ঢাকা ০২:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
ন্যাম ভবনের নীরব ফ্ল্যাটে এক তরুণীর মৃত্যু: প্রশ্নের ভার, সত্যের অপেক্ষা। শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যুব সংলাপ নেত্রকোনায় ধারের টাকা ফেরত চাওয়ায় নাীরকে হত্যার হুমকি প্রধান শিক্ষকের, থানায় অভিযোগ  গীতার আলোয় নৈতিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়ার প্রত্যয়ে ‘গীতারধ্বনি’ পুরস্কার বিতরণী ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লীতে মাদক সেবনের দায়ে একজনের ১৫ দিন, দুজনের ২ দিনের কারাদণ্ড বেনাপোলে পাসপোর্ট যাত্রীর শরীরে লুকিয়ে রাখা ৮২ গ্রাম স্বর্ণসহ কাস্টমস গোয়েন্দার হাতে আটক  কক্সবাজারে প্রাইভেটকারের নিচে ৮৯ হাজার ইয়াবা, আটক ১ সীমান্তে মিলল নিখোঁজ শিশু শাকিলের মরদেহ নড়াইল সদর থানা পুলিশের অভিযানে দেশীয় অস্ত্রসহ ১১ জন গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় Climate Resilient Campus Initiative এর আওতায় আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মাশরুম চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা নারীর আত্ম মর্যাদা ও সম্মানের মূর্ত প্রতীক।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:৪১:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩৭৫ জন সংবাদটি পড়েছেন

 

মাত্র ১৭ বছর বয়সী কিশোরী ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা যে ইতালির আইন পাল্টে দিয়েছিলো চিরতরে।সালটি ছিল ১৯৬৫ ।তাকে বলা হয়েছিলো তার ধ’র্ষককে বিয়ে করতে, সে বলেছিলো “না।”

সিসিলি ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা নামের কিশোরী দাঁড়িয়ে ছিল লাল-চোখা সমাজের মাঝখানে, যে-সমাজ তাকে আদেশ দিলো মানসম্মান ফিরে পেতে চাইলে লোকটাকে বিয়ে করো। নষ্টা হয়ে গেছ তুমি। পুরুষ একটুআধটু এসব করেই। সে তোমাকে ধ’র্ষণ করেছে তো কী হয়েছে, বিয়ে করতে চাইছে সে তোমাকে। এ তোমার সাত-জনমের সৌভাগ্য। বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও। ফ্রাঙ্কা রাজি হলো না। এভাবে নিঃশব্দে দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যেতে সে রাজি হলো না। ফিলিপ্পো মেলোডিয়া নামের এক মাফিয়া-সদস্যের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার পর, ফ্রাঙ্কাকে অপহরণ করে অমানুষিক নির্যাতন করা হলো, এবং দীর্ঘ আট-দিন আট-রাত আটকে রেখে অকথ্য যৌ’ন নিপীড়ন করলো ফিলিপ্পো, একটিই দাবিতে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার বেয়াদবি মাফ করে দেবো, যদি আমাকে বিয়ে করো।

রাজি হলো না ফ্রাঙ্কা। অতএব, তাকে উদ্ধারের পরে এবার চাপ দিলো সমাজ ও নিজের পরিবার বিয়ে করো তাকে, মানসম্মান বাঁচাও।

ওসময়, ইতালির আইনের ধারা-৫৪৪ অনুযায়ী ধ’র্ষক যদি ধর্ষিতাকে বিয়ে করে, তাহলে শাস্তি মওকুফ হয়ে যেতো ধ’র্ষকের। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিলো এতে করে নারীর সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা যাবে।

কী বিকৃত মানসিকতার বিধি! সম্মান পুনরুদ্ধার করছে ন্যায়বিচার না-করে!

তো, সমাজের ও পরিবারের চাপের মুখেও মাত্র ১৭ বছরের কিশোরী স্পষ্ট বলে দিলো: “না।”

ফ্রাঙ্কা সেই কাজটি করলো, ইতালির ইতিহাসে এর আগে কেউ করতে সাহস করেনি! “না।”…

“না।”

জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়াকে ‘না’। হাস্যকর সম্মান পুনরুদ্ধারকে ‘না’। লজ্জা? ‘না।’ ধ’র্ষককে বাঁচিয়ে দেওয়াকে “না।”

তার জেদ আগুন জ্বালিয়ে দিলো ইতালি-জুড়ে! সমাজ তাকে একঘরে করলো। তাদের শস্যক্ষেত পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো। কিন্তু পিছিয়ে এলো না ফ্রাঙ্কা।

১৯৬৬ সালে, আদালতে মামলা করলো ফ্রাঙ্কা। মামলায় জিতে গেলো। ধ’র্ষক ফিলিপ্পোর ১১ বছরের কারাদণ্ড হলো। এবং ফ্রাঙ্কা হয়ে গেলো ইতালির প্রথম নারী, যে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলো ‘সম্মান-রক্ষার বিবাহ’-এর মতো জংলী প্রথাটিকে।

ঐ মামলার বিচার-প্রক্রিয়াটি বিশ্বজুড়ে হইচই তুলেছিলো। তৎকালীন পোপ ৬ষ্ঠ পল এবং ইতালির তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়োসেপ্পে সারাগাত, দু’বিশ্বনেতাই, প্রশংসা করেছিলেন ফ্রাঙ্কার সাহসের। যদিও ফ্রাঙ্কা এইসব খ্যাতি-শিরোনাম-শংসা’র কিছুই চায়নি, সে শুধু চেয়েছিলো ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা। যা আদায় করে নিয়েছিলো সে।

অমর্যাদাপূর্ণ আইনটি পুরোপুরি বাতিল হতে লেগেছিলো আরও ১৫ বছর। অবশেষে, ১৯৮১ সালে বিলুপ্ত হলো নির্যাতিতাকে অসম্মান করে নির্যাতনকারীকে রক্ষা করার উদ্ভট আইনটি। ১৯৬৮ সালে, ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা বিয়ে করলো তার বাল্যবন্ধু জিউসেপ্পে-কে। যে-জিউসেপ্পে তার বন্ধু ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা’র এই লড়াইয়ের সময় একবারের জন্যও বলেনি ‘তুমি ধ’র্ষিতা’, বারেবার বলেছিলো “তুমি যোদ্ধা।”

পুরুষ! ফিলিপ্পোও পুরুষ, জিউসেপ্পেও পুরুষ। সত্যিকার পুরুষ আছে জগতে। সত্যিকার নারীর জন্য।

আজ, ‘ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা’ নামটি মানবেতিহাসে অমর, যে-নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়: মেনে নেওয়ায় আত্মসম্মান নেই, আত্মসম্মান প্রতিবাদে। সে ছিল ১৭ বছর বয়সী। কিশোরী। সমাজ তাকে বলেছিলো নত হতে। সে বলেছিলো “না”।

এবং ইতালি পাল্টে গেলো চিরতরে। ঘোষিত হলো নারীর আত্ম মর্যাদা ও আত্ম সম্মানের জয় ডঙ্কা।ফ্রাঙ্কা হয়ে উঠলো নারী জাগরণের অগ্রদূত।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

ন্যাম ভবনের নীরব ফ্ল্যাটে এক তরুণীর মৃত্যু: প্রশ্নের ভার, সত্যের অপেক্ষা।

ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা নারীর আত্ম মর্যাদা ও সম্মানের মূর্ত প্রতীক।

আপডেট সময় : ০৩:৪১:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

 

মাত্র ১৭ বছর বয়সী কিশোরী ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা যে ইতালির আইন পাল্টে দিয়েছিলো চিরতরে।সালটি ছিল ১৯৬৫ ।তাকে বলা হয়েছিলো তার ধ’র্ষককে বিয়ে করতে, সে বলেছিলো “না।”

সিসিলি ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা নামের কিশোরী দাঁড়িয়ে ছিল লাল-চোখা সমাজের মাঝখানে, যে-সমাজ তাকে আদেশ দিলো মানসম্মান ফিরে পেতে চাইলে লোকটাকে বিয়ে করো। নষ্টা হয়ে গেছ তুমি। পুরুষ একটুআধটু এসব করেই। সে তোমাকে ধ’র্ষণ করেছে তো কী হয়েছে, বিয়ে করতে চাইছে সে তোমাকে। এ তোমার সাত-জনমের সৌভাগ্য। বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও। ফ্রাঙ্কা রাজি হলো না। এভাবে নিঃশব্দে দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যেতে সে রাজি হলো না। ফিলিপ্পো মেলোডিয়া নামের এক মাফিয়া-সদস্যের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার পর, ফ্রাঙ্কাকে অপহরণ করে অমানুষিক নির্যাতন করা হলো, এবং দীর্ঘ আট-দিন আট-রাত আটকে রেখে অকথ্য যৌ’ন নিপীড়ন করলো ফিলিপ্পো, একটিই দাবিতে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার বেয়াদবি মাফ করে দেবো, যদি আমাকে বিয়ে করো।

রাজি হলো না ফ্রাঙ্কা। অতএব, তাকে উদ্ধারের পরে এবার চাপ দিলো সমাজ ও নিজের পরিবার বিয়ে করো তাকে, মানসম্মান বাঁচাও।

ওসময়, ইতালির আইনের ধারা-৫৪৪ অনুযায়ী ধ’র্ষক যদি ধর্ষিতাকে বিয়ে করে, তাহলে শাস্তি মওকুফ হয়ে যেতো ধ’র্ষকের। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিলো এতে করে নারীর সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা যাবে।

কী বিকৃত মানসিকতার বিধি! সম্মান পুনরুদ্ধার করছে ন্যায়বিচার না-করে!

তো, সমাজের ও পরিবারের চাপের মুখেও মাত্র ১৭ বছরের কিশোরী স্পষ্ট বলে দিলো: “না।”

ফ্রাঙ্কা সেই কাজটি করলো, ইতালির ইতিহাসে এর আগে কেউ করতে সাহস করেনি! “না।”…

“না।”

জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়াকে ‘না’। হাস্যকর সম্মান পুনরুদ্ধারকে ‘না’। লজ্জা? ‘না।’ ধ’র্ষককে বাঁচিয়ে দেওয়াকে “না।”

তার জেদ আগুন জ্বালিয়ে দিলো ইতালি-জুড়ে! সমাজ তাকে একঘরে করলো। তাদের শস্যক্ষেত পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো। কিন্তু পিছিয়ে এলো না ফ্রাঙ্কা।

১৯৬৬ সালে, আদালতে মামলা করলো ফ্রাঙ্কা। মামলায় জিতে গেলো। ধ’র্ষক ফিলিপ্পোর ১১ বছরের কারাদণ্ড হলো। এবং ফ্রাঙ্কা হয়ে গেলো ইতালির প্রথম নারী, যে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলো ‘সম্মান-রক্ষার বিবাহ’-এর মতো জংলী প্রথাটিকে।

ঐ মামলার বিচার-প্রক্রিয়াটি বিশ্বজুড়ে হইচই তুলেছিলো। তৎকালীন পোপ ৬ষ্ঠ পল এবং ইতালির তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়োসেপ্পে সারাগাত, দু’বিশ্বনেতাই, প্রশংসা করেছিলেন ফ্রাঙ্কার সাহসের। যদিও ফ্রাঙ্কা এইসব খ্যাতি-শিরোনাম-শংসা’র কিছুই চায়নি, সে শুধু চেয়েছিলো ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা। যা আদায় করে নিয়েছিলো সে।

অমর্যাদাপূর্ণ আইনটি পুরোপুরি বাতিল হতে লেগেছিলো আরও ১৫ বছর। অবশেষে, ১৯৮১ সালে বিলুপ্ত হলো নির্যাতিতাকে অসম্মান করে নির্যাতনকারীকে রক্ষা করার উদ্ভট আইনটি। ১৯৬৮ সালে, ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা বিয়ে করলো তার বাল্যবন্ধু জিউসেপ্পে-কে। যে-জিউসেপ্পে তার বন্ধু ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা’র এই লড়াইয়ের সময় একবারের জন্যও বলেনি ‘তুমি ধ’র্ষিতা’, বারেবার বলেছিলো “তুমি যোদ্ধা।”

পুরুষ! ফিলিপ্পোও পুরুষ, জিউসেপ্পেও পুরুষ। সত্যিকার পুরুষ আছে জগতে। সত্যিকার নারীর জন্য।

আজ, ‘ফ্রাঙ্কা ভিয়োলা’ নামটি মানবেতিহাসে অমর, যে-নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়: মেনে নেওয়ায় আত্মসম্মান নেই, আত্মসম্মান প্রতিবাদে। সে ছিল ১৭ বছর বয়সী। কিশোরী। সমাজ তাকে বলেছিলো নত হতে। সে বলেছিলো “না”।

এবং ইতালি পাল্টে গেলো চিরতরে। ঘোষিত হলো নারীর আত্ম মর্যাদা ও আত্ম সম্মানের জয় ডঙ্কা।ফ্রাঙ্কা হয়ে উঠলো নারী জাগরণের অগ্রদূত।