ঢাকা ০৬:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
খুলনায় মাদক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৯ মোহনা টিভির অনলাইন শাখায় পুনর্বিন্যাস: আটজনকে অব্যাহতি; বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকির অভিযোগ আহত পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমকে দেখতে হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সচিবালয় (মন্ত্রণালয়) স্থানান্তরের গল্প: ঢাকার বাস্তবতা….. কালিয়াকৈরে অবৈধ আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারী পুরুষ কর্তৃপক্ষ সহ ৩৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ প্রয়াত নন-পুলিশ সদস্যের পরিবারের পাশে কেএমপি, দুর্গাপূজার উপহার দিলেন পুলিশ কমিশনার গণপূর্ত অধিদপ্তরে ১১৬ প্রকৌশলীর  ‎বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ!  ‎ প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর: জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনে হুইপ বকুল পঞ্চগড়ে সদরে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নামে সার ডিলার নিয়োগের আদেশ বাতিল করে : ছোলায়মান আলীকে সার ডিলার নিয়োগের দাবী এলাকাবাসীর জাতীয়তাবাদী ব্যাটারী চালিত থ্রি-হুইলারযান শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন আবুল হাসান খান

হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ।

 

“শৈশব হলো জীবনের সেই স্বর্গ, যেখান থেকে একবার বেরিয়ে এলে আর কখনো ফিরে যাওয়া যায় না।”

মানুষের জীবনে শৈশব একটি অনন্য আশীর্বাদ। এই সময়ে থাকে না কোনো হিংসা, লোভ, প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিমতার বোঝা। থাকে শুধু নির্মল হাসি, সীমাহীন কৌতূহল, অফুরন্ত স্বপ্ন এবং ভালোবাসার উষ্ণ পরশ। কিন্তু সময়ের স্রোত কাউকে অপেক্ষা করে না। একদিন শিশুটি বড় হয়ে বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে প্রবেশ করে। তখন জীবনের হিসাব-নিকাশ, দায়িত্ব, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাকে ঘিরে ধরে। ফলে মানুষ প্রায়ই ফিরে তাকায় হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশবের দিকে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“ইস! যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম!”

হারানো শৈশবের স্মৃতি

একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশুদের রাজ্য। কাদামাটির গন্ধ, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ—এসবই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তখন সুখ কিনতে অর্থের প্রয়োজন হতো না; একটি বাঁশির সুর, একটি ঘুড়ি কিংবা একটি গল্পই ছিল অফুরন্ত আনন্দের উৎস।

আজ সেই মাঠের জায়গায় উঠেছে কংক্রিটের অট্টালিকা। শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ট্যাব ও গেমিং ডিভাইস। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কমছে, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে সংকুচিত করেছে।

বর্তমান জীবনের সংকট

আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যস্ত, কিন্তু সবসময় বেশি সুখী নয়। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবেশগত সংকট এবং মানসিক অস্থিরতা জীবনের স্বাভাবিক শান্তিকে ব্যাহত করছে।

মানুষ আজ হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের অন্তরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু থাকলেও প্রকৃত সহমর্মিতার মানুষ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও অসহিষ্ণুতা আমাদের মানবিকতাকে ক্রমশ ক্ষয় করছে।

সংকটের মূল কারণ

এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা।

পরিবারে পারস্পরিক সময় ও আন্তরিকতার অভাব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার তুলনায় প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন।

অর্থ ও ভোগবিলাসকে জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা।

উত্তরণের পথ

সংকট থেকে মুক্তির পথ আমাদের হাতেই।

প্রথমত, শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের খেলতে দিতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিতে হবে, বই পড়তে, গান গাইতে, ছবি আঁকতে এবং স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একসঙ্গে সময় কাটানো, আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের জন্য নয়, একজন আদর্শ মানুষ গড়ার জন্যও।

চতুর্থত, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, আসক্তি হিসেবে নয়। প্রযুক্তি যেন মানুষের সেবক হয়, প্রভু নয়।

সবশেষে, প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে মানুষ বিস্মিত হতে জানে, ক্ষমা করতে জানে, ভালোবাসতে জানে এবং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায় না।

হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শৈশবের শিক্ষা, সরলতা, সততা ও মানবিকতা হৃদয়ে ধারণ করা সম্ভব। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুন্দর শৈশব উপহার দিতে পারি এবং নিজের জীবনেও মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সহমর্মিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে বর্তমানের বহু সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে কেবল উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; গড়ে ওঠে সুন্দর মানুষ, সুন্দর পরিবার এবং সুন্দর শৈশবের ভিত্তির ওপর।

তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি—যেখানে শিশুর হাসি হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ, মানুষের মানবিকতা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, আর জীবনের প্রতিটি সংকট মোকাবিলার শক্তি আসবে ভালোবাসা, সততা ও নৈতিকতার আলো থেকে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু

শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় মাদক ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৯

হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ।

আপডেট সময় : ১২:০৮:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

 

“শৈশব হলো জীবনের সেই স্বর্গ, যেখান থেকে একবার বেরিয়ে এলে আর কখনো ফিরে যাওয়া যায় না।”

মানুষের জীবনে শৈশব একটি অনন্য আশীর্বাদ। এই সময়ে থাকে না কোনো হিংসা, লোভ, প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিমতার বোঝা। থাকে শুধু নির্মল হাসি, সীমাহীন কৌতূহল, অফুরন্ত স্বপ্ন এবং ভালোবাসার উষ্ণ পরশ। কিন্তু সময়ের স্রোত কাউকে অপেক্ষা করে না। একদিন শিশুটি বড় হয়ে বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে প্রবেশ করে। তখন জীবনের হিসাব-নিকাশ, দায়িত্ব, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাকে ঘিরে ধরে। ফলে মানুষ প্রায়ই ফিরে তাকায় হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশবের দিকে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“ইস! যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম!”

হারানো শৈশবের স্মৃতি

একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশুদের রাজ্য। কাদামাটির গন্ধ, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ—এসবই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তখন সুখ কিনতে অর্থের প্রয়োজন হতো না; একটি বাঁশির সুর, একটি ঘুড়ি কিংবা একটি গল্পই ছিল অফুরন্ত আনন্দের উৎস।

আজ সেই মাঠের জায়গায় উঠেছে কংক্রিটের অট্টালিকা। শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ট্যাব ও গেমিং ডিভাইস। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কমছে, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে সংকুচিত করেছে।

বর্তমান জীবনের সংকট

আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যস্ত, কিন্তু সবসময় বেশি সুখী নয়। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবেশগত সংকট এবং মানসিক অস্থিরতা জীবনের স্বাভাবিক শান্তিকে ব্যাহত করছে।

মানুষ আজ হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের অন্তরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু থাকলেও প্রকৃত সহমর্মিতার মানুষ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও অসহিষ্ণুতা আমাদের মানবিকতাকে ক্রমশ ক্ষয় করছে।

সংকটের মূল কারণ

এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা।

পরিবারে পারস্পরিক সময় ও আন্তরিকতার অভাব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার তুলনায় প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন।

অর্থ ও ভোগবিলাসকে জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা।

উত্তরণের পথ

সংকট থেকে মুক্তির পথ আমাদের হাতেই।

প্রথমত, শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের খেলতে দিতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিতে হবে, বই পড়তে, গান গাইতে, ছবি আঁকতে এবং স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একসঙ্গে সময় কাটানো, আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের জন্য নয়, একজন আদর্শ মানুষ গড়ার জন্যও।

চতুর্থত, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, আসক্তি হিসেবে নয়। প্রযুক্তি যেন মানুষের সেবক হয়, প্রভু নয়।

সবশেষে, প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে মানুষ বিস্মিত হতে জানে, ক্ষমা করতে জানে, ভালোবাসতে জানে এবং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায় না।

হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শৈশবের শিক্ষা, সরলতা, সততা ও মানবিকতা হৃদয়ে ধারণ করা সম্ভব। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুন্দর শৈশব উপহার দিতে পারি এবং নিজের জীবনেও মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সহমর্মিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে বর্তমানের বহু সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে কেবল উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; গড়ে ওঠে সুন্দর মানুষ, সুন্দর পরিবার এবং সুন্দর শৈশবের ভিত্তির ওপর।

তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি—যেখানে শিশুর হাসি হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ, মানুষের মানবিকতা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, আর জীবনের প্রতিটি সংকট মোকাবিলার শক্তি আসবে ভালোবাসা, সততা ও নৈতিকতার আলো থেকে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু

শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী