ঢাকা ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ। বিআরটিসিতে দুর্নীতির অভিযোগ: রাজনৈতিক প্রভাবে বারবার পার পেয়ে জান , নায়েব আলীর বিরুদ্ধে পুনঃতদন্তের দাবি। জনগণের আস্থা ফেরাতে পুলিশকে আরও জনবান্ধব করতে হবে : ইয়ারুল ইসলাম। ভালুকা পৌরসভায় উন্নয়নে গতি, বাড়ছে নাগরিক সেবা। ডুমুরিয়া সোনালী ব্যাংকে চরম অব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ। ৮৪টি মাদ্রাসায় আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার অনুদান প্রদান। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে রাজশাহীতে ২ বেকারীকে জরিমানা। আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে এখনো টিকে আছে ঠাকুরের হাট। ময়মনসিংহে ভাড়া বাসা থেকে যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার, আটক ২। দিনাজপুর বীরগঞ্জে ১০ নং মহনপুর ইউনিয়নে সেনপাড়া হরিবাসরে জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু। 

হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ।

 

“শৈশব হলো জীবনের সেই স্বর্গ, যেখান থেকে একবার বেরিয়ে এলে আর কখনো ফিরে যাওয়া যায় না।”

মানুষের জীবনে শৈশব একটি অনন্য আশীর্বাদ। এই সময়ে থাকে না কোনো হিংসা, লোভ, প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিমতার বোঝা। থাকে শুধু নির্মল হাসি, সীমাহীন কৌতূহল, অফুরন্ত স্বপ্ন এবং ভালোবাসার উষ্ণ পরশ। কিন্তু সময়ের স্রোত কাউকে অপেক্ষা করে না। একদিন শিশুটি বড় হয়ে বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে প্রবেশ করে। তখন জীবনের হিসাব-নিকাশ, দায়িত্ব, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাকে ঘিরে ধরে। ফলে মানুষ প্রায়ই ফিরে তাকায় হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশবের দিকে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“ইস! যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম!”

হারানো শৈশবের স্মৃতি

একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশুদের রাজ্য। কাদামাটির গন্ধ, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ—এসবই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তখন সুখ কিনতে অর্থের প্রয়োজন হতো না; একটি বাঁশির সুর, একটি ঘুড়ি কিংবা একটি গল্পই ছিল অফুরন্ত আনন্দের উৎস।

আজ সেই মাঠের জায়গায় উঠেছে কংক্রিটের অট্টালিকা। শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ট্যাব ও গেমিং ডিভাইস। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কমছে, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে সংকুচিত করেছে।

বর্তমান জীবনের সংকট

আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যস্ত, কিন্তু সবসময় বেশি সুখী নয়। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবেশগত সংকট এবং মানসিক অস্থিরতা জীবনের স্বাভাবিক শান্তিকে ব্যাহত করছে।

মানুষ আজ হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের অন্তরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু থাকলেও প্রকৃত সহমর্মিতার মানুষ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও অসহিষ্ণুতা আমাদের মানবিকতাকে ক্রমশ ক্ষয় করছে।

সংকটের মূল কারণ

এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা।

পরিবারে পারস্পরিক সময় ও আন্তরিকতার অভাব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার তুলনায় প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন।

অর্থ ও ভোগবিলাসকে জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা।

উত্তরণের পথ

সংকট থেকে মুক্তির পথ আমাদের হাতেই।

প্রথমত, শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের খেলতে দিতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিতে হবে, বই পড়তে, গান গাইতে, ছবি আঁকতে এবং স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একসঙ্গে সময় কাটানো, আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের জন্য নয়, একজন আদর্শ মানুষ গড়ার জন্যও।

চতুর্থত, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, আসক্তি হিসেবে নয়। প্রযুক্তি যেন মানুষের সেবক হয়, প্রভু নয়।

সবশেষে, প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে মানুষ বিস্মিত হতে জানে, ক্ষমা করতে জানে, ভালোবাসতে জানে এবং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায় না।

হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শৈশবের শিক্ষা, সরলতা, সততা ও মানবিকতা হৃদয়ে ধারণ করা সম্ভব। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুন্দর শৈশব উপহার দিতে পারি এবং নিজের জীবনেও মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সহমর্মিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে বর্তমানের বহু সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে কেবল উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; গড়ে ওঠে সুন্দর মানুষ, সুন্দর পরিবার এবং সুন্দর শৈশবের ভিত্তির ওপর।

তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি—যেখানে শিশুর হাসি হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ, মানুষের মানবিকতা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, আর জীবনের প্রতিটি সংকট মোকাবিলার শক্তি আসবে ভালোবাসা, সততা ও নৈতিকতার আলো থেকে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু

শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ।

হারানো শৈশব ও বর্তমান জীবনের সংকট: আত্মান্বেষণ, উপলব্ধি ও উত্তরণের পথ।

আপডেট সময় : ১২:০৮:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

 

“শৈশব হলো জীবনের সেই স্বর্গ, যেখান থেকে একবার বেরিয়ে এলে আর কখনো ফিরে যাওয়া যায় না।”

মানুষের জীবনে শৈশব একটি অনন্য আশীর্বাদ। এই সময়ে থাকে না কোনো হিংসা, লোভ, প্রতিযোগিতা কিংবা কৃত্রিমতার বোঝা। থাকে শুধু নির্মল হাসি, সীমাহীন কৌতূহল, অফুরন্ত স্বপ্ন এবং ভালোবাসার উষ্ণ পরশ। কিন্তু সময়ের স্রোত কাউকে অপেক্ষা করে না। একদিন শিশুটি বড় হয়ে বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে প্রবেশ করে। তখন জীবনের হিসাব-নিকাশ, দায়িত্ব, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাকে ঘিরে ধরে। ফলে মানুষ প্রায়ই ফিরে তাকায় হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশবের দিকে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“ইস! যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম!”

হারানো শৈশবের স্মৃতি

একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শিশুদের রাজ্য। কাদামাটির গন্ধ, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ—এসবই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তখন সুখ কিনতে অর্থের প্রয়োজন হতো না; একটি বাঁশির সুর, একটি ঘুড়ি কিংবা একটি গল্পই ছিল অফুরন্ত আনন্দের উৎস।

আজ সেই মাঠের জায়গায় উঠেছে কংক্রিটের অট্টালিকা। শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ট্যাব ও গেমিং ডিভাইস। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কমছে, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে সংকুচিত করেছে।

বর্তমান জীবনের সংকট

আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যস্ত, কিন্তু সবসময় বেশি সুখী নয়। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, পারিবারিক দূরত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবেশগত সংকট এবং মানসিক অস্থিরতা জীবনের স্বাভাবিক শান্তিকে ব্যাহত করছে।

মানুষ আজ হাজারো মানুষের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু নিজের অন্তরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু থাকলেও প্রকৃত সহমর্মিতার মানুষ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও অসহিষ্ণুতা আমাদের মানবিকতাকে ক্রমশ ক্ষয় করছে।

সংকটের মূল কারণ

এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা।

পরিবারে পারস্পরিক সময় ও আন্তরিকতার অভাব।

শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার তুলনায় প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব।

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন।

অর্থ ও ভোগবিলাসকে জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা।

উত্তরণের পথ

সংকট থেকে মুক্তির পথ আমাদের হাতেই।

প্রথমত, শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের খেলতে দিতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিতে হবে, বই পড়তে, গান গাইতে, ছবি আঁকতে এবং স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একসঙ্গে সময় কাটানো, আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের জন্য নয়, একজন আদর্শ মানুষ গড়ার জন্যও।

চতুর্থত, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, আসক্তি হিসেবে নয়। প্রযুক্তি যেন মানুষের সেবক হয়, প্রভু নয়।

সবশেষে, প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে মানুষ বিস্মিত হতে জানে, ক্ষমা করতে জানে, ভালোবাসতে জানে এবং অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায় না।

হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু শৈশবের শিক্ষা, সরলতা, সততা ও মানবিকতা হৃদয়ে ধারণ করা সম্ভব। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুন্দর শৈশব উপহার দিতে পারি এবং নিজের জীবনেও মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সহমর্মিতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে বর্তমানের বহু সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—“মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে কেবল উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; গড়ে ওঠে সুন্দর মানুষ, সুন্দর পরিবার এবং সুন্দর শৈশবের ভিত্তির ওপর।

তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি—যেখানে শিশুর হাসি হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ, মানুষের মানবিকতা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, আর জীবনের প্রতিটি সংকট মোকাবিলার শক্তি আসবে ভালোবাসা, সততা ও নৈতিকতার আলো থেকে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু

শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী