ঈশ্বরগঞ্জে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব ১১ সদস্যের পরিবার, সহায়তার অপেক্ষায় বৃদ্ধ আবদুস সালাম
মোঃ মানিক, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: জীবনের শেষ বয়সে এসে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ৮০ বছর বয়সী আবদুস সালাম। নিজের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে আগুন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যে ঘরটিতে বসবাস করতেন, অগ্নিকাণ্ডে সেটি সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটানোর শঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের হারুয়া গ্রামে ঘটে এ ঘটনা। সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে বসতঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় প্রায় দুই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরিবারের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের জায়গাজুড়ে পুড়ে যাওয়া কাঠ, ছাই ও আসবাবপত্রের অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে রয়েছে। সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কিছুই আর ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এখন চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আবদুস সালামের বড় ছেলে উজ্জ্বল মিয়া (৪০) অন্যের সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ও সাত সন্তান রয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়েও একই সংসারে বসবাস করতেন তাঁরা। সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্য ১১ জন। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব মূলত উজ্জ্বলের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল।
দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে প্রায় এক বছর আগে দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে বসতঘরটি নির্মাণ করেছিলেন উজ্জ্বল। কিন্তু আগুনে তাঁর সেই পরিশ্রমের ফল মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।
উজ্জ্বল মিয়া জানান, অগ্নিকাণ্ডে ঘরের আসবাবপত্র, পোশাক, রান্নার সরঞ্জাম, থালাবাসন ও নগদ অর্থসহ আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘর থেকে কোনো মালামাল বের করার সুযোগ পাননি তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘আমি অন্যের সিএনজি চালিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাই। বাবা-মা, স্ত্রী ও সাত সন্তান নিয়ে আমার পরিবার। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে ঘরটি বানিয়েছিলাম। এখন আমাদের থাকার মতো ঘর নেই, সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নেই। একা আমার পক্ষে এত বড় ক্ষতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি সহযোগিতা পেলে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।’
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুলতান উদ্দিন (৬০) জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সবাই মিলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও ঘরের মালামাল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাড়ির ভিটা ছাড়া অন্য কোনো জমিজমা না থাকায় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা রাম প্রসাদ পাল জানান, সকালে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তবে পথে আবার ফোন করে জানানো হয়, স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় আগুন নিভে গেছে। পরে তাঁরা স্টেশনে ফিরে যান।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আবেদন করলে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুনর্বাসনের অপেক্ষায় পরিবারটি
একটি অগ্নিকাণ্ডে শুধু বসতঘর নয়, উজ্জ্বল মিয়ার পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অবলম্বন হারিয়ে গেছে। বৃদ্ধ বাবা-মা ও সাত সন্তানকে নিয়ে এখন নতুন করে ঘর নির্মাণ এবং সংসার চালানোর চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। দ্রুত সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে পরিবারটি এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার কিছুটা সুযোগ পাবে।
সারাক্ষণ ডেস্ক 


















