প্রায় এক বছর পলাতক থাকার পর আবার ঝালকাঠিতে ফিরে এসেছে ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর ও পৌর আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনু। তিনি ঝালকাঠি পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত থেকে ১৭ বছর এলাকায় হেন কোন অপরাধ নেই যা করেন নি। জর্দা ব্যবসার পাশাপাশি তিনি এলাকায় ইয়াবা ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচন ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন।
তার অফিস থেকে ৩ হাজার ৯ শত পিচ ইয়াবা উদ্ধার:
বরিশালের মাদক কর্মকর্তাদের সুত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে একবার তার ফ্যক্টরীর অফিস রুম থেকে ১৩ প্যাকেটে ৩ হাজার ৯ শত পিচ ইয়াবা উদ্ধার করেন মাদক কর্মকর্তারা।
বরিশালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এনায়েত হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বরিশাল থেকে রাশেদ নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। তার তথ্যের ভিত্তিতে ঝালকাঠিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আমরা অভিযান পরিচালনা করে ঝালকাঠির সড়ক ও জনপথ বিভাগের অফিসের একটু উত্তর পাশে আদি শাহী ৯৯ জর্দা কোম্পানির কারখানার ভিতরে অভিযান চালিয়ে বেলায়েতকে ৩ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা সহ আটক করি। আটককৃত মাদক ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয় । কিন্তু ওই মামলায় তিনি আসামী বা গ্রেফতার হননি। ২৫/৩০ লাখ টাকা ঘুস দিয়ে বেঁচে যান।
নারী শ্রমিককে ধর্ষণ:
এ ছাড়া ২০২৬ মালের ৫ জানুয়ারি ঝালকাঠি নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে একজন নারী শ্রমিককে ধর্ষণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। সেই মামলা তিনি মোটা অংকের টাকায় জীবন্ত কবর দেন। মামলার নালিশিতে ভুক্তভোগী জানান, আসামি মনু মিয়া আদি সাবিহা কেমিক্যাল ওয়ার্কস শাহী ৯৯ নামে একটি জর্দা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই কোম্পানিতে মনু মিয়ার বিশ্বস্থ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ হোসেন।
ফরিদ হোসেন তাঁকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে এক দিন মনু মিয়ার কাছে নিয়ে যান। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ফরিদ তাঁকে কারখানায় আসতে বলেন। তিনি সেখানে এলে ফরিদ তাঁকে মনু মিয়ার রুম পরিষ্কার করতে বলে সেখান থেকে চলে যান।
এ সময় মনু মিয়া তাঁকে ধর্ষণ করেন। পরে সেখানে চাকরি করার সুবাধে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় গর্ভের সন্তানকে বৈধতা দিতে মনু মিয়ার পরামর্শে ফরিদ ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে বিয়ে করেন।
গত বছরের ১৫ জুলাই তাঁর একটি মেয়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর ফরিদ তাঁকে তালাক দেন। এ ঘটনায় সাক্ষীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গত ২ ডিসেম্বর মামলা করতে থানায় গেলে তাঁকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি আওয়ামী লীগের ডোনার:
তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আমির হোসেন আমু ও ঝালকাঠি আওয়ামী লীগের একজন বড় ডোনার ছিলেন। এখন এলাকায় ফিরে এসে আবার আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনু’র বিরুদ্ধে ঝালকাঠিতে অবৈধ ট্রেডমার্ক ব্যবহার করে জর্দা তৈরির মামলা রয়েছে।
সাম্প্রতিক অপতৎপরতা:
এলাকাবাসী সুত্রে আরো জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা সুচতুর শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনু ৫ আগষ্ট ২০২৪ এর পটপরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে যান। এ সময় তিনি ব্যাংকক,থাইল্যন্ড,কানাডা, সিংগাপুর সহ বেশ কয়েকটি দেশে পালিয়ে ছিলেন।
সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন এবং ঝালকাঠিতে অবস্থান করছেন। ফ্যাসিবাদের অন্যতম ডোনার হয়েও কার সাথে আঁতাত করে বা কোন যাদুবলে তিনি ঝালকাঠিতে ফিরে এসেছেন তা কারো বোধগম্য হচ্ছে না।
২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর এলাকাবাসী আশা করেছিলেন যে, শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনু এবার বুঝি গ্রেফতার হবেন বা যতাযথ শাস্তি পাবেন। কিন্তু হয়েছে তার উল্টোটা।
ফ্যাসিবাদমুক্ত সময়ে অর্থাত বিগত অন্তরবর্তী সরকার আমলে তার লোমটিও স্পর্শ করতে পারেনি সেনাবাহিনী বা পুলিশ।
সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দেশ ক্ষমতায় আসার পরও শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনুর কোন সমস্যা হয়নি। তিনি বিনা বাঁধায় ঝালকাঠিতে অবস্থান করে আবার তার জর্দা ও মাদক ( ইয়াবা) বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এই তথ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে একাধিক সুত্রের দাবী, ফ্যাসিবাদের দোসর শামসুল হক মনু ওরফে জর্দা মনু কয়েক কোটি টাকা খরচ করে তবেই ঝলিকাঠিতে ফিরে এসেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শাসক দলের কয়েকজন নেতার সাথে আঁতাত করেছেন। ফলে তিনি ঝালকাঠিতে অবস্থান করলেও বিএনপি’র কোন নেতা টু শব্দটিও করেন নি।
এ বিষয়ে এলাকাবাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই,এনএসআই ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















