ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
খুলনায় সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সভা ২৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপি ৩ ভাগে বিভক্ত, ফিরতে চান বহিষ্কৃতরাও  গোপালগঞ্জে কলেজ শিক্ষার্থী হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার  কাঁঠালিয়ায় সংবর্ধনা পেলেন নবাগত হাফেজ হাফিজুল ইসলাম কুমারের বুকে বৈঠার ঝংকার—টেকেরহাটে ফিরল হারানো বাংলার উৎসব। ফতুল্লায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান ‎ টেকনাফে মানবপাচারের চেষ্টা ভণ্ডুল, ১৭ জন উদ্ধার আওয়ামী লীগের নৈরাজ্য মহানগর যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রদলে বিক্ষো/ভ দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টার প্রতিবাদে খুলনায় যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিটফোর্ডের মিনিয়ালস কোয়ার্টার: আজকের নাগরিক সমাবেশ যে প্রশ্নটি রেখে গেল।
বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস, আর প্রতিটি টানে অপ্রতিরোধ্য ‘বৈতরণী’।

কুমারের বুকে বৈঠার ঝংকার—টেকেরহাটে ফিরল হারানো বাংলার উৎসব।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৮:১৪:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৭ জন সংবাদটি পড়েছেন

 

নদীর নাম কুমার। অথচ আজ তার বুকে শুধু জল ছিল না—ছিল মানুষের আবেগ, ছিল শেকড়ের টান, ছিল বাংলার চিরচেনা লোকঐতিহ্যের উচ্ছ্বাস। বৈঠার ছন্দে ছন্দে আজ যেন কুমার নদী নিজেই গেয়ে উঠেছিল বাংলার পুরোনো কোনো জারি-সারি গান।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বন্দরনগরী টেকেরহাট আজ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল উৎসবের জনপদে। কুমার নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল। আকাশে মেঘ, কখনো বৃষ্টি—তবুও মানুষের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। কারণ নদীর বুকে তখন শুরু হয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ।

প্রায় ৩০টি নৌকা যখন একে একে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হলো, তখন কুমারের জলরাশিতেও যেন উত্তেজনার ঢেউ উঠল। বৈঠা হাতে মাঝিরা প্রস্তুত, নদীর দুই পাড়ে অগণিত দর্শক, আর মুহূর্তের অপেক্ষা—কখন শুরু হবে সেই কাঙ্ক্ষিত টান!

তারপরই—

“হেইয়া… হেইয়া…”

মাঝিদের সম্মিলিত হুঙ্কার, বৈঠার একসঙ্গে পানিতে পড়ার শব্দ আর দ্রুত ছুটে চলা নৌকা—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, আধুনিকতার কোলাহল পেছনে ফেলে টেকেরহাট ফিরে গেছে সেই চিরচেনা গ্রামবাংলায়, যেখানে নদী ছিল জীবনের অংশ আর নৌকা ছিল আনন্দের অন্যতম বাহন।

প্রতিটি টানে এক নাম—বৈতরণী

প্রতিযোগিতার উত্তেজনার মধ্যেই বারবার সামনে উঠে এসেছে একটি নাম—‘বৈতরণী’।

কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধাবাড়ি গ্রামের নিউটন বসুর বৈতরণী প্রতিটি টানেই দেখিয়েছে দুর্দান্ত গতি ও ছন্দ। একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নেয় বৈতরণী।

প্রথম পুরস্কার হিসেবে অর্জন করে ১৩ সিএফটি রেফ্রিজারেটর।

এ যেন শুধু একটি নৌকার জয় নয়। এটি মৃধাবাড়ির মানুষের আনন্দের জয়, মাঝিদের শ্রমের জয়, দলগত ঐক্যের জয়। নদীর বুকে বৈতরণীর ছুটে চলা আর তীর থেকে উঠে আসা উল্লাস—দুটি মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ‘আমগ্রাম এক্সপ্রেস’, যার পুরস্কার ছিল ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন।

বৃষ্টি থামাতে পারেনি উৎসব

এই আয়োজনের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্যগুলোর একটি ছিল দর্শকদের উপস্থিতি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ—বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেছেন নৌকা বাইচ।

কারও হাতে ছাতা, কেউ ভিজেছেন বৃষ্টিতে, কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন প্রিয় মুহূর্ত। কিন্তু সবার চোখ ছিল নদীর দিকে।

কারণ এটি শুধু নৌকা বাইচ ছিল না—এ ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনমেলা।

ঐতিহ্যের সঙ্গে তারুণ্যের সংযোগ

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাজির বয়াতি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং রাজৈর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওহাব আলী মিয়া, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান লেবু, যুবনেতা খায়ের হাওলাদারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া, গাঁজা ও বিভিন্ন অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে নৌকা বাইচের মতো আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদও জানানো হয়।

কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তরুণদের হাতে যদি বৈঠা থাকে, মাঠ থাকে, সংস্কৃতি থাকে, প্রতিযোগিতা থাকে—তাহলে তাদের সামনে সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের পথও উন্মুক্ত হয়।

যে বৈঠা নৌকাকে এগিয়ে নেয়, সেই বৈঠাই যেন প্রতীক হয়ে ওঠে—অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার।

নৌকা বাইচ মানে আমরা

একটি নৌকা কখনো একজনের শক্তিতে বিজয়ী হয় না। বহু মাঝির বৈঠা যখন একই ছন্দে পড়ে, তখনই নৌকা ছুটে যায় সামনে।

সমাজও তো এমনই।

ছন্দ আলাদা হলে নৌকা থেমে যায়; ঐক্যবদ্ধ হলে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

এই সহজ অথচ গভীর শিক্ষাটিই নৌকা বাইচ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়।

তাই কুমারের বুকে আজকের এই আয়োজনকে শুধু বিনোদনের চোখে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যাবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের লোকসংস্কৃতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন, সামষ্টিক আনন্দ, প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়।

উপসংহারে এটাই বলতে হয়-

দিন শেষে নদী শান্ত হবে।

বৈঠা থেমে যাবে।

নৌকাগুলো ফিরে যাবে আপন ঠিকানায়।

দর্শকেরাও ফিরবেন ঘরে।

কিন্তু কুমারের বুকের আজকের সেই দৃশ্য কি এত সহজে মুছে যাবে?

বৃষ্টিভেজা বিকেলে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস, বৈঠার ঝংকার, মাঝিদের সম্মিলিত হুঙ্কার আর সবার সামনে ছুটে চলা ‘বৈতরণী’—এসবই থেকে যাবে টেকেরহাটের স্মৃতির পাতায়।

আজ কুমার নদী শুধু একটি নৌকা বাইচ দেখেনি।

সে দেখেছে মানুষকে এক হতে।

সে দেখেছে ঐতিহ্যকে জেগে উঠতে।

সে দেখেছে বাংলার প্রাণকে আবারও বৈঠার ছন্দে ছুটতে।

আর তাই আজকের দিনটির সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো রেফ্রিজারেটর নয়, কোনো এলইডি টেলিভিশনও নয়—

সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো—কুমারের বুকে আজ আবারও বাংলার হারিয়ে যেতে বসা সেই চিরচেনা আনন্দের ঢেউ উঠেছে।

বৈতরণীর বিজয় তাই শুধু একটি নৌকার বিজয় নয়—এটি টেকেরহাটের উৎসব, কুমারের গর্ব এবং আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল পুনর্জাগরণ।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সভা ২৬ সেপ্টেম্বর

বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস, আর প্রতিটি টানে অপ্রতিরোধ্য ‘বৈতরণী’।

কুমারের বুকে বৈঠার ঝংকার—টেকেরহাটে ফিরল হারানো বাংলার উৎসব।

আপডেট সময় : ০৮:১৪:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

নদীর নাম কুমার। অথচ আজ তার বুকে শুধু জল ছিল না—ছিল মানুষের আবেগ, ছিল শেকড়ের টান, ছিল বাংলার চিরচেনা লোকঐতিহ্যের উচ্ছ্বাস। বৈঠার ছন্দে ছন্দে আজ যেন কুমার নদী নিজেই গেয়ে উঠেছিল বাংলার পুরোনো কোনো জারি-সারি গান।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বন্দরনগরী টেকেরহাট আজ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল উৎসবের জনপদে। কুমার নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল। আকাশে মেঘ, কখনো বৃষ্টি—তবুও মানুষের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। কারণ নদীর বুকে তখন শুরু হয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ।

প্রায় ৩০টি নৌকা যখন একে একে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হলো, তখন কুমারের জলরাশিতেও যেন উত্তেজনার ঢেউ উঠল। বৈঠা হাতে মাঝিরা প্রস্তুত, নদীর দুই পাড়ে অগণিত দর্শক, আর মুহূর্তের অপেক্ষা—কখন শুরু হবে সেই কাঙ্ক্ষিত টান!

তারপরই—

“হেইয়া… হেইয়া…”

মাঝিদের সম্মিলিত হুঙ্কার, বৈঠার একসঙ্গে পানিতে পড়ার শব্দ আর দ্রুত ছুটে চলা নৌকা—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, আধুনিকতার কোলাহল পেছনে ফেলে টেকেরহাট ফিরে গেছে সেই চিরচেনা গ্রামবাংলায়, যেখানে নদী ছিল জীবনের অংশ আর নৌকা ছিল আনন্দের অন্যতম বাহন।

প্রতিটি টানে এক নাম—বৈতরণী

প্রতিযোগিতার উত্তেজনার মধ্যেই বারবার সামনে উঠে এসেছে একটি নাম—‘বৈতরণী’।

কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধাবাড়ি গ্রামের নিউটন বসুর বৈতরণী প্রতিটি টানেই দেখিয়েছে দুর্দান্ত গতি ও ছন্দ। একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে নেয় বৈতরণী।

প্রথম পুরস্কার হিসেবে অর্জন করে ১৩ সিএফটি রেফ্রিজারেটর।

এ যেন শুধু একটি নৌকার জয় নয়। এটি মৃধাবাড়ির মানুষের আনন্দের জয়, মাঝিদের শ্রমের জয়, দলগত ঐক্যের জয়। নদীর বুকে বৈতরণীর ছুটে চলা আর তীর থেকে উঠে আসা উল্লাস—দুটি মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ‘আমগ্রাম এক্সপ্রেস’, যার পুরস্কার ছিল ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন।

বৃষ্টি থামাতে পারেনি উৎসব

এই আয়োজনের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্যগুলোর একটি ছিল দর্শকদের উপস্থিতি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ—বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেছেন নৌকা বাইচ।

কারও হাতে ছাতা, কেউ ভিজেছেন বৃষ্টিতে, কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন প্রিয় মুহূর্ত। কিন্তু সবার চোখ ছিল নদীর দিকে।

কারণ এটি শুধু নৌকা বাইচ ছিল না—এ ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনমেলা।

ঐতিহ্যের সঙ্গে তারুণ্যের সংযোগ

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাজির বয়াতি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং রাজৈর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওহাব আলী মিয়া, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান লেবু, যুবনেতা খায়ের হাওলাদারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া, গাঁজা ও বিভিন্ন অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে নৌকা বাইচের মতো আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদও জানানো হয়।

কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তরুণদের হাতে যদি বৈঠা থাকে, মাঠ থাকে, সংস্কৃতি থাকে, প্রতিযোগিতা থাকে—তাহলে তাদের সামনে সুস্থ বিনোদন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের পথও উন্মুক্ত হয়।

যে বৈঠা নৌকাকে এগিয়ে নেয়, সেই বৈঠাই যেন প্রতীক হয়ে ওঠে—অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার।

নৌকা বাইচ মানে আমরা

একটি নৌকা কখনো একজনের শক্তিতে বিজয়ী হয় না। বহু মাঝির বৈঠা যখন একই ছন্দে পড়ে, তখনই নৌকা ছুটে যায় সামনে।

সমাজও তো এমনই।

ছন্দ আলাদা হলে নৌকা থেমে যায়; ঐক্যবদ্ধ হলে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

এই সহজ অথচ গভীর শিক্ষাটিই নৌকা বাইচ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়।

তাই কুমারের বুকে আজকের এই আয়োজনকে শুধু বিনোদনের চোখে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যাবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের লোকসংস্কৃতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন, সামষ্টিক আনন্দ, প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়।

উপসংহারে এটাই বলতে হয়-

দিন শেষে নদী শান্ত হবে।

বৈঠা থেমে যাবে।

নৌকাগুলো ফিরে যাবে আপন ঠিকানায়।

দর্শকেরাও ফিরবেন ঘরে।

কিন্তু কুমারের বুকের আজকের সেই দৃশ্য কি এত সহজে মুছে যাবে?

বৃষ্টিভেজা বিকেলে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস, বৈঠার ঝংকার, মাঝিদের সম্মিলিত হুঙ্কার আর সবার সামনে ছুটে চলা ‘বৈতরণী’—এসবই থেকে যাবে টেকেরহাটের স্মৃতির পাতায়।

আজ কুমার নদী শুধু একটি নৌকা বাইচ দেখেনি।

সে দেখেছে মানুষকে এক হতে।

সে দেখেছে ঐতিহ্যকে জেগে উঠতে।

সে দেখেছে বাংলার প্রাণকে আবারও বৈঠার ছন্দে ছুটতে।

আর তাই আজকের দিনটির সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো রেফ্রিজারেটর নয়, কোনো এলইডি টেলিভিশনও নয়—

সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো—কুমারের বুকে আজ আবারও বাংলার হারিয়ে যেতে বসা সেই চিরচেনা আনন্দের ঢেউ উঠেছে।

বৈতরণীর বিজয় তাই শুধু একটি নৌকার বিজয় নয়—এটি টেকেরহাটের উৎসব, কুমারের গর্ব এবং আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল পুনর্জাগরণ।