ঢাকা ১০:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ। ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা? ১৫ আগস্ট: গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া। হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ৭ মাসে ৪৫২ জন আটক, খুশি সচেতন মহল। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। যশোরের বাঘারপাড়ায় পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ গ্রাম। রূপগঞ্জে দেবরের হামলায় ভাবী নিহত গ্রেফতার ৩। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পেলেন ইউপি সদস্য। ১৭ দেশে ২৫ বার ভ্রমণ, ১৭ বছর পেকুতে—গণপূর্ত প্রকৌশলী কাজী ফিরোজকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়।

যে নারী নিজের ঘর গড়েননি, গড়েছেন একটি বিদ্যালয়: কুমারী রেখা রানী ওঝার স্বপ্ন কি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে না?

 

একটি বাড়ি মানুষের আশ্রয় দেয়, আর একটি বিদ্যালয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেন নিজের ঘর, নিজের পরিবার ও নিজের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের জীবনকে অতিক্রম করে সমাজের জন্য বেঁচে থাকেন। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামের কুমারী রেখা রানী ওঝা তাঁদেরই একজন।

পেশায় একজন নার্স। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি সঞ্চিত টাকা তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যয় করেননি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন—একজন শিক্ষিত মেয়ে মানে একটি শিক্ষিত পরিবার, একটি আলোকিত সমাজ এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল।

আজ সেই বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। প্রত্যন্ত গ্রামের বহু কন্যাশিশু এই বিদ্যালয়ে এসে শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জন করছে না; তারা স্বপ্ন দেখতে শিখছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে এবং জীবনের নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছে। অথচ এই আলোর প্রদীপটি জ্বালাতে যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁর নিজের মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী বসতবাড়িও নেই। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই বাণীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি—”আপনাকে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনীপরে।”

আজকের সমাজে যেখানে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ব্যস্ত, সেখানে রেখা রানী ওঝা নিঃস্বার্থ মানবসেবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি বড় হৃদয় এবং অটল সংকল্প।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত বড় আত্মত্যাগের ফসল কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল এখনও এমপিওভুক্ত নয়। শিক্ষক-কর্মচারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন, বিদ্যালয়ের আর্থিক স্থায়িত্বও প্রশ্নের মুখে। অথচ একটি এমপিওভুক্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, শিক্ষকদের মর্যাদা এবং একজন মহীয়সী নারীর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

বাংলাদেশ নারী শিক্ষায় বিশ্বে প্রশংসিত। এই সাফল্যের পেছনে শুধু সরকারের নীতি নয়, রেখা রানী ওঝার মতো হাজারো নীরব যোদ্ধার অবদানও রয়েছে। তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মানিত করা নয়; এটি সমাজকে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া—ত্যাগ, সততা ও মানবিকতার মূল্য এই রাষ্ট্র দিতে জানে।

আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এমপিও সংক্রান্ত দায়িত্বশীলদের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানাই—কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল-এর সব শর্ত ও যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করে দ্রুত এমপিওভুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করুন। কারণ এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়; এটি একটি জনপদের কন্যাশিশুদের ভবিষ্যতের জন্য, নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রার জন্য এবং মানবিক বাংলাদেশের জন্য।

একজন রেখা রানী ওঝা বারবার জন্ম নেন না। এমন মানুষদের জীবদ্দশায় সম্মান জানাতে পারলে সেটিই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মহত্ত্ব। অন্যথায় ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—যে নারী নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না, সমাজের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিলেন, আমরা তাঁর জন্য কী রেখে গেলাম?

আসুন, আমরা সবাই এই মহীয়সী নারীর স্বপ্নের পাশে দাঁড়াই। একটি বিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখি, একটি জনপদকে আলোকিত করি এবং আগামী প্রজন্মকে জানিয়ে দিই—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার সৃষ্টি; তার ভোগ নয়, তার ত্যাগ।

কুমারী রেখা রানী ওঝার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক। কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল এমপিওভুক্ত হোক। নারী শিক্ষার এই আলোকবর্তিকা আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠুক সমগ্র বাংলাদেশে।

এই নিবন্ধটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় ভাষাশৈলী অনুসরণ করে রচিত। চাইলে এতে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ, শিক্ষানীতি ২০১০ এবং নারী শিক্ষার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের আলোকে আরও শক্তিশালী আইনি ও নীতিগত বিশ্লেষণও যুক্ত করে দিতে পারি।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ।

যে নারী নিজের ঘর গড়েননি, গড়েছেন একটি বিদ্যালয়: কুমারী রেখা রানী ওঝার স্বপ্ন কি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে না?

আপডেট সময় : ০৫:৩২:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

 

একটি বাড়ি মানুষের আশ্রয় দেয়, আর একটি বিদ্যালয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেন নিজের ঘর, নিজের পরিবার ও নিজের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের জীবনকে অতিক্রম করে সমাজের জন্য বেঁচে থাকেন। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামের কুমারী রেখা রানী ওঝা তাঁদেরই একজন।

পেশায় একজন নার্স। দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি সঞ্চিত টাকা তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যয় করেননি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন—একজন শিক্ষিত মেয়ে মানে একটি শিক্ষিত পরিবার, একটি আলোকিত সমাজ এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল।

আজ সেই বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। প্রত্যন্ত গ্রামের বহু কন্যাশিশু এই বিদ্যালয়ে এসে শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জন করছে না; তারা স্বপ্ন দেখতে শিখছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছে এবং জীবনের নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছে। অথচ এই আলোর প্রদীপটি জ্বালাতে যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁর নিজের মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী বসতবাড়িও নেই। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই বাণীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি—”আপনাকে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনীপরে।”

আজকের সমাজে যেখানে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ব্যস্ত, সেখানে রেখা রানী ওঝা নিঃস্বার্থ মানবসেবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি বড় হৃদয় এবং অটল সংকল্প।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এত বড় আত্মত্যাগের ফসল কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল এখনও এমপিওভুক্ত নয়। শিক্ষক-কর্মচারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন, বিদ্যালয়ের আর্থিক স্থায়িত্বও প্রশ্নের মুখে। অথচ একটি এমপিওভুক্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, শিক্ষকদের মর্যাদা এবং একজন মহীয়সী নারীর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

বাংলাদেশ নারী শিক্ষায় বিশ্বে প্রশংসিত। এই সাফল্যের পেছনে শুধু সরকারের নীতি নয়, রেখা রানী ওঝার মতো হাজারো নীরব যোদ্ধার অবদানও রয়েছে। তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মানিত করা নয়; এটি সমাজকে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া—ত্যাগ, সততা ও মানবিকতার মূল্য এই রাষ্ট্র দিতে জানে।

আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এমপিও সংক্রান্ত দায়িত্বশীলদের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানাই—কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল-এর সব শর্ত ও যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করে দ্রুত এমপিওভুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করুন। কারণ এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়; এটি একটি জনপদের কন্যাশিশুদের ভবিষ্যতের জন্য, নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রার জন্য এবং মানবিক বাংলাদেশের জন্য।

একজন রেখা রানী ওঝা বারবার জন্ম নেন না। এমন মানুষদের জীবদ্দশায় সম্মান জানাতে পারলে সেটিই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মহত্ত্ব। অন্যথায় ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—যে নারী নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না, সমাজের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিলেন, আমরা তাঁর জন্য কী রেখে গেলাম?

আসুন, আমরা সবাই এই মহীয়সী নারীর স্বপ্নের পাশে দাঁড়াই। একটি বিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখি, একটি জনপদকে আলোকিত করি এবং আগামী প্রজন্মকে জানিয়ে দিই—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার সৃষ্টি; তার ভোগ নয়, তার ত্যাগ।

কুমারী রেখা রানী ওঝার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক। কুমারী রেখা রানী গার্লস স্কুল এমপিওভুক্ত হোক। নারী শিক্ষার এই আলোকবর্তিকা আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠুক সমগ্র বাংলাদেশে।

এই নিবন্ধটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় ভাষাশৈলী অনুসরণ করে রচিত। চাইলে এতে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ, শিক্ষানীতি ২০১০ এবং নারী শিক্ষার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের আলোকে আরও শক্তিশালী আইনি ও নীতিগত বিশ্লেষণও যুক্ত করে দিতে পারি।