আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের প্রায় শত কোটি টাকা লুটপাট করে প্রকল্প পরিচালক আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বি সি এস আই আর এর সদস্য) (যুগ্ম সচিব) এর দায়িত্ব পালন করছেন। ১৫ তম বিসিএস তথ্য ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। স্টেশন প্রকৌশলী, মনিটরিং পরিদপ্তর, বাংলাদেশ বেতার, আগারগাও, ঢাকাতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলকের তদবিরে ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে ২৫ শতাংশ কোটায় উপসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। উল্লেখ্য আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলকের স্ত্রী সম্পর্কে বালিগুরের ভাতিজি হয় অর্থাৎ বালিগুর সম্পর্কে পলকের চাচা শ্বশুর। উপসচিব হবার পর বালিগুর অধিকাংশ সময়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে পদায়িত হয়েছেন আবার ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর বগুড়ার বাসিন্দা তদবীরে পেয়েছেন পদন্নোতিও। তার বস সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জেলখানায় থাকলেও তার ডান হাত খ্যাত ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের পিডি আবুল ফাতাহ মো.বালিগুর রহমান যুগ্ম সচিব পদে পদন্নোতি নিয়ে দিব্যি সরকারী চাকুরী করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে তিনি এখন সুপার পাওয়ার কর্মকর্তা।
আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, সরকারি অর্থ লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগ যা আইসিটি মন্ত্রণালয় ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল। বালিগুর রহমান এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার নামে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে যে, প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে স্বজনপ্রীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অস্বচ্ছতা ছিল। প্রতিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল এই বালিগুর রহমানের তাই তিনি কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করতেন না। নিয়মকে অনিয়ম বানিয়ে দেশে-বিদেশে গড়েছেন অঢেল সম্পদ।
অনুসন্ধানকালে জানা যায়, জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তার ডান হাত ছিলেন বালিগুর রহমান, তখন বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৫% কমিশন নিতেন তিনি। এই কমিশন ব্যবস্থা তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন এই বালিগুর রহমান যা ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। আওয়ামী লীগের সময়ও তার সম্পর্কে অভিযোগের পাহাড় ছিল। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নিউজ করতে কেউ সাহস পেতো না। তিনি আওয়ামী সুবিধাভোগি একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোসর বলে মন্তব্য করেছেন আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
আইসিটি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যে সব প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে: বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অধীনে ৮৩৭ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (১১টি) প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত), ১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার জেলা পর্যায়ে আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন (১২ জেলায়) (প্রথম সংশোধিত), ৫৩৩ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প, ৪৩১ কোটি টাকার বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত), ৩৫৩ কোটি টাকার ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প, ৭৪ কোটি টাকার বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সেবা ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ (বিডিসেট) কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাকরণ শীর্ষক প্রকল্প, ১ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (১৪টি) প্রকল্প। দুর্নীতি দমন কমিশন এ সব প্রকল্পের ফাইল জব্দ করে তদন্ত শুরু করেছে।
প্রতিমন্ত্রী পলক জেলে পিডি বালিগুর রহমান বহাল তবিয়তে!
উল্লেখিত দুর্নীতির জন্য আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, স্বৈরাচারের দোসর জুনায়েদ আহমেদ পলক গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় থাকলেও ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের পিডি বালিগুর রহমান যুগ্ম সচিব পদে পদন্নোতি নিয়ে প্রথমে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে পদায়িত হন। পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কেনাকাটায় ই-জিপি না করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করে সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে বিপুল পরিমান অর্থের মালিক হন। এছাড়াও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্পে নিয়োজিত অন্যান্য কর্মকর্তাদের সহায়তায় ঠিকাদারদেরকে তদন্ত কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয় ও দুদকের ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেন। এজি অফিস ও অডিট বাবদ ৪ শতাংশ অর্থ তিনি, পিডি আবুল বাশার এবং প্রকল্পের লেঃ কমান্ডার রাকিব মিলে আদায় করেন। পরবর্তীতে ঠিকাদারগন এজি অফিস ও অডিটে যোগাযোগ করলে জানতে পারে যা এসব অফিসে কোনও অর্থ প্রদান করা হয় নাই অর্থাৎ এই তিনজনের সিন্ডিকেট এই অর্থ আত্মসাৎ করেন। এই একই সিন্ডিকেট শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার পরও ঠিকাদারদের পিজি অথবা এজি অফিসে কর্তনকৃত ১০ শতাংশ অর্থ ছাড় করার জন্য পিজি বা কর্তনকৃত অর্থের অর্ধেক দাবি করে বছর ঘুরাতে থাকেন। তদন্ত কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে তিনি ঠিকাদারদের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে মন্ত্রণালয় ও দুদকের ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং যেসব ঠিকাদার দাবীকৃত অর্থ দিতে পারে নাই তাদের বিরুদ্ধে মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে হয়রানির সম্মুখীন করেছেন। প্রকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থায়ীকরণের জন্য পিডি আবুল বাশার এবং সহকারি পরিচালক শাহাদাতের সিন্ডিকেট ১ কোটি টাকা দাবি করে। প্রকল্পে কর্মরত গরীব অসহায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা টাকা দিতে ব্যর্থ হলে এই সিন্ডিকেট তাদের ৩ ঘণ্টার নোটিশে চাকরীচ্যুত করেন। এছাড়াও পরিচালক প্রশাসন বালিগুর রহমান সহকারি পরিচালক সাহাদাতের যোগসাজশে জনপ্রতি ১ লক্ষ টাকা এবং মাসিক মাসোয়ারার ভিত্তিতে বিভিন্ন লোভনীয় জায়গায় কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন করে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেন। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে বালিগুর রহমানকে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাকে আরও আকর্ষণীয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে সদস্য পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় অবাক হয়েছেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা। তাদের প্রশ্ন একই অপরাধে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জেলখানায় থাকলেও ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের পিডি বালিগুর রহমান কিভাবে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ এর সদস্য এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) প্রকল্পের সাবেক পিডি আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ মিথ্যা। ঢাকা শহরে আমার এক ছটাক জমিও নেই। তবে আমাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, তিনি ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় ৩ হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। রাজশাহী এবং বগুড়াতে তিনি নামে-বেনামে প্রচুর সম্পদ ক্রয় করেছেন। তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারদের মাধ্যমেও বিদেশেও প্রচুর টাকা পাচার করেছেন। সর্বপরি-তিনি আওয়ামী লীগের একজন সুবিধাভোগি কর্মকর্তা এবং স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন। আইসিটি ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও ইনোভেশন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিড) সহ তিনি ২০১৮ সাল থেকে যেসব প্রকল্পে তিনি জড়িত ছিলেন সেই ফাইলগুলো দুদকের মাধ্যমে নীরিক্ষা করলেই তিনি ফেঁসে যাবেন এটা নিশ্চিত।
রোস্তম মল্লিক 













