ঢাকা ১০:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
যশোর ডিবির তিন এসআইকে আইজিপি ব্যাজ প্রদান । গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কাছারির গল্প- অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলম। কিশোরগঞ্জে গরু গোসল করাতে গিয়ে নিখোঁজের ২ দিন পর কিশোরের মরদেহ উদ্ধার। জৈন্তাপুরে নবাগত ইউএনও হিসেবে যোগদান করলেন সুনন্দা রায়। সব রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের জানাজা অনুষ্ঠিত। ওমানে গাড়ির ভেতর চট্টগ্রামের ৪ প্রবাসী ভাইয়ের রহস্যজনক মৃত্যু। প্রতিমন্ত্রী করলেন বরখাস্ত প্রধান নির্বাহী আদেশ দিলেন যোগদানের। আসলে বড় কে? জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘তারুণ্যের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় ১৯৯তম ঈদের জামাত আয়োজনে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত। রাজবাড়ী সদরে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষকের সম্মাননা পেলেন সহকারী অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান।

গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কাছারির গল্প- অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলম।

এক সময় এ দেশে ফেস বুক,ইন্টারনেট এর মত বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। কিন্তু বিনোদন ছিল,ছিল বিনোদনের মাধ্যম।তবে বিনোদনের এই মাধ্যম ছিল গল্প গুজব,তাস,পাশা,স্থানীয় খেলা যেমন সাত ঘুটি বাঘ বন্ধ, তে পতিয়া,লুডু, ঘুটি খেলা, যাকে আমরা ঘরোয়া খেলা ( Traditional Indoor Game)বলে থাকি এবং হুকোয় ধুম পানে সময় ক্ষেপণ যা কাছারি ,কোনো কোনো বাড়ির চওড়া বারান্দা ভিত্তিক। যে সমস্ত বাড়িতে কাছারি বানানোর সামর্থ ছিল না অথচ মানুষ তার বাড়িতে গল্প গুজব বা অবসর সময়ে আড্ডা দিতে চাইত তারা বাড়ির একটি সদর বারান্দা এ সকল মানুষের জন্য ছেড়ে দিত। সাধারণত গ্রামের নিরিবিলি, আম,জাম গাছ পরিবেষ্টিত বাড়িতেই এ রকম পরিবেশ তৈরী হতো।

এ সময়টা ছিল ১৯৮৭/৮৮ পর্যন্ত । তখন কাছারি সংস্কৃতি ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। এ সময় কিছু গ্রামের উচ্চ শিক্ষিত, যারা একটু ভিন্ন মানসিকতায়,ভিন্ন আলোচনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটি আলাদা ভূবন গ্রাম্য জীবনে সৃষ্টি করতে চাইত তারাই মূলত কোন নিরিবিলি নিরাপদ বাড়ির বারান্দা পছন্দ করে আড্ডা জমাতো। এ ধরনের বাড়ির মধ্যে দাতিয়াদহের গোপাল দত্তের বাড়ি এবং শিবপুরের নিরঞ্জন কামারের বাড়ি অন্যতম। নিরঞ্জন কামারের বাড়িতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর গোপাল দত্তের বাড়ি কয়েকজন ডাক্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আড্ডা বসতো।

গোপাল দত্তের বাড়িটি দাতিয়াদহের পাল পাড়ার ঘাট থেকে দক্ষিন দিকে যে রাস্তাটি খান বাড়ির পাশ দিয়ে ভেড়ি বাঁধে উঠেছে, সে রাস্তা থেকে প্রায় ১০০/১৫০ ফুট ভিতরে। যেখানে রাস্তার কোলাহল সহজে বাড়ির আংগিনায় প্রবেশ করতে পারেনা।বাড়িটি বাগান পরিবেষ্টিত। রাস্তা থেকে এক পায়ে একটি রাস্তা দুই পাশে বাঁশ ঝাড়ের মাঝ দিয়ে গোপাল দত্তের বাড়ির দক্ষিন ঘরের বারান্দায় উঠেছিল। বাঁশ ঝাড়ের উত্তর পাশে সবে একটি টিনের ঘরে ছোট শিশুদের জন্য একটি প্রাইমারি স্কুলের জীবন দানের জন্য কংকাল কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। রুহল,আজিজার,আরও কয়েকজন কারিগরের আনাগোনা দেখা যেত এ আংগিনায়। বাড়ির দক্ষিণে ফসলের ফাঁকা মাঠ। চৈত্র মাসে দক্ষিণের বাতাস ঝিরিঝিরি নাচের তালে শান্তির পরশ মেখে দিত। ঘরের উপরে বাগানের গাছের ছায়া আর দক্ষিনের বাতাসের সমন্বয় সেবায় আপ্লুত হতো আশ্রিত পথিক। এখানেই ক্ষয়িষ্ণু কাছারি জীবনের কিছু আড্ডাবাজ যুবক এ বাড়িতে আড্ডা জমাত। অন্যতম ছিলেন ডা:কাজি রেজাউল হক,মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স, মহম্মদপুর, মাগুরা,ডা:শ্যামল কুমার দাস,মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মহম্মদপুর, মাগুরা,রতন কুমার পাল, সৈয়দ রবিউল আলম (আমি)।বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষে এ আড্ডায় অংশগ্রহণ। মাঝে মধ্যে এডভোকেট সুজিত কুমার রাহা আসতেন।তখন সুজিত দা উকিল হননি।ঢাকায় একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আরও দুই জন যুবক।এ যুবকেরা মূলত আসত আমরা কি আলোচনা করি তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য।এটা ছিল তাদের অন্যতম আগ্রহ।তবে এরা নিয়মিত ছিলনা।সব মিলে বলা চলে সাত জন,যেন সপ্তর্ষি মন্ডল।তবে নিয়মিত ছিল চার জন।

এ বাড়িতে কলেজ পড়ুয়া আরও অনেক যুবকের আগমন ছিল। এ ছেলেদের দেখা মিলতো না যখন বয়ো:জেষ্ঠরা এ আড্ডায় যোগ দিত। এদের আড্ডা প্রতিদিন ছিলনা।সপ্তাহে ছুটির দিনে ডা:রেজাউল হক, শ্যামল বাবু চলে আসতেন। রেজাউল হক মহম্মদপুর থেকে একটি ক্লাস বিহীন হোন্ডা ৫০ সি,সি চালিয়ে আসতেন। শ্যমল বাবু বাড়ি থেকেই হেটে হেটে আসতেন।কখনও একটি গামছা ঘাড়ের উপর বিছিয়ে। কখনও আবার একটি গেঞ্জি গায়ে দিয়ে। এই ছুটির দিনে অন্যরা এ বাড়িতে আড্ডা দিতে আসতো না।তাই বোঝা যায়নি কারা আড্ডা জমাতো।

শ্যামল বাবুদের জন্য দত্ত বাবু টুল,আলসে,জল চৌকি প্রস্তুত করে রাখতেন সরকারি ছুটির দিনে। শ্যামল বাবু দত্ত বাড়িতে বসে থাকতেন আর রেজাউল হক মোটর সাইকেল চালিয়ে সরাসরি চলে আসতেন। ধীরে ধীরে রতন,আমি, এ দুজনের আগমন ঘটত। বর্নিত চারজনেই তখন অবিবাহিত। এ চারজনের জন্য এ আড্ডাটি ছিল আনন্দ ধামের মত।

ধাম বা আশ্রম শব্দটার আভিধানিক অর্থ যাইই হোকনা কেন ভাব অর্থ এদের নিকট ধাম বা আশ্রমেরও অধিক।

এ বারান্দায় দত্ত বাবু একটি হুকো, ডিবায় খাম্বেরী তামাক,মালসায় নিভু নিভু কাঠের কয়লার আগুন গোজ করে নিজের কাজে বেড়িয়ে পড়তেন। তিনি খাম্বেরী তামাক কেবলমাত্র শ্যামল বাবু আর রেজাউল হক সাহেবের জন্য কামারখালী থেকে কিনে নিয়ে যেতেন। শ্যামল বাবু খাম্বেরী তামাকে আগুন সংযোগ দেয়া হুকো ধীরে ধীরে টানতেন।চোখ বুজে কড়ুত কুড় কুড়ুত কুড় শব্দ করে ।কেউ গেলে কথা না বলে ইশারায় জল চৌকিতে বসতে বলতেন।টানা শেষ হলে নিজের মুখ লাগানো জায়গায় ভালো করে মুছে দিয়ে বলতেন, “নাও টানো” আবার চোখ দুটো উপরের দিকে টেনে উঠিয়ে বলতেন,” খাম্বেরী তামাক’ত একটু মজা করেই টানলাম”। তার এ কথায় মনে হতো হুকো টানা সময়টুকু তার নিকট পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সময় ছিল যেন।

রেজাউল হক এলে জমতো গল্প।সে গল্পে ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি,দর্শন আরও অনেক বিষয়। যখন বিশ্ব নেতাদের নিয়ে প্রসংগ উঠত তখন মার্ক্স,লেনিন,চে গুয়েভারা,ফিদেল ক্যাস্ত্রো,মাও সে তুং,হো চি মিন নিয়ে কথা বলতেন।এই দূটো লোককে মনে হতো যেন সব বিষয়ের অভিজ্ঞ জন। তবে ডাক্তারী বিষয় নিয়ে কম আলোচনাই হতো। রেজাউল হক জড়িত ছিলেন ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে । শ্যামল বাবু জাসদ ছাত্রলীগের সাথে।রতন, রবিউল (আমি) এ দুজন জাসদ ছাত্র লীগের সাথে।শ্যামল দা মাঝে মাঝে বলতেন, “বাড়িটা বাগানের মধ্যে হলেও একদিন বিখ্যাত হয়ে যাবে।”

রতন বলতো,”কেন দাদা”?

শ্যামল দার সোজা উত্তর, “এখান থেকেই একদিন এ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে।”

আমি বললাম, “কিভাবে”?

তারপর একটু ভেবে উত্তর, ” এখানে বসেই এদেশের সকল সমাজ তান্ত্রিক দলকে একত্রিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। এ জায়গাটা একটি উত্তম জায়গা যে কোন পরিকল্পনার জন্য।”

আমি বলতাম,” যেভাবে ধর্ম ভিত্তক দলগুলো কাজ করছে তাতে আমরা এ দেশে এগোতে পারব না।”

রেজাউল ভাই বলতেন,”নকশাল বাড়ির মত এ বাড়ি একদিন আলোচিত বাড়ি হবে।আর শ্যমল হবে কানু সান্নাল।” শ্যামল দা হুকোয় জোরে একটা দম মেরে”হুম” শব্দ করতেন। মুখের মধ্যে জমা ধূয়া উপরের দিকে ছেড়ে চোখ দুটো মিটমিট করে তাকিয়ে বলতেন,”তাইই মনে হচ্ছে।”হুকোয় টান দেওয়ার সময় তিনি তার ইচ্ছেমত কথা বলতেন, একটু থেমে থেমে হুকোয় টান, ধূয়া ছাড়তে ছাড়তে কথা,আবার টান।মুখ দিয়ে নাক দিয়ে ধূয়া বের হতো। হাতে হুকো রেখেই গান ধরতেন ভূপেন হাজারিকার গন সংগীত, কিছুদূর যেয়ে থেমে গিয়ে সাম্যবাদী কবিতা আবৃত্তি করতেন। এ সময় রেজাউল ভাই এবং অন্যদের অন্য গল্পে চলে যেতে হতো। শ্যামল দা গেয়েই চলতেন বা আবৃত্তির আবেগে ডুবে যেতেন। তার এই ভাব সাগরে নিমজ্জিত হওয়ায় কেউ বিরক্ত হতেন না। হঠাৎ তিনি বলতেন,”কাইয়ুম ,গ্রামটা খুব সুন্দর না?মনে হয় বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর গ্রাম নিশ্চিন্তপুরে আছি”। দত্তবাবুর ছেলে মেয়ের খেলা দেখলে বলতেন, “অপু দূর্গা খেলা করছে।” এখানে আলাদা একটি ভূবন সৃষ্টির পরিবেশ বিরাজিত ছিল এ কয়েকটি মানুষের নিকট। নিজেদের মধ্যে আলাদা ভূবন সৃষ্টি করতে হলে আলাদা জ্ঞান সঞ্চয় করতে হয়।তা আমাদের মধ্যে না থাকলেও শ্যমলদার মধ্যে ছিল। সেই জ্ঞানের আলো থেকেই আমরা আলোকিত ছিলাম।

কাইয়ুম আমার ডাকনাম।উওরে বলতাম, “না দাদা, শরৎ বাবুর বিলাসী গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের গ্রাম ও বাড়ির মত। একটু পরেই হয়তো বা বিলাসী আসবে মৃত্যুঞ্জয় কে সেবা করতে।” শ্যামল দা হো হো করে হেসে দিতেন। তার হাসিতে কৃত্রিমতা ছিল না। একবারে প্রান খোলা হাসি যাকে বলে।

আবার হুকোয় মুখ লাগিয়ে টানতে থাকতেন। কুড়ুত কুড় কুড়ুত কুড় হুকোর শব্দ হয়।মুখটা উঠিয়ে হাতের তালু দিয়ে হূকোয় লেগে থাকা জলের স্পর্শ মুছে রেজাউল ভাইয়ের নিকট দিলে তিনি বলতেন,”তুমি আরও টানো”।

খাম্বেরী তামাকের একটা আলাদা মৃদু গন্ধ পাশে থাকা সাথীকেও আকৃষ্ট করতো। ধীরে ধীরে শুধু বাড়ি নয় এই খাম্বেরী তামাকের সাথেও বন্ধুত্ব হয়ে গেল নিগুঢ়। তাই ছুটির দিন হলেই এই চারটি লোকের বিনোদনের এই জায়গাটা যেন স্থায়ী হয়ে গেল।

শ্যামলদার মাকে আমরা পিসি বলেই ডাকতাম।প্রায় দুই’শ বছরের পুরনো দালানের পাশেই ছিল তার খড়ের একচালা রান্না ঘর।এ বাড়িটিকে বসু বাড়ি বলে।এটা মূলত শ্যামল দার মামা বাড়ি। তার বাবার বাড়ি বোয়াল মারী থানার শেখর জমিদার বাড়ির পাশে।

দুপুরের রান্না শেষ হলে তিনি ছেলেকে খুজতে যেতেন দত্ত বাড়িতে। বয়স তখন তার ষাট বছর।কিন্তু বয়সের ভারের চেয়ে দায়িত্বের ভার যেন বেশি ছিল। দায়িত্বের ভার বেশী বলছি এ কারনে যে ছেলে বেলায় শ্যামলদার বাবা মারা যান।বিধবা জীবনে বাঙালী সমাজ ব্যাবস্থায় একজন সন্তানকে এ পর্যন্ত বয়ে আনার সংগ্রামী অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে কথাটা বললাম। তখনও তিনি তাকে চোখে চোখে রাখতে চাইতেন।তাই দুপুরের খাবার তৈরী হয়ে গেলে ছেলেকে খুজতে যেতেন। পিসিমা রাস্তা থেকেই ডাকতে থাকলে হুকোটা সরিয়ে গল্পে মেতে উঠতো সবাই। কাছে গিয়ে সস্নেহের আহবান ছিল, ” শুধু গল্প করলেই হবে? খেতে হবে টবে না?”

দুপুরের এই অন্ন ভোজনে মাতৃত্বের আহবান শুধু শ্যামল দার জন্যই ছিলনা। ছিল সবার জন্যই।তবে রতন পাল এ আহবানে সাড়া না দিয়ে উভয়কে সমর্থন জানিয়ে বাড়ি চলে যেত। সন্তান বৎসল সার্বজনীন আহবান এখন বিরল।

সবদিনেই দত্তবাবু বাড়িতে থাকতেন না।কিন্তু এ আপ্যায়নে তার স্ত্রী সমান দায়িত্ব পালন করতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি আমাদের খোজ নিতেন। কোন কিছু দরকার কি না। এনাদের পরিমল,শ্যামল, অমল, মেয়ে মমতা তখন একেবারে শিশু। কিন্তু তারা কখনও আমাদের বিরক্ত করে নাই। তারা তাদের মত খেলা করে বেড়াতো।

আমরা জীবনকে যেভাবেই ভাবিনা কেন, জীবন বলতে জগতের জন যুদ্ধের এক বিশাল জৈবিক ক্ষেত্র।এখানে নিজে তৃপ্ত হতে হয় অন্যকে তৃপ্তি দিতে হয়। তৃপ্ত ও তৃপ্তিদায়ীর মাঝখনে এক সময় একটা ফলাফলও এসে দাঁড়ায়। এ ফলাফল জীবনকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।

রেজাউল ভাই বিয়ে করলেন। তার জীবন তৃপ্ত হওয়ার বিশাল বাসনায় ব্যাকুল হয়ে উঠল।ধীরে ধীরে সামাজিক জীবনের চেয়ে ব্যাক্তি ও পারিবারিক জীবনের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।পরিবার নামক জীর্ন লতা তাকে আকড়ে ধরল। রানী মৌমাছি যেমন শ্রমিক মৌমাছিকে কৌশলে তার অনুগত করে রাখে তিনিও তাই হয়ে গেলেন। গোপাল দত্তের বাড়ির মধুর স্বাদ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।পারিবারিক মৌচাকের মধু সঞ্চয় বৃদ্ধি পেতে লাগল। তাই তার উপস্থিতিতে দীর্ঘ বিরতি পড়ল। গোপাল দত্তের বাড়ির একটি জল চৌকি প্রায়ই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেল।আমাদের আকাশ থেকে সপ্তর্ষি মন্ডলের অরুন্ধতীর বিদায়ে দিকভ্রম নাবিকের মত হয়ে গেলাম।আলোচনায় প্রানহীন নীরবতা দেখা দিল। আলোচনার ছন্দে ছন্দ পতন শুরু হোল।

আমাদের হৃদয় আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।

রেজাউল ভাইয়ের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি পিসিমার মনে মাতৃ স্নেহের শূন্যতা দেখা দিল।তিনি মন খারাপ করে শ্যামলদাকে বললেন, “হারে শ্যামল রেজাউল কি মহম্মদপুরে নেই?” কথাটি সহজ সরল হলেও কন্ঠে যেন কেমন আবেগ জড়ানো ছিল। পিসিমার কথার মধ্যে মাতৃত্বের অনুভূতি যেন জেগে উঠেছিল। তিনি মনের অজান্তেই বলে ফেলেছিলেন, “ও যে আমাকে দেখতে আসে না”। তখন আষাঢ়ের দুপুর। বাইরে আকাশে বাষ্পীভূত জলের কালো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। এ বাষ্পীভূত জল পিসিমার হৃদয় আকাশ থেকেই হয়ত প্রকৃত আকাশে গিয়েছিল।

মাতৃত্বের অনুভূতি যে ধর্মের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ নয় তা পিসিমার দিয়েই বুঝা গেল। সকল মায়ের সার্বজনীন সন্তান ভাবাবেগ বা মাতৃত্ব সকল মানব শিশুর উপর বর্ষিত হয় কিনা জানিনে তবে তার মধ্যে সর্বজনীন মাতৃত্বের অনুভূতি দেখেছিলাম। সার্বজনীন মাতৃত্ব স্বত্তার জন্ম যে ধর্ম দিয়ে হয় না। তা পিসিমার মধ্যে উপলব্ধি করেছিলাম। আর এ আলো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসেনা। এ আলো প্রকৃতি থেকে নিতে হয়। সবাই প্রকৃতি থেকে নিতে পারে না।যে পারে না তার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এ জ্ঞানের ধারনা দেওয়া। দিব্য স্বত্তার বিশাল আলোয় মানুষ আলোকিত না হলে সমাজ সংকীর্ণই থেকে যায়। আমাদের সমাজ এ আলো বিস্তৃৃত করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

আমি তখন সবে বড়রিয়া মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে বাংলা বিভাগে যোগদান করেছি।রেজাউল ভাইর আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শ্যামলদা, রতন,আমি জীবন জগতের কল্পনা আখড়ায় আলোচনার হুকোর ধূয়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিলাম। শ্যমল দা জিজ্ঞেস করলেন,”কাইয়ুম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক চরিত্র উন্নয়নের জন্য, তা কি হচ্ছে?”

কেন? এই যে কত মানুষ লেখা পড়া শিখছে।

লেখা পড়া শিখছে কিন্তু মানবিক মানুষ কি হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজকে থেকে নয়।নৈতিক গুন সম্পন্ন মানুষ কতজন তৈরী হয়েছে? যীশুর জন্মেরও পূর্বে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে মানুষকে মানবিক মানুষ রুপে গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু তা কি হয়েছে?

কেন দাদা,এত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, কত সভ্যতার জন্ম হচ্ছে।

তা ঠিক।তবে মানবিক মানুষ হচ্ছে না।তাহলে এত যুদ্ধ,হানাহানি, দূর্নীতি থাকতো না।

তাইতো দাদা!

তাইই যদি হয় তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে কি হবে?যুগ যুগ ধরে শিক্ষকেরা শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে সেই তুলনায় মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরী করতে পারে নাই।

দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর অফিসার ছাড়া অফিসে খুব কম অফিসারই হয়।এরা কি শিক্ষকদের নিকট থেকে কোন নৈতিক পাঠ নেয়নি?

আসলে এই ধরনের প্রশ্ন তার মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি।তাই মাঝে মাঝে বলতাম, “আপনিতো দার্শনিক হয়ে গিয়েছেন।আপনার আর গ্রামে থাকার দরকার নেই। ”

না।মানুষ মাত্রেই দার্শনিক। দর্শন ছাড়া মানুষ নেই।তবে আমাদের শিক্ষায় যে দর্শনের জন্ম নিচ্ছে তা ব্যক্তি কেন্দ্রিক। সামগ্রিক চিন্তার মধ্যেও ব্যক্তি কেন্দ্রিকতার ঢেউ খুজে পাওয়া যায়।লেখাপড়া না শিখলে আদিম সাম্যবাদী সমাজের বন্টন ব্যবস্থা চালু থাকতো। আমরা সবাই ভালো থাকতাম।

আমাদের এই ধরনের আলোচনায় অনেক সময় যোগ দিতে অন্য লোক আগ্রহ ভরে আসতো। যেহেতু গ্রামের কোন প্যাচাল থাকতো না তাই আগ্রহ হারিয়ে চলে যেত।আর বলতো, “কয় পাগল বসে দত্ত বাড়ি।” এমনই অনুভুতিতে অন্য লোকের নিকট আমরা উপেক্ষিত ছিলাম।

গ্রামের লোকের নিকট তখনই অবহেলিত হতে হয় যখন চিন্তা ভাবনায় ওদের মত না হওয়া হয়। কারন বেশির ভাগ গ্রামের লোকের চিন্তা ভাবনা প্রগতিশীল নয়,স্থুল।

ডা: রেজাউল মহম্মদপুর থেকে বদলী হয়ে মাগুরায় গেল। যাওয়ার সময় গরীব মানুষ গুলো খুব কান্নাকাটি করেছিল।কারন তিনি গরীবের ডাক্তার বলে খ্যাত হয়েছিলেন। রোগী দেখে কোনদিন চেয়ে ভিজিটিং ফিস নিতেন না। এমনকি রোগীরা ভিজিট হিসাবে লাউ,কুমড়াও দিত।তিনি ফিরিয়ে দিতেন না।

ধীরে ধীরে রেজাউল ভাই একেবারে সংসার সচেতন একজন মানুষ হয়ে গেলেন। এক সময় ভাবতেন মানুষের সেবার জন্য সংসার ত্যাগ করবেন।কিন্তু বিয়ের পর সংসার সাধক হয়ে গেলেন,সংসার তাকে গ্রাস করল।” সংসার বিরাগী হতে গিয়ে সংসারী হয়ে গেলেন।” কথাটি কোন লেখকের মনে নেই।

রতন পাল একটি চাকরি পেয়ে ঢাকায় চলে গেল। শ্যামল দা বদলী হয়ে আগৈলঝরা (গৈলা) চলে গেলেন।আমি বিয়ে করে মহম্মদপুর থিতু হয়ে গেলাম।

বউ নার্স।সংসার ভাল লাগতে শুরু করল। নতুন জীবন, নতুন ভূবণ, নতুন আশা, জীবনের বিশাল ভালবাসার আর ভরসার জায়গা নিয়ে মেতে উঠলাম।

দীর্ঘ বিরতি।সে সময় মোবাইল যোগাযোগ ছিল না গ্রামে।

একদিন পিসিমাকে দেখতে গেলাম।বায়ে গোপাল দত্তের বাড়ি রেখে ডাইনে শ্যামল দার বাড়ি। রাস্তা থেকে নেমে এক পেয়ে পথটি সফেদা আর নারকেল, কাঁঠাল গাছের পাশ দিয়ে সোজা দালানের পূর্ব পাশের দরজায় এসে ঠেকেছে।আমি গিয়ে ডাক দিলাম,”পিসিমা আছেন?”

উনি আহ্নিক করছিলেন। তাই সাড়া পেলাম না।আমি দাড়িয়ে রইলাম।

তিনি আহ্নিক শেষে এলেন। আমাকে দাড়ান দেখে দু:খ প্রকাশ করলেন। আমাকে বসতে দিয়ে কাদো কাদো কন্ঠে বললেন, “অনেক দিন শ্যমলের খোঁজ খবর পাচ্ছি নে।চিঠি পত্র নেই,বাড়িও আসেনা।” পচাকে দিয়ে পোস্ট অফিসে অনেক খোজ নিয়েছেন তিনি। পচা শ্যামল দার মাসতুত ভাই।আসলে চিঠি না এলে কাঊকে দিয়ে খোজ নিলে কি চিঠি পাওয়া যায়? মন বোঝেনা মায়ের মন তাই।

শ্যমল দা বরাবরই আত্মভোলা লোক। তিনি এত আত্মভোলা ছিলেন যে চুল না আঁচড়িয়েও হাস্পাতালে ঢুকতেন।

আমি ভাবলাম নিশ্চয়ই গোপাল দত্তের বাড়ির মত কোন জায়গা হয়তো পেয়ে গেছে।

গৈলা, মনসা মংগল কাব্যের রচয়িতা কবি “বিজয় গুপ্তের” জন্ম স্থান। আমার সন্দেহ হয়ত বা এই মনসা মংগল কবির বাড়ি তার মনের কোনায় গভীর ছাপ ফেলেছে তাই বাড়ির কথা প্রিয়জনের কথা ভুলে গেছে।

আমি শ্যামল দা কে খুজতে বের হলাম।কোন এক ঈদ উল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি না এসে গৈলার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম।

সে সময় বরিশাল যেতে মাগুরা থেকে প্রায় একদিন লাগতো। কয়েকটি ফেরী পার হতে হতো। সে এক বিশ্রী বিড়ম্বনা। তবে গৈলা বরিশালের আগেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। রোজার ঈদের আগের দিনের বিকেলে গৈলা হাস্পাতালে গিয়ে হাজির। খোঁজ নিতেই জানতে পারলাম তিনি সকালেই বাড়ি চলে গিয়েছেন।

আসলে ভালবাসা এমনই যে ধর্ম দিয়ে বিচার করা যায় না। ভালবাসায় খোজে ভাল মন আর ধর্ম খোজে ধর্মীয় আবেগ।ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ধর্ম বেছে নেওয়া যায় কিন্তু মানবিক মন দিয়ে মানুষ বেছে নিতে হয়।মানবিক মূল্যবোধ সর্বজনিন কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধে মানবিকতা সব সময় সর্বজনিন হয় না।সে কারণে আমরা যে ক’জন এখানে সময় কাটাতাম সবার উদার মনস্তাত্ত্বিক বোধই আলাদা আলাদা ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্বেও একটি মানবিক মূল্যবোধ জন্ম নিয়েছিল।

গৈলা হাসপাতাল থেকে ঈদের দিনে বাড়ি ফিরলাম। আত্মভোলা এই মানুষটি সত্যি বাড়ি এলো কিনা খুজতে গোপাল দত্তের বাড়ি ঢুকলাম। বাড়ির দক্ষিন বারান্দায় খাম্বেরী তামাকের গন্ধে তাকে আবিষ্কার করলাম। শ্যমল দা আমাকে দেখে হুকোর খোল থেকে মুখটা সরিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “কাইউম বসো।”

আমার অন্তর সমুদ্রে জ্বলন্ত রোষাগ্নির ধূয়া বের হতে লাগল।কিন্তু সবই সংবরন করে আমিও মৃদু স্বরে বললাম,”আমি গৈলা গিছিলাম। পিসিমার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে।এখনও বাড়ি যায়নি। ”

“হ্যাঁ, গৈলা মনসা মংগল কবির বাড়ি।জায়গাটা এমনই যে,

ওখানে গেলে সব ভুলে যেতে হয়। পথের পাঁচালী উপন্যাসে বর্ণিত প্রকৃতির মত গ্রামগুলি। আর বনের মধ্যে একপেয়ে পথ নিজেকে হারাতে মন চায়। ওখানে একটি ভাংগা পুরনো বাড়ি আছে। দেখে মনে হয় হরিহর রায়ের বাড়ি।ক্ষয়ে গেলেও আভিজাত্যের ছাপ বাড়িতে আছে।”

“ঠিক যেন বসু বাড়ি তাই না?” সব রাগ ভুলে গেলাম। রাগের সব অনুভূতি যেন জলের স্রোত হয়ে মধুমতিতে পতিত হলো।

বসু বাড়িও একদিন এ রকমই ছিল।তাদের পুকুর ঘাটে এক সময় বাইরের লোক প্রবেশ করতে পারতো না। এখন বাড়িতে একটি পাট কাঠির ব্যাড়াও নেই।জীবন জগতের এই মহাকালের যজ্ঞলীলার অনুভূতি তার মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। “চলো বাড়ি যাই” বলে উঠে পড়লেন।

দত্ত বাড়ি থেকে একপেয়ে সরু পথটা রাস্তায় গিয়ে উঠেছে। এ পথে হাটার সময় পায়ের দিকে নজর রেখে হাটতে হয়।নইলে সাপের ভয় আছে।এ কথা দত্ত বাবুই আমাদের বলেছিল। হাটতে হাটতে বললাম, “পিসিমা আপনাকে কিছু বলে নাই?”

“না”

উনি বিজ্ঞ ঋষির মত হাটতে লাগলেন আর আমি পিছনে পিছনে দেয়ালের চুন সুড়কি ক্ষয়ে যাওয়া দালানের কক্ষে প্রবেশ করলাম। পিসিমা আমাকে দেখে হেসে দিলেন। তার হাসিটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের।

শ্যামল দা চৌকির প্রান্তে বসে শার্টটা খুলছিল আর বলছিল, “রতনের খোজ জান?”

হ্যা, সে’ত বিয়ে করেছে। একা একাই। এমন সময় পিসিমাও এসে হাজির হলেন।তিনি রতনের বিয়ের খবর জেনে আমাকেও বললেন ডাক্তার বাবুর বিয়ে দিতে হবে।

শ্যামল দা বিয়ের কথা শুনে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ” এতে যে মায়ের প্রতি ভালবাসার অনুভূতি ভাগ হয়ে যাবে।” শ্যামল দা বিড় বিড় করে বললেও পিসিমা তা শুনে ফেললেন।

তাই বলে কি বিয়ে মানুষ করে না? কথা বলতে বলতে তিনি রান্না ঘরে চলে গেলেন। উননের উপর থেকে ভাতের হাড়িটা নামাতে নামাতে বললেন, “ভাত হয়ে গেছে স্নান করে এসো।”

মানুষের জীবন নানা রকম আনন্দে ভরপুর। বাঙালি বঁধুরা যে কোন উৎসবের আনন্দ জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ বলে মনে করে। আমার বউ এই শ্রেষ্ঠ আনন্দ থেকে সে বার বঞ্চিত হলো।আমার সাথে ঈদ করতে না পেরে। বুকের ব্যাথা মুখের কোনায় লুকিয়ে রেখে সেদিন পার করল।

সংসার এমনই যে পৃথিবীর সব স্বর্গালোক যেমন বিচ্ছুরিত হয়ে জীবন আনন্দময় করে তোলে আবার নরকের যন্ত্রনাও জীবনকে অন্ধকার করে দেয়। কখনও আবার শ্মশানের শূন্যতাও আচ্ছন্ন করে তোলে।আমাদের ব্যাস্ততা, সংসার স্বর্গালোক অন্ধকার নয়, যেন শূন্য শ্মশানে পরিনত হতে লাগলো। আমি আমার মধ্যে অন্যরা যে যার মধ্যে প্রবেশ করল। আমরা সবাই অন্তর্মুখী হয়ে গেলাম।

কেউই অন্তর্মুখী হতে চায় না।সময়ই মানুষকে অন্তর্মুখী করে ফেলে।আমাদের এই অন্তর্মুখী জীবনে গোপাল দত্তের বাড়ি শূন্য শ্মশান হলো।খাম্বেরী তামাকের গন্ধের আফসোস আশ পাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠল।গোপাল দত্তের হুকোটি বারান্দার বাঁশের চ্যাচাড়ি ব্যাড়ায় নি:সংগ বাতাসে অবগাহন করতে লাগলো।

আমার স্ত্রীর বদলীর সুবাদে মাগুরায় অস্থায়ী নিবাস গড়ে উঠল।শ্যামল দা,রেজাউল ভাইও এ শহরে। মাঝে মাঝে দেখা হয়,কথা হয়।কখনও কোন অফিসের মিলনায়তনে আবার কখনো রাস্তার ফুটপাতে,বাজারের গলিতে। দেখা হলে কারও কথা জিজ্ঞাসা না করলেও গোপাল দত্তের কথা একবার জিজ্ঞেস করতেন।তার আগ্রহ ছিল এ বাড়িতে আর কেউ হুকো টানতে আসে কি না? কিন্তু গোপাল দত্ত এ হুকোটি কাউকে ব্যাবহার করতে দিতেন না। যে হুকো ডাক্তাররা ব্যবহার করে সে হুকো আর কেউ ব্যাবহার করতে পারেনা। এটি মাথায় রেখে হুকোটিতে তেল মেখে রেখে দিতেন বেড়ায় সেঠে।

বহুদিন গত হলো দেশে মোবাইল এলো,ফেসবুক এলো,গুগল এলো,ধীরে ধীরে মানুষ বিচ্ছিন্নও হতে লাগলো। কেউ আর কারও ঘরের বারান্দায় সময় কাটানোর জন্য খাম্বেরী তামাক খেজেনা।একটি ফোনই সংগ দেয় সারাক্ষণ। ফোনই যেন জীবনের সব আবেগ কেড়ে নিল। আনন্দের খবর জানাতে সরাসরি দেখা করতে হয়না।দু:খ বেদনার খবরটা পেয়ে সহানুভূতি জানাতেও আর স্বশরীর উপস্তিতির প্রয়োজন পড়েনা।খুশির খবরে আত্মহারা, দু সংবাদে বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া লিখে Status দিলেই যেন সব দায় শেষ হয়ে যায়। জীবনের এই আবেগহীন সৌজন্যবোধ আজ সমাজের অলিগলি ফেলে একেবারে জীবন বোধের মধ্যে মিশে গিয়েছে।

শুনতে পেলাম রেজাউল হক মানসিক রোগী।

এক সময় নিজে মানুষের মনের রোগ, দেহের রোগের চিকিৎসা দিয়েছেন।অথচ তিনি মনের রোগী হয়ে মনের ডাক্তারের তত্বাবধানে । ডাক্তার ব্যবস্থাপত্রে লেখে দিয়েছেন আত্মহত্যা প্রবন।

যে রোগের ওষুধ নেই এ সেই রোগ। এ রোগ এমনই যে, যতই বলা হোক চিন্তা ভাবনা করবেন না। ততই চিন্তা ভাবনা আকড়ে ধরে। ভাবনা আর পিছু ছাড়ে না।কারনে অকারণে ভাবনা।ভাবনার একটা ধুম্রজালের সাগর সৃষ্টি হয়। এ সাগরের কুল কিনারা নাই।

সেদিন মাগুরা সদর হাস্পাতালের সামনে প্রচন্ড ভিড়।হাস্পাতাল কর্মী, সাধারণ জনগণ একাকার হয়ে ভিড়ের শেষ প্রান্ত হাইওয়ের সাথে মিশেছে। মানুষের মুখে কোন কথা নেই। চাপা বেদনায় একে অপরের দিকে সজল চোখে তাকায় শুধু,জিজ্ঞাসা করলে নির্বাক।বিষয়টি ভাবিয়ে তুলতেই আগ্রহের পা দুখানি ভিড়ের মধ্যে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা লোকটির দিকে নিয়ে যায়। যাকে দেখেছি, গল্প করেছি,চিনেছি,সম্মান করেছি,কখনও আবার হুকোটার কলকের নিভুনিভু আগুনে ফুঁ দিতে দিতে হাতে ধরিয়ে দিয়েছি।সেই মানুষকে চিনতে আমার অনেক কষ্ট হলো।আমার চোখকে অবিশ্বাস করে মনকে এগিয়ে দিলাম। মন চিনল,মরা ইদুরের মত পড়ে আছে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক সিংহ পুরুষ, রেজাউল হক।ব্যবচ্ছেদ হবে। কি কথা!ডাক্তারও ব্যবচ্ছেদ হবে। যিনি কত ব্যবচ্ছেদ করেছেন অথচ নিজে আজ ব্যবচ্ছেদ হতে এসেছেন।

তার এ মৃত্যু সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি। ডোম তার বিবেক জাগিয়ে কর্তব্যের বেড়াজালে নিজেকে আটকে ফেলে বলল, “যাকে সম্মান করেছি তাকে অপমান করতে চাইনে।”

তারপর অনেক দিন গেল। জীবনের মধ্যে কত জীবন অগোচরে চলে যায় সে খবর মনে রাখার মত বিবেকহীন ব্যাস্ততায় যখন মানুষকে পেয়ে বসে তখন মানুষ হয় ব্যক্তি কেন্দ্রিক। আমাদের ব্যাস্ততাও যেন ব্যক্তি কেন্দ্রিক করে ফেলল। দেখা হলে হাই হ্যলোর মধ্যেই আমরা আবদ্ধ হয়ে গেলাম।

একদিন অফিসে বসে আছি হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো, অপর প্রান্ত থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “রতন বাবু আপনার বন্ধু না?উনি মারা গিয়েছেন।”

যে মধুমতির তীরে বসে এক সময় বিকেলে আড্ডা দিতাম।সাধুর বাড়ির কাঁঠাল চাপার গন্ধে বড় ঘাট মুখরিত হয়ে উঠত। ফাগুনের জ্যোৎস্না হাত বাড়িয়ে চাদের দেশে যেতে আহবান করত। সেখানেই রতনের প্রানহীন দেহ চিতায় শুইয়ে দেয়া হলো। বউদির আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করা আর্তনাদ সব ফেলে রতন ভশ্ম হলো। একটি পরিবার একটি সংসারের সকল পাঠ চুকিয়ে বৌদি তার সন্তানদের নিয়ে চলে গেলেন।আর দাতিয়াদহে ফিরে এলেন না।চিতার ভশ্মের মত দাতিয়াদহের স্মৃতিও বৌদির নিকট যেন ছাই হয়ে গেল।কিন্তু আমি পারলাম না স্মৃতিকে ভশ্ম করে দিতে।কারন বউদির বৈদিক মন্ত্রের চেয়ে মানবত্মার মন মন্ত্র জীবনের পরতে মিলিত ছিল তাই।

নদীর কুলে যাই বর্ষায়,গ্রীষ্মে,শরতে, হেমন্তে রতনের চিতার জায়গাটি দেখি। কখনও ঘাস জমে সবুজ আবার কখনও জলে ঘাস ডুবিয়ে জলা ভূমি হয়। কিন্তু বন্ধুতের জলা ভূমিতে রতন ম্লান হয় না।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

যশোর ডিবির তিন এসআইকে আইজিপি ব্যাজ প্রদান ।

গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কাছারির গল্প- অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলম।

আপডেট সময় : ০৮:৩২:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

এক সময় এ দেশে ফেস বুক,ইন্টারনেট এর মত বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। কিন্তু বিনোদন ছিল,ছিল বিনোদনের মাধ্যম।তবে বিনোদনের এই মাধ্যম ছিল গল্প গুজব,তাস,পাশা,স্থানীয় খেলা যেমন সাত ঘুটি বাঘ বন্ধ, তে পতিয়া,লুডু, ঘুটি খেলা, যাকে আমরা ঘরোয়া খেলা ( Traditional Indoor Game)বলে থাকি এবং হুকোয় ধুম পানে সময় ক্ষেপণ যা কাছারি ,কোনো কোনো বাড়ির চওড়া বারান্দা ভিত্তিক। যে সমস্ত বাড়িতে কাছারি বানানোর সামর্থ ছিল না অথচ মানুষ তার বাড়িতে গল্প গুজব বা অবসর সময়ে আড্ডা দিতে চাইত তারা বাড়ির একটি সদর বারান্দা এ সকল মানুষের জন্য ছেড়ে দিত। সাধারণত গ্রামের নিরিবিলি, আম,জাম গাছ পরিবেষ্টিত বাড়িতেই এ রকম পরিবেশ তৈরী হতো।

এ সময়টা ছিল ১৯৮৭/৮৮ পর্যন্ত । তখন কাছারি সংস্কৃতি ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। এ সময় কিছু গ্রামের উচ্চ শিক্ষিত, যারা একটু ভিন্ন মানসিকতায়,ভিন্ন আলোচনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটি আলাদা ভূবন গ্রাম্য জীবনে সৃষ্টি করতে চাইত তারাই মূলত কোন নিরিবিলি নিরাপদ বাড়ির বারান্দা পছন্দ করে আড্ডা জমাতো। এ ধরনের বাড়ির মধ্যে দাতিয়াদহের গোপাল দত্তের বাড়ি এবং শিবপুরের নিরঞ্জন কামারের বাড়ি অন্যতম। নিরঞ্জন কামারের বাড়িতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর গোপাল দত্তের বাড়ি কয়েকজন ডাক্তার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আড্ডা বসতো।

গোপাল দত্তের বাড়িটি দাতিয়াদহের পাল পাড়ার ঘাট থেকে দক্ষিন দিকে যে রাস্তাটি খান বাড়ির পাশ দিয়ে ভেড়ি বাঁধে উঠেছে, সে রাস্তা থেকে প্রায় ১০০/১৫০ ফুট ভিতরে। যেখানে রাস্তার কোলাহল সহজে বাড়ির আংগিনায় প্রবেশ করতে পারেনা।বাড়িটি বাগান পরিবেষ্টিত। রাস্তা থেকে এক পায়ে একটি রাস্তা দুই পাশে বাঁশ ঝাড়ের মাঝ দিয়ে গোপাল দত্তের বাড়ির দক্ষিন ঘরের বারান্দায় উঠেছিল। বাঁশ ঝাড়ের উত্তর পাশে সবে একটি টিনের ঘরে ছোট শিশুদের জন্য একটি প্রাইমারি স্কুলের জীবন দানের জন্য কংকাল কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। রুহল,আজিজার,আরও কয়েকজন কারিগরের আনাগোনা দেখা যেত এ আংগিনায়। বাড়ির দক্ষিণে ফসলের ফাঁকা মাঠ। চৈত্র মাসে দক্ষিণের বাতাস ঝিরিঝিরি নাচের তালে শান্তির পরশ মেখে দিত। ঘরের উপরে বাগানের গাছের ছায়া আর দক্ষিনের বাতাসের সমন্বয় সেবায় আপ্লুত হতো আশ্রিত পথিক। এখানেই ক্ষয়িষ্ণু কাছারি জীবনের কিছু আড্ডাবাজ যুবক এ বাড়িতে আড্ডা জমাত। অন্যতম ছিলেন ডা:কাজি রেজাউল হক,মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স, মহম্মদপুর, মাগুরা,ডা:শ্যামল কুমার দাস,মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মহম্মদপুর, মাগুরা,রতন কুমার পাল, সৈয়দ রবিউল আলম (আমি)।বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষে এ আড্ডায় অংশগ্রহণ। মাঝে মধ্যে এডভোকেট সুজিত কুমার রাহা আসতেন।তখন সুজিত দা উকিল হননি।ঢাকায় একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আরও দুই জন যুবক।এ যুবকেরা মূলত আসত আমরা কি আলোচনা করি তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য।এটা ছিল তাদের অন্যতম আগ্রহ।তবে এরা নিয়মিত ছিলনা।সব মিলে বলা চলে সাত জন,যেন সপ্তর্ষি মন্ডল।তবে নিয়মিত ছিল চার জন।

এ বাড়িতে কলেজ পড়ুয়া আরও অনেক যুবকের আগমন ছিল। এ ছেলেদের দেখা মিলতো না যখন বয়ো:জেষ্ঠরা এ আড্ডায় যোগ দিত। এদের আড্ডা প্রতিদিন ছিলনা।সপ্তাহে ছুটির দিনে ডা:রেজাউল হক, শ্যামল বাবু চলে আসতেন। রেজাউল হক মহম্মদপুর থেকে একটি ক্লাস বিহীন হোন্ডা ৫০ সি,সি চালিয়ে আসতেন। শ্যমল বাবু বাড়ি থেকেই হেটে হেটে আসতেন।কখনও একটি গামছা ঘাড়ের উপর বিছিয়ে। কখনও আবার একটি গেঞ্জি গায়ে দিয়ে। এই ছুটির দিনে অন্যরা এ বাড়িতে আড্ডা দিতে আসতো না।তাই বোঝা যায়নি কারা আড্ডা জমাতো।

শ্যামল বাবুদের জন্য দত্ত বাবু টুল,আলসে,জল চৌকি প্রস্তুত করে রাখতেন সরকারি ছুটির দিনে। শ্যামল বাবু দত্ত বাড়িতে বসে থাকতেন আর রেজাউল হক মোটর সাইকেল চালিয়ে সরাসরি চলে আসতেন। ধীরে ধীরে রতন,আমি, এ দুজনের আগমন ঘটত। বর্নিত চারজনেই তখন অবিবাহিত। এ চারজনের জন্য এ আড্ডাটি ছিল আনন্দ ধামের মত।

ধাম বা আশ্রম শব্দটার আভিধানিক অর্থ যাইই হোকনা কেন ভাব অর্থ এদের নিকট ধাম বা আশ্রমেরও অধিক।

এ বারান্দায় দত্ত বাবু একটি হুকো, ডিবায় খাম্বেরী তামাক,মালসায় নিভু নিভু কাঠের কয়লার আগুন গোজ করে নিজের কাজে বেড়িয়ে পড়তেন। তিনি খাম্বেরী তামাক কেবলমাত্র শ্যামল বাবু আর রেজাউল হক সাহেবের জন্য কামারখালী থেকে কিনে নিয়ে যেতেন। শ্যামল বাবু খাম্বেরী তামাকে আগুন সংযোগ দেয়া হুকো ধীরে ধীরে টানতেন।চোখ বুজে কড়ুত কুড় কুড়ুত কুড় শব্দ করে ।কেউ গেলে কথা না বলে ইশারায় জল চৌকিতে বসতে বলতেন।টানা শেষ হলে নিজের মুখ লাগানো জায়গায় ভালো করে মুছে দিয়ে বলতেন, “নাও টানো” আবার চোখ দুটো উপরের দিকে টেনে উঠিয়ে বলতেন,” খাম্বেরী তামাক’ত একটু মজা করেই টানলাম”। তার এ কথায় মনে হতো হুকো টানা সময়টুকু তার নিকট পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সময় ছিল যেন।

রেজাউল হক এলে জমতো গল্প।সে গল্পে ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি,দর্শন আরও অনেক বিষয়। যখন বিশ্ব নেতাদের নিয়ে প্রসংগ উঠত তখন মার্ক্স,লেনিন,চে গুয়েভারা,ফিদেল ক্যাস্ত্রো,মাও সে তুং,হো চি মিন নিয়ে কথা বলতেন।এই দূটো লোককে মনে হতো যেন সব বিষয়ের অভিজ্ঞ জন। তবে ডাক্তারী বিষয় নিয়ে কম আলোচনাই হতো। রেজাউল হক জড়িত ছিলেন ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে । শ্যামল বাবু জাসদ ছাত্রলীগের সাথে।রতন, রবিউল (আমি) এ দুজন জাসদ ছাত্র লীগের সাথে।শ্যামল দা মাঝে মাঝে বলতেন, “বাড়িটা বাগানের মধ্যে হলেও একদিন বিখ্যাত হয়ে যাবে।”

রতন বলতো,”কেন দাদা”?

শ্যামল দার সোজা উত্তর, “এখান থেকেই একদিন এ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে।”

আমি বললাম, “কিভাবে”?

তারপর একটু ভেবে উত্তর, ” এখানে বসেই এদেশের সকল সমাজ তান্ত্রিক দলকে একত্রিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। এ জায়গাটা একটি উত্তম জায়গা যে কোন পরিকল্পনার জন্য।”

আমি বলতাম,” যেভাবে ধর্ম ভিত্তক দলগুলো কাজ করছে তাতে আমরা এ দেশে এগোতে পারব না।”

রেজাউল ভাই বলতেন,”নকশাল বাড়ির মত এ বাড়ি একদিন আলোচিত বাড়ি হবে।আর শ্যমল হবে কানু সান্নাল।” শ্যামল দা হুকোয় জোরে একটা দম মেরে”হুম” শব্দ করতেন। মুখের মধ্যে জমা ধূয়া উপরের দিকে ছেড়ে চোখ দুটো মিটমিট করে তাকিয়ে বলতেন,”তাইই মনে হচ্ছে।”হুকোয় টান দেওয়ার সময় তিনি তার ইচ্ছেমত কথা বলতেন, একটু থেমে থেমে হুকোয় টান, ধূয়া ছাড়তে ছাড়তে কথা,আবার টান।মুখ দিয়ে নাক দিয়ে ধূয়া বের হতো। হাতে হুকো রেখেই গান ধরতেন ভূপেন হাজারিকার গন সংগীত, কিছুদূর যেয়ে থেমে গিয়ে সাম্যবাদী কবিতা আবৃত্তি করতেন। এ সময় রেজাউল ভাই এবং অন্যদের অন্য গল্পে চলে যেতে হতো। শ্যামল দা গেয়েই চলতেন বা আবৃত্তির আবেগে ডুবে যেতেন। তার এই ভাব সাগরে নিমজ্জিত হওয়ায় কেউ বিরক্ত হতেন না। হঠাৎ তিনি বলতেন,”কাইয়ুম ,গ্রামটা খুব সুন্দর না?মনে হয় বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর গ্রাম নিশ্চিন্তপুরে আছি”। দত্তবাবুর ছেলে মেয়ের খেলা দেখলে বলতেন, “অপু দূর্গা খেলা করছে।” এখানে আলাদা একটি ভূবন সৃষ্টির পরিবেশ বিরাজিত ছিল এ কয়েকটি মানুষের নিকট। নিজেদের মধ্যে আলাদা ভূবন সৃষ্টি করতে হলে আলাদা জ্ঞান সঞ্চয় করতে হয়।তা আমাদের মধ্যে না থাকলেও শ্যমলদার মধ্যে ছিল। সেই জ্ঞানের আলো থেকেই আমরা আলোকিত ছিলাম।

কাইয়ুম আমার ডাকনাম।উওরে বলতাম, “না দাদা, শরৎ বাবুর বিলাসী গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের গ্রাম ও বাড়ির মত। একটু পরেই হয়তো বা বিলাসী আসবে মৃত্যুঞ্জয় কে সেবা করতে।” শ্যামল দা হো হো করে হেসে দিতেন। তার হাসিতে কৃত্রিমতা ছিল না। একবারে প্রান খোলা হাসি যাকে বলে।

আবার হুকোয় মুখ লাগিয়ে টানতে থাকতেন। কুড়ুত কুড় কুড়ুত কুড় হুকোর শব্দ হয়।মুখটা উঠিয়ে হাতের তালু দিয়ে হূকোয় লেগে থাকা জলের স্পর্শ মুছে রেজাউল ভাইয়ের নিকট দিলে তিনি বলতেন,”তুমি আরও টানো”।

খাম্বেরী তামাকের একটা আলাদা মৃদু গন্ধ পাশে থাকা সাথীকেও আকৃষ্ট করতো। ধীরে ধীরে শুধু বাড়ি নয় এই খাম্বেরী তামাকের সাথেও বন্ধুত্ব হয়ে গেল নিগুঢ়। তাই ছুটির দিন হলেই এই চারটি লোকের বিনোদনের এই জায়গাটা যেন স্থায়ী হয়ে গেল।

শ্যামলদার মাকে আমরা পিসি বলেই ডাকতাম।প্রায় দুই’শ বছরের পুরনো দালানের পাশেই ছিল তার খড়ের একচালা রান্না ঘর।এ বাড়িটিকে বসু বাড়ি বলে।এটা মূলত শ্যামল দার মামা বাড়ি। তার বাবার বাড়ি বোয়াল মারী থানার শেখর জমিদার বাড়ির পাশে।

দুপুরের রান্না শেষ হলে তিনি ছেলেকে খুজতে যেতেন দত্ত বাড়িতে। বয়স তখন তার ষাট বছর।কিন্তু বয়সের ভারের চেয়ে দায়িত্বের ভার যেন বেশি ছিল। দায়িত্বের ভার বেশী বলছি এ কারনে যে ছেলে বেলায় শ্যামলদার বাবা মারা যান।বিধবা জীবনে বাঙালী সমাজ ব্যাবস্থায় একজন সন্তানকে এ পর্যন্ত বয়ে আনার সংগ্রামী অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে কথাটা বললাম। তখনও তিনি তাকে চোখে চোখে রাখতে চাইতেন।তাই দুপুরের খাবার তৈরী হয়ে গেলে ছেলেকে খুজতে যেতেন। পিসিমা রাস্তা থেকেই ডাকতে থাকলে হুকোটা সরিয়ে গল্পে মেতে উঠতো সবাই। কাছে গিয়ে সস্নেহের আহবান ছিল, ” শুধু গল্প করলেই হবে? খেতে হবে টবে না?”

দুপুরের এই অন্ন ভোজনে মাতৃত্বের আহবান শুধু শ্যামল দার জন্যই ছিলনা। ছিল সবার জন্যই।তবে রতন পাল এ আহবানে সাড়া না দিয়ে উভয়কে সমর্থন জানিয়ে বাড়ি চলে যেত। সন্তান বৎসল সার্বজনীন আহবান এখন বিরল।

সবদিনেই দত্তবাবু বাড়িতে থাকতেন না।কিন্তু এ আপ্যায়নে তার স্ত্রী সমান দায়িত্ব পালন করতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি আমাদের খোজ নিতেন। কোন কিছু দরকার কি না। এনাদের পরিমল,শ্যামল, অমল, মেয়ে মমতা তখন একেবারে শিশু। কিন্তু তারা কখনও আমাদের বিরক্ত করে নাই। তারা তাদের মত খেলা করে বেড়াতো।

আমরা জীবনকে যেভাবেই ভাবিনা কেন, জীবন বলতে জগতের জন যুদ্ধের এক বিশাল জৈবিক ক্ষেত্র।এখানে নিজে তৃপ্ত হতে হয় অন্যকে তৃপ্তি দিতে হয়। তৃপ্ত ও তৃপ্তিদায়ীর মাঝখনে এক সময় একটা ফলাফলও এসে দাঁড়ায়। এ ফলাফল জীবনকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।

রেজাউল ভাই বিয়ে করলেন। তার জীবন তৃপ্ত হওয়ার বিশাল বাসনায় ব্যাকুল হয়ে উঠল।ধীরে ধীরে সামাজিক জীবনের চেয়ে ব্যাক্তি ও পারিবারিক জীবনের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।পরিবার নামক জীর্ন লতা তাকে আকড়ে ধরল। রানী মৌমাছি যেমন শ্রমিক মৌমাছিকে কৌশলে তার অনুগত করে রাখে তিনিও তাই হয়ে গেলেন। গোপাল দত্তের বাড়ির মধুর স্বাদ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।পারিবারিক মৌচাকের মধু সঞ্চয় বৃদ্ধি পেতে লাগল। তাই তার উপস্থিতিতে দীর্ঘ বিরতি পড়ল। গোপাল দত্তের বাড়ির একটি জল চৌকি প্রায়ই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেল।আমাদের আকাশ থেকে সপ্তর্ষি মন্ডলের অরুন্ধতীর বিদায়ে দিকভ্রম নাবিকের মত হয়ে গেলাম।আলোচনায় প্রানহীন নীরবতা দেখা দিল। আলোচনার ছন্দে ছন্দ পতন শুরু হোল।

আমাদের হৃদয় আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।

রেজাউল ভাইয়ের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি পিসিমার মনে মাতৃ স্নেহের শূন্যতা দেখা দিল।তিনি মন খারাপ করে শ্যামলদাকে বললেন, “হারে শ্যামল রেজাউল কি মহম্মদপুরে নেই?” কথাটি সহজ সরল হলেও কন্ঠে যেন কেমন আবেগ জড়ানো ছিল। পিসিমার কথার মধ্যে মাতৃত্বের অনুভূতি যেন জেগে উঠেছিল। তিনি মনের অজান্তেই বলে ফেলেছিলেন, “ও যে আমাকে দেখতে আসে না”। তখন আষাঢ়ের দুপুর। বাইরে আকাশে বাষ্পীভূত জলের কালো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। এ বাষ্পীভূত জল পিসিমার হৃদয় আকাশ থেকেই হয়ত প্রকৃত আকাশে গিয়েছিল।

মাতৃত্বের অনুভূতি যে ধর্মের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ নয় তা পিসিমার দিয়েই বুঝা গেল। সকল মায়ের সার্বজনীন সন্তান ভাবাবেগ বা মাতৃত্ব সকল মানব শিশুর উপর বর্ষিত হয় কিনা জানিনে তবে তার মধ্যে সর্বজনীন মাতৃত্বের অনুভূতি দেখেছিলাম। সার্বজনীন মাতৃত্ব স্বত্তার জন্ম যে ধর্ম দিয়ে হয় না। তা পিসিমার মধ্যে উপলব্ধি করেছিলাম। আর এ আলো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসেনা। এ আলো প্রকৃতি থেকে নিতে হয়। সবাই প্রকৃতি থেকে নিতে পারে না।যে পারে না তার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এ জ্ঞানের ধারনা দেওয়া। দিব্য স্বত্তার বিশাল আলোয় মানুষ আলোকিত না হলে সমাজ সংকীর্ণই থেকে যায়। আমাদের সমাজ এ আলো বিস্তৃৃত করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

আমি তখন সবে বড়রিয়া মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে বাংলা বিভাগে যোগদান করেছি।রেজাউল ভাইর আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শ্যামলদা, রতন,আমি জীবন জগতের কল্পনা আখড়ায় আলোচনার হুকোর ধূয়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিলাম। শ্যমল দা জিজ্ঞেস করলেন,”কাইয়ুম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক চরিত্র উন্নয়নের জন্য, তা কি হচ্ছে?”

কেন? এই যে কত মানুষ লেখা পড়া শিখছে।

লেখা পড়া শিখছে কিন্তু মানবিক মানুষ কি হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজকে থেকে নয়।নৈতিক গুন সম্পন্ন মানুষ কতজন তৈরী হয়েছে? যীশুর জন্মেরও পূর্বে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে মানুষকে মানবিক মানুষ রুপে গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু তা কি হয়েছে?

কেন দাদা,এত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, কত সভ্যতার জন্ম হচ্ছে।

তা ঠিক।তবে মানবিক মানুষ হচ্ছে না।তাহলে এত যুদ্ধ,হানাহানি, দূর্নীতি থাকতো না।

তাইতো দাদা!

তাইই যদি হয় তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে কি হবে?যুগ যুগ ধরে শিক্ষকেরা শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে সেই তুলনায় মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরী করতে পারে নাই।

দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর অফিসার ছাড়া অফিসে খুব কম অফিসারই হয়।এরা কি শিক্ষকদের নিকট থেকে কোন নৈতিক পাঠ নেয়নি?

আসলে এই ধরনের প্রশ্ন তার মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি।তাই মাঝে মাঝে বলতাম, “আপনিতো দার্শনিক হয়ে গিয়েছেন।আপনার আর গ্রামে থাকার দরকার নেই। ”

না।মানুষ মাত্রেই দার্শনিক। দর্শন ছাড়া মানুষ নেই।তবে আমাদের শিক্ষায় যে দর্শনের জন্ম নিচ্ছে তা ব্যক্তি কেন্দ্রিক। সামগ্রিক চিন্তার মধ্যেও ব্যক্তি কেন্দ্রিকতার ঢেউ খুজে পাওয়া যায়।লেখাপড়া না শিখলে আদিম সাম্যবাদী সমাজের বন্টন ব্যবস্থা চালু থাকতো। আমরা সবাই ভালো থাকতাম।

আমাদের এই ধরনের আলোচনায় অনেক সময় যোগ দিতে অন্য লোক আগ্রহ ভরে আসতো। যেহেতু গ্রামের কোন প্যাচাল থাকতো না তাই আগ্রহ হারিয়ে চলে যেত।আর বলতো, “কয় পাগল বসে দত্ত বাড়ি।” এমনই অনুভুতিতে অন্য লোকের নিকট আমরা উপেক্ষিত ছিলাম।

গ্রামের লোকের নিকট তখনই অবহেলিত হতে হয় যখন চিন্তা ভাবনায় ওদের মত না হওয়া হয়। কারন বেশির ভাগ গ্রামের লোকের চিন্তা ভাবনা প্রগতিশীল নয়,স্থুল।

ডা: রেজাউল মহম্মদপুর থেকে বদলী হয়ে মাগুরায় গেল। যাওয়ার সময় গরীব মানুষ গুলো খুব কান্নাকাটি করেছিল।কারন তিনি গরীবের ডাক্তার বলে খ্যাত হয়েছিলেন। রোগী দেখে কোনদিন চেয়ে ভিজিটিং ফিস নিতেন না। এমনকি রোগীরা ভিজিট হিসাবে লাউ,কুমড়াও দিত।তিনি ফিরিয়ে দিতেন না।

ধীরে ধীরে রেজাউল ভাই একেবারে সংসার সচেতন একজন মানুষ হয়ে গেলেন। এক সময় ভাবতেন মানুষের সেবার জন্য সংসার ত্যাগ করবেন।কিন্তু বিয়ের পর সংসার সাধক হয়ে গেলেন,সংসার তাকে গ্রাস করল।” সংসার বিরাগী হতে গিয়ে সংসারী হয়ে গেলেন।” কথাটি কোন লেখকের মনে নেই।

রতন পাল একটি চাকরি পেয়ে ঢাকায় চলে গেল। শ্যামল দা বদলী হয়ে আগৈলঝরা (গৈলা) চলে গেলেন।আমি বিয়ে করে মহম্মদপুর থিতু হয়ে গেলাম।

বউ নার্স।সংসার ভাল লাগতে শুরু করল। নতুন জীবন, নতুন ভূবণ, নতুন আশা, জীবনের বিশাল ভালবাসার আর ভরসার জায়গা নিয়ে মেতে উঠলাম।

দীর্ঘ বিরতি।সে সময় মোবাইল যোগাযোগ ছিল না গ্রামে।

একদিন পিসিমাকে দেখতে গেলাম।বায়ে গোপাল দত্তের বাড়ি রেখে ডাইনে শ্যামল দার বাড়ি। রাস্তা থেকে নেমে এক পেয়ে পথটি সফেদা আর নারকেল, কাঁঠাল গাছের পাশ দিয়ে সোজা দালানের পূর্ব পাশের দরজায় এসে ঠেকেছে।আমি গিয়ে ডাক দিলাম,”পিসিমা আছেন?”

উনি আহ্নিক করছিলেন। তাই সাড়া পেলাম না।আমি দাড়িয়ে রইলাম।

তিনি আহ্নিক শেষে এলেন। আমাকে দাড়ান দেখে দু:খ প্রকাশ করলেন। আমাকে বসতে দিয়ে কাদো কাদো কন্ঠে বললেন, “অনেক দিন শ্যমলের খোঁজ খবর পাচ্ছি নে।চিঠি পত্র নেই,বাড়িও আসেনা।” পচাকে দিয়ে পোস্ট অফিসে অনেক খোজ নিয়েছেন তিনি। পচা শ্যামল দার মাসতুত ভাই।আসলে চিঠি না এলে কাঊকে দিয়ে খোজ নিলে কি চিঠি পাওয়া যায়? মন বোঝেনা মায়ের মন তাই।

শ্যমল দা বরাবরই আত্মভোলা লোক। তিনি এত আত্মভোলা ছিলেন যে চুল না আঁচড়িয়েও হাস্পাতালে ঢুকতেন।

আমি ভাবলাম নিশ্চয়ই গোপাল দত্তের বাড়ির মত কোন জায়গা হয়তো পেয়ে গেছে।

গৈলা, মনসা মংগল কাব্যের রচয়িতা কবি “বিজয় গুপ্তের” জন্ম স্থান। আমার সন্দেহ হয়ত বা এই মনসা মংগল কবির বাড়ি তার মনের কোনায় গভীর ছাপ ফেলেছে তাই বাড়ির কথা প্রিয়জনের কথা ভুলে গেছে।

আমি শ্যামল দা কে খুজতে বের হলাম।কোন এক ঈদ উল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি না এসে গৈলার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম।

সে সময় বরিশাল যেতে মাগুরা থেকে প্রায় একদিন লাগতো। কয়েকটি ফেরী পার হতে হতো। সে এক বিশ্রী বিড়ম্বনা। তবে গৈলা বরিশালের আগেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। রোজার ঈদের আগের দিনের বিকেলে গৈলা হাস্পাতালে গিয়ে হাজির। খোঁজ নিতেই জানতে পারলাম তিনি সকালেই বাড়ি চলে গিয়েছেন।

আসলে ভালবাসা এমনই যে ধর্ম দিয়ে বিচার করা যায় না। ভালবাসায় খোজে ভাল মন আর ধর্ম খোজে ধর্মীয় আবেগ।ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ধর্ম বেছে নেওয়া যায় কিন্তু মানবিক মন দিয়ে মানুষ বেছে নিতে হয়।মানবিক মূল্যবোধ সর্বজনিন কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধে মানবিকতা সব সময় সর্বজনিন হয় না।সে কারণে আমরা যে ক’জন এখানে সময় কাটাতাম সবার উদার মনস্তাত্ত্বিক বোধই আলাদা আলাদা ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্বেও একটি মানবিক মূল্যবোধ জন্ম নিয়েছিল।

গৈলা হাসপাতাল থেকে ঈদের দিনে বাড়ি ফিরলাম। আত্মভোলা এই মানুষটি সত্যি বাড়ি এলো কিনা খুজতে গোপাল দত্তের বাড়ি ঢুকলাম। বাড়ির দক্ষিন বারান্দায় খাম্বেরী তামাকের গন্ধে তাকে আবিষ্কার করলাম। শ্যমল দা আমাকে দেখে হুকোর খোল থেকে মুখটা সরিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “কাইউম বসো।”

আমার অন্তর সমুদ্রে জ্বলন্ত রোষাগ্নির ধূয়া বের হতে লাগল।কিন্তু সবই সংবরন করে আমিও মৃদু স্বরে বললাম,”আমি গৈলা গিছিলাম। পিসিমার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে।এখনও বাড়ি যায়নি। ”

“হ্যাঁ, গৈলা মনসা মংগল কবির বাড়ি।জায়গাটা এমনই যে,

ওখানে গেলে সব ভুলে যেতে হয়। পথের পাঁচালী উপন্যাসে বর্ণিত প্রকৃতির মত গ্রামগুলি। আর বনের মধ্যে একপেয়ে পথ নিজেকে হারাতে মন চায়। ওখানে একটি ভাংগা পুরনো বাড়ি আছে। দেখে মনে হয় হরিহর রায়ের বাড়ি।ক্ষয়ে গেলেও আভিজাত্যের ছাপ বাড়িতে আছে।”

“ঠিক যেন বসু বাড়ি তাই না?” সব রাগ ভুলে গেলাম। রাগের সব অনুভূতি যেন জলের স্রোত হয়ে মধুমতিতে পতিত হলো।

বসু বাড়িও একদিন এ রকমই ছিল।তাদের পুকুর ঘাটে এক সময় বাইরের লোক প্রবেশ করতে পারতো না। এখন বাড়িতে একটি পাট কাঠির ব্যাড়াও নেই।জীবন জগতের এই মহাকালের যজ্ঞলীলার অনুভূতি তার মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। “চলো বাড়ি যাই” বলে উঠে পড়লেন।

দত্ত বাড়ি থেকে একপেয়ে সরু পথটা রাস্তায় গিয়ে উঠেছে। এ পথে হাটার সময় পায়ের দিকে নজর রেখে হাটতে হয়।নইলে সাপের ভয় আছে।এ কথা দত্ত বাবুই আমাদের বলেছিল। হাটতে হাটতে বললাম, “পিসিমা আপনাকে কিছু বলে নাই?”

“না”

উনি বিজ্ঞ ঋষির মত হাটতে লাগলেন আর আমি পিছনে পিছনে দেয়ালের চুন সুড়কি ক্ষয়ে যাওয়া দালানের কক্ষে প্রবেশ করলাম। পিসিমা আমাকে দেখে হেসে দিলেন। তার হাসিটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের।

শ্যামল দা চৌকির প্রান্তে বসে শার্টটা খুলছিল আর বলছিল, “রতনের খোজ জান?”

হ্যা, সে’ত বিয়ে করেছে। একা একাই। এমন সময় পিসিমাও এসে হাজির হলেন।তিনি রতনের বিয়ের খবর জেনে আমাকেও বললেন ডাক্তার বাবুর বিয়ে দিতে হবে।

শ্যামল দা বিয়ের কথা শুনে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ” এতে যে মায়ের প্রতি ভালবাসার অনুভূতি ভাগ হয়ে যাবে।” শ্যামল দা বিড় বিড় করে বললেও পিসিমা তা শুনে ফেললেন।

তাই বলে কি বিয়ে মানুষ করে না? কথা বলতে বলতে তিনি রান্না ঘরে চলে গেলেন। উননের উপর থেকে ভাতের হাড়িটা নামাতে নামাতে বললেন, “ভাত হয়ে গেছে স্নান করে এসো।”

মানুষের জীবন নানা রকম আনন্দে ভরপুর। বাঙালি বঁধুরা যে কোন উৎসবের আনন্দ জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ বলে মনে করে। আমার বউ এই শ্রেষ্ঠ আনন্দ থেকে সে বার বঞ্চিত হলো।আমার সাথে ঈদ করতে না পেরে। বুকের ব্যাথা মুখের কোনায় লুকিয়ে রেখে সেদিন পার করল।

সংসার এমনই যে পৃথিবীর সব স্বর্গালোক যেমন বিচ্ছুরিত হয়ে জীবন আনন্দময় করে তোলে আবার নরকের যন্ত্রনাও জীবনকে অন্ধকার করে দেয়। কখনও আবার শ্মশানের শূন্যতাও আচ্ছন্ন করে তোলে।আমাদের ব্যাস্ততা, সংসার স্বর্গালোক অন্ধকার নয়, যেন শূন্য শ্মশানে পরিনত হতে লাগলো। আমি আমার মধ্যে অন্যরা যে যার মধ্যে প্রবেশ করল। আমরা সবাই অন্তর্মুখী হয়ে গেলাম।

কেউই অন্তর্মুখী হতে চায় না।সময়ই মানুষকে অন্তর্মুখী করে ফেলে।আমাদের এই অন্তর্মুখী জীবনে গোপাল দত্তের বাড়ি শূন্য শ্মশান হলো।খাম্বেরী তামাকের গন্ধের আফসোস আশ পাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠল।গোপাল দত্তের হুকোটি বারান্দার বাঁশের চ্যাচাড়ি ব্যাড়ায় নি:সংগ বাতাসে অবগাহন করতে লাগলো।

আমার স্ত্রীর বদলীর সুবাদে মাগুরায় অস্থায়ী নিবাস গড়ে উঠল।শ্যামল দা,রেজাউল ভাইও এ শহরে। মাঝে মাঝে দেখা হয়,কথা হয়।কখনও কোন অফিসের মিলনায়তনে আবার কখনো রাস্তার ফুটপাতে,বাজারের গলিতে। দেখা হলে কারও কথা জিজ্ঞাসা না করলেও গোপাল দত্তের কথা একবার জিজ্ঞেস করতেন।তার আগ্রহ ছিল এ বাড়িতে আর কেউ হুকো টানতে আসে কি না? কিন্তু গোপাল দত্ত এ হুকোটি কাউকে ব্যাবহার করতে দিতেন না। যে হুকো ডাক্তাররা ব্যবহার করে সে হুকো আর কেউ ব্যাবহার করতে পারেনা। এটি মাথায় রেখে হুকোটিতে তেল মেখে রেখে দিতেন বেড়ায় সেঠে।

বহুদিন গত হলো দেশে মোবাইল এলো,ফেসবুক এলো,গুগল এলো,ধীরে ধীরে মানুষ বিচ্ছিন্নও হতে লাগলো। কেউ আর কারও ঘরের বারান্দায় সময় কাটানোর জন্য খাম্বেরী তামাক খেজেনা।একটি ফোনই সংগ দেয় সারাক্ষণ। ফোনই যেন জীবনের সব আবেগ কেড়ে নিল। আনন্দের খবর জানাতে সরাসরি দেখা করতে হয়না।দু:খ বেদনার খবরটা পেয়ে সহানুভূতি জানাতেও আর স্বশরীর উপস্তিতির প্রয়োজন পড়েনা।খুশির খবরে আত্মহারা, দু সংবাদে বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া লিখে Status দিলেই যেন সব দায় শেষ হয়ে যায়। জীবনের এই আবেগহীন সৌজন্যবোধ আজ সমাজের অলিগলি ফেলে একেবারে জীবন বোধের মধ্যে মিশে গিয়েছে।

শুনতে পেলাম রেজাউল হক মানসিক রোগী।

এক সময় নিজে মানুষের মনের রোগ, দেহের রোগের চিকিৎসা দিয়েছেন।অথচ তিনি মনের রোগী হয়ে মনের ডাক্তারের তত্বাবধানে । ডাক্তার ব্যবস্থাপত্রে লেখে দিয়েছেন আত্মহত্যা প্রবন।

যে রোগের ওষুধ নেই এ সেই রোগ। এ রোগ এমনই যে, যতই বলা হোক চিন্তা ভাবনা করবেন না। ততই চিন্তা ভাবনা আকড়ে ধরে। ভাবনা আর পিছু ছাড়ে না।কারনে অকারণে ভাবনা।ভাবনার একটা ধুম্রজালের সাগর সৃষ্টি হয়। এ সাগরের কুল কিনারা নাই।

সেদিন মাগুরা সদর হাস্পাতালের সামনে প্রচন্ড ভিড়।হাস্পাতাল কর্মী, সাধারণ জনগণ একাকার হয়ে ভিড়ের শেষ প্রান্ত হাইওয়ের সাথে মিশেছে। মানুষের মুখে কোন কথা নেই। চাপা বেদনায় একে অপরের দিকে সজল চোখে তাকায় শুধু,জিজ্ঞাসা করলে নির্বাক।বিষয়টি ভাবিয়ে তুলতেই আগ্রহের পা দুখানি ভিড়ের মধ্যে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা লোকটির দিকে নিয়ে যায়। যাকে দেখেছি, গল্প করেছি,চিনেছি,সম্মান করেছি,কখনও আবার হুকোটার কলকের নিভুনিভু আগুনে ফুঁ দিতে দিতে হাতে ধরিয়ে দিয়েছি।সেই মানুষকে চিনতে আমার অনেক কষ্ট হলো।আমার চোখকে অবিশ্বাস করে মনকে এগিয়ে দিলাম। মন চিনল,মরা ইদুরের মত পড়ে আছে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক সিংহ পুরুষ, রেজাউল হক।ব্যবচ্ছেদ হবে। কি কথা!ডাক্তারও ব্যবচ্ছেদ হবে। যিনি কত ব্যবচ্ছেদ করেছেন অথচ নিজে আজ ব্যবচ্ছেদ হতে এসেছেন।

তার এ মৃত্যু সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি। ডোম তার বিবেক জাগিয়ে কর্তব্যের বেড়াজালে নিজেকে আটকে ফেলে বলল, “যাকে সম্মান করেছি তাকে অপমান করতে চাইনে।”

তারপর অনেক দিন গেল। জীবনের মধ্যে কত জীবন অগোচরে চলে যায় সে খবর মনে রাখার মত বিবেকহীন ব্যাস্ততায় যখন মানুষকে পেয়ে বসে তখন মানুষ হয় ব্যক্তি কেন্দ্রিক। আমাদের ব্যাস্ততাও যেন ব্যক্তি কেন্দ্রিক করে ফেলল। দেখা হলে হাই হ্যলোর মধ্যেই আমরা আবদ্ধ হয়ে গেলাম।

একদিন অফিসে বসে আছি হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো, অপর প্রান্ত থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “রতন বাবু আপনার বন্ধু না?উনি মারা গিয়েছেন।”

যে মধুমতির তীরে বসে এক সময় বিকেলে আড্ডা দিতাম।সাধুর বাড়ির কাঁঠাল চাপার গন্ধে বড় ঘাট মুখরিত হয়ে উঠত। ফাগুনের জ্যোৎস্না হাত বাড়িয়ে চাদের দেশে যেতে আহবান করত। সেখানেই রতনের প্রানহীন দেহ চিতায় শুইয়ে দেয়া হলো। বউদির আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করা আর্তনাদ সব ফেলে রতন ভশ্ম হলো। একটি পরিবার একটি সংসারের সকল পাঠ চুকিয়ে বৌদি তার সন্তানদের নিয়ে চলে গেলেন।আর দাতিয়াদহে ফিরে এলেন না।চিতার ভশ্মের মত দাতিয়াদহের স্মৃতিও বৌদির নিকট যেন ছাই হয়ে গেল।কিন্তু আমি পারলাম না স্মৃতিকে ভশ্ম করে দিতে।কারন বউদির বৈদিক মন্ত্রের চেয়ে মানবত্মার মন মন্ত্র জীবনের পরতে মিলিত ছিল তাই।

নদীর কুলে যাই বর্ষায়,গ্রীষ্মে,শরতে, হেমন্তে রতনের চিতার জায়গাটি দেখি। কখনও ঘাস জমে সবুজ আবার কখনও জলে ঘাস ডুবিয়ে জলা ভূমি হয়। কিন্তু বন্ধুতের জলা ভূমিতে রতন ম্লান হয় না।