একটি রাষ্ট্রীয় সফর কখনো শুধু একটি সফর নয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বিদেশযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকে কূটনৈতিক বার্তা, রাজনৈতিক হিসাব, জাতীয় স্বার্থ এবং কখনো কখনো ইতিহাসের ভার।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও তাই নিছক সফরসূচির পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১৬ আগস্ট ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগে একটি “অনুকূল পরিবেশ” প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক আসামিদের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশাও সামনে এসেছে।
এই একটি বাক্য—“অনুকূল পরিবেশ”—দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে।
কারণ বাংলাদেশ এবার শুধু দিল্লির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আলোচনার টেবিলে বসতে চাইছে না; বরং আলোচনার আগে নিজের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোও টেবিলে রাখতে চাইছে।
এটি ভারতবিরোধিতা নয়
এই ঘটনাকে কেউ যদি সরলভাবে “তারেক রহমানের ভারতবিরোধী অবস্থান” বলে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে সম্ভবত পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশই একে অপরের জন্য অপরিহার্য প্রতিবেশী।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সীমান্ত, নদীর পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাই প্রশ্নটি ভারতকে বাদ দেওয়ার নয়।
প্রশ্নটি হলো—ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটি কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে?
সমমর্যাদার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে, নাকি একতরফা নির্ভরতার পুরোনো কাঠামোয়?
তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থানকে এই বৃহত্তর প্রশ্নের মধ্যেই দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
শেখ হাসিনা—কূটনীতির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তির কেন্দ্রে রয়েছেন শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করছে।
এখানেই দুই দেশের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য।
ঢাকার কাছে এটি একটি বিচারিক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
দিল্লির কাছে এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ, যার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব আইন, চুক্তি এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা জড়িত।
সুতরাং বিষয়টি যতটা রাজনৈতিক, ততটাই আইনি।
আর এই কারণেই কোনো পক্ষের অবস্থানকে সরলীকরণ না করে উভয় দিকের যুক্তি বোঝা জরুরি।
দিল্লির জন্যও বিষয়টি সহজ নয়
বাংলাদেশের দাবি যতই আবেগপূর্ণ হোক, ভারতের জন্য শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা একটি জটিল সিদ্ধান্ত।
ভারত ইতোমধ্যে বলেছে, প্রত্যর্পণ একটি “legal issue” এবং সে অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
অর্থাৎ দিল্লি এখনো প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এখানে ভারতের সামনে একটি কঠিন ভারসাম্য—
একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা;
অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নিজের আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা।
আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও। আগস্টের শুরুতে তাঁর দিল্লি থেকে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকার ক্ষোভ আরও বেড়েছে। The Guardian এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ভারত অবশ্য শেখ হাসিনার অবস্থানকে নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি হিসেবে স্বীকার করেনি; ভারতীয় সরকার সংসদে জানিয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি।
সুতরাং বাস্তবতা সাদা-কালো নয়।
তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানের পেছনে কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তিনটি স্তর দেখতে হবে।
প্রথমত, জাতীয় স্বার্থ।
একজন নির্বাচিত সরকারের কাছে পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।
শেখ হাসিনা ইস্যুটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। এই প্রশ্নে সরকার যদি অতিরিক্ত নরম হয়, তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
তৃতীয়ত, কূটনৈতিক মর্যাদা।
ঢাকা সম্ভবত বোঝাতে চাইছে—ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের অর্থ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্নগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়।
এখানেই তারেক রহমানের অবস্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য।
তিনি হয়তো বলতে চাইছেন—
“আমরা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক চাই, কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে।”
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বার্তাও একরৈখিক নয়
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেখা যাচ্ছে।
কেউ এটিকে বাংলাদেশের কঠোর দর-কষাকষি হিসেবে দেখছে। কেউ আবার মনে করছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো বিষয় ভারত তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিতে পারবে না।
Times of India জানিয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চললেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
আবার ভারতীয় পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ দিল্লির দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।
কূটনীতিতে দরজা বন্ধ না থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশার জায়গা।
পাকিস্তান ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিতে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরিবর্তন শুধু দুই দেশের বিষয় নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যদি আরও বহুমুখী হয়, তাহলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও তার প্রভাব পড়বে।
বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা ভারতের কৌশলগত হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। রয়টার্সের ফেব্রুয়ারির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে তাকে পুরোপুরি পাশ কাটানো বাংলাদেশের পক্ষেও বাস্তবসম্মত নয়।
এখানেই বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
ভারতকে দূরে সরিয়ে চীনের কাছে যাওয়া যেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমনি ভারতের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতাও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি।
কঠোরতা যদি আত্মমর্যাদা হয়, নমনীয়তাও হতে হবে প্রজ্ঞা
তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানের মধ্যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা আছে—এ কথা বলা যায়।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু দৃঢ়তা যথেষ্ট নয়।
দৃঢ়তার সঙ্গে প্রয়োজন ধৈর্য।
কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তির সম্পর্ক নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক।
আজ শেখ হাসিনা আছেন, কাল অন্য কেউ থাকবেন। আজ তারেক রহমান আছেন, ভবিষ্যতে অন্য সরকার আসবে। কিন্তু পদ্মা, মেঘনা, তিস্তা, সীমান্ত, বঙ্গোপসাগর, বাণিজ্য ও দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ—এসব থেকে যাবে।
তাই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আবেগকে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।
আবার জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কূটনৈতিক সৌজন্য দেখানোও কোনো রাষ্ট্রনায়কের কাজ হতে পারে না।
সঠিক পথটি মাঝখানে—দৃঢ় কিন্তু সংযত, আত্মমর্যাদাশীল কিন্তু বাস্তববাদী।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে—এই ঘটনাকে ‘ভারত বনাম বাংলাদেশ’ বানানো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে ফুটবল ম্যাচের মতো দেখি—কে জিতল, কে হারল।
কিন্তু কূটনীতি কোনো ক্রিকেট ম্যাচ নয়।
এখানে আজকের জয় অনেক সময় আগামী দিনের পরাজয়ের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে শত্রু হিসেবে দেখতে চায় না।
ভারতের সাধারণ মানুষও বাংলাদেশের শত্রু নয়।
দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, আত্মীয়তা ও ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক।
রাজনীতির টানাপোড়েনে সেই মানবিক সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তাহলে এখন করণীয় কী?
প্রথমত, দুই দেশকেই উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এড়িয়ে গোপন ও প্রকাশ্য কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি আবেগের পরিবর্তে প্রত্যর্পণ চুক্তি, আইন ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো অরাজনৈতিক কিন্তু জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক বিরোধের জিম্মি করা উচিত হবে না।
চতুর্থত, বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে।
এটাই হতে পারে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি।
শেষ কথা
তারেক রহমানের দিল্লি সফর আপাতত অনিশ্চিত—কিন্তু এটি কোনো সম্পর্কের শেষ নয়।
বরং হয়তো এটি সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু।
দিল্লির জন্য এটি একটি বার্তা—বাংলাদেশ বদলেছে।
ঢাকার জন্যও এটি একটি পরীক্ষা—নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে যেন বাস্তব স্বার্থকে বিসর্জন না দেওয়া হয়।
আর দুই দেশের জনগণের জন্য বার্তাটি আরও সহজ—
রাষ্ট্রের মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে শত্রুতা থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে পারে, ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হতে পারে—কিন্তু বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা হলো, সেখানে ভয় থাকে না, আধিপত্য থাকে না, থাকে পারস্পরিক সম্মান।
তাই তারেক রহমানের দিল্লি সফর হবে কি হবে না—এই মুহূর্তে সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—
বাংলাদেশ কি এমন এক পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে?
যদি পারে, তবে আজকের এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা একদিন ইতিহাসে পরিণত হতে পারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে।
আর যদি না পারে, তাহলে সফর হবে—হয়তো করমর্দনও হবে—কিন্তু সম্পর্কের ভেতরের অস্বস্তি থেকেই যাবে।
কূটনীতির প্রকৃত বিজয় তাই সফর আয়োজনের মধ্যে নয়।
প্রকৃত বিজয় হলো—মর্যাদা রক্ষা করে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখা।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক
সারাক্ষণ বার্তা।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 

























