ঢাকা ০৩:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
চট্টগ্রাম বন্দরের জট কমাতে আরও ১০২ কন্টেইনার পণ্য নিলামে। ছয় দফা দাবিতে চমেক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম। নগদে প্রশাসকের ক্ষমতার অপব্যবহার! আমতলীতে নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, নিহত ২। কক্সবাজারে পৃথক অভিযানে ৮ হাজার ইয়াবাসহ ২৯৯ লিটার দেশীয় মদ উদ্ধার, আটক ৩। মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির প্রক্রিয়ায় ঘুষ দাবির অভিযোগ। পদ্মা বাঁচাতে রান ফর পদ্মা নদী সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ৪০ সংগঠনের পাশে থাকার অঙ্গীকার। কালীগঞ্জে সড়কের পাশ থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাবার দেখানো পথেই হাঁটছেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। ফুলের সুগন্ধ থেকে বিকল্প চিকিৎসা, এরোমা থেরাপির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা।

মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির প্রক্রিয়ায় ঘুষ দাবির অভিযোগ।

মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির প্রক্রিয়ায় ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও শাখার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা সংশোধনের জন্য প্রার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ না পাওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদিত নীতিমালার ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠিয়ে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষক, কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশট এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় কৃষি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ সুপারিশ পান চার শতাধিক শিক্ষক। কৃষি সহকারী শিক্ষক পদটি পূর্বে ১০ম গ্রেডভুক্ত থাকলেও নিয়োগ সুপারিশের পর মাদ্রাসার সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারি করা হয়। সেখানে পদটি ১১তম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে স্কুল পর্যায়ে একই পদ ১০ম গ্রেডেই বহাল থাকে। ফলে একই যোগ্যতা ও একই নিয়োগ সুপারিশের পরও মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকরা গ্রেড বৈষম্যের শিকার হন।বৈষম্য নিরসনের দাবিতে শিক্ষকরা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে আবেদন করেন। তিনি বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছে কল রেকর্ড এবং স্ক্রিন শট থাকলে সেগুলো আমার পিএস (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা)-এর কাছে দিয়ে যান। বিষয়টি আমি দেখব।’—দাউদ মিয়া, সচিব কারিগিরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ

গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেড সংশোধনের অগ্রগতি জানতে সচিবালয়ে যান কৃষি সহকারী পদে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষক। সেখানে তারা এমপিও শাখার উপসচিব মো. আব্দুল হান্নান এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজু আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এক শিক্ষক রাজু আহমেদের ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করে পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২৩ ফেব্রুয়ারি মুঠোফোনে যোগাযোগের সময় রাজু আহমেদ গ্রেড সংশোধনের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেন। পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি সরাসরি সাক্ষাতে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। দর-কষাকষির একপর্যায়ে দুই লাখ টাকায় সমঝোতার কথা হয় এবং এক লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

পরবর্তীতে গ্রেড বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি শুরু হলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দ্রুত ফাইল উত্থাপন করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের জন্য পাঠান। সূত্র জানায়, শিক্ষামন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফাইলটিতে অনুমোদন দেন।

শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর ভুক্তভোগী শিক্ষকরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজুর মাধ্যমে আর কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে আগ্রহ দেখাননি। এর পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ‘এটি ঠিক হয়নি’ বলে বার্তা পাঠানো হয়। যদিও ঘুষ দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজু আহমেদ। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছে কোনো টাকা চাইনি। ফাইলটি উচ্চপর্যায় থেকে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।’ আমাদের কাছে টাকা চাওয়া এবং প্রার্থীদের সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত হয়ে টাকা রেডি করার কথা বলার একাধিক কল রেকর্ড রয়েছে জানানো হলে রাজু আহমেদ আর কোনো উত্তর দেননি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির লক্ষ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কক্ষে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকে নীতিমালা জারির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এমপিও শাখার উপসচিব মো. আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষকরা দাবি করেন, পূর্বনির্ধারিত অর্থ না পাওয়ায় ফাইলটি ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হয়।

অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়েরই রয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও ফাইলটি সেখানে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। ফাইলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ফলে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির বিষয়টি থমকে যায়। এর ফলে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে এমপিওভুক্তির আবেদন করতে পারেননি চার শতাধিক কৃষি শিক্ষক। বেতন-ভাতা ছাড়াই মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

‘আমি কারো কাছে কোনো টাকা চাইনি। ফাইলটি উচ্চপর্যায় থেকে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।’ আমাদের কাছে টাকা চাওয়া এবং প্রার্থীদের সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত হয়ে টাকা রেডি করার কথা বলার একাধিক কল রেকর্ড রয়েছে জানানো হলে রাজু আহমেদ আর কোনো উত্তর দেননি’—রাজু আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এমপিও), কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (এমপিও) মো. আব্দুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘রাজু টাকা চেয়ে থাকলে সেই দায় আমার না। আপনার শাখার কর্মকর্তা টাকা চেয়েছে, টাকা না দেওয়ায় সংশোধিত নীতিমালা জারির সভায় আপনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়ার পরামর্শ দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সঠিক নয়। এ বিষয়ে আপনার সাথে আমার কোনো কথা হয়নি।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনের ফাইলটি বাজেট-১ অনুবিভাগে আসে। সেখান থেকে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন-১ শাখায় পাঠানো হয়। বাস্তবায়ন শাখা থেকে গত ১৯ মে এ বিষয়ে একটি চিঠি বাজেট-১ অনুবিভাগে পাঠানো হয়। বাস্তবায়ন-১ শাখার উপসচিব জমিলা শবনম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অনুবিভাগ হতে কোনও পদ সৃজনের সম্মতি প্রদান করা হলে বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে সে সকল পদের বেতনগ্রেড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানের বেতনগ্রেড বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে নির্ধারণ করা হয় না; এরূপ কোনও নজিরও নেই ‘

পরবর্তীতে গত ১ জুন বাজেট-১ শাখা এ বিষয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে মতামত জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। বাজেট-১ শাখার উপসচিব শিহাব উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ [ডোকেশনাল, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা টেকনোলজি (বিএমটি) ও ডিপ্লোমা] এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ এ সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদের বেতনস্কেল সংশোধনের ক্ষেত্রে একই বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে দুই ধরনের বেতনস্কেল (১০ম ও ১১তম) প্রদান করা হলে বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টি সমাধান করত: কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব এবং উপসচিব পদমর্যাদার দুইজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ নিজেরাই সমাধান করে নিতে পারত। এই ধরনের চিঠি আমাদের কাছে কেন পাঠানো হয়েছে সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। স্কুলের ক্ষেত্রে এমন কোনো চিঠি আমাদের পাঠানো হয়নি।’

ভুক্তভোগী এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের কাছে রাজু টাকা চেয়েছিল। তবে শিক্ষামন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ায় আমাদের কাজটি এমনিতেই হয়ে যাবে। এজন্য আমরা আর তার সাথে যোগাযোগ করিনি। সেজন্য এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই ফাইলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হয়। আমরা চার মাস ধরে বেতনহীন। দুইটি ঈদ গেছে। কোনো বেতন পাইনি। এমন ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

গ্রেড বৈষম্য দূর করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তার ঘুষ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছে কল রেকর্ড এবং স্ক্রিনশট থাকলে সেগুলো আমার পিএস (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা)-এর কাছে দিয়ে যান। বিষয়টি আমি দেখব।’

thedailycampus

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরের জট কমাতে আরও ১০২ কন্টেইনার পণ্য নিলামে।

মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির প্রক্রিয়ায় ঘুষ দাবির অভিযোগ।

আপডেট সময় : ১২:৩২:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির প্রক্রিয়ায় ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও শাখার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা সংশোধনের জন্য প্রার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ না পাওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদিত নীতিমালার ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠিয়ে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষক, কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশট এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সারাক্ষণ বার্তার অনুসন্ধানে জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় কৃষি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ সুপারিশ পান চার শতাধিক শিক্ষক। কৃষি সহকারী শিক্ষক পদটি পূর্বে ১০ম গ্রেডভুক্ত থাকলেও নিয়োগ সুপারিশের পর মাদ্রাসার সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারি করা হয়। সেখানে পদটি ১১তম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে স্কুল পর্যায়ে একই পদ ১০ম গ্রেডেই বহাল থাকে। ফলে একই যোগ্যতা ও একই নিয়োগ সুপারিশের পরও মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকরা গ্রেড বৈষম্যের শিকার হন।বৈষম্য নিরসনের দাবিতে শিক্ষকরা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে আবেদন করেন। তিনি বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছে কল রেকর্ড এবং স্ক্রিন শট থাকলে সেগুলো আমার পিএস (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা)-এর কাছে দিয়ে যান। বিষয়টি আমি দেখব।’—দাউদ মিয়া, সচিব কারিগিরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ

গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেড সংশোধনের অগ্রগতি জানতে সচিবালয়ে যান কৃষি সহকারী পদে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষক। সেখানে তারা এমপিও শাখার উপসচিব মো. আব্দুল হান্নান এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজু আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এক শিক্ষক রাজু আহমেদের ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করে পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২৩ ফেব্রুয়ারি মুঠোফোনে যোগাযোগের সময় রাজু আহমেদ গ্রেড সংশোধনের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেন। পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি সরাসরি সাক্ষাতে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। দর-কষাকষির একপর্যায়ে দুই লাখ টাকায় সমঝোতার কথা হয় এবং এক লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

পরবর্তীতে গ্রেড বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি শুরু হলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দ্রুত ফাইল উত্থাপন করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের জন্য পাঠান। সূত্র জানায়, শিক্ষামন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফাইলটিতে অনুমোদন দেন।

শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর ভুক্তভোগী শিক্ষকরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজুর মাধ্যমে আর কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে আগ্রহ দেখাননি। এর পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ‘এটি ঠিক হয়নি’ বলে বার্তা পাঠানো হয়। যদিও ঘুষ দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজু আহমেদ। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছে কোনো টাকা চাইনি। ফাইলটি উচ্চপর্যায় থেকে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।’ আমাদের কাছে টাকা চাওয়া এবং প্রার্থীদের সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত হয়ে টাকা রেডি করার কথা বলার একাধিক কল রেকর্ড রয়েছে জানানো হলে রাজু আহমেদ আর কোনো উত্তর দেননি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির লক্ষ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কক্ষে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকে নীতিমালা জারির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এমপিও শাখার উপসচিব মো. আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষকরা দাবি করেন, পূর্বনির্ধারিত অর্থ না পাওয়ায় ফাইলটি ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হয়।

অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়েরই রয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও ফাইলটি সেখানে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। ফাইলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ফলে সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারির বিষয়টি থমকে যায়। এর ফলে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে এমপিওভুক্তির আবেদন করতে পারেননি চার শতাধিক কৃষি শিক্ষক। বেতন-ভাতা ছাড়াই মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

‘আমি কারো কাছে কোনো টাকা চাইনি। ফাইলটি উচ্চপর্যায় থেকে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।’ আমাদের কাছে টাকা চাওয়া এবং প্রার্থীদের সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত হয়ে টাকা রেডি করার কথা বলার একাধিক কল রেকর্ড রয়েছে জানানো হলে রাজু আহমেদ আর কোনো উত্তর দেননি’—রাজু আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এমপিও), কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (এমপিও) মো. আব্দুল হান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘রাজু টাকা চেয়ে থাকলে সেই দায় আমার না। আপনার শাখার কর্মকর্তা টাকা চেয়েছে, টাকা না দেওয়ায় সংশোধিত নীতিমালা জারির সভায় আপনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়ার পরামর্শ দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সঠিক নয়। এ বিষয়ে আপনার সাথে আমার কোনো কথা হয়নি।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য নিরসনের ফাইলটি বাজেট-১ অনুবিভাগে আসে। সেখান থেকে বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন-১ শাখায় পাঠানো হয়। বাস্তবায়ন শাখা থেকে গত ১৯ মে এ বিষয়ে একটি চিঠি বাজেট-১ অনুবিভাগে পাঠানো হয়। বাস্তবায়ন-১ শাখার উপসচিব জমিলা শবনম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অনুবিভাগ হতে কোনও পদ সৃজনের সম্মতি প্রদান করা হলে বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে সে সকল পদের বেতনগ্রেড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানের বেতনগ্রেড বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে নির্ধারণ করা হয় না; এরূপ কোনও নজিরও নেই ‘

পরবর্তীতে গত ১ জুন বাজেট-১ শাখা এ বিষয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে মতামত জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। বাজেট-১ শাখার উপসচিব শিহাব উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ [ডোকেশনাল, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা টেকনোলজি (বিএমটি) ও ডিপ্লোমা] এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ এ সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদের বেতনস্কেল সংশোধনের ক্ষেত্রে একই বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে দুই ধরনের বেতনস্কেল (১০ম ও ১১তম) প্রদান করা হলে বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টি সমাধান করত: কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব এবং উপসচিব পদমর্যাদার দুইজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ নিজেরাই সমাধান করে নিতে পারত। এই ধরনের চিঠি আমাদের কাছে কেন পাঠানো হয়েছে সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। স্কুলের ক্ষেত্রে এমন কোনো চিঠি আমাদের পাঠানো হয়নি।’

ভুক্তভোগী এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের কাছে রাজু টাকা চেয়েছিল। তবে শিক্ষামন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ায় আমাদের কাজটি এমনিতেই হয়ে যাবে। এজন্য আমরা আর তার সাথে যোগাযোগ করিনি। সেজন্য এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই ফাইলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হয়। আমরা চার মাস ধরে বেতনহীন। দুইটি ঈদ গেছে। কোনো বেতন পাইনি। এমন ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

গ্রেড বৈষম্য দূর করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তার ঘুষ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনার কাছে কল রেকর্ড এবং স্ক্রিনশট থাকলে সেগুলো আমার পিএস (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা)-এর কাছে দিয়ে যান। বিষয়টি আমি দেখব।’

thedailycampus