ঢাকা ১২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাঁধে দুর্নীতির ভুত: চার মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের টেন্ডারের ফাইল! নিকরাইল বেগম মমতাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভাষা কর্মশালা ও মুক্ত পাঠাগার উদ্বোধন। নড়াইলের লোহাগড়ায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গাছ কর্তন। প্রায় ২০ কোটি টাকার স্থাপনার হদিস নেই, রামেবি ক্যাম্পাসে লুটপাটের অভিযোগ। লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং প্রগ্রেসিভ ওয়েস্ট’র উদ্যোগে ফ্রি চক্ষু শিবির ও মেডিক্যাল ক্যাম্প সম্পন্ন। আখাউড়ায় বিশেষ অভিযানে উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি গ্রেপ্তার একটি স্বপ্নের নাম মর্ম মাধুর্য বসু (তাথৈ) শুভ জন্মদিন, আমাদের প্রাণের আলো। হাওর ভ্রমণ মুহূর্তেই রূপ নিল আজীবনের শোকে। যে বাবা পরিবারের সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়েই বাঁচিয়ে গেলেন মেয়েকে! কালিগঞ্জ উপজেলাস্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকর্মীর হামলায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আহত একজন শিক্ষকের হাতজোড়, একদল শিক্ষার্থীর কান্না—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক নির্মম প্রশ্ন।

গণপূর্তে ‘মাছের খামার’ রহস্য : ৮০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদে দুদকের চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত আমিনুল।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:১৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২২১ জন সংবাদটি পড়েছেন

 

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মোঃ আমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।

প্রজ্ঞাপন নং-২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০০২.১৮-২০, তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এ বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় আদালত ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে চার্জশিট গ্রহণ করায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৯(২) অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।

মামলার পটভূমি: সম্পদ বিবরণীতে ‘মাছের আয়’ ১ কোটির বেশি!দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, মামলা নং-১৬ (তারিখ: ২৫/০৯/২০২৩)–এ তদন্ত শেষে চার্জশিট নং-২৩ (তারিখ: ২০/০৩/২০২৫) দাখিল করা হয়। অভিযোগ—মোঃ আমিনুল ইসলাম (৪৩/৪৫), উপ-সহকারী প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭ (সাবেক), ঢাকা; বর্তমান কর্মস্থল টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগ—নিজ সম্পদ বিবরণীতে ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে মোট ১,০৪,১৪,৭৬০ টাকা আয় দেখান। তদন্তে বলা হয়, ১৯০ একর পুকুর শ্রেণীর জমি (বাৎসরিক ৩০,০০০ টাকা চুক্তি, ৫ বছর) এবং পরবর্তীতে ১.৭০ ও ১.৯০ একর পুকুর—এভাবে একাধিক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিজ নেওয়ার দাবি করা হয়। কাগজে-কলমে ৬ বছরে মাছ বিক্রি থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ১৯–২০ লাখ টাকা করে আয় দেখানো হয়েছে।

তদন্তে গড়মিল: আয়কর রিটার্ন নেই, উৎপাদন-ব্যয়ের রেকর্ডও না !

দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অসঙ্গতি উঠে আসে—

২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্নের তথ্য মেলেনি, কেবল ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের নথি পাওয়া যায়। কর সার্কেল-৭৬ (বৈতনিক), কর অঞ্চল-০৪, ঢাকা—এর সহকারী কর কমিশনার লিখিতভাবে রিটার্ন না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরিদর্শনে দেখা যায়, পুকুরে নিবিড় মাছ চাষের প্রমাণ, উৎপাদন-বিক্রির হিসাব, পোনা/খাদ্য/শ্রমিক ব্যয়ের রেকর্ড—কোনোটিই উপস্থাপন করা যায়নি।

উল্লেখিত ১.৯০ একর পুকুরের বাস্তব পরিমাণ খতিয়ান অনুযায়ী প্রায় ৭৬ শতাংশ পাওয়া যায়—অর্থাৎ আয় দেখানোর সঙ্গে জমির পরিমাণে অসামঞ্জস্য।সম্পদের হিসাব-নিকাশ : ৮০,৮১,০২৩ টাকা ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ ।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদ ১,২৭,৩৫,৭২১ টাকা; পারিবারিক ব্যয় ১২,০০,৫৯৪ টাকা বাদে নিট সম্পদ ১,৫৯,০৬,০১৫ টাকা ধরা হয়। গ্রহণযোগ্য আয় ৫৮,৫৫,২৯২ টাকা বিবেচনায় ৮০,৮১,০২৩ টাকা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মত দেয় দুদক। এ প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

জব্দ তালিকা ও সাক্ষ্য: কর নথি উদ্ধার : ২৯/০২/২০২৪ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পুরাতন ভবন (সেগুনবাগিচা) থেকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের আয়কর রিটার্নের কপি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র জব্দ করা হয়। অফিস সহকারী ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিকদের জবানবন্দীতে রিটার্ন অনুপস্থিতির বিষয়টি পুনরায় উঠে আসে। জব্দতালিকা প্রস্তুত করে নথি জিম্মায় নেওয়া হয়।

আদালতের গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ : চার্জশিট ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে আদালতে গৃহীত হওয়ার পর ২৩/০২/২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয় সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।”

কাগজে-কলমে দেখানো কোটি টাকার মাছের আয়—বাস্তবে তার প্রমাণ কোথায় ? টানা চার করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনুপস্থিত কেন ? জমির পরিমাণে গড়মিল থাকলে আয় গণনায় কীভাবে এত উচ্চ অঙ্ক দেখানো হলো ? গণপূর্তের একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলী পদে থেকে এমন সম্পদ বৃদ্ধির উৎস কী ?

এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন আদালতের বিবেচনায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ড, আর প্রমাণিত না হলে অব্যাহতি—দুই পথই খোলা। তবে ‘মাছের খামার’ ঘিরে কোটি টাকার এই আর্থিক রহস্য ইতোমধ্যেই গণপূর্ত অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাঁধে দুর্নীতির ভুত: চার মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের টেন্ডারের ফাইল!

গণপূর্তে ‘মাছের খামার’ রহস্য : ৮০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদে দুদকের চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত আমিনুল।

আপডেট সময় : ০৯:১৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মোঃ আমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।

প্রজ্ঞাপন নং-২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০০২.১৮-২০, তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এ বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় আদালত ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে চার্জশিট গ্রহণ করায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৯(২) অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।

মামলার পটভূমি: সম্পদ বিবরণীতে ‘মাছের আয়’ ১ কোটির বেশি!দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, মামলা নং-১৬ (তারিখ: ২৫/০৯/২০২৩)–এ তদন্ত শেষে চার্জশিট নং-২৩ (তারিখ: ২০/০৩/২০২৫) দাখিল করা হয়। অভিযোগ—মোঃ আমিনুল ইসলাম (৪৩/৪৫), উপ-সহকারী প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭ (সাবেক), ঢাকা; বর্তমান কর্মস্থল টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগ—নিজ সম্পদ বিবরণীতে ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে মোট ১,০৪,১৪,৭৬০ টাকা আয় দেখান। তদন্তে বলা হয়, ১৯০ একর পুকুর শ্রেণীর জমি (বাৎসরিক ৩০,০০০ টাকা চুক্তি, ৫ বছর) এবং পরবর্তীতে ১.৭০ ও ১.৯০ একর পুকুর—এভাবে একাধিক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিজ নেওয়ার দাবি করা হয়। কাগজে-কলমে ৬ বছরে মাছ বিক্রি থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ১৯–২০ লাখ টাকা করে আয় দেখানো হয়েছে।

তদন্তে গড়মিল: আয়কর রিটার্ন নেই, উৎপাদন-ব্যয়ের রেকর্ডও না !

দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অসঙ্গতি উঠে আসে—

২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্নের তথ্য মেলেনি, কেবল ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের নথি পাওয়া যায়। কর সার্কেল-৭৬ (বৈতনিক), কর অঞ্চল-০৪, ঢাকা—এর সহকারী কর কমিশনার লিখিতভাবে রিটার্ন না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরিদর্শনে দেখা যায়, পুকুরে নিবিড় মাছ চাষের প্রমাণ, উৎপাদন-বিক্রির হিসাব, পোনা/খাদ্য/শ্রমিক ব্যয়ের রেকর্ড—কোনোটিই উপস্থাপন করা যায়নি।

উল্লেখিত ১.৯০ একর পুকুরের বাস্তব পরিমাণ খতিয়ান অনুযায়ী প্রায় ৭৬ শতাংশ পাওয়া যায়—অর্থাৎ আয় দেখানোর সঙ্গে জমির পরিমাণে অসামঞ্জস্য।সম্পদের হিসাব-নিকাশ : ৮০,৮১,০২৩ টাকা ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ ।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদ ১,২৭,৩৫,৭২১ টাকা; পারিবারিক ব্যয় ১২,০০,৫৯৪ টাকা বাদে নিট সম্পদ ১,৫৯,০৬,০১৫ টাকা ধরা হয়। গ্রহণযোগ্য আয় ৫৮,৫৫,২৯২ টাকা বিবেচনায় ৮০,৮১,০২৩ টাকা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মত দেয় দুদক। এ প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

জব্দ তালিকা ও সাক্ষ্য: কর নথি উদ্ধার : ২৯/০২/২০২৪ তারিখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পুরাতন ভবন (সেগুনবাগিচা) থেকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের আয়কর রিটার্নের কপি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র জব্দ করা হয়। অফিস সহকারী ও সাঁট মুদ্রাক্ষরিকদের জবানবন্দীতে রিটার্ন অনুপস্থিতির বিষয়টি পুনরায় উঠে আসে। জব্দতালিকা প্রস্তুত করে নথি জিম্মায় নেওয়া হয়।

আদালতের গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ : চার্জশিট ০৭/০৭/২০২৫ তারিখে আদালতে গৃহীত হওয়ার পর ২৩/০২/২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয় সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।”

কাগজে-কলমে দেখানো কোটি টাকার মাছের আয়—বাস্তবে তার প্রমাণ কোথায় ? টানা চার করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনুপস্থিত কেন ? জমির পরিমাণে গড়মিল থাকলে আয় গণনায় কীভাবে এত উচ্চ অঙ্ক দেখানো হলো ? গণপূর্তের একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলী পদে থেকে এমন সম্পদ বৃদ্ধির উৎস কী ?

এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন আদালতের বিবেচনায়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ড, আর প্রমাণিত না হলে অব্যাহতি—দুই পথই খোলা। তবে ‘মাছের খামার’ ঘিরে কোটি টাকার এই আর্থিক রহস্য ইতোমধ্যেই গণপূর্ত অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে।