একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাঙ্গনে। যেখানে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চা হওয়ার কথা, সেখানে যদি পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর এবং শিক্ষকের মর্যাদাহানির অভিযোগ ওঠে, তবে তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
গত ১১ জুলাই ২০২৬ ভোলার চরফ্যাসনের ফাতেমা মতিন কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে আইসিটি পরীক্ষা চলাকালে নকল করতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষে কিছু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী নকলের দাবিতে স্লোগান দেয় এবং পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষা কেন্দ্র ভাঙচুর ও শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো—একটি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ না পাওয়া কি কখনো সহিংসতার কারণ হতে পারে? উত্তর অবশ্যই ‘না’। নকলের সুযোগ পাওয়া কোনো অধিকার নয়; বরং সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত পরীক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা সবার দায়িত্ব।
একজন শিক্ষক যখন পরীক্ষার হলে নকল প্রতিরোধ করেন, তখন তিনি কোনো শিক্ষার্থীর শত্রু নন। তিনি বরং শিক্ষার মান, পরীক্ষার পবিত্রতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। নকলের মাধ্যমে অর্জিত নম্বর হয়তো একটি কাগজে সাফল্যের চিহ্ন তৈরি করতে পারে, কিন্তু জীবনের বাস্তব পরীক্ষায় তা কোনো কাজে আসে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষাঙ্গনে ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হচ্ছে যেখানে কেউ কেউ মনে করছে—চাপ সৃষ্টি করে, বিশৃঙ্খলা করে বা শক্তি প্রদর্শন করে দাবি আদায় করা যায়। এই প্রবণতা শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
যদি কোনো শিক্ষার্থী বা অন্য কোনো ব্যক্তি পরীক্ষা কেন্দ্রের শৃঙ্খলা নষ্ট, ভাঙচুর, ক্ষয়ক্ষতি, হুমকি বা শিক্ষকদের লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ আইনহীনতা কখনো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক। আবেগ বা গুজবের ভিত্তিতে নয়, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ যেন অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার না হন—এ দায়িত্বও প্রশাসনের।
শিক্ষক সমাজ আজ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম কর্তব্য। যে সমাজে শিক্ষক অপমানিত হন, সে সমাজে জ্ঞানের আলো ম্লান হয়ে যায়।
এ ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার—শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের ঘাটতি কোথায় তৈরি হচ্ছে। পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে এ বিষয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
শিক্ষাঙ্গনকে কোনো ধরনের অরাজকতা, প্রভাব বিস্তার বা স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে শান্তি, শৃঙ্খলা ও জ্ঞানচর্চার স্থান—এটাই প্রত্যাশিত।
ভোলার চরফ্যাসনের ফাতেমা মতিন কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রের ঘটনাটি তাই শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা নিয়ম ভেঙে সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করবে? নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা সততা, পরিশ্রম ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে?
সময়ের দাবি স্পষ্ট—
নকলের সংস্কৃতি রুখতে হবে, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং শিক্ষাঙ্গনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 






















