খাদ্যে ভেজাল: মানবতার বিরুদ্ধে নীরব হত্যাকাণ্ড
খাদ্য পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের প্রথম প্রার্থনা। মানুষ বাঁচার জন্য খায়, খাওয়ার জন্য বাঁচে না। অথচ সেই বাঁচার অবলম্বনই যদি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এর চেয়ে বড় বেদনা, এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর কী হতে পারে?
আমরা মানব রূপে জন্মেছি – এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অহংকার। আর এই অহংকারের ভিত্তি হলো মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ। যে মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব নেই, সে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম প্রাণীর চেয়েও অধম। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমাদের পরিচয়, আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের মর্যাদা, সবকিছুর মূলে আছে একে অপরের প্রতি মমতা। যখন সেই মমতাই হারিয়ে যায়, তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না।
আজ ভাবতে কষ্ট হয়, আমাদের মানবতাবোধ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। ব্যক্তিস্বার্থের লোভে আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছি, সামান্য কিছু টাকার জন্য আমরা অন্যের মুখের গ্রাসে বিষ মিশিয়ে দিতে দ্বিধা করি না। এটি কোনো ব্যবসা নয়, এটি নীরব হত্যা।
পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে মানুষ তার নিজের ভাইয়ের খাবারে বিষ মেশায় কি না, জানি না। কিন্তু আমার সোনার বাংলাদেশে আজ এমন কোনো খাবার নেই, যা নিঃসন্দেহে বলা যায় ভেজালমুক্ত। যে চাল-ডাল ফুটপাতের মানুষটি ভিক্ষার টাকায় কিনে রাতের ক্ষুধা মেটায়, সেই চালেও পাথর, সেই ডালেও রং। যে দুধটুকু দিয়ে একটি মা তার শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে চায়, সেই দুধেও পানি আর কেমিক্যাল। রূপচর্চার প্রসাধনীতে ভেজাল, আর সবচেয়ে ভয়াবহ – যে ওষুধ খেয়ে একজন অসুস্থ মানুষ সুস্থ হতে চায়, সেই ওষুধেও ভেজাল!
এই বিষ প্রতিদিন আমাদের শরীরে ঢুকছে। আমাদের কিডনি নষ্ট হচ্ছে, লিভার পচে যাচ্ছে, হৃদযন্ত্র বিকল হচ্ছে। যে শিশুটি আজ জন্ম নিচ্ছে, সে জন্মের আগেই ক্যান্সারের বীজ নিয়ে জন্মাচ্ছে। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, আমরা নিজের হাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছি?
ও ভেজালকারী ভাই, একবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন করো। তুমি কার খাবারে ভেজাল দিচ্ছ? সে তোমারই ভাই, তোমারই বোন, তোমারই সন্তানের মতো কেউ। তুমি যে টাকা লাভ করছ, সেই টাকা দিয়ে তুমি হয়তো তোমার সন্তানের জন্য দামি খাবার কিনবে, কিন্তু অন্যের সন্তানের মুখের খাবার তুমি কেড়ে নিচ্ছ। তোমার সন্তান যদি সেই ভেজাল খাবার খেয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করত, তোমার কেমন লাগত?
মনে রেখো, আইন তোমাকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু বিবেকের আদালতের চেয়ে বড় আদালত আর নেই।
তাই আজ সময় এসেছে সোচ্চার হওয়ার।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের আকুতি: খাদ্যে ভেজালকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখবেন না। এটি মানবতা হত্যার শামিল। এর জন্য কঠিন, দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুত শাস্তির বিধান করুন। বাজারে বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ান, যেন মানুষ অন্তত নিশ্চিন্তে এক মুঠো ভাত খেতে পারে।
আর ভেজালকারী ভাইদের কাছে আমাদের মানবিক আহ্বান: ফিরে আসুন। টাকার লোভে মানুষ হত্যা বন্ধ করুন। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় লাভ হলো মানুষের দোয়া। একজন মানুষ যখন আপনার বিক্রি করা নির্ভেজাল খাবার খেয়ে সুস্থ থাকবে, তার হৃদয়ের গভীর থেকে যে দোয়া আসবে, কোটি টাকার চেয়েও তার দাম অনেক বেশি।
আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি – আমরা ভেজাল দেব না, ভেজাল খাব না, ভেজালকে প্রশ্রয় দেব না। যেখানে ভেজাল দেখব, সেখানেই প্রতিবাদ করব।
কারণ, খাদ্য শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, খাদ্য হলো জীবন। আর জীবন নিয়ে খেলা করার অধিকার কারও নেই।
(বি. দ্র. লেখা ও ছবি তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।)
খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং আহ্বায়ক: নিরাপদ খাদ্য খাই (নিখাখা)।
সারাক্ষণ ডেস্ক 

















