লোক মানে মানুষ। আবার লোক (Folk) মানে অতীত লোক সম্পর্কিত কোন কাহিনি যা হারিয়ে গিয়েছে বা হারাতে বসেছে। তা হতে পারে গান,শিল্প,লোকাচার অথচ তা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। এই প্রচলিত বিষয়ই লোক (Folk) বা লোকজ।
বাবুখালী মূলত একটি ইউনিয়ন। মাগুরা জেলার মহম্মদপুর থানার একবারে উত্তর সীমানায় মধুমতী নদীর দক্ষিন তীর ঘেসে অবস্থিত। খাল,বিল,কালি গংগা আর মধুমতী নদী বিধৌত ছোট একটি জনপদ। কালি গংগা নদীটি বাঁশো গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল।এ নদীর অস্তিত্ব এখন আর নাই। এক সময় মধুমতীর ঘোলা জল বয়ে আনতো পলি মাটি। এ মাটি প্রলেপ দিত মাঠের বুকে।জমি হতো উর্বর। সে উর্বর মাটি আর কৃষকের হাতের যত্নে লাংগলের ফলার তীব্র আচড়ে উৎপাদিত হতো আউশ আমন ধান। আর মানুষের মন ও মননে জন্ম দিয়েছে আনন্দ, উচ্ছাস,আবেগ আর ভালবাসার অনুভূতি।
সময়টা ছিল ষাটের দশক। এ সময়ে মোকছেদ মোল্লার ধুয়োজারি এবং সায়েরও নতুন আউশ,আমন ধানের মতই ছিল উজ্জীবিত প্রানের উৎস। নতুন উঠা আউশ ধান দিয়ে, চিড়ে কুটে খেজুর রসের ঝোলা গুড় মেখে খেতে খেতে সম্পন্ন গৃহস্থের কাছারি মুখর থাকত, একক গান,কিসসা,জারি,ধুয়ো জারি গানে, কিতাব পাঠে। লুডু, সাত গুটি বাঘ বন্ধ, তেপতিয়া খেলায় মেতে উঠতো কেউ কেউ। কেউ আবার হুকোর কলকেয় তামাক সাজিয়ে অগ্নি সংযোগে ধুয়োর স্বাদ নিত।
বিকেল গড়িয়ে রাত হয়ে যেত এ সব গান শুনতে শুনতে। তারপর দিন আবারও। সময় কাটানোর এ উৎসবের আমেজ যেন লেগেই থাকতো এ কাছারি গুলোতে।লোক আপ্যায়নের জন্য সব সময়ই ব্যাড়াতে ঝুলানো থাকতো হুকো, তামাক আর মালসায় ঘুটোর আগুন। সামান্য তামাকের ধূয়া সেবনেই খুশি থাকতো কিছু মানুষ।
এ ইউনিয়নে কাছারি ছিল প্রচুর।শুধু এ ইউনিয়নেই নয়।কাছারি সংস্কৃতি সারা বাংলাদেশ জুড়েই ছিল।তবে সকল কাছারিতেই এ রকম লোকজ আমেজ ছিলনা। বাবুখালী ইউনিয়নে এ রকম হাতেগোনা কয়েকটি কাছারি ছিল।তন্মধ্যে চালমিয়া গ্রামের এয়াকুব মোল্যা, করিম খানের, দাতিয়াদহের আফতাব খানের,বাঁশো জাফর বিশ্বাসের, ফলসিয়া অন্টু ডাকতারের,আড়পাড়া রফি উদ্দিন মোল্লার, আঁকশা চর বদর উদ্দিন জমাদার,দাতিয়াদহের নিতাই সাহার, হরিনা ডাংগা রহমান মাষ্টারের কাছারি অন্যতম।
কাছারি এ ইউনিয়নে অনেক থাকলেও লোকজ আমেজের কাছারির সংখ্যা ছিল কম। বিশেষ করে যে সমস্ত কাছারির মালিক একটু সংস্কৃতিমনা কেবলমাত্র তাদের কাছারিই এ রকম ছিল। এ সব কাছারিতে শুধুমাত্র লোকজ আনন্দেই পরিপূর্ণ ছিল না। মানবিক মূল্যবোধও এ সকল কাছারির সাথে জড়ানো থাকত। অচেনা ক্লান্ত পথিকও এ সব কাছারিতে আশ্রয় নিত। সে সময় অনেক কাছারিওয়ালা লজিং মাষ্টার রাখতেন এ সকল কাছারিতেই। এ সকল কাছারির মালিক ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার সাথে সাথে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতেন।
হ্যারিকেন, মাটির প্রদীপ, অনেক সময় হ্যজাক জ্বালিয়েও বসত আসর। এ সমস্ত আসরে যে সকল গায়ক,কথক অংশগ্রহণ করতেন তারা কেউই তেমন লেখা পড়া জানতেন না।তবে দু একজন যা থাকতো তারা কোনমতে স্বাক্ষর জ্ঞান ছিল। কথা বলতে গেলে উচ্চারণ সঠিক হতো না ঠিকমত কিন্তু কাহিনি বা গানের পদের উচ্চারনে ভুল হতোনা।
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অনেক রাত পর্যন্ত চলত জারি, সারি,ধুয়ো জারি, পুঁথি, সায়ের,গাজির গীত,কিতাব পড়া,কিসসা। এক একদিন এক একটা বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো।
এ বাদেও বাড়ির অন্দর মহলের উঠানে খোলা আকাশের নীচে খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে মা,নানী,দাদি,খালা,ফুফুরা শিশুদের শোনাতেন চাঁদ মামা,বানেছা পরী,রাক্ষস খোক্ষস এর গল্প, গলাকাটা নীলকর সাহেবদের গল্প, এমনই কত কি।
কোন কোন বাড়িতে কামলা বা কৃষি শ্রমিক নেয়া হতো যারা এ সমস্ত কাহিনি জানতেন তাদের। এ গুলো করতেন তারাই যারা সংস্কৃতিমনা কাছারির মালিক ছিলেন।
বাবুখালী ইউনিয়নে এ সকল গান,কিসসা,কিতাব পড়ার সাথে যুক্ত থেকে জন বা কামলা দিত আকরম,ছলেমান(জ্যোৎস্না),ছরোয়ার (ছরু),সামাদ বয়াতি,মজিদ বয়াতি অন্যতম। এ ছাড়াও যারা কামলা দিত না অথচ সৌখিন বয়াতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইতেন তাদের মধ্যে বাশার,আতিয়ার,আয়নাল অন্যতম। আবার অনেক কে ধুয়োজারি শোনার জন্য গায়ককে দাওয়াত দিয়ে আনা হতো এ সকল কাছারিতে। এদের দূটো খাবারের ব্যবস্থা করলেই আসরে পাওয়া যেত। স্থানীয় কবি মোকছেদ মোল্লার ধুয়ো,সায়েরই বেশি চলতো।
আকরাম,ছলেমান,ছরোয়ার আপন তিন ভাই।বাপের নাম আইন উদ্দিন। আইন উদ্দিনও জারি,ধুয়ো জারি, কিতাব পাঠের সাথে জড়িত ছিলেন।গান বাজনা তার খুব প্রিয় ছিল।বেশ জমি জমারও মালিক ছিলেন। কিন্তু কাজ ফেলে গান বাজনা নিয়ে মেতে থাকতে থাকতে ফসল ফলানোর কথা ভুলে যেতেন।তাই ঘরে ফসল না উঠার কারণে অভাব দেখা দেয়।এক সময় তিনি ভূমিহীন হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়েই তার সন্তানদের কৃষি শ্রমিক হয়ে জীবন যাপন করতে হয়েছে। কৃষি শ্রমিক হলেও বাপের মতই সংস্কৃতি মনা ছিলেন। আর এই সংস্কৃতিমনার পরিচয় দিনে দিতেন ক্ষেত খামারে এবং রাতে মালিকের কাছারিতে। এরা ছাড়া আরও অনেক ছিল। এখন তাদের নাম আর পাওয়া যায় না।
তখন ছিল মোকছেদ মোল্লার ধুয়োজারি,সায়ের এলাকার মানুষের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম।আকরমের দরাজ কন্ঠে মোকছেদ মোল্লার সায়ের পাঠে মুগ্ধ করতো ।তার এই দক্ষতার জন্য যারা একটু সংস্কৃতিমনা তারা একে জমিতে কাজের শ্রমিক হিসেবে নিত।
ছলেমান কাজের ফাঁকে ঘোড়ার গাড়িও বাইতে দেখা যেত। তিনি পরবর্তীতে কবি মোকছেদ মোল্যার জারি দলের সাথে যুক্ত হয়ে যান।
আকরম আমের পাতা মুখে দিয়ে ভালো বাঁশি বাজাতে পারতো। মহিলা অন্তপুরে মাঝে মাঝে তার এই বাজনার জন্য ডাক পড়ত।এরা তিন ভাই করিম খানের বাড়িতেই বেশি কাজ করতো। করিম খানের পূর্ব পুরুষ নবাব সরফরাজ খানের সময় এখানে আসেন কিছু জমি পত্তনি নিয়ে।সেই থেকে তারা এখানে অনেক জমির মালিক।
ছরোয়ার তিন ভাইয়ের সবার ছোট। তিনি গানের চেয়ে কিসসা বেশি শুনাতেন। কিসসার সাথে সংগতি রেখে গানও গাইতেন।কিসসা তাতক্ষনিক তৈরী করতে পারতেন।
তার কিসসার জনপ্রিয় গল্পটা ছিল পাতাল পুরির রাজ কন্যা। রাক্ষস কর্তৃক অপহৃত রাজ কন্যাকে উদ্ধারের কাহিনী।পরবর্তীতে এ ধরনের সিনেমাও দেখা গিয়েছিল।
তিনি যখন পরীর গল্প শুনাতেন তাতে ভয়ও ছিল আবার রোমাঞ্চিতও হতো শিশুরা। তার গল্পের চমতকারিত্বে শিশুরা সবই সত্য মনে করত। বর্ননায় পরীদের দেশ কুহক নগরে নিয়ে যেতেন। শ্রোতাদের অধিকাংশই থাকতো শিশু।
মধুমালা মদন কুমারের কিসসা বলতে বলতে নিজেও আবেগ ঘন হয়ে পড়তেন। যৌবনের রোমাঞ্চকর অনুভূতির বহি:প্রকাশ ছিল কাল্পনিক কাহিনি হলেও। যেমন
স্বপ্ন যদি মিথ্যা হইত
পালংক কেন বদল হইলো গো মা ধন।
স্বপ্ন যদি মিথ্যা হইত
মালা কেন বদল হইলো গো মা ধন।
আমি স্বপ্নে দেখলাম মধুমালার মুখ রে।
স্বপ্নে ভালবাসার বাস্তব অনুভুতি। একি সহজে ভোলা যায়? বাস্তব মন থেকে স্বপ্নের এ ঘোর সরে না।ফিরে ফিরে মনের মধ্যেই ঘুরপাক খায়।
দুজন বয়াতিকে দেখা গিয়েছে ঘরে বাঁশের বেড়া বুননের কাজে গিয়ে গান এবং কিতাব পাঠ করতে।আব্দুস সামাদ এবং আব্দুল মজিদ এদের নাম। আব্দুস সামাদের বাড়ি হরিনাডাংগা গ্রামে।তার একটি সারিন্দা ছিল।কাজ করতে গেলে এটিকে সাথে করে নিয়ে যেতেন। কাজ শেষে সন্ধ্যার পরে কাছারিতে শুরু হতো সমাদের গান। রাতের খাবারের সময় হলে বাড়ির ভিতর থেকে খবর আসত রান্না হয়ে গিয়েছে। সামাদ বয়াতি রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি চলে যেতেন।
আব্দুল মজিদও বাঁশের বেড়া বুনতেন।তার বাড়ি কোমরপুর গ্রামে। কিতাবের কাহিনি গুলো তার মুখস্ত ছিল। কিতাব তাকে বগলে করে নিয়ে বেড়াতে হতো না। তিনি নিজেই ছিলেন একটা আস্ত কিতাব।অথচ একেবারেই তিনি লেখা পড়া জানতেন না।
এ ছাড়াও চালমিয়া গ্রামে দুজন সৌখিন কিতাব পাঠক ছিলেন। আব্দুল করিম খান ও তজিবর মোল্লা। করিম খান তিনি তার কাছারির বাইরে কিতাব পাঠে যেতেন না। নিজেই তার দরাজ কন্ঠে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।তার নিজের একটি কিতাব সংগ্রহে ছিল।পরবর্তীতে বাশার নামের একজন বয়াতি নিয়ে যায়।
তজিবর মোল্লাও সৌখিন কিতাব পাঠক ।কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরেও মজমায় অংশগ্রহণ করতেন। তার হাতের কিতাবটি এখনও তার বাড়িতে সংরক্ষিত আছে।
হরিনা ডাংগা গ্রামের রহমান মাষ্টারের কাছারি ছিল সে সময়ের ব্যাতিক্রমধর্মী কাছারি।সংস্কৃতি চর্চার সাথে সাথে এখানে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের জন্যও বৈঠক বসত।যারা এখানে গান বাজনা শুনতে আসত তাদেরকে স্বাধীনতার পক্ষে উদবুদ্ধ করতেন রহমান মাষ্টার। তিনিই বাবুখালী বাজারে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তার দোকানে উত্তোলন করেন।
রহমান মাষ্টারের কাছারিতেও সামাদ,বাশার,আতিয়ার জারি গানের আসর বসাতেন।পরবর্তীতে সামাদ বেশ খ্যাতিমান বয়াতিতে পরিনত হন।তিনি মাঝে মধ্যে খ্যাপেও গান গাইতে যেতেন।
গাঁজির গীতে যিনি উন্মাদ ছিলেন তিনি চালমিয়া গ্রামের কিতাবদি শেখ । তাকে ফাটকিদার কিতাবাদী বলা হতো। এ গীতের কৌতুক অভিনেতা ছিলেন তিনি। গাঁজীর গীত সাধারনতঃ মানত গীত হিসেবেও অনেকে বিবেচনা করতেন।কারন সংসারে যাদের ছেলে সন্তান না হতো তারা গাঁজীর মত সাহসী সন্তানের আশায় এ গানের আয়োজন করতেন। এটা নাকি ইসলাম ধর্মে বিদত।তাই কিতাবাদী শেখকে একবার তওবা করতে হয়েছিল। তারপর তিনি ছেড়ে দেন। চালমিয়া গ্রামে বাকি আলী নামে আরও একজন ফাটকিদারের নাম পাওয়া যায়। এরা কেউই লেখা পড়া জানতেন না। অথচ চমৎকার ছিল তাদের বর্নন ও অভিনয় দক্ষতা।
বাঁশো গ্রামে এখনও এ গানের গায়ক জীবিত আছেন।সংগী সাথীর অভাবে আর এ গান গাওয়া হয় না। নাম তার আনোয়ার। বাপের নাম রোস্তম আলী। তিনিও একজন ওঝা ছিলেন।
কাছারিতে আর তেমন ধুয়ো জারির আয়োজন হতো না।মূলতঃ এ গান ছিল মাঠ কাপানোর গান। মাঠে আষাঢ় মাসের উৎসব ছিল দু রকম।এক, ঘন বৃষ্টি কৃষকের নিকট উৎসবের আমেজ ছিল।কারন মাঠে কৈ মাছ উদোস উঠা, মাছের প্রাচুর্যের সম্ভাবনায় এবং আউশ ধানের ফলনের আশায়।দুই, মাঠে মাঠে ধুয়ো জারির সমবেত সুর। তবে এ গানের আয়োজন কাছারিতেও হতো তা খুব স্বল্প। কবি মোকছেদ মোল্লার সাথের দোহারগুলো বা শ্রতারা মুখস্ত করে এ গান শোনাত। এ রকম কয়েক জনের নাম পাওয়া যায়। বাঁশোর হাফিজার,কওছার,চালমিয়ার ছরোয়ার। কওছার ও ছরোয়ার এখনও জীবিত এবং তার দলের চারজন সদস্য আছে। মাঝে মাঝে তারা এখনো এ গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
দাতিয়াদহের নিতাই সাহার কাছারি ছিল এর ব্যাতিক্রম। সেখানে এলাকার কিছু অভিজাত লোকের আড্ডা হতো পাশা খেলার জন্য। বাবুখালী এলাকায় কেবলমাত্র এই কাছারিতেই পাশা খেলা হতো।খেলায় নিয়মিত অংশ গ্রহন ছিল নিতাই সাহা,হরেন্দ্রনাথ ঘোষ, অমৃতলাল ঘোষ,কেষ্ট রাহা, জবু মিয়ারও এখানে সরব উপস্থিতি ছিল।
আমরা যাইই বলিনা কেন প্রবাদ প্রবচন যে মানুষের মুখ নিসৃত কষ্টের বানী তা বুঝা যায়।এ গুলো কষ্টের বা সুখের গল্প করতে করতেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসত।ধীরে ধীরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে এক সময় প্রবাদ হয়ে যায়। এ রকম কয়েকটি ভিন্ন ধর্মীয় প্রবাদের সন্ধান পাওয়া যায়।যা কাছারিতে আড্ডা দিতে দিতেই জন্ম হয়েছে। যেমন
নানা জানের আধলা
ঠাপাই আমি আর বাদলা।
অর্থাৎ ইজাহার ও বাদলা নামের দুজন সহজ সরল কৃষি শ্রমিক। তাদেরকে ইয়াকুব মোল্লা নামক জমি জমার মালিক তিন আধলা (ত্রিশ শতক) জমিকে এক আধলা (দশ শতক) বলে মজুরি দিত।কিন্তু তাদের সন্দেহ হলেও কাজের এত অভাব ছিল যে এ কাজ না করলে তাদের আহার জুটতো না। তাই আধলা ভেবেই তিন আধলার জমিতে কাজ করতো। তখন ওজনের একক ছিল সের। দশ সের সমান এক আধলা। এই জমির পরিমাণের কথা এজাহারকে বলে দিলে মনের কষ্টে ও কথাগুলো বলে। ধীরে ধীরে এটা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে যায়। এমনকি এখনো আছে।
হাফিজার খান নামে বাবুখালীর একজন কৃষক। তিনি স্কুলেও কেরানির কাজ করতেন। সে সময় কেরানি হিসাবে তেমন টাকা ছিল না। চাকরির পাশাপাশি তিনি কৃষি কাজ করতেন। এক দিকে চাকরি অন্যদিকে কৃষি কাজ দুটো এক সাথে ভালমতো করা যায় না।ফলে কোন কাজই ভালো করে করতে পারতেন না। যে কারণে গরুগুলোর স্বাস্থ্যও ভাল ছিল না।
তিনি গরুগুলো কাঁচা রাস্তার ধারে বেঁধে রেখে স্কুলে যেতেন।রাস্তার পাশের ক্ষেতের ধান অনেক সময় খেয়ে ফেলতো। কাছারিতে এ গুলো আলোচনা হলে তিনি বলতেন
শালার ফানা(স্বাস্থ্য হীন) গাই(গাভী) দুধ দেও আচ্ছর(আধাসের)
আর পরের ধান খাইয়ে কাটো যাবর।
তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন সামাল দেওয়ার সামর্থ অনুসারে অন্যায় কাজ করতে হয়।
আবার তারই জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপর একটি প্রবাদ আছে।তখন সময় ষাটের দশক শেষ এবং সত্তরের দশকের শুরু।জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচার প্রচারনা তুংগে। অথচ তার নয়টি সন্তান।তা তিনি সামাল দিয়ে পারছিলেন নাই। তাই তিনি জন্ম নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বলতে গিয়ে বললেন
আমার নয় দশটা পোলাপান
একসাথে পাইনে সারাক্ষণ
এক সময় এদেশে গ্রামীণ জীবনে বিনোদনের জন্য কোন অডিটোরিয়াম ছিলনা। বিনোদনের কোন আলাদা জায়গা ছিলনা।কাছারিগুলো এবং বাড়ির কাছারির সামনে খোলা জায়গা ছিল বিনোদন, নির্মল,নিরেট আনন্দের অডিটোরিয়াম । এটিই মানুষকে একত্রিত হওয়ার এবং একে অপরকে জানার সুযোগ করে দিত। আজ কাছারিও নেই ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের মিলন বন্ধনও ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
সৈয়দ রবিউল ইসলাম - সাবেক অধ্যক্ষ 






















