ঢাকা ১০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ। ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা? ১৫ আগস্ট: গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া। হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ৭ মাসে ৪৫২ জন আটক, খুশি সচেতন মহল। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। যশোরের বাঘারপাড়ায় পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ গ্রাম। রূপগঞ্জে দেবরের হামলায় ভাবী নিহত গ্রেফতার ৩। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পেলেন ইউপি সদস্য। ১৭ দেশে ২৫ বার ভ্রমণ, ১৭ বছর পেকুতে—গণপূর্ত প্রকৌশলী কাজী ফিরোজকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়।

শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা হোক।

 

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষে, রাজনৈতিক মঞ্চে নয়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি সংকটকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত বিতর্কের চেয়ে রাজনৈতিক দোষারোপই বেশি আলোচিত হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, সমালোচিত হতে পারে, এমনকি ভুল প্রমাণিত হলে তা সংশোধনও হতে পারে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেই পদত্যাগ একমাত্র সমাধান—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আগে নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করতে হবে—ব্যর্থতা কোথায়, কার, এবং কতটুকু।

একটি জাতীয় পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করা কখনোই কেবল একজন মন্ত্রীর একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দায়িত্বের ওপরই এর সফলতা নির্ভর করে। কোনো জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা গ্রহণে বাস্তব সমস্যা থাকলে, সেই তথ্য যথাসময়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যদি সেই প্রক্রিয়ায় কোথাও ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত। অন্যথায় প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না; বরং একই ভুল বারবার ফিরে আসবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আরেকটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়—বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে অতীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতায় এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে কোনো সাবেক বা বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, শিক্ষার মান, নীতির প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের আলোকে। রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিরোধিতার ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা হলে শিক্ষা নয়, রাজনীতিই লাভবান হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি। নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি সেই নীতির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ের তথ্য যদি সঠিকভাবে কেন্দ্রে না পৌঁছায়, অথবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকে, তাহলে নীতিগতভাবে সঠিক সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই ব্যক্তি-নির্ভর সমালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গণতন্ত্রে সমালোচনা অপরিহার্য, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমাধানমুখী। একজন মন্ত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতা যেমন আলোচনার বিষয়, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব পালনও সমানভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। জবাবদিহি যদি কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে প্রকৃত সংস্কারের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের শিক্ষা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের আস্থা। শিক্ষা কোনো দলীয় সম্পদ নয়; এটি জাতীয় সম্পদ। তাই শিক্ষা নিয়ে রাজনীতির বদলে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। কারণ শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ।

শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা হোক।

আপডেট সময় : ০৯:১৪:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

 

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষে, রাজনৈতিক মঞ্চে নয়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি সংকটকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত বিতর্কের চেয়ে রাজনৈতিক দোষারোপই বেশি আলোচিত হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, সমালোচিত হতে পারে, এমনকি ভুল প্রমাণিত হলে তা সংশোধনও হতে পারে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেই পদত্যাগ একমাত্র সমাধান—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আগে নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করতে হবে—ব্যর্থতা কোথায়, কার, এবং কতটুকু।

একটি জাতীয় পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করা কখনোই কেবল একজন মন্ত্রীর একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মিলিত দায়িত্বের ওপরই এর সফলতা নির্ভর করে। কোনো জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা গ্রহণে বাস্তব সমস্যা থাকলে, সেই তথ্য যথাসময়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যদি সেই প্রক্রিয়ায় কোথাও ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত। অন্যথায় প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না; বরং একই ভুল বারবার ফিরে আসবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আরেকটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়—বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে অতীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতায় এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে কোনো সাবেক বা বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, শিক্ষার মান, নীতির প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের আলোকে। রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিরোধিতার ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা হলে শিক্ষা নয়, রাজনীতিই লাভবান হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি। নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি সেই নীতির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ের তথ্য যদি সঠিকভাবে কেন্দ্রে না পৌঁছায়, অথবা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকে, তাহলে নীতিগতভাবে সঠিক সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই ব্যক্তি-নির্ভর সমালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গণতন্ত্রে সমালোচনা অপরিহার্য, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমাধানমুখী। একজন মন্ত্রীর সাফল্য বা ব্যর্থতা যেমন আলোচনার বিষয়, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব পালনও সমানভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। জবাবদিহি যদি কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে প্রকৃত সংস্কারের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের শিক্ষা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের আস্থা। শিক্ষা কোনো দলীয় সম্পদ নয়; এটি জাতীয় সম্পদ। তাই শিক্ষা নিয়ে রাজনীতির বদলে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। কারণ শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।