ঢাকা ০৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
মাদারীপুরের রাজৈরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা। ১৫০০ কোটিতে “নগদ” বিক্রি, ক্রেতা আবুল খায়ের। কক্সবাজার আয়কর অফিসের সাবেক প্রধান সহকারী মোঃ ছাবের আহমদের দাফন সম্পন্ন। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও আমু’র মুক্তির দাবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে পোস্টারিং। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অসহায় পরিবারকে ১০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান।। পঞ্চগড়ের কৃতী সন্তান খুকৃবি শিক্ষার্থী মারুফের বিস্ময়কর উদ্ভাবন : CGPA Tracker App  বিআইডব্লিউটিএর আরিফ উদ্দিনের অবৈধ সিন্ডিকেট, হাজার কোটি টাকার লুটপাটের মহোৎসব। অবৈধ দখল-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র। আদিতমারীতে নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ, এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য। আমতলীতে এতিম মাদরাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, পাষণ্ড খালু গ্রেপ্তার। বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত। নিহতের চারজন একই পরিবারের।

মাদারীপুরে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, নেপথ্যে পরকিয়াসহ প্রবাস জীবনই দায়ী!

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • ১১৫ জন সংবাদটি পড়েছেন

মাদারীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। বিশেষ করে প্রবাসজীবনের দূরত্ব, পরকীয়া, বাল্যবিবাহ ও দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থাহীনতা—এসব কারণকে সামনে এনে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। এতে করে সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে দেখা দিচ্ছে অস্থিরতা।

অনেকের অভিমত, দীর্ঘ প্রবাস জীবন, পরকিয়া ,নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতি নৈতিকতার অধঃপতন, আকাশ সংস্কৃতির প্রসার পারিবারিক কলহ, পারস্পারিক অবিশ্বাস,বিনা কারণে সন্দেহ প্রভৃতি কারণে জেলায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদারীপুরে মোট ৮ হাজার ১০৬টি বিয়ে হয়েছে।

এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৫২১টি, যা মোট বিয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি—২০২৪ সালে ৪৬.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৪.৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪৩.৮ শতাংশ ছিল।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলায় বিয়ে হয়েছে ২ হাজার ২২৬টি এবং বিচ্ছেদ হয়েছে ২ হাজার ১৭৭টি—যেখানে ব্যবধান মাত্র ৪৯টি। শিবচরে বিয়ে ২ হাজার ৪৩১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ২৩৭টি; কালকিনিতে বিয়ে ১ হাজার ৮২৮টি, বিচ্ছেদ ৯২১টি এবং রাজৈরে বিয়ে ১ হাজার ৬২১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ৯৬টি।

বিশেষ করে সদর ও প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই বিচ্ছেদের হার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসে অবস্থানের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এ সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়ায়।

কালকিনি উপজেলার এক প্রবাসী বলেন, বিদেশে থাকার কারণে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। দেশে ফিরে জানতে পারি, সে অন্য সম্পর্কে জড়িয়েছে। এরপর বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

রাজৈর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও রাজৈর পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি এফ আর মামুন  বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে বলেন,বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদেশ গমন,নীতি নৈতিকতার অধঃপতন , নারী স্বাধীনতার অপব্যবহারের কারণে মাদারীপুরে দিন দিন পরকিয়া বাড়ছে। এরজন্যই এ অঞ্চলে বিবাহ বিচ্ছেদ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।

শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক নকুল চন্দ্র বৈরাগী বলেন, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ, নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আকাশ সংস্কৃতির প্রসারের কারণে পারিবারিক কলহের জের ধরে মাদারীপুরে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ার অন্যতম কারণ।

মাদারীপুর সদর উপজেলার আরেক প্রবাসী করিম বলে0ন, আমি বিদেশে থেকে কষ্ট করে উপার্জিত টাকা স্ত্রীর কাছে পাঠাতাম। কয়েক বছর পর জানতে পারি, সে সব নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই তার স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি সামনে আসে, যা তাদের সংসার ভাঙনের কারণ হয়।

বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা জাহিদ আলম বলেন, প্রবাসী পরিবারের মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। দূরত্বের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল তৈরি হয়, আর পরকীয়া সেই ফাটলকে আরও গভীর করে।

মাদারীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেল বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি অধিকার হলেও এর ক্রমবর্ধমান হার সমাজের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোতে এই প্রবণতা বাড়ছে, যা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ম্যারেজ ও ডিভোর্স কনসালটেন্ট আলমগীর হোসেন জানান, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে ও বেকারত্বও বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। ‘অপরিপক্ব দম্পতিরা দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে না, ফলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে,’ বলেন তিনি।

জেলা রেজিস্ট্রার আমির হামজা বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ায় মাদারীপুরে বিচ্ছেদের হার বেশি। পরকীয়া এখন একটি বড় সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক সংসার ভাঙার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে।

এদিকে বিবাহ তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা আলী হোসেন জানান, শহর ও প্রবাসপ্রবণ এলাকাগুলোতে পরকীয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং বিচ্ছেদের ঘটনাও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী পরিবারে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদারীপুরের রাজৈরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা।

মাদারীপুরে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, নেপথ্যে পরকিয়াসহ প্রবাস জীবনই দায়ী!

আপডেট সময় : ১১:০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

মাদারীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা। বিশেষ করে প্রবাসজীবনের দূরত্ব, পরকীয়া, বাল্যবিবাহ ও দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থাহীনতা—এসব কারণকে সামনে এনে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। এতে করে সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে দেখা দিচ্ছে অস্থিরতা।

অনেকের অভিমত, দীর্ঘ প্রবাস জীবন, পরকিয়া ,নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতি নৈতিকতার অধঃপতন, আকাশ সংস্কৃতির প্রসার পারিবারিক কলহ, পারস্পারিক অবিশ্বাস,বিনা কারণে সন্দেহ প্রভৃতি কারণে জেলায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদারীপুরে মোট ৮ হাজার ১০৬টি বিয়ে হয়েছে।

এর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৫২১টি, যা মোট বিয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি—২০২৪ সালে ৪৬.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৪.৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪৩.৮ শতাংশ ছিল।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলায় বিয়ে হয়েছে ২ হাজার ২২৬টি এবং বিচ্ছেদ হয়েছে ২ হাজার ১৭৭টি—যেখানে ব্যবধান মাত্র ৪৯টি। শিবচরে বিয়ে ২ হাজার ৪৩১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ২৩৭টি; কালকিনিতে বিয়ে ১ হাজার ৮২৮টি, বিচ্ছেদ ৯২১টি এবং রাজৈরে বিয়ে ১ হাজার ৬২১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ৯৬টি।

বিশেষ করে সদর ও প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই বিচ্ছেদের হার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসে অবস্থানের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এ সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়ায়।

কালকিনি উপজেলার এক প্রবাসী বলেন, বিদেশে থাকার কারণে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। দেশে ফিরে জানতে পারি, সে অন্য সম্পর্কে জড়িয়েছে। এরপর বিচ্ছেদ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

রাজৈর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও রাজৈর পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি এফ আর মামুন  বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে বলেন,বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদেশ গমন,নীতি নৈতিকতার অধঃপতন , নারী স্বাধীনতার অপব্যবহারের কারণে মাদারীপুরে দিন দিন পরকিয়া বাড়ছে। এরজন্যই এ অঞ্চলে বিবাহ বিচ্ছেদ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।

শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক নকুল চন্দ্র বৈরাগী বলেন, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ, নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আকাশ সংস্কৃতির প্রসারের কারণে পারিবারিক কলহের জের ধরে মাদারীপুরে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ার অন্যতম কারণ।

মাদারীপুর সদর উপজেলার আরেক প্রবাসী করিম বলে0ন, আমি বিদেশে থেকে কষ্ট করে উপার্জিত টাকা স্ত্রীর কাছে পাঠাতাম। কয়েক বছর পর জানতে পারি, সে সব নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই তার স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি সামনে আসে, যা তাদের সংসার ভাঙনের কারণ হয়।

বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা জাহিদ আলম বলেন, প্রবাসী পরিবারের মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। দূরত্বের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল তৈরি হয়, আর পরকীয়া সেই ফাটলকে আরও গভীর করে।

মাদারীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেল বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি অধিকার হলেও এর ক্রমবর্ধমান হার সমাজের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোতে এই প্রবণতা বাড়ছে, যা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ম্যারেজ ও ডিভোর্স কনসালটেন্ট আলমগীর হোসেন জানান, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে ও বেকারত্বও বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। ‘অপরিপক্ব দম্পতিরা দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে না, ফলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে,’ বলেন তিনি।

জেলা রেজিস্ট্রার আমির হামজা বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ায় মাদারীপুরে বিচ্ছেদের হার বেশি। পরকীয়া এখন একটি বড় সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক সংসার ভাঙার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে।

এদিকে বিবাহ তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা আলী হোসেন জানান, শহর ও প্রবাসপ্রবণ এলাকাগুলোতে পরকীয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং বিচ্ছেদের ঘটনাও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী পরিবারে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।