বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গন বহুবার উত্তাল ঝড় দেখেছে—সেই ঝড়ের মাঝে কখনো রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা থমকে গেছে, কখনো মানুষ আশার আলো খুঁজতে থেকেছে। ঠিক সেই অস্থিরতার পটভূমিতেই, সমুদ্রের তেজি ঢেউ ভেদ করে নাবিক যেমন পথহারা নৌকাকে তীরে পৌঁছে দেয়, তেমনি দৃঢ়তা, ধৈর্য ও অবিচল সাহসের প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর আগমন ছিল ইতিহাসের প্রয়োজন, সময়ের দাবি, আর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন মোড়।
তিনি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক চরিত্র নন—তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণের অনন্য উদাহরণ। শোকের ছায়া মাড়িয়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার যে মানসিক শক্তি তিনি দেখিয়েছেন, তা কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়; এটি ছিল অভূতপূর্ব মানবিক সাহসের প্রকাশ। দল, কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের যে আস্থা তাঁর প্রতি ছিল, তা তাঁকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে বারবার, প্রতি মুহূর্তে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন ছিল এক ধারাবাহিক অধ্যায়—উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অধ্যায়। তিনবার দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়; নেতৃত্ব মানে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা এবং সময়ের প্রয়োজনে বিচক্ষণতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা ও দৃঢ় ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে, আর সেই স্থানটি তিনি এখনো ধরে রেখেছেন। আজও তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন হিসেবে জনগণের কাছে এক অটল আশার নাম।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনের নির্লোভ অধ্যায় তাঁকে শুধু রাজনৈতিক নেত্রী নয়—নৈতিকতার অবিচল প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ক্ষমতা তাঁর কাছে ছিল দায়িত্ব, প্রতিহিংসা তাঁর কাছে ছিল অগ্রহণযোগ্য, আর গণতন্ত্র তাঁর কাছে ছিল মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার মূলভিত্তি। সেই জন্যই মানুষ তাঁকে দিয়েছে ‘গণতন্ত্রের মা’ উপাধি একটি উপাধি যেটি অর্জিত হয়েছে সংগ্রাম, নিবেদন ও ত্যাগ দিয়ে, কথায় নয়।
তবুও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা ছিল না মসৃণ কিংবা স্বস্তির। প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কঠোরতা ও প্রতিহিংসার কারণে তিনি বহু বছর জটিল আইনি প্রক্রিয়া ও কারাবাসের ভেতর দিয়ে গেছেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও চিকিত্সার বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক এবং শারীরিক জটিলতা তাঁর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। তাঁর চিকিৎসা ও বিদেশে নেয়া নিয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তখন মানবিকতার প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবুও তিনি ছিলেন শান্ত, ধৈর্যশীল, ভয়-ভীতি বা প্রতিকূলতা কোনো কিছুই তাঁকে নত করেনি।
আজ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘ সংগ্রামের ক্লান্তিতে তাঁর শরীর হয়তো দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু তাঁর মনোবল, তাঁর বিশ্বাস এখনও অটুট, দৃঢ়, অচঞ্চল। যে নারী জীবনের প্রতিটি বাঁকে সংগ্রামকে সঙ্গী করেছেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, সেই নারী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, এটাই আজ এই জাতির নিঃশব্দ প্রার্থনা, হৃদয়ের গভীর আকুতি।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকথা কেবল একটি নামের ইতিহাস নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের এক অনন্য উপাখ্যান। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ, সমর্পণ, সাহস, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের সাধনার এক স্থায়ী স্মারক। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী চাইলে শুধু পরিবার নয়, সমগ্র জাতিকেও পথ দেখাতে পারে, শুধু নেতৃত্ব নয়—একটি আদর্শের প্রতীকেও রূপ নিতে পারে।
বাংলার ইতিহাসের পাতায় তাই তাঁর নাম থাকবে অবিচল—সংগ্রামের শিখায় উজ্জ্বল, সততার দীপ্তিতে দীপ্যমান, এবং গণতন্ত্রের যাত্রাপথে এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে। বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও প্যাগোডাতে প্রার্থনা শেষে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাত করা হচ্ছে তাঁর জন্য।
সারাক্ষণ ডেস্ক 














