রামিসা যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়! গত মঙ্গলবার ২০ মে, ২০২৬ সকাল সাড়ে দশটা। ঢাকা শহরের পল্লবী, মিরপুর এগারো নম্বর সেকশন, বি ব্লক, সাত নম্বর সড়ক, ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলা।সুনশান নিরবতা। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে রামিসার পরিবার।অলি গলি সকলেই চিনে রামিসাকে।
আট বছরের রামিসা আক্তার। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সকালে বড় বোন রাইসাকে এগিয়ে দিতে গিয়েছিল। মা পারভীন আক্তার রান্নাঘরে। বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। এই পরিবার এই বিল্ডিংয়ে প্রায় সতেরো বছর ধরে বাস করছে। প্রতিটি প্রতিবেশীর নাম জানা। প্রতিটি দরজা বিশ্বাসের। হঠাৎ রামিসা নেই।
মা হন্তদন্ত হয়ে ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে তাকিয়ে দেখেন, রামিসার পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। মাত্র একটি জুতা। মা পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দেন। ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। বারবার, ক্রমাগত। কেবল এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা, যে নিস্তব্ধতার ভাষা একজন মা সবার আগে চিনতে পারেন।
অতঃপর ৯৯৯ এ ফোন। পুলিশ আসে। দরজা ভাঙা হয়। ভেতরে যা পাওয়া গেছে, সেটি ছাপার অযোগ্য। শিশুটির শরীরের মূল অংশ পাওয়া যায় খাটের নিচ থেকে। বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায় শৌচাগারে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ধর্ষণের পর শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত সোহেল রানা পেশায় রিকশা মেকানিক, পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার স্ত্রীকেও আটক করা হয়েছে।
একজন বাবা সকালে মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন। দুপুরে তিনি লাশ চিনতে পারেননি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারা, একটি প্যাটার্ন, একটি জাতীয় মহামারি।যা গোটা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে উলঙ্গ করেছে। উলঙ্গ করেছে আমাদের মানবিকতা ও নৈতিককতা। প্রথিতযশা লেখক হুমায়ূন আজাদ লিখেছিলেন, ধর্ষণ হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ।আজ তাই প্রমানিত হয়েছে।
আমাদের কাছে আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(১) ধারায় শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ২০২৫ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন এবং শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, সরকার প্রতিটি জেলা ও মহানগর এলাকায় এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। মাগুরার শিশু ধর্ষণ মামলায় আইন উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাঁচ দিনের মধ্যে ডিএনএ রিপোর্ট, সাত দিনের মধ্যে বিচারকাজ শুরু। ঘোষণা আছে। কাগজ আছে। সিলমোহর আছে। গেজেট আছে। বাস্তব?
বিশ্বজুড়ে যৌন সহিংসতার ভুক্তভোগীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ বিচার পান, ৪০ শতাংশের কম আইনের দ্বারস্থ হন। বাংলাদেশে এই হার আরও কম। মামলা দায়ের হয় ধীরে। তদন্ত চলে বছরের পর বছর। সাক্ষী হারিয়ে যায়। আসামি জামিনে রাস্তায় ফিরে এসে নতুন শিকার খোঁজে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই অন্তত ৫৫টি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় কোনো মামলাই দায়ের হয়নি।
এই কাঠামোতে আইন কেবল কাগজে বেঁচে আছে। সমাজ বাস্তবতায় নয়।
আমাদের দাবি একটাই, এবং অত্যন্ত পরিষ্কার।শিশু ধর্ষণের প্রতিটি মামলা স্বতন্ত্র ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালে যাবে। সর্বোচ্চ ত্রিশ দিনের মধ্যে রায়। আপিল ও কার্যকর সহ সর্বোচ্চ ছয় মাস। মামলা প্রত্যাহারের জন্য পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগ, দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতিটি বিল্ডিংয়ের নতুন পুরুষ ভাড়াটিয়ার পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। প্রতিটি স্কুলে গুড টাচ ও ব্যাড টাচের নিয়মিত পাঠ। প্রতিটি থানায় শিশু সুরক্ষা ডেস্ক, যেখানে নারী কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন। এগুলো বিলাসিতা নয়। এগুলো ন্যূনতম। ক্যামেরায় শুধু আশ্বাস নয়। রাস্তায় কাজে প্রমাণ।
আট বছরের রামিসার কথা ভাবলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মাদরাসায় পাঠাতে ভয়, কোন বাসায় খেলতে গেলে ভয়, এমনকি নিজের ঘরে বসিয়ে রাখতেও ভয়। পাশের দরজার মানুষটাকে আজকাল আর চেনা যায় না। সতেরো বছরের প্রতিবেশী যখন একটি আট বছরের শিশুকে এভাবে শেষ করে দিতে পারে, তখন বাবা মা সন্তানকে কোথায় রাখবেন, কার হাতে রাখবেন?
আপনার আমার মেয়েও এক একটি রামিসা। প্রতিটি বাবার বুকের ভেতর একই কম্পন। প্রতিটি মায়ের চোখে একই অনিদ্রা। যতদিন আইন কাগজে ঘুমিয়ে থাকবে, ততদিন আমাদের প্রতিটি সন্তান কারও না কারও নরপিচাশদের শিকারের তালিকায়।
ছোট্ট রামিসার জন্য প্রার্থনা রইল। সৃষ্টিকর্তাতা তাকে জান্নাতের সবচেয়ে সুন্দর স্থানে আশ্রয় দেন। তার বাবা মাকে দান করুন অপরিসীম ধৈর্য। এবং এই নিষ্পাপ মেয়েটির রক্তে যেন বাংলাদেশের ঘুমিয়ে থাকা বিবেক ও আইন, দুইটাই সত্যি সত্যি জেগে ওঠে।
কাল আবার সকাল হবে। আবার কোনো মা সন্তানকে স্কুলের জন্য তৈরি করে দেবেন। সেই সকালে আমরা সবাই একটাই কথা বলতে চাই।রামিসা যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়।আর যেন কোনো হায়েনাদের থাবা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে। আমরা চাই এদেশে ঘটে যাওয়া সকল ধর্ষণ,হত্যা, নির্যাতনের যথাযথ সুষ্ঠু বিচার হোক। তাহলেই শান্তি পাবে রামিসার রুহের।
সারাক্ষণ ডেস্ক 























