একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, কতটা মানবিক এবং কতটা ন্যায়ভিত্তিক—তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণে। সুউচ্চ ভবন, দৃষ্টিনন্দন সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সেই উন্নয়নের বিনিময়ে যদি শতাব্দীপ্রাচীন একটি শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী মাথা গোঁজার ঠাঁই হারায়, তবে উন্নয়নের সেই ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ঢাকার ঐতিহাসিক মিটফোর্ড হাসপাতালের মিনিয়ালস কোয়ার্টার বা সুইপার কলোনি আজ এমনই এক প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে হরিজন সম্প্রদায়ের বহু পরিবার এখানে বসবাস করে আসছে। এই মানুষগুলো শুধু একটি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নন; তারা রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার নীরব যোদ্ধা। নগরজীবনের প্রতিদিনের স্বাভাবিকতা তাদের নিরলস শ্রমের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।
আজ তাদের সম্ভাব্য উচ্ছেদ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি জমি বা স্থাপনা নিয়ে বিরোধ নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রের নৈতিকতার প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে ৯ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতপাত বিলোপ জোট এবং বিভিন্ন দলিত, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনের মূল বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—”উচ্ছেদ নয়, আগে পুনর্বাসন।”
এ দাবিকে আবেগের দাবি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন—বিশেষ করে বাসস্থানের বিষয়টি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে বৈষম্যহীনতার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক আদর্শ কেবল কাগজে-কলমে থাকার জন্য নয়; বাস্তব নীতিনির্ধারণেও তার প্রতিফলন ঘটতে হবে।
হরিজন সম্প্রদায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। সামাজিক বৈষম্য, পেশাগত অবমূল্যায়ন, শিক্ষা ও আবাসনের সীমাবদ্ধতা—সবকিছুর মধ্যেও তারা রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদান করে এসেছে। অথচ উন্নয়নের আলোচনায় তাদের মতামত, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। যদি হাসপাতাল সম্প্রসারণ, জনস্বার্থ বা অন্য কোনো বৈধ কারণে ভূমি প্রয়োজন হয়, তবে রাষ্ট্রের সেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার কখনোই নাগরিকের মর্যাদা ও মানবিক নিরাপত্তাকে অস্বীকার করার অনুমতি দেয় না। উন্নয়নের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—কোনো মানুষ যেন উন্নয়নের শিকার না হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালাও একই শিক্ষা দেয়। পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত নোটিশ, আলোচনার সুযোগ, বিকল্প আবাসন এবং ন্যায্য পুনর্বাসন নিশ্চিত করা উচিত। উন্নয়ন ও মানবাধিকার—দুটিকে একসঙ্গে রক্ষা করাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশেও অতীতের বহু অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অনেক পরিবার কর্মসংস্থান হারায়, শিশুরা বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয় এবং নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। তাই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—স্বচ্ছতা। যদি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকে, তবে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ, পুনর্বাসনের লিখিত পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি নিশ্চিত করা হলে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত অনেকটাই কমে আসবে।
এই মানুষগুলোকে কেবল “সুইপার” পরিচয়ে দেখলে চলবে না। তারা নাগরিক, তারা করদাতা, তারা শ্রমজীবী, তারা পরিবারের অভিভাবক, তারা এই রাষ্ট্রেরই অংশ। রাষ্ট্রের কাছে তাদের অধিকার অন্য যেকোনো নাগরিকের মতোই সমান।
আজ প্রয়োজন রাজনীতি নয়, মানবিকতা; সংঘাত নয়, সংলাপ; উচ্ছেদ নয়, ন্যায্য পুনর্বাসন। সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।
একটি মানবিক সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয় অবিলম্বে বিবেচনা করা যেতে পারে—
উচ্ছেদের আগে প্রতিটি পরিবারের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা।
পুনর্বাসনস্থলে বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা।
কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগের উপযোগী আবাসন নিশ্চিত করা।
বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন।
পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ।
মিটফোর্ড সুইপার কলোনির প্রশ্নটি আজ কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনেরও পরীক্ষা। উন্নয়ন কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য—এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তাকে নির্ধারণ করবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়নের বুলডোজারের নিচে কোনো মানুষের স্বপ্ন চাপা পড়বে না; যেখানে রাষ্ট্র দুর্বলকে রক্ষা করবে, প্রান্তিককে মর্যাদা দেবে এবং সংবিধানের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেবে।
মনে রাখতে হবে—বাসস্থান শুধু ইট-পাথরের একটি ঘর নয়; এটি একটি পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই কোনো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের আগে মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক, সাংবিধানিক এবং মানবিক দায়িত্ব।
উন্নয়ন অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, মানুষের বিরুদ্ধে নয়। “আগে পুনর্বাসন, পরে প্রয়োজনে স্থানান্তর”—এই নীতিই হোক একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 


















