছে। কাটার সময় সে কি কান্না!সভাপতির পায়ে পর্যন্ত ধরেছিল। কিন্তু শুনল না। আরও বলে রবিউল প্রিন্সিপালের হাতের কিছুই রাখা যাবে না।তাই বলে তোমার স্ত্রীর দেওয়া দুটো হাতল ওয়ালা চেয়ার পুড়ায়ে খিচুড়ি রান্না করে খেয়ে ফেলেছে। সে কি উল্লাস!”
আমি বললাম, “তারা কি এলাকায় আছে?”
আরে না–।২০২৪ এর গণ আন্দোলনে সব পলাতক। গাছটি উত্তর দিল।
আমি ফুলের দিকে তাকালাম। বাহারি লাল ফুল,কি সুন্দর! অথচ মনে হোল যেন , যে সমস্ত স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুন আর বিতাড়নের শিকার হয়েছেন তাদের বুকের রক্ত, বেদনার রক্তক্ষরণ এ ফুলে।
আমি কি যেন বলতে গেলাম। তার আগেই ও বলল,”এখন প্রায় নয়টা বাজে, তুমি চলে যাও।নইলে আমার বিপদ”।
আমি ধীর পায়ে ফিরে এলাম।পিছনে রয়ে গেল দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি বিজড়িত কিছু গাছের সবুজ হাতছানি আর বঞ্চনার গ্লানি।
সারাক্ষণ ডেস্ক 






















