একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো শুধু তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলেই যথেষ্ট।
একই মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের যদি ছোটবেলা থেকেই আলাদা আলাদা জগতে বড় করা হয়, যদি তাদের কেউ শেখে একটি বাংলাদেশ, কেউ আরেকটি বাংলাদেশ; যদি তাদের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, স্বপ্ন ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি করা হয়—তাহলে একদিন একই পতাকার নিচে দাঁড়িয়েও তারা পরস্পরের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা মাধ্যম আছে, ইংরেজি মাধ্যম আছে, মাদ্রাসা শিক্ষা আছে, ক্যাডেট কলেজসহ নানা ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। শিক্ষার এই বহুত্ব নিজে কোনো সংকট নয়। বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতির অস্তিত্ব স্বাভাবিক।
কিন্তু সংকট শুরু হয় তখন, যখন শিক্ষার বৈচিত্র্য সুযোগের বৈষম্যে পরিণত হয়; যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক শ্রেণির দুর্গে পরিণত হয়; যখন ভিন্ন শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীরা একে অন্যকে মানুষ হিসেবে নয়, পরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে শেখে।
তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি ভিন্ন ভিন্ন বাংলাদেশ তৈরি করছি?
শিক্ষা কি মানুষকে কাছে আনছে, নাকি দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?
শিক্ষার সবচেয়ে বড় কাজ কী?
শুধু চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি করা?
শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানো?
শুধু একটি সনদ দেওয়া?
না। শিক্ষার সবচেয়ে বড় কাজ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা—যাতে সে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে, সত্য অনুসন্ধান করতে পারে, ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে পারে এবং নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে পারে।
কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, একই রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা ক্রমেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠছে।
একজন শিশু হয়তো শহরের নামী প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তি, ভাষা, বিজ্ঞান ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে একই বয়সের আরেক শিশু হয়তো একটি প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি কিংবা খেলাধুলার সুযোগের অভাবে বড় হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমে বিশ্বকে জানছে, অন্যজন পরীক্ষার গাইড ও নোট মুখস্থ করছে।
একজন আধুনিক আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, অন্যজন ভালো একটি শ্রেণিকক্ষের জন্য অপেক্ষা করছে।
এ বৈষম্য শুধু শিক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান, পেশাগত সুযোগ এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে তার ধারণাকেও প্রভাবিত করে।
বাংলা মাধ্যম: সংখ্যাগরিষ্ঠের শিক্ষা, কিন্তু কেন এত বৈষম্য?
বাংলা মাধ্যম বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল স্রোত। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সন্তান এই ধারায় শিক্ষা গ্রহণ করে।
এই ব্যবস্থার মধ্যেই অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সফল মানুষ তৈরি হয়েছেন। তাই বাংলা মাধ্যমকে ব্যর্থ বা অকার্যকর বলে এক কথায় বিচার করা অন্যায়।
তবে সমস্যাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অনেক বিদ্যালয়ে এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোথাও বিজ্ঞানাগার নেই, কোথাও লাইব্রেরি নেই, কোথাও পর্যাপ্ত প্রযুক্তি নেই। আবার অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনে ইংরেজি ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা, দলগত কাজ কিংবা সমস্যা সমাধানের সুযোগ খুব কম পায়।
ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আমরা শিশুকে বলি—‘ভালো করে পড়ো, মানুষ হও।’
কিন্তু তাকে এমন শিক্ষা দিই, যেখানে প্রশ্নের চেয়ে উত্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বোঝার চেয়ে মুখস্থ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সৃজনশীলতার চেয়ে পরীক্ষার নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে শিক্ষা মানুষকে স্বাধীন চিন্তার নাগরিকের বদলে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে।
ইংরেজি মাধ্যম: বিশ্বজ্ঞান অর্জনের সুযোগ, কিন্তু শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
ইংরেজি মাধ্যমকে নিয়েও আমাদের সমাজে এক ধরনের দ্বৈত মনোভাব রয়েছে। একদিকে অনেকে এটিকে ‘উচ্চবিত্তের শিক্ষা’ হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে অনেক পরিবার মনে করে ইংরেজি মাধ্যমই তাদের সন্তানের আন্তর্জাতিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভালো পথ।
বাস্তবতা হলো, ইংরেজি জানা কোনো অপরাধ নয়; বরং বিশ্বজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষার জন্য এটি বড় সম্পদ।
সমস্যা ভাষায় নয়—ভাষাকে সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক বানানোতে।
যদি কোনো শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাবলীল হওয়ার কারণে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, যদি বাংলা ভাষায় কথা বলাকে কম মর্যাদার মনে করা হয়, যদি বাংলাদেশের সাহিত্য, ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন তার কাছে অপরিচিত হয়ে থাকে—তাহলে তার শিক্ষা যত আন্তর্জাতিকই হোক, নাগরিক ভিত্তিটি দুর্বল থেকে যেতে পারে।
আমাদের এমন বিশ্বনাগরিক প্রয়োজন, যে নিউইয়র্ক, লন্ডন কিংবা টোকিওর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ রাখতে পারে, কিন্তু নিজের গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, কারিগর ও সাধারণ মানুষের জীবনকেও বুঝতে পারে।
বিশ্বকে জানার জন্য শিকড় কেটে ফেলতে হয় না।
মাদ্রাসা শিক্ষা: ধর্মের শিক্ষা নয়, বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন
মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দুটি বিপরীত চরম অবস্থানে চলে যাই।
এক পক্ষ মাদ্রাসাকে সন্দেহের চোখে দেখে। অন্য পক্ষ মনে করে মাদ্রাসার সমালোচনা মানেই ধর্মের সমালোচনা।
দুটিই ভুল।
ধর্মীয় শিক্ষা একটি সমাজের বাস্তবতা এবং বহু পরিবারের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মসংযম ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো—ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রযুক্তি, যুক্তিবোধ ও নাগরিক শিক্ষার সমন্বয় কতটা হচ্ছে?
একজন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী যদি ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, ইংরেজি, বাংলা, সংবিধান, মানবাধিকার ও সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করে, তাহলে সে কেন পিছিয়ে থাকবে?
বরং রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে মূলধারার নাগরিক ও কর্মক্ষেত্রের সমান সুযোগ দেওয়া।
একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার নামে যদি অন্য ধর্ম, মত, সংস্কৃতি বা জীবনধারার প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়, সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে; কিন্তু নাগরিক অধিকার সবার।
ক্যাডেট কলেজ: উৎকর্ষ থাকবে, কিন্তু সেই উৎকর্ষ কি সবার অধিকার নয়?
ক্যাডেট কলেজ ও অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, খেলাধুলা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য পরিচিত।
এসব প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—তাদের সাফল্যের পদ্ধতিগুলো কেন দেশের অন্যান্য বিদ্যালয়ে আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হবে না?
একটি শিশু যদি ভালো শিক্ষক, উন্নত আবাসন, খেলাধুলা, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও প্রযুক্তির সুযোগ পেয়ে উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে, তাহলে সাধারণ বিদ্যালয়ের শিশুও কেন একই ধরনের সুযোগ পাবে না?
বিশেষ প্রতিষ্ঠান থাকা সমস্যা নয়; বিশেষ সুযোগকে সীমিত শ্রেণির মধ্যে আটকে রাখা সমস্যার।
শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু শৃঙ্খলা যেন অন্ধ আনুগত্য না হয়।
নেতৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব যেন সাধারণ মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি না করে।
দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এমন হতে হবে, যারা আদেশ দিতে জানে—কিন্তু মানুষের কথা শুনতেও জানে।
আসল সংকট: আমরা কি চার ধরনের অহংকার তৈরি করছি?
সমস্যাটি শিক্ষাপদ্ধতির চেয়েও গভীর।
একটি বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চার ধরনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করতে পারে।
বাংলা মাধ্যমের কেউ ভাবতে পারে—‘আমরাই প্রকৃত বাংলাদেশ।’
ইংরেজি মাধ্যমের কেউ ভাবতে পারে—‘আমরাই আধুনিক ও যোগ্য।’
মাদ্রাসার কেউ ভাবতে পারে—‘আমরাই নৈতিক ও সঠিক।’
বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কেউ ভাবতে পারে—‘আমরাই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য।’
অবশ্যই প্রত্যেক শিক্ষার্থী এমন হবে না। অধিকাংশ মানুষই উদার ও সহনশীল। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো যদি এই ধরনের বিভাজনকে উৎসাহিত করে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
ফলে মানুষ অন্য মানুষকে তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে নয়, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভাষা, পোশাক, ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করতে শুরু করে।
এটাই বিপজ্জনক।
ইতিহাসের পাঠ: সত্য, নাকি রাজনৈতিক স্মৃতি?
একটি জাতির জন্য ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়। ইতিহাস তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস। কিন্তু এই ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
একইভাবে দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস, গণআন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দলিলভিত্তিক ও বহুমাত্রিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
একটি শিশুকে যদি শেখানো হয়—ইতিহাস মানে শুধু আমাদের পক্ষের গল্প, তাহলে সে ইতিহাস শিখছে না; সে পক্ষপাত শিখছে।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি পাঠ্যবইয়ে অতীতের মূল্যায়ন বারবার বদলে যায়, তাহলে শিশুর মনে একটি ভয়ংকর প্রশ্ন জন্মায়—
‘সত্য কি তাহলে ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যায়?’
রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক শিক্ষা খুব কমই আছে।
ইতিহাসে কারও অবদান থাকলে তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কারও ভুল থাকলে তা বলতে হবে। কোনো ঘটনাকে ভালোভাবে বুঝতে হলে তার পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন দলিল ও ব্যাখ্যা দেখতে হবে।
কারণ জাতীয় স্মৃতি যত নিরপেক্ষ হবে, জাতীয় পরিচয় তত শক্তিশালী হবে।
১৯৭১ ও ২০২৪—ইতিহাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সামনে সাম্প্রতিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে সমাজে নানা ব্যাখ্যা, আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এসব ঘটনাকে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, গবেষণা ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তুলে ধরা প্রয়োজন।
নতুন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা পুরোনো ইতিহাসকে মুছে দেয় না।
২০২৪ যদি ইতিহাস হয়, তাহলে ১৯৭১ তার আগে থাকা ইতিহাস। একটি অধ্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অধ্যায়কে ধ্বংস করা ইতিহাসচর্চা নয়।
পরিণত জাতি তার ইতিহাসের সঙ্গে তর্ক করে, ইতিহাস মুছে ফেলে না।
তাহলে করণীয় কী?
সমাধান সব শিক্ষাধারা বিলুপ্ত করে একটি একরৈখিক শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা নয়।
বরং প্রয়োজন—বিভিন্ন শিক্ষাধারার মধ্যে একটি অভিন্ন নাগরিক ভিত্তি তৈরি করা।
প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে—
প্রথমত, বাংলা ভাষায় দক্ষতা।
দ্বিতীয়ত, কার্যকর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা।
তৃতীয়ত, গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দৃঢ় ভিত্তি।
চতুর্থত, যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা।
ষষ্ঠত, দলিলভিত্তিক জাতীয় ইতিহাস।
সপ্তমত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান।
অষ্টমত, পরিবেশ, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিকতার শিক্ষা।
শিক্ষাধারা আলাদা থাকতে পারে; কিন্তু নাগরিক ভিত্তি অভিন্ন হওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের পরস্পরের কাছে আনতে হবে
শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
বিভিন্ন শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে।
একটি জাতীয় বিজ্ঞান উৎসবে বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তারা একই দলে খেলতে পারে।
একটি সামাজিক সেবামূলক কর্মসূচিতে তারা একই গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে পারে।
একটি ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনে তারা একই গাইডের কাছ থেকে ইতিহাস শুনতে পারে।
একটি বিতর্কে তারা ভিন্ন মত প্রকাশ করতে পারে—কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাববে না।
কারণ সহনশীলতা শুধু বইয়ে লেখা যায় না; সহনশীলতা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ভবন নয়, শিশু
আমরা অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করি। রাস্তা, সেতু, ভবন, প্রকল্প—সবই প্রয়োজন।
কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো তার মানুষ।
আজকের শিশু আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, বিচারক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, রাজনীতিক ও নাগরিক।
তাই শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে বিনিয়োগ।
একটি বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষক নেই, কিন্তু পাশেই একটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সুবিধা আছে—এই বৈষম্য দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—শিক্ষার সুযোগের সমতা; ফলাফলের কৃত্রিম সমতা নয়।
সব শিশু একই ফল করবে না। কিন্তু সব শিশুর ভালো শিক্ষা পাওয়ার অধিকার সমান হতে হবে।
শেষ কথা: চার শিক্ষাধারা থাকতে পারে, চার বাংলাদেশ নয়
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য থাকবে। কেউ বাংলা মাধ্যমে পড়বে, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে, কেউ মাদ্রাসায়, কেউ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে।
কিন্তু তাদের সবার একটি সাধারণ পরিচয় থাকতে হবে—
আমি বাংলাদেশের নাগরিক।
তাদের সবার জানতে হবে—ভিন্ন মত মানেই শত্রু নয়।
ভিন্ন ধর্ম মানেই দূরত্ব নয়।
ভিন্ন ভাষা মানেই শ্রেষ্ঠত্ব নয়।
ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই ভিন্ন মানুষ নয়।
আমরা যদি আমাদের শিশুদের এমনভাবে বড় করি যে তারা একে অপরের প্রতি সন্দেহ, অবজ্ঞা ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ নিয়ে বড় হয়, তাহলে একদিন হয়তো আমাদের কাছে উন্নত ভবন থাকবে, বড় বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, অসংখ্য সনদ থাকবে, প্রযুক্তিতে অগ্রগতি থাকবে—কিন্তু থাকবে না পারস্পরিক আস্থা।
আর পারস্পরিক আস্থা ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকতে পারে না।
রাষ্ট্রের নীরব আত্মহত্যা তখন যুদ্ধক্ষেত্রে হবে না।
হবে শ্রেণিকক্ষে।
হবে পাঠ্যবইয়ের পাতায়।
হবে শিশুর মনে তৈরি হওয়া অদৃশ্য দেয়ালে।
তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—
আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা শিশুদের শুধু সফল করবে; নাকি এমন শিক্ষা চাই, যা তাদের মানুষ করবে এবং একই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে শেখাবে?
আমাদের উত্তরটি পরিষ্কার হওয়া উচিত।
চার শিক্ষাধারা থাকতে পারে।
চার ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি থাকতে পারে।
চার ধরনের পাঠ্যক্রমও থাকতে পারে।
কিন্তু—
চার বাংলাদেশ থাকতে পারে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার ঠিকানা এক।
আমাদের পতাকা এক।
আমাদের ভবিষ্যৎও এক।
সেই ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার প্রথম দায়িত্ব—শিক্ষাকে বিভাজনের দেয়াল নয়, জাতীয় ঐক্যের সেতুতে পরিণত করা।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 














