গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গত বৃহস্পতিবার জারি করা ব্যাপক বদলি ও পদায়ন আদেশকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত বাধ্যতামূলক বিধান উপেক্ষা করে একযোগে শতাধিক পদায়ন করা হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আইনের শাসন ও সুশাসনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি হওয়া নীতিমালা কার্যকর থাকার পরও কোন আইনি ভিত্তিতে এসব পদায়ন করা হলো?
মন্ত্রণালয় কি নিজেই নিজের প্রণীত বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বদলির তালিকা তৈরিতে নীতিমালার নির্ধারিত যোগ্যতা, কর্মমেয়াদ, অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের কাজের ধারাবাহিকতা এবং শ্রেণিভিত্তিক পদায়নের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাদের দাবি, এতে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন, আবার অনেকে অস্বাভাবিক সুবিধা পেয়েছেন।
আইন যখন বলছে এক কথা, বাস্তবতা কি অন্য কথা ?
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার সংসদে অনুমোদিত হওয়ায় তা কার্যকর আইনে পরিণত হয়েছে। সেই আইনের আলোকে প্রণীত গণপূর্ত অধিদপ্তরের পদায়ন নীতিমালাও বর্তমানে বলবৎ রয়েছে।
বাংলাদেশ গেজেটে (২৩ অক্টোবর ২০২৫) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ, দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বদলির জন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা তদবিরকে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে এসব বিধান পাশ কাটিয়ে ঢালাওভাবে পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির শর্ত—মানা হয়েছে কতটুকু ?
নীতিমালার ১২ নম্বর ধারায় মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোকে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে পদায়নের সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—
জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা ও কর্মস্পৃহার ভিত্তিতে পদায়ন করতে হবে।
পদোন্নতির পর বিশেষ অনুমতি ছাড়া অন্তত দুই বছর ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণিতে কাজ না করে ‘ক’ শ্রেণির অফিসে পদায়ন করা যাবে না।
একই কর্মকর্তাকে একই পদে পরপর দুই মেয়াদ ঢাকা বা চট্টগ্রামের ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে রাখা যাবে না।
নির্দিষ্ট পদে নিয়োগের আগে মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়া বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পাঁচ বছর ‘ক’ শ্রেণিতে পদায়ন না করা, মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব না দেওয়া, চাকরির শুরুতে মাঠ ও দাপ্তরিক উভয় পর্যায়ে অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা এবং লিয়েন বা শিক্ষাছুটি শেষে মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতাও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
কাগজে নীতিমালা, বাস্তবে কি ‘ইচ্ছেমতো’ পদায়ন ?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বদলিতে এসব শর্তের অনেকগুলোই উপেক্ষিত হয়েছে। কোথাও অভিজ্ঞতা, কোথাও কর্মমেয়াদ, কোথাও আবার পদোন্নতির পর আবশ্যিক মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের শর্ত মানা হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, নীতিমালা কার্যকর থাকা অবস্থায় যদি তার মৌলিক বিধানগুলো অনুসরণ না করেই পদায়ন করা হয়, তাহলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা চাইলে এসব পদায়ন আদালতে চ্যালেঞ্জও করতে পারেন।
প্রশিক্ষণ নীতিমালার উদ্দেশ্যও কি উপেক্ষিত ?
একই গেজেটে প্রকাশিত “গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ নীতিমালা-২০২৫”-এ বলা হয়েছে, দক্ষ, নৈতিক ও পেশাদার জনবল গড়ে তোলা এবং মাঠপর্যায়, প্রকল্প, ডিজাইন ও পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমিক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। কিন্তু অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—যদি পদায়নের সময় সেই অভিজ্ঞতা ও নীতিমালার শর্তই উপেক্ষিত হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ ও পদায়ন নীতিমালার কার্যকারিতা কোথায়?
এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর চায় প্রশাসন : গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বদলি আদেশকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত পদায়ন নীতিমালার সব শর্ত কি যাচাই করা হয়েছিল ?
কোন কোন কর্মকর্তাকে বিশেষ বিবেচনায় পদায়ন করা হয়েছে এবং তার আইনি ভিত্তি কী ?
‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির পদায়নের বিধান সবক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে কি?
যেসব কর্মকর্তা নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের পদায়নের যৌক্তিকতা কী ?
নীতিমালার ব্যতিক্রম হয়ে থাকলে তার অনুমোদন কে দিয়েছেন ? এসব প্রশ্নের জবাব এখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকেই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রশাসনিক বিশ্লেষক এবং সুশাসন-সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ, রাষ্ট্রের আইন ও সরকারি গেজেট কেবল প্রকাশের জন্য নয়—বাস্তবায়নের জন্যই প্রণীত হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











